Story

মেহেরজান

September 25, 2026

5 views

১
জয়নাল মন খারাপ করে ঘরের দাওয়ায় বসে আছে। দুপুর গড়িয়ে গেছে, সুর্য ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ছে। উঠোনের পূর্ব পাশের ঘরটাতে সে আর তার স্ত্রী থাকে। সুর্য ডোবা পর্যন্ত তার ঘরের দরজায় রোদ লেগেই থাকে। বিয়ের আগে এ রোদে সে বিরক্ত বোধ করতো, কিন্তু এখন গা সওয়া হয়ে গেছে। অথবা গা সওয়া বলে কিছু নয়। বিয়ের পর তার মনোযোগের একটি বিশাল অংশ এখন তার বউয়ের দিকে থাকে, তাই এ রোদকে নিজের অজান্তেই সে উপেক্ষা করছে। উঠোনের পশ্চিম দিকের ঘরটাতে তার ছোট ভাই ময়নাল থাকে। ময়নাল বিয়ে শাদি করেনি এখনো। জয়নাল বিয়ে করে ফেলায় ময়নালকে আলাদা ঘর তৈরি করতে হয়েছে। সকালে বাজারে যাবে বলে মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলো জয়নাল। গতকাল রাতে বউকে কথায় কথায় বলেছিলো। বাজারে যাবার কথা শুনে মেহেরজান খানিকক্ষণ চুপ থেকে বলে দিলো, সে যেন আজ বাজারে না যায়। তখন জয়নাল মেহেরজানের কথায় কোন জবাব দেয়নি। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই মেহেরজানকে জিজ্ঞেস করেছে, বাজারে যেতে নিষেধ করেছে কেন?
কথাটা শুনেই মেহেরজান তার দিকে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকিয়ে জবাব দিয়েছে, এ কথাটা রাতেই সে জিজ্ঞেস করতে পারতো। তা না করে সকাল পর্যন্ত পেটে চেপে রাখতে গেলো কেন? বলেই মেহেরজান জয়নালের দিকে তাকিয়ে হেসেছে। হাসতে গেলেই মেহেরজানের বাঁ চোখটা বুজে আসে। জয়নাল অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে মেহেরজানের দিকে। বাঁ চোখটা আধো বোঁজা অবস্থায় মেহেরজান হাসতে লাগলে তাকে অপ্সরার মতো দেখায়, তখন জয়নালের মনের ভেতর একটা ইচ্ছাই হয়, মেহেরজানের মুখে এই হাসিটা লেগে থাকুক। মেহেরজানের হাসি দেখার চেয়ে সুন্দর কিছু পৃথিবীতে আর নেই।
বাজারে যাবে না কেন, সেটার জবাবের জন্য সে আর মনের মধ্যে কোনো তাড়া পেলো না। সে শুধু জানে, মেহেরজান যখন বলেছে, তাহলে নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে। দুপুরের খানিক আগে বাড়ির সামনের রাস্তায় হেঁটে যাওয়া লোকজনের কাছে শুনেছে, বাজারে সকাল বেলা একদল পুলিশ এসেছিলো। তারা বাজারে এসে সামনে যাকেই পেয়েছে, সবাইকে ধরে নিয়ে গেছে। গ্রামের সবচেয়ে পয়সাওয়ালা লোক, খলিল মেম্বারের গদিতে নাকি রাতের বেলা ডাকাত পড়েছিলো। সেখানে একটা কর্মচারী ঘুমাতো, ডাকাতেরা তাকেও কুপিয়েছে। সকাল বেলা থানা সদর থেকে পুলিশ এসে সব দেখে কাউকে কিছু না বলে বাজারে যারা যারা এসেছিলো, তাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তাকেই ধরে নিয়ে গেছে। খবরটা শুনে জয়নাল ভাবতে লাগলো, বাজারে না গিয়ে ভালোই করেছিলো সে। তার নিজের চেহারা আহামরি কিছু না। ঢ্যাংগা, রোগা, গায়ের রং কালো- দেখতেই কেমন যেন লাগে। খবরটা শুনে ঘরের বেড়ায় টাঙ্গানো আয়নাটাতে নিজের চেহারা দেখতে গেলো সে। আয়নায় নিজের মুখখানা দেখে কেন যেন সে নিশ্চিত হয়ে গেলো, আজ বাজারে তাকে পাওয়া গেলে নির্ঘাত তাকে পুলিশে ধরে নিয়ে যেত। চেহারাতে কতো কিছু এ দুনিয়ায়। দুনিয়ার সব কিছু খুব সহজ, যারা দেখতে সুন্দর। নিজের চেহারার কথা ভেবেই কেন যেন ঠিক এখনই তার মন খারাপ করে বসে আছে সে। নিজের চেহারা দেখতে দেখতে তার মনে একটা প্রশ্ন এলো, আচ্ছা আমার চেহারা কি চোর ডাকাতের মতো? মাথায় প্রশ্নটা আসতেই আয়নায় নিজের মুখের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে তাতক্ষণিকভাবেই মনে হলো, হ্যাঁ, একেবারেই চোর ডাকাতের মতো। ভাগ্যিস, সকালে বাজারে যায়নি সে আজ।
মেহেরজান ঘরের ভেতর থেকে ভেরিয়ে এসে তার পাশে এসে বসেই জিজ্ঞেস করলো,
কি চিন্তা করতাছেন?
জয়নাল কিছু না ভেবেই জবাব দিয়ে দিলো, বউ তোর কথামতো বাজারে না গিয়ে ভালো হয়েছে। বাজারে ডাকাতি হয়েছিলো রাতে। পুলিশ এসে বাজারে থাকা অনেককে ধরে নিয়ে গেছে। আমার চেহারাও চোর ডাকাতের মতো। আমি বাজারে থাকলে পুলিশ আমারেও ধরে নিয়ে যেতো। পুলিশের হাতে পড়লে খবর আছিলো, বউ। দুনিয়ার স্বৈর কাছে কিরা কসমে কাজ হয়, পুলিশের কাছে হয় না। পুলিশের কাছে টাকা ছাড়া কথা নাই।
