রাত গভীর হলে ছেলেটি মায়ের কাছে এসে বসত। তার বয়স চৌদ্দ। জন্মের পর থেকে পৃথিবী তার কাছে কখনো কোনো দৃশ্য নিয়ে আসেনি। কোনো সকাল তার চোখে ভোরের রং ঢেলে দেয়নি, কোনো সন্ধ্যা তাকে সূর্য ডোবার দৃশ্য দেখায়নি। সে জানত না নীল কী, সবুজ কী, কিংবা মায়ের মুখের রেখাগুলো কেমন।
তবু মাকে সে চিনত। চোখ দিয়ে নয়, স্পর্শ দিয়ে, মায়ের গায়ের গন্ধে।
মায়ের হাতের তালুতে তার কাছে একটি সম্পূর্ণ পৃথিবী ছিল। আঙুলের ডগায় ছিল পথের দিশা, কবজির কাছে ছিল আশ্রয়, আর মা তার কপালে হাত রাখলে সে বুঝতে পারত, আজ মা ভালো আছেন, না ভেতরে কোথাও চুপচাপ কাঁদছেন।
মা মাঝে মাঝে তাকে জিজ্ঞেস করতেন,
তুই আমাকে কেমন দেখতে ভাবিস? কথাটা শুনে ছেলেটি হেসে বলত,
তোমাকে দেখতে হয় নাকি? বুঝতে পারি, সেটাইতো যথেষ্ট, মা।
ছেলের উত্তরে এবার মা হাসতেন। কিন্তু ছেলেটি দেখতে পেত না, হাসির আড়ালে মায়ের চোখ দুটো কেমন করে ভিজে উঠত। গত চৌদ্দ বছর ধরে মা এই একটি কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছিলেন। ছেলেটা তাকে কোনোদিন দেখেনি। ছেলের জন্মের আগের থেকে তিনি পৃথিবীর প্রতিটি সুন্দর জিনিসকে মনে মনে তার জন্য জমিয়ে রেখেছিলেন। অথচ যখন দেখলেন, ছেলে দেখতে পায় না তখন যেন আক্ষেপ এবং অঝোর কান্নার পৃথিবীতে ডুবে গেলেন। বৃষ্টি হলে ভাবতেন, এমন বৃষ্টির শব্দ যদি ও দেখতে পারত! শিউলি ফুটলে মনে হতো, ও যদি জানত সাদা ফুল কাকে বলে! সন্ধ্যায় আকাশ লাল হলে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকতেন। তারপর নিজের অজান্তেই ছেলের ঘরে গিয়ে তার চুলে হাত বুলিয়ে দিতেন।
ছেলেটি বুঝত না কেন মা মাঝে মাঝে এমন চুপ করে থাকেন। ছেলেটা কিছু জিজ্ঞেস করলে মা বলতেন,
কিছু না। ঘুমা।
সে জানত না, তার মা তখন নিজের চোখ দিয়ে তার হয়ে পৃথিবী দেখছেন।
কদিন আগে এক রাতে ছেলেটি মায়ের পাশে এসে বসল।
বাইরে বাতাস ছিল না। অথচ ঘরের ভেতর পর্দাটা অদ্ভুতভাবে দুলছিল। ছেলেটি হঠাৎ বলল,
মা।
হুম?
ঘরে পানি পড়ছে।
মা কান পেতে শুনলেন।
টুপ। একটু পর আবার টুপ। তিনি ছাদের দিকে তাকালেন। কোথাও পানি নেই।
কোথায়?
ছেলেটি আঙুল তুলে বলল,
ওপরে।
ওপরে তো ছাদ।
ছাদেরও ওপরে।
মা একটু হেসে বললেন,
ছাদের ওপরে তো আকাশ।
ছেলেটি মাথা নেড়ে বলল,
আজ আকাশটা ঘরের ভেতরে। মায়ের হাসি থেমে গেল।
তিনি ছেলের মুখের দিকে তাকালেন। অন্ধ চোখ দুটি বন্ধ।
কিন্তু তার মুখে এমন এক নির্লিপ্ততা, মায়ের মনে হলো যেন সে সত্যিই কোনো অদৃশ্য দৃশ্য দেখছে। কিছুক্ষণ পর ছেলেটি বলল,
মা, তুমি কি আলো দেখতে পাচ্ছ?
