Article

ধনসম্পদের প্রাচুর্যের আড়ালে যে শূন্যতা

September 24, 2026

15 views

অর্থই কি সুখের মূল?

মানুষ অর্থের পেছনে ছোটে। একটু স্বচ্ছলতার জন্য, একটু নিরাপত্তার জন্য, প্রিয়জনের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। তারপর কখনো কখনো সেই ছোটার শেষ কোথায়—তা আর মনে থাকে না। একসময় অর্থ হয়ে ওঠে সাফল্যের মাপকাঠি, সম্পদ হয়ে ওঠে মর্যাদার প্রতীক। আমরা ভাবি, আরও একটু অর্থ, আরও একটু স্বাচ্ছন্দ্য—তারপর বুঝি জীবন পূর্ণ হবে।

কিন্তু সত্যিই কি তাই?

পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষগুলোর জীবন আমাদের সামনে সেই প্রশ্নটিই নতুন করে দাঁড় করায়। যাঁদের কাছে অর্থের অভাব নেই, যাঁরা চাইলে পৃথিবীর বহু বিলাসিতা হাতের মুঠোয় আনতে পারেন, তাঁদের অনেকের ব্যক্তিজীবনেও এসেছে বিচ্ছেদ, ভাঙন, একাকিত্ব কিংবা সম্পর্কের সমাপ্তি। অর্থাৎ অর্থের প্রাচুর্যও সবসময় সম্পর্কের স্থায়িত্বের নিশ্চয়তা নয়।

অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস ও ম্যাকেঞ্জি স্কটের দাম্পত্য ছিল প্রায় ২৫ বছরের। তাঁরা একসঙ্গে পরিবার গড়েছেন, সাফল্যের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন। অথচ ২০১৯ সালে তাঁদের সেই দীর্ঘ দাম্পত্যের সমাপ্তি ঘটে বিবাহবিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে।

মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস এবং মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটসও ২৭ বছরের দাম্পত্যের পর ২০২১ সালে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সম্পদের মালিক হয়েও তাঁদের সম্পর্ক চিরস্থায়ী হয়নি।

গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিনের দাম্পত্যও শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদের পথে গড়ায়। এলন মাস্কের ক্ষেত্রেও দেখা যায় একই বাস্তবতার আরেকটি রূপ—তালুলাহ রাইলির সঙ্গে তাঁর বিয়ে একবার ভেঙে যাওয়ার পর তাঁরা আবার বিয়ে করেছিলেন; পরবর্তীতে সেই সম্পর্কও শেষ হয়।

এই মানুষগুলোর কারও ব্যক্তিগত জীবনের অন্তর্গত কারণ আমরা সম্পূর্ণভাবে জানি না। বাইরে থেকে একটি সম্পর্ককে সুখী কিংবা অসুখী বলে দেওয়া সহজ, কিন্তু একটি সংসারের দরজা বন্ধ হয়ে গেলে তার ভেতরের কান্না, নীরবতা, অভিমান কিংবা দূরত্বের গল্প বাইরের মানুষ খুব কমই জানতে পারে।

তবু ঘটনাগুলো আমাদের একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—

যদি বিপুল অর্থই সুখের মূল হতো, তবে এত সম্পদের মালিক মানুষের জীবনেও কেন কখনো সম্পর্ক ভেঙে যায়?

