Story

শৈশবের দিনগুলি

September 27, 2026

35 views

শৈশবের দিনগুলো আসলে কোথায় থাকে?

পুরোনো কোনো কাঠের বাক্সে? মায়ের আলমারির ভাঁজে রাখা শাড়ির গন্ধে? নাকি সেই স্কুলের খাতার শেষ পাতায়, যেখানে অঙ্কের হিসাব শেষ করে আমরা অকারণে নদী, নৌকা আর মানুষের ছবি আঁকতাম?

অনেক বছর পরেও আমি এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাইনি।

শুধু মাঝে মাঝে মনে হয়, শৈশব কোথাও যায় না। সে আমাদের ভেতরেই থেকে যায়। মানুষ বড় হয়, তার ঘর বদলে যায়, শহর বদলে যায়, পরিচিত মুখগুলো একে একে অচেনা হয়ে যায়—কিন্তু কোনো এক নির্জন দুপুরে, জানালার পাশে বসে থাকলে হঠাৎ সেই ছোট্ট ছেলেটা আবার ফিরে আসে। কাদামাখা পা, এলোমেলো চুল, হাঁটুতে শুকিয়ে যাওয়া ক্ষত আর চোখভরা বিস্ময় নিয়ে।

আমারও এমন হয়।

বিশেষ করে বর্ষার দিনে।

বৃষ্টির গন্ধ পেলেই আমার মনে পড়ে আমাদের গ্রামের সেই সরু মাটির রাস্তা। রাস্তার দুই পাশে কচুরিপানা ভরা ডোবা, বাঁশঝাড় আর দূরে তালগাছের সারি। বর্ষার পানিতে রাস্তার অর্ধেক ডুবে যেত। আমরা তখন জুতো হাতে নিয়ে হাঁটতাম। কখনো জুতো মাথায় তুলে নিয়ে পানির ভেতর দিয়ে দৌড়ে যেতাম।

সেই দিনগুলোতে আমাদের পৃথিবী ছিল খুব ছোট।

কিন্তু সেই ছোট পৃথিবীর ভেতরেই কত আনন্দ লুকিয়ে ছিল!

আমাদের বাড়ির পাশেই ছিল একটা বিশাল আমগাছ। গাছটা এত পুরোনো ছিল যে গ্রামের বয়স্ক মানুষদের কাছেও তার বয়সের কোনো হিসাব ছিল না। বাবা বলতেন, তিনি ছোট থাকতেও গাছটা এমনই বড় ছিল।

গাছটির নিচে বসেই আমাদের বিকেল কাটত।

আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ছিল রতন।

রতনের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব কীভাবে হয়েছিল, আজ আর মনে নেই। হয়তো একসঙ্গে স্কুলে যাওয়া থেকেই। হয়তো একদিন সে আমার জন্য কাঁচা আম পেড়ে দিয়েছিল। কিংবা কোনো একদিন আমি তাকে আমার টিফিনের অর্ধেক দিয়ে দিয়েছিলাম।

শৈশবের বন্ধুত্বের জন্য কোনো কারণ লাগে না।

একদিন পাশাপাশি বসা, আরেকদিন থেকেই যেন মানুষটা নিজের হয়ে যায়।

রতন ছিল আমার চেয়ে একটু সাহসী। গাছে উঠতে তার কোনো ভয় ছিল না। পুকুরে সাঁতার কাটত, বাঁশঝাড়ে ঢুকে পাখির বাসা খুঁজত, এমনকি একবার গ্রামের পরিত্যক্ত বাড়িটাতেও ঢুকে পড়েছিল।

আমরা সবাই বলতাম, ওই বাড়িতে ভূত আছে।

রতন বলত, “ভূত থাকলে থাকুক। ভূত কি মানুষকে খায়?”

আমি বলতাম, “খায় না, কিন্তু ভয় দেখায়।”

রতন হাসত।

“ভয় পাস কেন?”