আপনার চেহারা খারাপ এটা কে বলেছে?
না, আমি নিজেই বলেছি। কেউ বলেনি।
নিজের কথা সবসময় ঠিক, সেটা নয়। মানুষ যদি নিজেই সব ঠিক জানতো, তাহলেতো দুনিয়ার চেহারা এইরকম থাকতো না।
কথাটা শুনে জয়নাল মেহেরজানের দিকে তাকিয়ে রইলো। মেহেরজান একটা মুচকি হাসি দিয়ে আবার বললো, দুনিয়ায় মানুষ নিজে যা জানে, সেগুলোর অল্প কয়েকটা সত্য হয়, আর বাকী সব ভুল। আর যারা জ্ঞানী মানুষ, তাদের কথা আলাদা। কিন্তু জ্ঞানী মানুষের সংখ্যা খুব কম হয়। লাখে একজন। আপনি আমি – আমরা কেউই জ্ঞানী না।
জয়নাল খানিকটা অবাক হয়ে মেহেরজানের দিকে তাকিয়ে রইলো। এই মেয়েটা মাঝে মাঝেই জ্ঞানী মানুষের মতো কথা বলে। মেহেরজান ওই লাখ মানুষের মধ্যে একজন।
মেহেরজান জয়নালকে অবাক করে দিয়ে এবার বললো, আমাকে জ্ঞানী চিন্তা কইরেন না। আমি জ্ঞানী মানুষ না। বলেই মেহেরজান হাসি হাসি মুখে তার দিকে তাকিয়ে রইলো।
মেহেরজান কীভাবে যেন তার মনের কথাটা ধরে ফেললো। জয়নালের ভেতরে ভেতরে কেন যেন ভয় লাগতে লাগলো, ঠিক এখনই। মেহেরজানকে নিয়েই তার চিন্তা হচ্ছে। মেহেরজান কি জানতো আজ বাজারে সকালে কোন সমস্যা হবে? সে তাকে বারণ করেলো কেন রাতের বেলা? আবার এখন সে যেইমাত্র মনে মনে ভাবল, মেহেরজান জ্ঞানী মানুষ, তখনি সে কীভাবে তার মনের কথাটাই বলে উঠলো? অবশ্য এ ভয়টা আজই সে প্রথম পেলো, তা নয়। তার বিয়ে হয়েছে মাত্র চার মাস হলো। এই চার মাসে অসংখ্যবার তার মনে হয়েছে, মেহেরজান সাধারণ কোন মানুষ নয়। এই অসাধারণ মানুষকেই কেন তাকে বিয়ে করতে হলো! মেহেরজানকে ধরে রাখতে পারবে তো সে? মেহেরজানকে অসম্ভব ভালোবাসে জয়নাল। এতো গভীর ভালোবাসা, তার মনে হয় মেহেরজানের জন্যে মরে যেতে হলেও সে মরে যাবে। নিজের প্রাণের চেয়ে বেশী মায়া মানুষ আর কাকে করে! মেহেরজানের জন্য মায়ার কাছে তার নিজের জীবন কিছুই নয়।
পাশে বসা মেহেরজান এবার তার বাঁ হাঁটুতে হাত রেখে বললো, মায়ার দুনিয়ায় আমরা থাকি। মায়ার জন্য মানুষ করে যায়, মায়ার ঘোরে মানুষ যুদ্ধ করে, মায়ার ঘোরে মানুষ অমানুষও হয়ে যায়। আমার জন্য এতো বেশি ভাইবেন না।
মেহেরজানের কথাগুলো শুনে জয়নাল এখন আরও আতংকগ্রস্থ হয়ে পড়লো। তীব্র ভয়ের একটা ঠাণ্ডা স্রোত যেন তার মেরুদণ্ড বরাবর ঘাড় থেকে নিচের দিকে গড়িয়ে গেলো। ঘাড় ফিরিয়ে মেহেরজানের দিকে তাকাতেও তার ভয় করছে ঠিক এখন। বাঁ হাঁটুর উপরে মেহেরজানের হাতটাকে তার বরফের মতো শীতল ঠেকছে এখন। ঠিক এখন কি বলতে হবে সেটিও মাথায় আসছে না।
গত মাসে একদিন সন্ধ্যাবেলায় গোয়ালঘরে নারকেলের ছোবড়াতে আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়া দিতে গিয়েছিলো মেহেরজান। এ সময়টায় ধোঁয়া দিলে মশা কিছুটা কমে যায়। গরুটার বিশ্রাম হয়। গোয়ালঘর থেকে বেরিয়ে এসেই জয়নালকে ডেকে বলল,
গরুটা বিক্রি করে দেন হাটের দিন। বিক্রি করে আরেকটা গরু কিনে আনবেন।
জয়নাল খানিকটা অবাক হয়ে বলেছিল, দুই বছর ধরে পালছি ওকে। এখন বিক্রি করবো কেন?
আপনি বিক্রি কইরা দেন। বিক্রি কইরা আরেকটা কিনা নিয়া আসবেন। সারা শরীর বাদামী কিন্তু মাথাটা সাদা এরকম একটা গাভী কিনবেন।
কথাটা আদেশ না আবদার, সেটি বুঝতে পারলো না জয়নাল। তার কেবল মনে হলো, মেহেরজান যা বলেছে, সেটিই করবে। কিন্তু যে রকম গাভী কিনতে বলেছে, সেটি পাবে কোথায়? কথাটা মেহেরজানকে বলতেই সে জবাব দিয়েছিলো, বাজারে গিয়াই দেখেন আগে।
পরের হাটে গরুটা বিক্রি করে টাকা গুণে পকেটে রাখতে না রাখতেই দেখলো, ঠিক তার সামনে দিয়েই বাদামী রঙয়ের একটা গাভী নিয়ে একজন যাচ্ছে, সে গাভীটার মাথাটা সাদা- ঠিক যেমনটা মেহেরজান বলেছিলো। গাভীটা কিনে বাজার থেকে ফেরার পথে আচমকা তার মনে হলো, ঠিক এ রঙয়ের গাভীর কথা মেহেরজান কীভাবে বলেছিল?
মেহেরজান এখনো তার হাঁটুর উপর হাত রেখে বসে আছে। মেহেরজান এবার বলল, গাভীটার কথা এতো চিন্তা করেন ক্যান? সবকিছু নিয়া এতো চিন্তা করেন ক্যান? সন্ধ্যা নেমে এসেছে। বিকেলের সোনালী আলতা আভা এখন অদ্ভুত সুরমা রঙয়ের আলো হয়ে গেছে। জয়নাল মনে হলো, তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। ভয় লাগছে তার, ভীষণ ভয়। মেহেরজানকেই তার ভয় লাগছে। মেহেরজান সম্ভবত মানুষ না।

