খন্দক যুদ্ধ, যা আহযাব যুদ্ধ নামেও পরিচিত, ইসলামের ইতিহাসে তৃতীয় বৃহত্তম ও সবচেয়ে কৌশলগত যুদ্ধ। এটি ৫ হিজরিতে ৬২৭ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত হয়। এর পটভূমি ছিল বনু নাদির ও বনু কাইনুকার ইহুদি গোত্রকে বিশ্বাসঘাতকতার কারণে মদিনা থেকে বহিষ্কার করা হলে তারা মক্কায় গিয়ে কুরাইশদের সাথে জোট গঠন করে। পরে তারা নজদের বনু গাতাফান সহ অন্যান্য আরব গোত্রকে যুক্ত করে। আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে প্রায় দশ হাজার সৈন্যের সম্মিলিত বাহিনী মদিনা আক্রমণের জন্য রওনা হয়, যেখানে মুসলিমদের সংখ্যা ছিল মাত্র তিন হাজার জন।
এত বড় বাহিনীর খবর মদিনায় পৌঁছালে রাসূল (সা) সাহাবীদের নিয়ে পরামর্শ সভা করেন। সেই সভায় পারস্য থেকে আগত সাহাবী সালমান আল-ফারসি (রা.) একটি নতুন পরামর্শ দেন। তিনি বলেন পারস্যে শত্রুর হাত থেকে শহর রক্ষায় আমরা শহরের চারপাশে গভীর পরিখা খনন করি। আরবদের যুদ্ধ ইতিহাসে এই কৌশল আগে কখনো ব্যবহার হয়নি। রাসূল (সা) এই মত গ্রহণ করেন। মদিনার তিন দিকে খেজুর বাগান ও পাথুরে পাহাড় থাকায় প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষিত ছিল, তাই শুধু উত্তর দিকে খোলা অংশে পরিখা খননের সিদ্ধান্ত হয়। রাসূল (সা) নিজে সহ প্রতিটি সক্ষম মুসলিম খনন কাজে যোগ দেন। প্রতি দশ জনের উপর চল্লিশ হাত খননের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং মাত্র ছয় দিনে খনন শেষ হয়।
শত্রুরা এসে পরিখা দেখে হতবাক হয়ে যায়। আরবে এমন প্রতিরক্ষা তারা আগে দেখেনি। ফলে তারা পরিখা পার হতে না পেরে অবরোধ শুরু করে, যা সাতাশ দিন স্থায়ী ছিল। তারা দূর থেকে তীর নিক্ষেপ করতে থাকে। এক পর্যায়ে আমর ইবনে আবদ উদ সহ কয়েকজন অশ্বারোহী একটি সরু স্থান দিয়ে পরিখা পার হয়ে যায়। তখন হযরত আলী (রা.) এগিয়ে এসে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আমরকে হত্যা করেন এবং বাকিরা ভয়ে পালিয়ে যায়।
এই অবরোধের মধ্যেই সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়। জোটবাহিনীর প্ররোচনায় মদিনার ভেতরে থাকা মিত্র গোত্র বনু কুরাইযা চুক্তি ভঙ্গ করে। ফলে মুসলিমরা দুই দিক থেকে বিপদে পড়ে। এই কঠিন সময়ে আল্লাহ এক অদৃশ্য সাহায্য পাঠান। গোপনে ইসলাম গ্রহণকারী নুয়াইম ইবনে মাসউদ (রা.) এর বুদ্ধিমত্তায় জোটের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হয়। তিনি কুরাইযাকে বলেন কুরাইশরা পালিয়ে যাবে, তোমরা বিপদে পড়বে, আর কুরাইশদের বলেন কুরাইযা তোমাদের লোক চেয়ে মুসলিমদের হাতে তুলে দিতে চায়। এতে জোটে ভাঙন ধরে। একই সময়ে প্রচণ্ড শীত ও ঝড়ো বাতাসে শত্রুদের তাঁবু উপড়ে যায়, উট-ঘোড়া মারা যেতে থাকে। শেষ পর্যন্ত তারা ব্যর্থ হয়ে ফিরে যায়।
এই যুদ্ধের পর মদিনা চিরতরে নিরাপদ হয়ে যায় এবং কুরাইশদের আক্রমণাত্মক শক্তি শেষ হয়ে যায়। রাসূল ( সাঃ ) বলেন, এখন থেকে আমরাই তাদের উপর আক্রমণ করব। এটি প্রমাণ করে যে সংখ্যা নয়, বরং কৌশল, ধৈর্য ও ঐক্য থাকলে ছোট বাহিনীও বড় বাহিনীকে প্রতিহত করতে পারে। খন্দকের বিজয়ের ফলে ইসলামের মর্যাদা আরব জুড়ে বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
তথ্যসূত্র: বাংলা উইকিপিডিয়া - খন্দকের যুদ্ধ, আর-রাহীকুল মাখতুম ও সীরাত ইবনে হিশাম।