আমি মুখ গম্ভীর করে বলতাম, “আমি ভয় পাই না। শুধু সাবধান থাকি।”

সে হেসে গড়িয়ে পড়ত।

আমাদের স্কুল ছিল বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। বর্ষাকালে সেই এক কিলোমিটার পথই আমাদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রাস্তা মনে হতো।

সকালে মা ঘুম থেকে তুলে দিতেন।

“উঠ, স্কুলে যাবি না?”

আমি কম্বলের ভেতর থেকে বলতাম, “আজ স্কুল বন্ধ।”

মা জানতেন, এটা আমার প্রতিদিনের মিথ্যা।

তিনি জানালা খুলে দিতেন।

সকালের আলো চোখে এসে পড়ত।

“উঠ। রতন তো অনেক আগেই চলে গেছে।”

রতনের নাম শুনলেই আমার ঘুম উধাও হয়ে যেত।

দাঁত মাজতে মাজতেই দৌড়ে বেরিয়ে পড়তাম। মা পেছন থেকে চিৎকার করতেন,

“ভাতটা খেয়ে যা!”

আমি বলতাম, “ফিরে এসে খাব।”

“স্কুল থেকে এসে আবার কোথায় যাবি?”

আমি কোনো উত্তর দিতাম না।

কারণ উত্তরটা আমি নিজেও জানতাম না।

স্কুলে যাওয়ার রাস্তার মাঝখানে ছিল একটা ছোট খাল। বর্ষায় খালটা ফুলে উঠত। আমরা স্কুলে যাওয়ার সময় তার দিকে তাকিয়ে থাকতাম।

একদিন রতন বলল, “চল, আজ স্কুলে যাব না।”

আমি ভয় পেয়ে বললাম, “কেন?”

“খালে নৌকা এসেছে।”

“তাতে কী?”

“নৌকায় উঠব।”

আমি জানতাম, নৌকায় উঠলে বিপদ হতে পারে। শিক্ষক জানতে পারলে মার খাব। বাড়িতে জানলে তার চেয়েও বেশি।

তবু রতনের পেছনে হাঁটলাম।

সেদিন আমরা স্কুলে যাইনি।

নৌকার মাঝি ছিলেন গ্রামের কাদের চাচা। তিনি আমাদের দেখে প্রথমে রাগ করেছিলেন।

“তোমরা স্কুলে যাওনি?”

আমরা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

তিনি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হেসে বললেন,

“উঠো।”

আমরা নৌকায় উঠলাম।

সেদিন খালের পানির ওপর দিয়ে নৌকা চলছিল আর আমরা দুজন পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ হয়ে বসেছিলাম।

কাদের চাচা বৈঠা চালাতে চালাতে বলেছিলেন,

“পড়াশোনা করো। আমার মতো সারাজীবন নৌকা বাইতে হবে না।”

তখন তার কথার অর্থ বুঝিনি।

আজ বুঝি।

মানুষের বড় হওয়ার পথে কত কথাই যে সে পরে বুঝতে শেখে!

সেদিন বিকেলে বাড়ি ফিরে মা কিছু একটা বুঝে ফেলেছিলেন।

“স্কুলে গিয়েছিলি?”

আমি মাথা নাড়লাম।

“হ্যাঁ।”

মা কিছু বললেন না।

শুধু আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

মায়েদের চোখে এমন কিছু থাকে, যার সামনে পৃথিবীর সব মিথ্যা খুব ছোট হয়ে যায়।

রাতে খেতে বসে মা বললেন,

“আজ তোমাদের স্কুলে কী পড়িয়েছে?”