মা ঘরের দিকে তাকালেন। বাতি নিভানো। জানালা বন্ধ। বাইরে চাঁদ নেই।
না তো বাবা। আমিতো কোথাও কোন আলো দেখতে পাচ্ছি না।
ছেলেটি ধীরে ধীরে বলল,
আমি পাচ্ছি। মায়ের বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। চৌদ্দ বছর ধরে তিনি এই কথাটির অপেক্ষা করেছিলেন, কিন্তু এখন কেন যেন তার ভয় লাগছে।
ছেলের অন্ধত্ব নিয়ে তিনি কখনো তার সামনে কাঁদেননি। হাসপাতালের করিডরের এক কোণে একা একা কেঁদেছেন। ডাক্তারের ঘর থেকে বেরিয়ে বাথরুমে গিয়ে কেঁদেছেন। রাস্তায় অন্য বাচ্চাদের দেখে বাসে ফেরার সময় জানালার বাইরে মুখ ফিরিয়ে কেঁদেছেন। কিন্তু ছেলের সামনে নয়। কারণ তিনি জানতেন, তার কান চোখের চেয়েও বেশি তীক্ষ্ণ। তার কান্নার সামান্য শব্দও সে শুনে ফেলবে। তাই এত বছর ধরে মা কান্না করছেন নিঃশব্দে।
আজ ছেলেটি বলল,
আলোটা তোমার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে।
মায়ের গলা শুকিয়ে গেল।
আমার মাথার কাছে? মা অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন।
হ্যাঁ, মা।
আলোটা দেখতে কেমন, বাবা?
ছেলেটি একটু ভেবে বলল,
ঠিক তোমার মতোই।
মা হেসে ফেললেন। কিন্তু সেই হাসি ভেঙে গেল কান্নায়।
তিনি মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। ছেলেটি শুনতে পেল।
তুমি কাঁদছ, মা?
না।
মিথ্যা বলো কেন, মা?
মা এবার ছেলেকে নিজের বুকে টেনে নিলেন। চৌদ্দ বছর ধরে যে কান্না তিনি আটকে রেখেছিলেন, সেই মুহূর্তে তার বুকের ভেতর থেকে যেন একটি পুরোনো কান্নার নদী বেরিয়ে এল। তিনি ফিসফিস করে বললেন,
তুই আমাকে দেখতে পারিস না বলে আমি কতদিন ভেবেছি, আমি বুঝি তোর কাছে একটু কম মা হয়ে গেছি।
ছেলেটি চুপ করে রইল। মা তার চুলে মুখ ডুবিয়ে বললেন,
তুই যখন ছোট ছিলি, তোর আঙুল ধরে জানালার কাছে নিয়ে যেতাম। বলতাম, ওটা আকাশ। ওটা চাঁদ। ওটা পাখি। জানিস, তখন আমার ভয় হতো, আমি যা বলছি, তুই কিছুই বুঝতে পারছিস না। বলতে বলতে মায়ের কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
তারপর একদিন বুঝলাম, তোর চোখ না থাকলেও তুই আমাকে আমার নিজের চেয়েও ভালো চিনিস।
ছেলেটি মায়ের গাল ছুঁয়ে দিল।
মা, চলো।
কোথায়?
ওই ঘরে।
কোন ঘরে?
ছেলেটি উঠে দাঁড়াল। ঘরের উত্তর দেয়ালের দিকে হাঁটতে লাগল। মা তার পেছনে গেলেন। দেয়ালের কাছে এসে ছেলেটি হাত বাড়াল। তার আঙুল যেন অন্ধকারের মধ্যে কিছু খুঁজে পেল। তারপর সে বলল,
এইখানে।
মা হাত রাখলেন দেয়ালে। ঠান্ডা। সাধারণ দেয়াল। কিন্তু পরক্ষণেই তিনি একটি ধাতব হাতল অনুভব করলেন।
মায়ের শরীর শিউরে উঠল। এই দেয়ালেতো কোনোদিন দরজা ছিল না।
নিজের হাতে কতোবার এই দেয়াল মুছেছেন। কতোবার এখানে পেরেক ঠুকেছেন। কতোবার ছেলের খেলনা এই দেয়ালের পাশে পড়ে থাকতে দেখেছেন। সেখানে কোনো দরজা ছিল না। আজ আছে। ছেলেটি দরজা খুলে দিল। ভেতর থেকে মাটির গন্ধ এল। তারপর ভেজা ঘাসের। তারপর দূরের কোনো নদীর শব্দ। মা ছেলের হাত শক্ত করে ধরে রইলেন। দরজার ওপারে ছিল এমন একটি পৃথিবী, যার অস্তিত্ব তিনি কোনো ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারলেন না। সেখানে আকাশ দেখা যাচ্ছিল না, অথচ আলো আছে। মাটি দেখা যাচ্ছে না, অথচ পায়ের নিচে ঘাসের কোমলতা অনুভব করছেন। আর চারদিকে অসংখ্য জানালা ঝুলছিল শূন্যের মধ্যে।
প্রতিটি জানালার ভেতরে একটি করে দৃশ্য। একটিতে বৃষ্টি। একটিতে দুপুর। একটিতে নদী। একটিতে শিউলি ঝরা উঠোন। একটিতে একটি শিশু মায়ের হাত ধরে হাঁটছে। মা হঠাৎ থেমে গেলেন। তিনি দেখলেন,
শিশুটি তারই ছেলে। খুব ছোট। তিন বা চার বছর বয়স। চোখ দুটি উজ্জ্বল। সে দৌড়াচ্ছে। হাসছে। তার হাত ধরে একজন নারী হাঁটছেন। মা বুঝলেন, নারীটি তিনি নিজেই।
কিন্তু এই দৃশ্যটি তিনি কখনো দেখেননি। সেই বয়সে তার ছেলেটাতো দেখতে পেত না। মায়ের বুকের ভেতর যেন কেউ মুঠো করে ধরল।
তিনি জানালার কাছে গিয়ে হাত রাখলেন। কাঁচের ওপারে শিশুটি হাসছে। মা ফিসফিস করে বললেন,
তুই আমাকে কখনো দেখেছিস?