২
জানালা দিয়ে চাঁদের আলো বিছানায় এসে পড়েছে। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় ঘরের ভেতর এত আলো কেন, জয়নাল ভেবে পেলো না। ধাতস্থ হয়ে খানিকটা সময় লাগলো তার, এটি চাঁদের আলো। পাশ ফিরে মেহেরজানের দিকে ফিরতেই অবাক হয়ে গেলো সে। মেহেরজান বিছানায় বসে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মেহেরজানের চোখে চোখ পড়তেই মেহেরজান বলে উঠলো,
চিন্তা কইরেন না। আমিই ধাক্কা মেরে আপনের ঘুম ভাঙ্গাইলাম।
ঘুম ভেঙ্গে যাবার কারণটা বুঝতেই জয়নাল জিজ্ঞেস করলো, ঘুম ভাঙ্গাইলি ক্যান, বউ?
কী সুন্দর জ্যোৎস্না আইজ। আমার জ্যোৎস্না দেখতে মন চাইছে। আপনি উঠেন। উঠানে চলেন।
খানিকটা বিরক্ত, খানিকটা অবাক হয়ে জয়নাল উঠে বসলো। মেহেরজান এরই মধ্যে ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে গেলো। জয়নাল চৌকি থেকে নেমে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। মেহেরজান উঠানের মধ্যিখানে বসে আছে। জয়নাল অবাক হয়ে দেখলো, আজ কি চাঁদটা আরও নেমে এসেছে? জ্যোৎস্নায় এতো আলো কীভাবে হয়? সে আলোতে উঠোনের মাঝখানে বসা মেহেরজানকে দেখে ক্ষণিকের জন্য তার মনে হলো, মেহেরজানের গায়ে চাঁদের আলো পড়ে চারদিকে যেন ঠিকরে পড়েছে। মেহেরজানের চারপাশে চাঁদের আলো যেন আরো উজ্জ্বল, আরও ঝলমলে। মেহেরজান তাকে দেখে হাতের ইশারায় কাছে ডাকলো। জয়নাল এগিয়ে গিয়ে তার পাশে বসতেই মেহেরজান তাকে বললো,
আপনে তো গান জানেন। এখন একটা গান গাইবেন আমার লাইগা?
কথাটা শুনে জয়নাল খানিকটা অবাক হয়ে বলল, বউ, আমিতো আর গান গাইবো না বলে কথা দিয়েছিলাম তোর বাড়িতে। তোরে বিয়া করার সাথে সাথেই আমার বাউল জীবন শেষ। তোর বাড়ির মুরুব্বিরা আমারে বলে দিয়েছিলো, তোকে বিয়া করতে গেলে একতারা নিয়া বাড়ি ছাইড়া দিনের পর দিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরা বন্ধ করতে হইবো। আমি রাজি হইয়াইতো তোরে পাইলাম।
কথাটা শুনে মেহেরজান হাসতে লাগলো। চারদিকে রাত্রির নির্জনতায় চাঁদের ঝলমলে আলোতে উঠোনে বসা নারীর কণ্ঠে খিলখিল হাসি- সব মিলিয়ে জয়নালের কেমন যেন লাগছে। তার একবার মনে হলো, সে আসলে এখনো ঘুমিয়ে আছে। এখন যা হচ্ছে, সব স্বপ্ন।
মেহেরজান বললো, আমার জন্য আবার বাউল হইয়া যান এখন। আমার লাইগা একটা গান ধরেন এখন।
কথাটা শুনেই জয়নাল প্রায় দৌড়ে ঘরের ভেতর থেকে একতারাটা নিয়ে এসে মেহেরজানের কাছে এসে বসলো। একতারাটায় টুং টুং শব্দ করে একতারার কান ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তারের টান হিক করতে করতে জয়নাল আচমকা গান ধরলো,
চান্দের মায়া, চান্দের মায়া রে
এতো আলো, পথ কেন পাই না রে।
আমার চক্ষে আলো দে রে খোদা।
আমারে একবার পথ দেখা রে।।
এটুকু বলেই থেমে গেলো জয়নাল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার শুরু করলো সে।
আমারে কোন চান্দে ডাকে
আসমানে নাকি জমিনে সে
তারে একবার দেখাও খোদা
তারে দেইখা মরবো রে।।
তারে একবার দেখাও খোদা
তারে দেইখা মরবো রে।।
এটুকু গেয়েই থামলো জয়নাল। কেন যেন চুপ করে রইলো সে। গানটা শোনার সময় মেহেরজান আকাশের দিকে তাকিয়েছিল। সেদিকে তাকিয়েই সে জিজ্ঞেস করলো,
এই গানটা কবে বানাইছিলেন?
এখনই মাথায় এলো। তাই গাইলাম। না গাইলে ভুইলা যামু।
আপনে কার লাইগা এইটা গাইলেন? মেহেরজানের কণ্ঠে খানিকটা উদাস ভাব।
মানুষ নিজে কি আসলে জানে সে আসলে কি চায়? জয়নাল জবাব দিলো।
কিন্তু আপনে জানেন, আপনে কি চান।
আমি আমারেই খুঁজি। কতকিছু দেখি, সবকিছুর মইদ্দে আমি আমারে খুঁজি। তুই আমার জীবনে আসার পর আমার মনে হইছে, তুই’ই আমি। তোর মইদ্দে মাঝে মাঝে আমি আমারে দেখি।
ক্যামনে দেখেন?
তোর রহস্যের কথায়। তুই যা বলিস, তাই ঘটে। আসলে সব মানুষের মইদ্দে রহস্য থাকে। সবাই সেইটা জানে না। কিন্তু তুই নিজে জানোস, তোর কথা ফইলা যায়। আর তখনি আমার মনে হয়, সেইটাইতো আমি। রহস্য আমার ভালো লাগে, কিন্তু মানুষ রহস্যের কাছে যাইতে চায় না। এদিকে আমারে দেখ, আমি তোর কাছে থাকি, আমি রহস্যের মইদ্দে থাকি। আমি রহস্য খুঁজতে গিয়া বাউল হইছিলাম। এখন তুই আমার জীবনে আইছিস, আমি এখন রহস্যের মইদ্দে বাস করতাছি।