কারণ অর্থ আর সুখ এক জিনিস নয়।

অর্থ দিয়ে একটি সুন্দর বাড়ি কেনা যায়; কিন্তু সেই বাড়িতে ভালোবাসার উষ্ণতা কেনা যায় না।

অর্থ দিয়ে দামি বিছানা কেনা যায়; কিন্তু প্রশান্তির ঘুম কেনা যায় না।

অর্থ দিয়ে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে উড়ে যাওয়া যায়; কিন্তু দূরে সরে যাওয়া দুটি হৃদয়কে সবসময় কাছে আনা যায় না।

অর্থ আমাদের অনেক প্রয়োজন মেটায়। ক্ষুধার কাছে অর্থ গুরুত্বপূর্ণ, চিকিৎসার কাছে অর্থ গুরুত্বপূর্ণ, শিক্ষার কাছে অর্থ গুরুত্বপূর্ণ। দারিদ্র্যের যন্ত্রণা যে বাস্তব—তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু মানুষের কিছু চাহিদা আছে, যেগুলোর মূল্য টাকা দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না।

একজন মানুষ হয়তো কোটি কোটি টাকার মালিক। তার ঘরে দামি আসবাব, দেয়ালে মূল্যবান শিল্পকর্ম, গাড়ির সারি, ভ্রমণের অসংখ্য সুযোগ। অথচ রাত গভীর হলে যদি তার মনে হয়—“আমার কথা শোনার মতো একজন মানুষ নেই”, তখন সেই সম্পদের বিশালত্বও হয়তো তার একাকিত্বকে ছোট করতে পারে না।

আবার এমনও তো হয়—অল্প আয় করা একজন মানুষ দিনের শেষে ঘরে ফিরে দেখে, কেউ তার অপেক্ষায় আছে। ক্লান্ত শরীরে এক কাপ চা এগিয়ে দেয় প্রিয় মানুষটি। হয়তো সেই চায়ের দাম খুব বেশি নয়, কিন্তু তার ভেতরে যে মমতা মিশে থাকে, তার কোনো বাজারমূল্য নেই।

সুখ অনেক সময় এমনই।

সুখ দামি রেস্তোরাঁর টেবিলে নয়, কখনো কখনো দুজন মানুষের ভাগ করে খাওয়া সাধারণ খাবারের প্লেটে থাকে।

সুখ সবসময় বিলাসবহুল ভ্রমণে নয়, কখনো প্রিয় মানুষের পাশে নীরবে বসে থাকার মধ্যেও থাকে।

সুখ বড় বাড়ির আয়তনে নয়, কখনো ছোট্ট ঘরের ভালোবাসায় তার সবচেয়ে বড় ঠিকানা খুঁজে পায়।

তবে এর অর্থ এই নয় যে অর্থের কোনো প্রয়োজন নেই। বরং অর্থ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি ভিত্তি। অর্থের অভাব মানুষের জীবনকে কঠিন করে তোলে, স্বপ্নকে সীমাবদ্ধ করে, নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে। তাই “অর্থের প্রয়োজন নেই”—এ কথাও সত্য নয়।

সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন আমরা অর্থকে প্রয়োজন থেকে জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্যে পরিণত করি।

তখন মানুষ হয়তো সম্পদ বাড়াতে বাড়াতে সময় হারায়। অর্থ উপার্জন করতে করতে প্রিয় মানুষটির সঙ্গে কথা বলার সময় হারিয়ে যায়। সাফল্যের পেছনে ছুটতে ছুটতে সন্তান বড় হয়ে যায়। বড় বাড়ি তৈরি হয়, কিন্তু সেখানে বসে গল্প করার মানুষগুলো ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়।

শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ভারী হয়েছে—কিন্তু সম্পর্ক হালকা হয়ে গেছে।

জীবনের সবচেয়ে নির্মম হিসাবটি হয়তো এখানেই।

আমরা টাকার হিসাব রাখি, সম্পদের হিসাব রাখি, ব্যবসার লাভ-ক্ষতির হিসাব রাখি; কিন্তু কতদিন প্রিয় মানুষের সঙ্গে মন খুলে কথা বলেছি—তার হিসাব রাখি না। কতবার অভিমান ভেঙে কাছে গিয়েছি—তার হিসাব রাখি না। কতবার ব্যস্ততার অজুহাত না দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছি—তার হিসাবও রাখি না।

অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ হয়তো বুঝতে পারে, সব হিসাবের চেয়ে এই হিসাবগুলোই ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

বিবাহবিচ্ছেদও তাই সবসময় ব্যর্থতার গল্প নয়। কখনো দুটি মানুষ বুঝতে পারেন, তাদের পথ আলাদা। কখনো দীর্ঘ সম্পর্কও সময়ের সঙ্গে বদলে যায়। বাইরে থেকে আমরা কেবল একটি বিচ্ছেদ দেখি; কিন্তু তার ভেতরে হয়তো বছরের পর বছর জমে থাকা অসংখ্য অনুভূতি, সিদ্ধান্ত ও বাস্তবতা কাজ করে। তাই ধনী মানুষের বিচ্ছেদ দেখে তাঁদের ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ঠিক নয়।

তবু তাঁদের জীবন আমাদের জন্য একটি আয়না হয়ে দাঁড়ায়।

সে আয়নায় আমরা দেখতে পাই—সম্পদ মানুষের জীবনকে সহজ করতে পারে, কিন্তু সম্পর্ককে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুন্দর করে না।

ভালোবাসার জন্য দরকার উপস্থিতি।

বিশ্বাসের জন্য দরকার সততা।

সম্পর্কের জন্য দরকার সময়।

দাম্পত্যের জন্য দরকার পারস্পরিক শ্রদ্ধা।

আর মানসিক শান্তির জন্য দরকার নিজের জীবনের সঙ্গে নিজের একটি অর্থপূর্ণ সম্পর্ক।

এসবের কোনোটি বাজার থেকে কিনে আনা যায় না।

হয়তো এ কারণেই পৃথিবীর সবচেয়ে দামি জিনিসগুলোর অনেকগুলোরই দাম আছে, কিন্তু সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসের কোনো দাম নেই।

একটি আন্তরিক “কেমন আছো?”

একটি অপেক্ষা।

একটি ক্ষমা।

একটি হাত ধরে থাকা।

একটি মানুষ, যার কাছে নিজের দুর্বলতাগুলোও নির্ভয়ে প্রকাশ করা যায়।

এসবের কোনো মূল্যতালিকা নেই।

তাই জীবনে অর্থ উপার্জন করা দরকার—অনেকটাই দরকার। কিন্তু অর্থ যেন জীবনের উদ্দেশ্য না হয়ে জীবনের উপকরণ হয়। কারণ অর্থ দিয়ে জীবনকে সাজানো যায়, কিন্তু জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া যায় অন্য জায়গায়।

শেষ পর্যন্ত হয়তো মানুষ সবচেয়ে বেশি মনে রাখে না, তার কত টাকা ছিল। মনে রাখে—কে তার পাশে ছিল। কে তার দুঃসময়ে হাত ধরেছিল। কে তার সাফল্যে সত্যিকারের আনন্দ পেয়েছিল। কে তার নীরবতাও বুঝেছিল।

আর তখনই বোঝা যায়—

অর্থ জীবনকে সমৃদ্ধ করতে পারে,

কিন্তু ভালোবাসাই জীবনকে পূর্ণ করে।

হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ধনকুবেরও একদিন এই সত্যের সামনে দাঁড়ায়—

সবকিছু কেনা যায়,

শুধু সুখ নয়।

Picked up where you left off

Comments

Abdul Khaiyam আবদুল খৈয়াম was this story’s first reader

+40 XP

    Please login to post comment. Login

  • গেটস স্বীকার করেছেন কিছু ভুল মেলিন্ডার বিশ্বাস ভেঙ্গে দিয়েছে।বিশ্বাস ভেঙ্গে গেলে বিলিয়ন ডলারেও জোড়া লাগেনা।আবার ভারতীয় ধনকুবের মুকেশ নিতা আম্বানির 40 বছরের দাম্পত্য সম্পর্কের জাদু দেশীয় কালচার,বিশ্বাস ও পার্টনারশিপ।