আমি থেমে গেলাম।

বাবা পাশে বসে ছিলেন।

তিনি চুপচাপ আমার দিকে তাকালেন।

আমি বুঝলাম, সব শেষ।

পরদিন স্কুলে যাওয়ার আগে বাবা বললেন,

“ভুল করলে স্বীকার করতে হয়। মিথ্যা বললে ভুলটা আরও বড় হয়।”

আমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

তিনি আমাকে মারেননি।

সেদিন কেন জানি মার না খেয়েও আমার চোখে পানি এসেছিল।

বাবা তখন খুব কঠিন মানুষ বলে মনে হতো।

আজ মনে হয়, তিনি ছিলেন আমাদের সময়ের সবচেয়ে নরম মানুষগুলোর একজন।

শুধু তার ভালোবাসার ভাষাটা আমরা বুঝতাম না।

আমাদের শৈশবে আনন্দের সবচেয়ে বড় উৎস ছিল ছুটির দিন।

শুক্রবার সকালে ঘুম থেকে উঠতে কোনো তাড়া থাকত না। মা যতবার ডাকতেন, আমি ততবার বলতাম,

“আর পাঁচ মিনিট।”

সেই পাঁচ মিনিট কখন যে এক ঘণ্টা হয়ে যেত, বুঝতাম না।

দুপুরের দিকে আমরা মাঠে চলে যেতাম।

মাঠে তখন ফুটবল খেলা হতো।

আমাদের ফুটবল ছিল পুরোনো, অনেক জায়গায় সেলাই করা একটা বল। তবু সেটাই ছিল আমাদের কাছে বিশ্বকাপের বলের চেয়েও দামি।

খেলার সময় কে কোন দলে থাকবে, তা নিয়ে ঝগড়া হতো।

রতন সবসময় আমাকে নিজের দলে নিত।

“ও আমার সঙ্গে থাকবে।”

“কেন?”

“কারণ ও ভালো খেলে।”

আমি জানতাম, আমি ভালো খেলতাম না।

তবু বন্ধুর মুখে নিজের সম্পর্কে এমন কথা শুনলে বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত আনন্দ হতো।

খেলা শেষে আমরা পুকুরে ঝাঁপ দিতাম।

পুকুরের পানি ছিল সবুজাভ। পাড়ে শেওলা জমে থাকত। মায়েরা দূর থেকে চিৎকার করতেন,

“পানি থেকে উঠ!”

আমরা শুনতাম না।

আর একটু পরে আবার চিৎকার—

“শুনতে পাচ্ছিস না?”

আমরা তখন পানির নিচে ডুব দিয়ে থাকতাম।

বাড়ি ফিরে ভেজা কাপড় নিয়ে দাঁড়ালে মা রাগে বলতেন,

“তোর এই পুকুরে নামা বন্ধ করব একদিন।”

আমি জানতাম, তিনি সত্যি বন্ধ করবেন না।

কারণ পরদিন আবার তিনি নিজেই শুকনো কাপড় গুছিয়ে রাখবেন।

শৈশবের সুখগুলো এমনই ছিল।

তখন আমরা বুঝতাম না, এগুলো সুখ।

শুধু বেঁচে থাকতাম।

এক বিকেলে আমগাছের নিচে বসে রতন আমাকে বলেছিল,

“তুই বড় হয়ে কী হবি?”

আমি বললাম, “শিক্ষক।”

“কেন?”

“ছুটি বেশি।”

রতন হেসে বলল, “আমি পুলিশ হব।”

“কেন?”

“সবাইকে ধরব।”

আমি বললাম, “আমাকেও?”

সে কিছুক্ষণ ভেবে বলল,

“তোকে না।”

“কেন?”

“তুই আমার বন্ধু।”

সেদিনের কথাটা এত সাধারণ ছিল যে তখন মনে রাখিনি।

কিন্তু বহু বছর পরে বুঝেছি, মানুষের জীবনে কিছু কথা সময় পেরিয়ে গেলে আরও মূল্যবান হয়ে ওঠে।

আমাদের গ্রামে তখন বিদ্যুৎ ছিল না।

সন্ধ্যা নামলে কেরোসিনের বাতি জ্বলত।

বাড়ির উঠোনে মা বসে শাক কাটতেন। বাবা রেডিও শুনতেন। পাশের বাড়ির চাচা এসে গল্প করতেন।

আমরা উঠোনে বসে জোনাকি ধরতাম।

একটা জোনাকি হাতে এলে মনে হতো, আমরা যেন একটা ছোট্ট তারা ধরে ফেলেছি।

আমি রতনকে বলতাম,

“এগুলো কোথা থেকে আসে?”