কথা বলতে বলতে একসময় জয়নালের মনে হলো, হেঁয়ালিপূর্ণ অনেক কথা বলে ফেলছে সে। কথাটা মনে হতেই কথা থামিয়ে চুপ হয়ে গেলো জয়নাল। খানিকক্ষণ চুপ থেকে মেহেরজান জিজ্ঞেস করলো,
সেই রহস্যটা কি?
সেইটা আমি নিজেও জানি না। শুধু এইটাই বুঝি, আমি আমারেই খুঁজতাছিলাম। এখন তুই আমার সেইসবের জবাব হইয়া আইছস।
আমি যদি হারাইয়া যাই কোনোদিন?
কথাটার কোন জবাব না দিয়ে জয়নাল ঘাড় ফিরিয়ে মেহেরজানের দিকে তাকিয়ে রইলো।
আমার মইদ্দে এত কিছু পাইলেন আপনে। আমারে এতদিন কিছু কন নাই ক্যান?
মানুষ যা চায়, সেইটা পাইলে মুখ ফুইটা কি বলে, আমি পাইছি? জয়নাল জবাব দিলো।
এখন যে কইলেন? মেহেরজানের কণ্ঠে হালকা অনুযোগ। আমিতো অন্য কাউরে কই নাই। আমি আমারেই কইছি। আমি তো আমিই, তুইওতো আমিই।
মেহেরজান খানিকটা কাছে এসে জয়নালের বাম কাঁধে মাথা রেখে ফিসফিসিয়ে বললো, এইখানে কি শুধুই আমরা দুইজন? আমি আপনে ছাড়াও চাঁদ আছে, জ্যোৎস্না আছে, আরও কতো কিছু আছে। সব কিছু সবখানে বলতে নাই।
মেহেরজানের কথার শেষটুকু শুনেই জয়নালের কেন যেন ভয় করতে লাগলো। আর কে আছে এইখানে? তার মাথায় ঘুরতে লাগলো, আরও কতো কিছু আছে বলতে মেহেরজান কি বললো!
মেহেরজান এবার গলা আরও নামিয়ে বললো,
আমি আপনের সাথে আছি। আমি যতক্ষণ সাথে আছি, কেউ আপনেরে কিছু করতে পারবো না।
কথাগুলো শুনে শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠলো জয়নালের। খুব ভয়ে ভয়ে মাথা উঁচু করে চাঁদের দিকে তাকালো সে। এমনভাবে তাকালো যেন চারদিকে অনেকে বা অনেককিছু তাকে দেখছে। চাঁদের দিক ছাড়া আর কোনদিকে সে তাকাচ্ছে না। এমন কী মেহেরজানের দিকেও তাকাচ্ছে না।
ঠিক এ সময়েই পেছন থেকে কে যেন বলে উঠলো, ওহ, আপনেরা! আমি আরও মনে করলাম, এতো রাইতে কে আইল?
জয়নাল ভীষণ রকমের চমকে গিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখলো, ছোট ভাই ময়নাল নিজের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। ময়নালকে দেখেই যেন আশ্বস্ত হলো খানিকটা।
ভাই, রাইত হইছে অনেক। ঘুমাইতে যান। বলেই ময়নাল ঘুরে ঢুকে গেলো।
ময়নাল ঘরের ভেতর চলে যাবার পর যেন একটা অদ্ভুত নির্জনতা এসে হাজির হলো উঠোনজুড়ে। জয়নাল মেহেরজানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
ঘুমাইতে যাবি না, মেহেরজান?
না, আমি ঘুমামু না। যতক্ষণ ঘুমামু, ততোক্ষণ আপনেরে দেখতে পামু না। আমি জাইগাই থাকুম।
জয়নালের মাথায় একটা অদ্ভুত প্রশ্ন এলো ঠিক এখনই। মেহেরজান এরকম করে কথা বললো কেন? খানিক আগে একতারাটা হাতে নেয়ার পরই তার মনে হচ্ছিলো, আবার কবে বেরিয়ে পড়বে সে? মেহেরজান এরকম করে বললে সেতো কোনদিন বাড়ি ছেড়ে আর বেরোতে পারবে না। এই মেয়েটা তাকে ঘরবন্দী করে ফেলছে ধীরে। এই মেয়েকে সে ঠিক বুঝতে পারে না। সারা জীবন ধরে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে চেয়েছে, আপনমনে গান বানিয়ে গাইতে চেয়েছে। ছোট করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। জয়নালের দীর্ঘশ্বাসটা মেহেরজান টের পেয়েই জয়নালের বাম বাহুটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে গুন গুন করে গাইতে শুরু করলো,
আমারে কোন চান্দে ডাকে
আসমানে নাকি জমিনে সে
তারে একবার দেখাও খোদা
তারে দেইখা মরবো রে।।
তারে একবার দেখাও খোদা
তারে দেইখা মরবো রে।।
মেহেরজানের গলায় এত দরদ কীভাবে এলো? মেহেরজান গান গাইতে পারে, ভাবেনি সে। জয়নাল ঘাড় বাঁকিয়ে মেহেরজানের দিকে তাকালো। মেহেরজান তখনো বলছে,
তারে একবার দেখাও খোদা
তারে দেইখা মরবো রে।।
জয়নাল আশ্চর্য হয়ে দেখলো, মেহেরজান গান গাইছে, আর তার দুচোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।জয়নালের মনে হলো, খোদাকে খোঁজার আকুতি নিয়ে মেহেরজানও কি দিন গুনছিল এতদিন?

