বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস কেবল কালজয়ী রচনার ইতিহাস নয়, এটি বিদ্রোহ, প্রতিবাদ এবং সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে লড়াইয়েরও ইতিহাস। তৎকালীন শাসকশ্রেণী বা সামাজিক গোঁড়ামির ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া এমন ৫টি নিষিদ্ধ বইয়ের গল্প নিচে দেওয়া হলো:
১. পথের দাবী — শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
প্রকাশকাল: ১৯২৬
কেন নিষিদ্ধ হয়েছিল: ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনকে সহানুভূতি ও সমর্থনের চোখে দেখানোর কারণে ১৯২৭ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার বইটি বাজেয়াপ্ত ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
প্রভাব: বইটিতে বিপ্লবী চরিত্র 'সব্যসাচী'র দেশপ্রেম তৎকালীন তরুণ সমাজকে গভীরভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় এটি বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার অন্যতম জ্বালানি হিসেবে কাজ করে।
২. পথের আলো — কাজী নজরুল ইসলাম
প্রকাশকাল: ১৯৩১
কেন নিষিদ্ধ হয়েছিল: কাজী নজরুলের ‘যুগবাণী’, ‘বিষের বাঁশী’, ‘ভাঙার গান’ এবং ‘প্রলয়শিখা’র মতোই এই গ্রন্থটিতেও রাজদ্রোহের উপাদান খুঁজে পেয়েছিল ব্রিটিশ সরকার। এটি তাঁর নিষিদ্ধ হওয়া পাঁচটি প্রধান বইয়ের একটি।
প্রভাব: নজরুলের লেখনী তরুণ ও সাধারণ মানুষকে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে ও যেকোনো মূল্যে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
৩. জাগরী — সতীনাত দাস (পদ্মানন্দ দাস / সতীনাত ভাদুড়ী)
প্রকাশকাল: ১৯৪৫
কেন বিতর্ক ও কড়াকড়ির মুখে পড়েছিল: সতীনাত ভাদুড়ীর 'জাগরী' ১৯৪২ সালের 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত। ব্রিটিশবিরোধী এই উপন্যাসটি জেলখানার ফাঁসির মঞ্চের এক রাতের প্রেক্ষাপটে লেখা, যা তৎকালীন রাজনীতির ভেতরের নগ্ন সত্য প্রকাশ করায় সরকারি ও সামাজিক ব্যাপক রোষের মুখে পড়ে।
প্রভাব: রাজনীতির মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও ব্রিটিশ শাসনের নিষ্ঠুরতা ফুটিয়ে তুলে বাংলা রাজনৈতিক উপন্যাসের ধারায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিল বইটি।
৪. দুই বোন — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রকাশকাল: ১৯৩৩
কেন নিষিদ্ধ ও বিতর্কের মুখে পড়েছিল: রবীন্দ্রনাথের এই উপন্যাসটি সরাসরি সরকারি আইনি নিষেধাজ্ঞায় না পড়লেও তৎকালীন রক্ষণশীল সামাজিকভাবে ব্যাপকভাবে বয়কট ও নিষিদ্ধের মুখোমুখি হয়। মানব চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা এবং নারীর মনোজগতকে সামাজিক প্রথার বাইরে গিয়ে ফুটিয়ে তোলায় তৎকালীন সমাজ একে মেনে নিতে পারেনি।
প্রভাব: সামাজিক গোঁড়ামির প্রাচীর ভেঙে বাংলা সাহিত্যের রোমান্টিক উপন্যাসকে এক আধুনিক ও প্রাপ্তবয়স্ক রূপ দিয়েছিল এই রচনা।
৫. লজ্জা — তসলিমা নাসরিন
প্রকাশকাল: ১৯৯৩
কেন নিষিদ্ধ হয়েছিল: ১৯৯২ সালে ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙার পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নেমে আসা নির্যাতনের পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাসটি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অভিযোগে বাংলাদেশে সরকারিভাবে নিষিদ্ধ করা হয়।
প্রভাব: দক্ষিণ এশিয়ার সামাজিক ও ধর্মীয় রাজনীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রচণ্ড তোড়জোড় ও আলোচনার জন্ম দেয় বইটি, যা আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত ঘটনার সূচনা করে।
এই ৫টি বইয়ের মধ্যে কোনটি আপনি ইতোমধ্যে পড়েছেন? কমেন্টে জানান এবং পরবর্তী পার্ট দেখতে ফলো দিয়ে রাখুন!