সে বলত,

“আকাশ থেকে পড়ে।”

আমি বিশ্বাস করতাম।

শৈশবের পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কিছু ছিল না।

একদিন সন্ধ্যায় দাদু আমাকে বলেছিলেন,

“জোনাকি আকাশ থেকে পড়ে না। ওদের নিজের আলো আছে।”

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম,

“ওরা এত ছোট হয়েও আলো দেয় কীভাবে?”

দাদু হেসে বলেছিলেন,

“ছোট হলেই আলো কম হয় না।”

কথাটা তখন বুঝিনি।

আজ বুঝি।

মানুষের জীবনেও কিছু মানুষ থাকে, যারা খুব বেশি সময় আমাদের সঙ্গে থাকে না। অথচ অল্প সময়েই এমন আলো রেখে যায়, যা বহু বছর পরেও নিভে না।

আমার দাদুও তেমন ছিলেন।

শীতের সকালে তিনি উঠোনে রোদ পোহাতেন। আমি তার পাশে বসে গল্প শুনতাম।

তিনি স্বাধীনতার গল্প বলতেন, নদীর গল্প বলতেন, তার ছোটবেলার গল্প বলতেন।

একদিন বললেন,

“তুই বড় হয়ে এই গ্রাম ছেড়ে চলে যাবি।”

আমি প্রতিবাদ করে বলেছিলাম,

“কখনো না।”

তিনি হেসেছিলেন।

“সবাই যায়।”

“আমি যাব না।”

“মানুষ নিজের ইচ্ছায় সবসময় যায় না। সময় নিয়ে যায়।”

তখন তার কথায় অভিমান হয়েছিল।

আমি ভেবেছিলাম, দাদু আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন।

আজ বুঝি, তিনি ভবিষ্যৎ দেখেছিলেন।

কয়েক বছর পর সত্যিই আমি গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে এলাম।

তার আগেই দাদু চলে গিয়েছিলেন অন্য এক পৃথিবীতে।

দাদুর মৃত্যুর দিন প্রথমবার বুঝেছিলাম, কিছু মানুষ চলে গেলে পৃথিবী আগের মতো থাকে না।

বাড়ির উঠোন একই ছিল।

আমগাছ একই ছিল।

পুকুরও ছিল।

শুধু দাদুর চেয়ারটা খালি ছিল।

আমি সেই চেয়ারের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম।

মা বলেছিলেন,

“কাঁদিস না।”

কিন্তু মায়েরা কি জানেন, সব কান্না চোখ দিয়ে বের হয় না?

কিছু কান্না মানুষের ভেতরে জমে থাকে।

বছর কেটে গেল।

আমরা বড় হতে লাগলাম।

আমাদের খেলাধুলা কমে গেল।

বই বাড়তে লাগল।

পরীক্ষার চাপ বাড়তে লাগল।

রতনের সঙ্গে দেখা হওয়াও কমে গেল।

তার বাবা তাকে শহরে নিয়ে গেলেন কাজের জন্য।

যেদিন রতন চলে যাচ্ছিল, সে আমাকে বলেছিল,

“আমি আবার আসব।”

আমি বলেছিলাম,

“কবে?”

সে বলেছিল,

“শিগগির।”

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম,

“কতদিন পরে?”

সে হাসল।

“দুই-তিন দিন।”

সেই দুই-তিন দিন আর কখনো শেষ হলো না।

জীবন কখনো কখনো মানুষের কাছ থেকে বিদায় নেয় খুব সাধারণভাবে।

কেউ জানে না, সেটাই শেষ দেখা।

আমরা কেউ সেদিন বুঝিনি।

শুধু বাসটা যখন ধুলো উড়িয়ে চলে গেল, আমি অনেকক্ষণ রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।