৩
জয়নাল বাড়ির সামনে রাস্তায় হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে পুরো গ্রাম ঘুরে এখন বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে। বাড়ির সামনে একজন লোককে রাস্তার ধারে বসে দেখতে পেয়েই পা চালিয়ে এগোলো। লোকটার সামনে এসে খানিকটা চমকে গেলো। সচরাচর তাদের গ্রামে এ ধরণের বেশভূষার লোক দেখা যায় না। জটা বাঁধা চুলকে মাথার উপরে খোঁপার মতো করে বাঁধা। হাতে একটা বেঢপ ধরণের আঁকাবাঁকা লাঠি। লোকটার মুখে অনেক বছরের না কামানো গোঁফ দাড়ি। গায়ে ফিকে হয়ে আসা লাল রঙয়ের এক প্রস্থ কাপড়। গলায় একটা রুদ্রাক্ষের মালা। জয়নাল কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, আপনি কোথা থেকে এসেছেন? এ গ্রামে কার কাছে এসেছেন?
অদ্ভুত রকমের জ্বলজ্বলে চোখে লোকটা তার দিকে তাকিয়ে খুব শীতল কণ্ঠে বলল,
আমি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াই। খুব পানির পিপাসা পেয়েছে বলে এ বাড়ির সামনে বসে পড়েছি।
আহা! আসুন আমার সাথে। পানি খাবেন, বলে জয়নাল লোকটাকে তার সাথে নিয়ে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেলো। উঠোনে পা রেখেই মেহেরজানকে ডাক দিলো। মেহেরজান জয়নালের গলা শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে তাদের দুজনের দিকে তাকাতেই জয়নাল বললো, একটু পানি দে। এই মানুষটা বাড়ির সামনে রাস্তায় বসেছিল। উনার পানির তিয়াস লাগছে।
মেহেরজান ঘরে ঢুকে পানি নিয়ে এসে লোকটার দিকে গ্লাস এগিয়ে দিতেই লোকটা দ্রুত ঢক ঢক করে পানিটুকু খেয়ে পরিতৃপ্ত চোখে মেহেরজানের দিকে তাকালো। ঠিক তখনি মেহেরজান তাকে বলল,
কেমন আছেন হরি দাদা?
জয়নাল অবাক হয়ে মেহেরজানের দিকে তাকাতে তাকাতেই হরিশংকর জবাব দিলো, আমি ভালো আছি। কিন্তু আমি তোমার নাম ভুলে গেছি।
আমি মেহেরজান। বলেই মেহেরজান লোকটার দিকে তাকালো। মেহেরজানের চোখে মুখে বহুদিনের চেনা মানুষ দেখার অভিব্যাক্তি।
তুই চিনিস উনাকে?
আমরা ছোটবেলা থেকেই চিনি। আমাদের গ্রামে থাকতেন। কেন যেন মাঝে মাঝে বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যেতেন। ছয় সাত মাস পরপর বাড়ি ফিরতেন। কী সুন্দর গান গাইতে পারেন, উনি!
জয়নাল অবাক হয়ে লোকটার দিকে তাকালো। ইনি যে গান গান, সেটা বোঝা যায়নি। লোকটার সাথে কোন বাদ্যযন্ত্রও নাই। অবশ্য তার কাঁধে একটা ঝোলা আছে, তবে সে ঝোলাটা এতো ছোট, সেটার ভেতরে কোন বাদ্যযন্ত্র থাকার কথাও না। মেহেরজান আবার বলতে লাগলো, আমরা ছোটবেলা থেইকাই উনারে চিনি।
জয়নাল মেহেরজানের দিকে তাকালো। মেহেরজানের চোখেমুখে অনেক দিনের চেনা মানুষের সাথে দেখা হবার আনন্দের ছটা।
জয়নাল মেহেরজানকে বললো, উনি পানি খাবেন। সাথে আরও কিছু দে। উনাকে দেখে মনে হলো, উনি ক্ষুধার্ত
দিচ্ছি, আপনে উনারে বসান। বলেই মেহেরজান ঘরের দিকে চলে গেলো। উঠোন পেরিয়ে জয়নাল অতিথিকে নিয়ে ঘরের দাওয়ায় গিয়ে বসলো। বসতেই জয়নাল তাকে জিজ্ঞেস করলো, আপনে কি করেন?
জটাধারী জয়নালের দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসলো কিছুক্ষণ। জয়নাল খানিকটা বিব্রত হয়ে গেলো নিজেই। তার মনে হলো, প্রশ্নটা না করলেও পারতো। মানুষটা এবার ছোট করে একটা গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
আমার নাম হরিশংকর। আমি কিছুই করিনা। পথে পথে ঘুরি। আমার নিজের একটা প্রশ্ন ছিলো নিজের সাথে। সেই প্রশ্নের জবাব খোঁজার জন্য ঘুরে বেড়াই।
কথাটা শুনে জয়নাল কিছুই বললো না। সে নিজেও একসময় পথে পথে ঘুরে গান গেয়েছে। তার মনেও একটা জিজ্ঞাসা ছিলো। সে জিজ্ঞাসার জবাব মেলার আগেই সংসারের বন্ধনে নিজেকে বেঁধে নিয়েছে। সংসারের বাঁধায় যে একবার আটকে যায়, তার মুক্তি মেলেনা। হরিশংকরের জবাব শুনে নিজের ভাবনায় ডুবে গেলো জয়নাল। মেহেরজান এসে পানি, সাথে একটা বাটিতে কিছু মুড়ি এবং গুড় নিয়ে এসে জয়নালের পাশে বসেই হরিশংকরের উদ্যেশ্যে বলল, দাদা, মানুষটারে এমন কিছু বইলেন না যাতে উনি আবার দোতারা নিয়ে রাস্তায় নেমে যায়।
কথাটা শুনে হরিশংকর মুচকি হেসে গানের সুরে বলল,
জগত ঘুরে যারে খুঁজি, সে থাকে আমার বুকে।
বৃথা গেল জীবন আমার, মাটিতে কপাল ঠুকে।
কথাটা শুনে জয়নাল আর মেহেরজান দুজনেই চুপ করে রইলো। মেহেরজান কথাগুলো বুকের ভেতর রেখে হয়তো তার ব্যাখ্যা খুঁজছে আর জয়নাল মাথাটা উঁচু করে আকাশের দিকে তাকিয়ে হরিশংকরের কথায় তার নিজের মনের ভেতরের প্রশ্নের জবাব হয় কীনা ভাবতে লাগলো। হরিশংক্কর খানিকক্ষণ চুপ থেকে এব্র বলল, পৃথিবীর সব মানুষের ভেতর একজন বাউল থাকে অথবা একজন দেশান্তরী মানুষ থাকে।