ছেলেটি বলল,
প্রতিদিন।
মায়ের চোখ দিয়ে এবার অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না।
কোথায় দেখেছিস?
ছেলেটি বলল,
স্বপ্নে।
মা চোখ বন্ধ করলেন। তার মনে হলো, এত বছর ধরে তিনি যে দুঃখটাকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য বলে ভেবেছেন, সেটি হয়তো সত্যিই ছিল না। তিনি ছেলের মুখ দুহাতে ধরে বললেন,
কিন্তু তুই তো কোনোদিন আমাকে দেখিসনি।
ছেলেটি মৃদু হাসল।
চোখ দিয়ে না।
তাহলে?
ভাবনায়, মা।
এই দুটি শব্দেই যেন মায়ের সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে গেল। তিনি ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
আমি তোর জন্য পৃথিবীটা দেখতে চেয়েছিলাম।
ছেলেটি মায়ের কানে মুখ এনে বলল,
তুমি তো দেখেছ।
কী?
আমার হয়ে।
মা স্থির হয়ে গেলেন। চৌদ্দ বছর ধরে যে অপরাধবোধ তিনি বয়ে বেড়াচ্ছিলেন, আমি ওকে পৃথিবী দেখাতে পারিনি! সেটি হঠাৎ তার বুকের ভেতর থেকে উছলে উঠে এসে দুই চোখের পারে ভেঙে পড়ল।
তিনি বুঝলেন, তিনি পৃথিবী দেখাননি। তিনি পৃথিবীকে ছেলের কাছে বর্ণনা করতে করতে নিজেই পৃথিবী হয়ে উঠেছেন। হঠাৎ চারপাশের সব জানালা নিভতে শুরু করল। একটি। দুটি। তিনটি। তারপর একে একে সব।
ছেলেটি এবার বলল,
মা, এবার ফিরতে হবে।
মা তার হাত ছাড়লেন না। তিনি বললেন,
আবার নিয়ে আসবি আমাকে এখানে?
ছেলেটি বলল,
তুমি থাকলে।
দুজন ফিরে এল। দরজাটি বন্ধ হয়ে গেল। পরদিন ভোরে মা ঘুম ভেঙে দেখলেন, ছেলেটি জানালার পাশে বসে আছে। সূর্যের আলো তার মুখে এসে পড়েছে। মা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন,
কী দেখছিস?
ছেলেটি মাথা ঘুরিয়ে মায়ের দিকে তাকাল।
তোমাকে।
মায়ের বুক ধক করে উঠল।
কীভাবে? তিনি জিজ্ঞেস করলেন।
ছেলেটি হাসল।
আজ খুব সুন্দর লাগছে তোমাকে।
মা এগিয়ে গিয়ে তার মুখ দুহাতে ধরলেন। তারপর খুব ধীরে ঝুঁকে এসে তার কপালে চুমু খেলেন।
চোখ দুটি তখনও বন্ধ। অন্ধদের যেমনটা হয়। কিন্তু মায়ের মনে হলো, সেই অন্ধ চোখের গভীরে কোথাও একটি ক্ষুদ্র জানালা খুলে আছে। সেই জানালার ওপারে কোনো আকাশ নেই, কোনো নদী নেই, কোনো রং নেই। শুধু তিনি আছেন। একজন মা।
যাকে তার অন্ধ সন্তান কোনোদিন চোখে দেখেনি, কিন্তু কীভাবে যেন সেই ছেলে পৃথিবীর সমস্ত আলো দিয়ে মা'কে দেখে।
Comments
Be this story’s first reader
+40 XPNobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.
Sign in to claimFirst reader
You were first.
+0 XP
Yours is the first word this story has heard. Its writer will see it.
You also earned the First Reader honour.
-
-
Mahfuza Runa 1 week ago
অন্ধ সন্তানের মায়ের আবেগগুলো ভালো।লিখেছে।
-
probash khobor 1 week ago
দারুণ লিখেছেন। মা চরিত্রটির অনুভুতিগুলো দারুণ ভাবে লিখেছেন।
-
তারিক হোসেন
1 week ago
অনেক সুন্দর লেখা।
-
Habiba Rozy 1 week ago
মাকে দেখার আকাশ ছোঁয়া আকুতি, কাল্পনিক জগত নির্মাণে লেখকের মুন্সীয়ানা,মর্ম ছুঁয়ে গেলো