রতন জানালা দিয়ে হাত নাড়ছিল।

আমিও নাড়ছিলাম।

তারপর বাসটা বাঁক ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেল।

আমি বাড়ি ফিরলাম।

আমগাছের নিচে বসে রইলাম।

সেদিন প্রথমবার মনে হয়েছিল, বিকেলটা খুব বড়।

আর আমি খুব ছোট।

তারপর সময় নিজের মতো করে চলতে থাকল।

আমি শহরে চলে এলাম।

স্কুল বদলাল।

কলেজ হলো।

বিশ্ববিদ্যালয় হলো।

জীবন ধীরে ধীরে ব্যস্ত হয়ে উঠল।

একসময় বুঝলাম, যে ছেলেটা একদিন জোনাকি ধরে আকাশের তারা ভেবেছিল, সে এখন সারাদিন কম্পিউটারের পর্দায় তাকিয়ে থাকে।

যে ছেলে বৃষ্টিতে কাদায় দৌড়াত, সে এখন বৃষ্টি হলে জানালা বন্ধ করে দেয়।

যে ছেলে ছুটির দিনে মাঠে ফুটবল খেলত, সে এখন ছুটির দিনেও কাজের তালিকা তৈরি করে।

তবু মাঝে মাঝে শৈশব ফিরে আসে।

হঠাৎ কোনো গন্ধে।

কোনো পুরোনো গানে।

কোনো বৃষ্টির শব্দে।

অথবা মায়ের মুখের একটা কথায়।

একদিন বহু বছর পর গ্রামের বাড়িতে গেলাম।

আমার বয়স তখন ত্রিশের কাছাকাছি।

বাড়িতে ঢুকেই প্রথমে আমগাছটার দিকে তাকালাম।

গাছটা এখনও আছে।

তবে আগের মতো নয়।

কয়েকটা বড় ডাল শুকিয়ে গেছে।

গাছের নিচে আগের সেই মাটির জায়গাটাও নেই। ইট বিছানো হয়েছে।

আমি দাঁড়িয়ে রইলাম।

মনে হলো, গাছটা আমাকে চিনতে পেরেছে।

কেমন অদ্ভুত!

মানুষ মানুষকে ভুলে যায়।

গাছ ভুলে যায় না।

আমি গাছটার গায়ে হাত রাখলাম।

শৈশবের কত বিকেল যে এই গাছের ছায়ায় পড়ে আছে, তার কোনো হিসাব নেই।

আমি চোখ বন্ধ করলাম।

রতনের হাসি শুনতে পেলাম যেন।

“ভয় পাস কেন?”

আমি মনে মনে বললাম,

“এখন আর ভূতকে ভয় পাই না, রতন। এখন সময়কে ভয় পাই।”

ঠিক তখন পাশ থেকে একটা কণ্ঠ শুনলাম।

“তুই এখনও একই রকম আছিস।”

আমি ঘুরে তাকালাম।

রতন।

কয়েক সেকেন্ড আমরা দুজন কেউ কথা বলতে পারলাম না।

তার চেহারায় বয়সের ছাপ পড়েছে। মাথার চুলে পাক ধরেছে। চোখের কোণে ক্লান্তি।

তবু আমি তাকে চিনে ফেলেছিলাম।

বন্ধুত্বের কিছু মুখ চিনতে চোখের প্রয়োজন হয় না।

আমি বললাম,

“তুই সত্যিই এসেছিস।”

সে হেসে বলল,

“দুই-তিন দিনের জন্য।”

আমি হাসলাম।

“কত বছর হলো?”

রতন কিছু বলল না।

আমরা দুজন আমগাছের নিচে বসে পড়লাম।

অনেকক্ষণ চুপ করে রইলাম।

তারপর সে বলল,

“মনে আছে, একদিন স্কুল ফাঁকি দিয়ে নৌকায় উঠেছিলাম?”

আমি হেসে ফেললাম।

“মনে আছে।”

“কাদের চাচা?”

“নেই।”

“দাদু?”