৪
কোথাও একটা শব্দ হতেই জয়নালের ঘুম ভেঙ্গে গেলো। এতো রাতে আবার কীসের শব্দ হলো, কথাটা মাথায় আসতেই চোখ মেলে অবাক হয়ে দেখলো, পাশে মেহেরজান নেই। ঘরের এক কোণে হারিকেনের সলতে ছোট করে রাখা, সেটির মিটমিটে আলোতে জয়নাল শুয়ে শুয়েই ভাবল, এতো রাতে মেহেরজান কোথায় গেলো! ঘরের বাহিরে চাপা স্বরে কেউ কথা বলছে। খুব সাবধানে ধীরে ধীরে চৌকি থেকে নেমে ঘরের বেড়ায় গুঁজে রাখা দা’টা হাতে নিয়ে দরজায় এসে দাঁড়ালো। এসময় সে আরও অবাক হয়ে গেলো- ঘরের দরজা হাট করে খোলা। উঠানে অন্ধকারের মধ্যেই দুটি ছায়ামূর্তি মুখোমুখি। পা টিপে টিপে দা হাতে ঘরের দরজা পেরিয়ে এক কদম এগিয়ে এসে থামল। মেহেরজানের গলাই মনে হচ্ছে। অন্য কণ্ঠটা হরিশংকরের।
নিজের বুকের ঢিপ ঢিপ শব্দ যেন সে নিজেই শুনতে পাচ্ছে। মেহেরজান বলছে,
তুই কেন এসেছিস? চাপা স্বরে বললেও মেহেরজানের কণ্ঠে রাগের সুর জয়নাল স্পষ্ট বুঝতে পারলো।
অন্য ছায়ামূর্তিটা হরিশংকরের কণ্ঠেই জবাব দিলো, তুই যেখানেই যাবি, আমি সেখানেই আসবো, এটি তুই জানিস। আর আমি এখানে কেন এসেছই, সেটি তুই জানিস।
আমার বাড়িতে কিছুই করবি না, তুই।
আমাকে ঠেকাতে পারবি?
তুই আমার সম্পর্কে জানিস।
তুইও আমাকে জানিস। আমি জয়নালের জন্যেই এসেছি।
না। মেহেরজানের চাপা কণ্ঠে আর্তনাদ। না। এ কাজ তুই করতে পারবি না।
সেটি আমি অবশ্যই করবো। তুই বিয়ে করেছিস কেন?
আমি তার জবাব দেবো না। মেহেরজান বলল।
হরিশংকর এদের দুজনের কথার মূল বিষয়টি বুঝতে পারছে না এখনো।
আমি সে জবাবটাও জেনে যাবো। আর জয়নালের কিছুই করবি না।
কথাটা শুনে হরিশংকর শব্দ করে হাসতে লাগলো। এতক্ষণে অন্ধকারে চোখ সয়ে এসেছে জয়নালের। অবাক হয়ে সে দেখলো, যেমনটা সে দেখে সবসময় মেহেরজানকে, মেহেরজানকে সে রকম দেখাচ্ছে না। হরিশংকরকেও দিনের বেলা যেমনটা দেখেছিলো, তেমনটা সেও নয়। দুজনেই রেগে কথা বলছে আর অদ্ভুতভাবে দুজনেই যেন আরও লম্বা হয়ে যাচ্ছে। উঠোনের পাশের গাছগুলো ছাড়িয়ে আরও উঁচু লম্বা হয়ে গেছে দুজনেই। হরিশংকরের গলায় আশ্চর্য মূর্তিটা এবার বলছে, জয়নালকে ছাড়াতো আমি যেতে পারবো না। আর তুই বিয়ে করেছিস কেন, সেটির জবাব যেহেতু দেসনি- সেটির জন্য তোর পরিণতি ভালো হবে না।
জয়নালের বদলে তাহলে আমি কি করবো?
তুই ময়নালকে নিয়ে যা।
মেহেরজানের এ কথায় জয়নালের সারাশরীরে অজানা ভয়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো।
ঠিক আছে, সেটি কাল দিনের বেলাতেই হয়ে যাবে। এখন তুই বল, বিয়ে করলই কেন? তোর কী মানুষের সাথে সংসারী হবার কথা ছিলো? কথাটা বলেই হরিশংকর মেহেরজানের ডান হাতের কব্জিতে ধরে অবলীলায় মেহেরজানকে শূন্যে উঠিয়ে মাটিতে ধড়াম করে ফেলে দিলো। মেহেরজানের মাথাটা উঠোনের মাটিতে খটাশ করে বাড়ি খেল। হরিশংকর এবার অট্টহাসি দিয়ে নিজের এক পা দিয়ে মেহেরজানের গলায় চাপা দিয়ে বলল, তোর অপরাধের শাস্তি এখনই তুই পাবি। বলেই হা হা করে হাসতে লাগলো হরিশংকর।
জয়নাল এবার আর নিজেকে আটকে রাখতে পারলও না। সে জানে অশরীরীদ্বয়ের মধ্যে সে হয়তো কিছুই না। কিন্তু মেহেরজানের গলায় পা দিয়ে চেপে রেখেছে দানবটা। মেহেরজানের গলা দিয়ে গোঁ গোঁ শব্দ বেরোচ্ছে।
জয়নাল হাতের দা’টা উঁচু করে তীব্র চিৎকার করে ঘরের দরজা থেকে লাফ দিয়ে উঠোনে নেমে এলো।
জয়নালের গলা শুনেই হয়তো অশরীরী দুজনেই খানিকটা চমকে গেলো। জয়নাল উঠোনের মাঝ বরাবর দা উঁচু করে এগিয়ে আসতে আসতে দেখে, সেখানে কেউই নেই। চারদিকে নির্জন অন্ধকার। চারপাশে শোঁশোঁ আওয়াজ। অথচ একটা গাছের পাতাও নড়ছেনা। তীব্র আতংকে সে মূহুর্তে জয়নালের মনে হলো, সে জ্ঞান হারাচ্ছে।

