গভীর রাত। নিঝুম গ্রাম কানাইপুর। কালচে কুয়াশায় ঢাকা বাঁশবাগান আর আঁকাবাঁকা কাঁচা রাস্তার ওপর এসে পড়েছে ফ্যাকাশে চাঁদের আলো।
গ্রামের বুড়ো শিবু মন্ডল সে রাতে হাট থেকে ফিরছিলেন একা। হাতে একটা টিমটিমে হারিকেন, আর কাঁধে হালকা ঝোলা। বাঁশবাগানটার কাছাকাছি আসতেই বাতাসের বেগ হঠাৎ করে বেড়ে গেল। বাঁশগাছগুলো একটার সাথে আরেকটা ঘষে গিয়ে অদ্ভুত এক কঁকিয়ে ওঠার মতো শব্দ তৈরি করছে।
শিবু কাকা নিজের মনেই বিড়বিড় করে উঠলেন, "আজ আবার বাতাসের এত দাপট কেন রে বাপু?"
ঠিক তখনই দূর থেকে ভেসে এলো খুব মৃদু এক মিষ্টি কণ্ঠের ডাক— "শিবু কাকা... ও শিবু কাকা... একটু দাঁড়াও না..."
শিবু কাকা থমকে দাঁড়ালেন। এই নিশুতি রাতে এমন পরিচিত কণ্ঠে কে ডাকবে? গলাটা যেন পাশের বাড়ির রহিম শেখের ছোট মেয়েটার। হারিকেনটা একটু উঁচিয়ে শিবু কাকা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বললেন, "কে রে? জমিলা নাকি? এই অসময়ে বাঁশবাগানে কী করছিস মা?"
ঝোপের আড়াল থেকে একটা ছোট্ট আবছা অবয়ব বেরিয়ে এলো। আলোয় তার মুখটা ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না, তবে পরনে সেই লাল জামাটা—যেটা পরে জমিলা সব সময় ঘুরে বেড়ায়।
মেয়েটি খিকখিক করে হেসে উঠে বলল, "কাকা, আমার পুতুলটা বাঁশঝাড়ের পেছনে পড়ে গেছে। একটু বের করে দেবে?"
শিবু কাকা মনে মনে ভাবলেন, এত রাতে বাচ্চা মেয়েটা একা কেন? কিছুটা স্নেহের বশেই তিনি হারিকেনটা একহাতে ধরে ঝোপের দিকে এগোলেন। বাঁশঝাড়ের ঘন অন্ধকারের ভেতরে আলোটা ধরতেই তার চোখ কপালে উঠল।
বাঁশঝাড়ের গোড়ায় মাটির ওপর পড়ে আছে জমিলার সেই পরিচিত পুতুলটা, কিন্তু সেটির গা বেয়ে টাটকা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। আর সবচেয়ে ভীতিপ্রদ বিষয় হলো—তিনি তো বিকেলেই শুনেছিলেন, জমিলা আজ দুপুরে পুকুরে ডুবে মারা গেছে! গ্রামজুড়ে সে নিয়ে কত কান্নাকাটি হলো!
শিবু কাকা শক্ত হয়ে গেলেন। হিমশীতল এক স্রোত যেন তার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল। তিনি ধীরে ধীরে মাথা ঘুরে পেছনে তাকালেন।
সেই আবছা অবয়বটা এখন আর ছোট বাচ্চার মতো নেই। সেটা ধীরে ধীরে ওপরের দিকে দীর্ঘ হচ্ছে। তার হাত দুটো অস্বাভাবিক লম্বা হয়ে হাঁটুর নিচে নেমে এসেছে, আঙুলের নখগুলো কাস্তের মতো বাঁকা আর ধারালো। মুখটাতে কোনো চোখ বা নাক নেই—শুধু একটা বিশাল রক্তবর্ণ হাঁ করা হা, যেখান থেকে দুর্গন্ধযুক্ত ধোঁয়া বের হচ্ছে।
জীব রূপটা এবার আর মিষ্টি গলায় নয়, বরং পুরো বাঁশবাগান কাঁপিয়ে এক বিকট ঘড়ঘড়ে গলায় বলে উঠল, "পুতুলটা তো দিলে না, শিবু কাকা... তবে তোমাকেই নিয়ে যাই!"
লম্বা হাত দুটো শিবু কাকার দিকে তড়িৎ গতিতে এগিয়ে এলো।
শিবু কাকা আর এক মুহূর্তও না ভেবে হাতের হারিকেনটা ফেলে দিয়ে চিৎকার করে দৌড় দিলেন। পেছনে শোনা যেতে লাগল শুকনো পাতায় ভারী কিছু খসখস করে তেড়ে আসার শব্দ আর অমানুষিক এক হা-হা হাসির প্রতিধ্বনি।
তিনি কীভাবে যে প্রাণ হাতে নিয়ে দৌড়ে গ্রামের মন্দিরের প্রাঙ্গণে গিয়ে পৌঁছালেন, তা তাঁর মনে নেই। মন্দিরের পুরোহিত তাকে ওভাবে ধপাস করে পড়ে যেতে দেখে ছুড়ে নিয়ে এলেন ভেতরে।
পরদিন সকালে শিবু কাকার সর্দি-জ্বর এসে গেল। আর গ্রামের মানুষ বাঁশবাগানের মুখে গিয়ে দেখল—শিবু কাকার ফেলে যাওয়া হারিকেনটা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে মাটির নিচে গেঁথে আছে, যেন বিশাল কোনো অমানুষিক হাত সেটাকে এক চাপে পিষে ফেলেছে।
সেই থেকে কানাইপুর গ্রামের কেউ আর নিশুতি রাতে একা ওই বাঁশবাগানের পথ দিয়ে হাঁটে না।