আমি চুপ হয়ে গেলাম।

রতনও চুপ।

কিছু নাম উচ্চারণ করলে বুকের ভেতর হঠাৎ একটা পুরোনো দরজা খুলে যায়।

আমরা সেদিন অনেকক্ষণ গল্প করেছিলাম।

আমাদের শৈশবের গল্প।

আমরা কে কী হতে চেয়েছিলাম, সে গল্প।

কতবার মার খেয়েছি, কতবার মিথ্যা বলেছি, কতবার পুকুরে পড়ে ভয় পেয়েছি—সব গল্প।

রতন বলল,

“তুই শিক্ষক হতে চেয়েছিলি।”

আমি বললাম,

“তুই পুলিশ হতে চেয়েছিলি।”

সে হেসে বলল,

“দেখ, দুজনের কেউই কিছু হতে পারলাম না।”

আমি বললাম,

“হয়েছি তো।”

“কী?”

আমি একটু ভেবে বললাম,

“মানুষ।”

সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ। হয়তো এটাই বড় কথা।”

সন্ধ্যা নেমে আসছিল।

আকাশে তখন মেঘ।

দূরে কোথাও মসজিদের আজান শোনা যাচ্ছিল।

আমাদের সামনে দিয়ে কয়েকটা শিশু দৌড়ে গেল।

তাদের কারও হাতে ফুটবল, কারও হাতে লাঠি।

একজন আরেকজনকে ধাক্কা দিয়ে বলল,

“তুই আউট!”

অন্যজন চিৎকার করল,

“না, আমি আউট না!”

আমরা দুজন তাকিয়ে রইলাম।

হঠাৎ মনে হলো, আমরা যেন নিজেদেরই দেখতে পাচ্ছি।

শুধু সময়টা বদলে গেছে।

শিশুরা জানে না, তাদের এই দৌড় একদিন স্মৃতি হয়ে যাবে।

তারা জানে না, আজকের এই ঝগড়া, এই হাসি, এই মাঠ, এই বিকেল—সবকিছুরই একদিন দাম হবে।

খুব বেশি দাম।

আমরা তাদের বলতে চাইলাম,

“দৌড়াও। যতটা পারো দৌড়াও। খেলো। কাদায় নামো। বৃষ্টিতে ভিজো। মায়ের বকা খাও। বাবার কাছে মিথ্যা বলে ধরা পড়ো। বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়া করো, আবার পাঁচ মিনিট পর মিটেও যাও। কারণ তোমরা এখন যে জীবনটা বেঁচে আছ, একদিন সেটাই তোমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়ে থাকবে।”

কিন্তু আমরা কিছু বললাম না।

শুধু তাকিয়ে রইলাম।

সেদিন রাতে মায়ের পাশে বসে খাচ্ছিলাম।

মা আগের মতোই বললেন,

“আর একটু ভাত দেব?”

আমি বললাম,

“দাও।”

মা অবাক হয়ে তাকালেন।

“শহরে তো এত খাস না।”

আমি হেসে বললাম,

“এখানে খেতে ভালো লাগে।”

মা আর কিছু বললেন না।

শুধু ভাত বাড়িয়ে দিলেন।

আমি খেতে খেতে বুঝলাম, মায়ের হাতে রান্না করা খাবারের স্বাদ শুধু খাবারের স্বাদ নয়।

তার সঙ্গে মিশে থাকে একটা বাড়ি।

একটা উঠোন।

একটা বিকেল।

একটা সময়।

যে সময় আর ফিরে আসে না।

রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে জানালার পাশে দাঁড়ালাম।

দূরে অন্ধকার মাঠ।

কোথাও একটা জোনাকি জ্বলছে।

আমি অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম।

দাদুর কথা মনে পড়ল।

“ছোট হলেই আলো কম হয় না।”