৫
উঠেন, উঠেন। এতো বেলা পর্যন্ত ঘুমাচ্ছেন কেন্‌? বিরাট ঘটনা ঘইটা গেছে। উঠেন। মেহেরজানের কণ্ঠে জয়নাল চোখ মেলতেই দেখে সে বিছানাতেই শুয়ে আছে। রাতের কথা মনে হতেই তার মনে হলো, সে স্বপ্ন দেখেছিলো। তাড়াতাড়ি আসেন। মেহেরজানের কণ্ঠে কেমন একটা স্বর। তাড়াতাড়ি বাইরে আসেন। ময়নাল ভাইকে সাপে কাটছে। আসেন, এখনি আসেন।

জয়নাল লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো। ঘরের দরজা দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখে বাহিরে রোদ ঝলমল করছে। এতো বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়েছে সে! দৌড়ে উঠোন পেরিয়ে ময়নালের ঘরের দরজাতেই দেখতে পেলো, ময়নাল মাটিতে পড়ে আছে। মুখ দিয়ে লালা ঝরছে। ময়নালের মাথাটা নিজের কোলে নিয়ে কয়েকবার ডাক দিলো। আশেপাশের বাড়ি থেকে আরও কিছু লোক এসেছে। একজন ময়নালের হাতের নাড়ি চেপে দেখলো। তারপর বললো,
আর নাই।
জয়নাল একবার ভাইয়ের মুখের দিকে তাকালো, তারপর মেহেরজানের দিকে তাকালো। মেহেরজানের দিকে তাকাতেই তার চোখে পড়লো, মেহেরজানের কপালের এক পাশে ফুলে আছে আর গলার চামড়া লাল হয়ে আছে। রোদে মানুষ ভয় পায় না। আলো মানেই মানুষের সাহস। তবুও রাতের স্বপ্নের মতো এখন আবার ওই আতংকটা এসে জয়নালকে ঘিরে ধরেছে।
জয়নালের শুধু মনে হলো, এ দৃশ্যও যেন সত্য না হয়, এটিও যেন স্বপ্ন হয়।

পুনশ্চ
বিকেলটা মনে হচ্ছে খুব দ্রুত গড়িয়ে যাচ্ছে। আবার সন্ধ্যা নামবে। জয়নালের কেমন যেন ভয় ভয় লাগছে। ঘরের দাওয়ায় বসে আছে। ভাইয়ের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে মনের ভেতর ভয়ের কুয়াশা এসে ভিড় করছে। তীব্র ভয়ে মানুষের বুকের ভেতরকার শোকের কথা মানুষ ভুলে যায়। জয়নালের মনে হচ্ছে, ধীরে ধীরে ভাইয়ের মৃত্যুর কষ্টটা ফিকে হয়ে আসছে। ঘরের ভেতর থেকে মেহেরজান এসে তার পাশে বসলো। তার গা ঘেঁষে বসতেই জয়নাল তার দিকে তাকাতেই আবার মেহেরজানের কপালের একপাশের ফোলাটার উপর তার চোখ পড়লো। সেটা নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করবে বলে কথা বলতে যাবার আগ মূহুর্তেই মেহেরজান বলে বসলো, বাড়িটা খালি খালি লাগছে।
জয়নাল খানিকক্ষণ চুপ থেকে বললো, তোর কপালে ফোলা কেন? কখন ব্যথা পেলি?
মেহেরজান জয়নালের পাশে আরো ঘেঁষে এসে বললো, এইটা নিয়া জিজ্ঞাস কইরেন না।
একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেলে জয়নাল এবার জিজ্ঞেস করলো, আমারে সত্যি কইরা বলতো, তুই আসলে কে?
আমি শুধু আপনের। আমিও একটা মাখলুকাত। আর কিছু জানতে চাইয়েন না। বলেই মেহেরজান মুচকি হেসে জয়নালের দিকে তাকিয়ে রইলো।
কথাটা শুনে জয়নালের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। সে মাথা নিচু করে পায়ের কাছের মাতির দিকে তাকিয়ে রইলো।
মেহেরজান এবার বললো, মনে ভয় ডর রাইখেন না। আমি আপনের, খালী এই কথাটা মনে রাইখেন। বলেই জয়নালের কাঁধে মাথা রাখল মেহেরজান।

Picked up where you left off

Comments

    Please login to post comment. Login

  • probash khobor 4 hours ago

    গল্পটার প্লট ভালো লেগেছে। মেহেরজান চরিত্রটিও দারুণ। গল্পের ভেতর যে গানের চরণগুলো লিখেছেন, সেগুলোও খুব ভালো লাগল। একটা অশরীরী অস্তিত্বের সাথে বসবাস, ভাবনাটাই এক্সিলেন্ট।

    • Borhan mahmud 4 hours ago

      ধন্যবাদ, আপনার মন্তব্যের জন্য।