আমার মনে হলো, শৈশবও তেমনই।

জীবনের তুলনায় তার সময়টা ছোট।

কিন্তু তার আলো অনেক দীর্ঘ।

মানুষ যত বড় হয়, তত বেশি জিনিস হারায়।

হারায় খেলনা।

হারায় মাঠ।

হারায় বন্ধু।

হারায় দাদুর গল্প।

হারায় মায়ের কাছে নির্ভয়ে আবদার করার অধিকার।

হারায় বাবার কাঁধে চড়ার দিন।

হারায় সেই বিশ্বাস—কাল আবার সবকিছু আগের মতো থাকবে।

তারপরও মানুষ বেঁচে থাকে।

কারণ স্মৃতি তাকে বাঁচিয়ে রাখে।

আমার শৈশবও আজ আর নেই।

আমগাছের নিচে সেই ছেলেটা নেই।

পুকুরের ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট আমি নেই।

স্কুল ফাঁকি দিয়ে নৌকায় ওঠা সেই দুষ্টু ছেলেটাও নেই।

রতনও আগের মতো নেই।

দাদু নেই।

কাদের চাচা নেই।

অনেকেই নেই।

তবু তারা সবাই আছে।

আমার ভেতরে।

কখনো বৃষ্টির গন্ধে।

কখনো শীতের সকালের রোদে।

কখনো মায়ের রান্নার গন্ধে।

কখনো পুরোনো কোনো গানের সুরে।

কখনো কোনো শিশুর অকারণ হাসিতে।

আর কখনো গভীর রাতে, যখন চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে আসে, তখন মনে হয়—কেউ একজন আমাকে ডাকছে।

“এই, চল!”

আমি চোখ বন্ধ করি।

দেখি, রতন দাঁড়িয়ে আছে আমগাছের নিচে।

হাতে পুরোনো একটা ফুটবল।

পেছনে বিকেলের মাঠ।

আকাশে মেঘ।

দূরে পাখির ডাক।

সে বলছে,

“চল, আজ স্কুলে যাব না।”

আমি হেসে ফেলি।

তারপর আবার চোখ খুলে দেখি—আমি আমার ঘরে।

চারপাশে শহরের আলো।

টেবিলের ওপর ল্যাপটপ।

দেয়ালে ঘড়ি।

বাইরে গাড়ির শব্দ।

শৈশব নেই।

তবু শৈশব আছে।

কারণ জীবনের সবকিছু হারিয়ে গেলেও কিছু দিন কখনো হারায় না।

সেগুলো আমাদের ভেতরে নীরবে বেঁচে থাকে।

আমরা শুধু ভুলে থাকার অভিনয় করি।

আর কোনো এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়, কোনো এক অচেনা গন্ধে, কোনো এক পুরোনো গানের সুরে তারা হঠাৎ ফিরে আসে।

তখন মনে হয়—

জীবনটা এত বড় নয়।

আমরা শুধু বড় হয়ে গেছি।

আর আমাদের ভেতরে কোথাও একজন ছোট্ট মানুষ এখনও বসে আছে।

সে এখনও কাদামাখা পায়ে দৌড়াতে চায়।

সে এখনও জোনাকি ধরতে চায়।

সে এখনও বন্ধুর হাত ধরে বলতে চায়,

“চল, বাড়ি ফিরি। মা বকবে।”

আমি জানি, একদিন আমিও চলে যাব।

আমার ঘর থাকবে।

আমার জিনিস থাকবে।

হয়তো আমার লেখা কিছু শব্দ কোথাও পড়ে থাকবে।

কিন্তু আমার শৈশব?

সে থাকবে সেই আমগাছের ছায়ায়।

সেই মাটির রাস্তায়।

সেই পুরোনো পুকুরের জলে।

মায়ের ডাকের মধ্যে।

বাবার নীরব ভালোবাসায়।

দাদুর অসমাপ্ত গল্পে।

রতনের হাসিতে।

আর সেই জোনাকির ছোট্ট আলোয়।

যে আলো একদিন আমাকে শিখিয়েছিল—

ছোট হলেই আলো কম হয় না।

শুধু মানুষ বড় হয়ে গেলে সেই আলো দেখতে ভুলে যায়।

আর শৈশব?

শৈশব কখনো আমাদের ছেড়ে যায় না।

আমরাই একদিন তার কাছ থেকে দূরে চলে যাই।

Picked up where you left off

Comments

    Please login to post comment. Login

  • খুব ভালো লাগলো। আসলেই! শৈশব আমাদের ছেড়ে যায় না। আমরাই একদিন তার কাছ থেকে দূরে চলে যাই।