১৯৯০ সালে চট্টগ্রামে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এক স্বপ্নবাজ মানুষ—ডাঃ বাবর আলী। পেশায় তিনি একজন চিকিৎসক হলেও নেশায় আপাদমস্তক এক অদম্য পাহাড়ি ও দুঃসাহসী অ্যাডভেঞ্চার প্রেমী। পর্বতারেহণের ইতিহাসে তিনি একের পর এক অনন্য ও মহাকাব্যিক কীর্তি গড়েছেন। ষষ্ঠ বাংলাদেশি হিসেবে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট (৮,৮৪৮ মিটার) জয়ের পাশাপাশি একই অভিযানে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে তিনি জয় করেন মাউন্ট লোৎসে (৮,৫১৬ মিটার)। এখানেই থেমে থাকেনি তাঁর এই অদম্য যাত্রা; তিনি প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে জয় করেছেন বিশ্বের অন্যতম কঠিন ও বিপজ্জনক পর্বত অন্নপূর্ণা-১। এরপর একে একে মানাসলু এবং সর্বশেষ মাকালু চূড়া স্পর্শ করে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্বের ৫-৫টি ‘আটহাজারী’ (৮,০০০ মিটারের চেয়ে উঁচু) পর্বতশৃঙ্গ জয়ের এক ঐতিহাসিক ও অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েছেন তিনি, যার প্রতিটি চূড়াতেই গর্বের সাথে উঁকি দিয়েছে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা।
শুধু হিমালয়ের চূড়াই নয়, পায়ে হেঁটে এবং সাইকেলের চাকা ঘুরিয়ে তিনি চষে বেড়িয়েছেন দেশের ৬৪টি জেলা। আর পর্বত ও পথ চেনার এই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতাগুলো তিনি চমৎকারভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন তাঁর ‘পায়ে পায়ে ৬৪ জেলা’, ‘এভারেস্ট ও লোৎসে শিখরে’ এবং ‘সাইকেলের সওয়ারি’ বইগুলোতে। শুধু তাই নয়, যৌথ অনুবাদের মাধ্যমে বাংলা পাঠকদের উপহার দিয়েছেন ‘ম্যালরি ও এভারেস্ট’-এর মতো রোমাঞ্চকর ইতিহাসও। বই পড়তে এবং ভালোবাসতে জানা এই অদম্য ও কীর্তিমান মানুষটির মুখোমুখি আমি।
প্রশ্ন : বাবর ভাই, আপনি অন্নপূর্ণা-১ এবং অতি সম্প্রতি মাকালুর মতো বিশ্বের অন্যতম টেকনিক্যাল ও বিপজ্জনক দুটি পর্বত জয় করেছেন। মাকালুকে বলা হয় ‘গ্রেট ব্ল্যাক ওয়ান’। তো এভারেস্টের তুলনায় অন্নপূর্ণা-১ এবং মাকালুর এই খাড়া পাথুরে ও বরফাবৃত ট্র্যাকে ক্লাইম্বিং করার স্ট্র্যাটেজি এবং চ্যালেঞ্জ কতটা ভিন্ন ছিল?
উত্তর : প্রত্যেকটা মাউন্টেনই আলাদা। মাউন্টেন বা পর্বতের ক্ষেত্রে যে চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের ফেস করতে হয়, সেটা প্রত্যেকটার জন্যই আলাদা। কোনো মাউন্টেনের সাথে আসলে ওভাবে তুলনা করা উচিত না। তারপরও আমি বলব, আমার এই তিনটা মাউন্টেনের মধ্যে আমাকে যদি এভারেস্ট, অন্নপূর্ণা-১ বা মাকালুর মধ্যে বলা হয়, নিঃসন্দেহে অন্নপূর্ণা-১ অনেক অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং ছিল! এটা এখন পর্যন্ত আমার ক্লাইম্ব করা সবচেয়ে কঠিন পর্বত। আর অবশ্যই মাকালুও এভারেস্টের চেয়ে টেকনিক্যাল। এভারেস্ট হতে পারে বিশ্বের উচ্চতম পর্বত, কিন্তু এর চেয়ে টেকনিক্যালি কঠিন আরও অনেক পর্বত আছে। অন্নপূর্ণা-১ তো, Definitely the toughest mountain I've ever climbed. একই সাথে মাকালুও খুবই আলাদা। দুটোর মধ্যে স্ট্র্যাটেজি বলতে আমি আসলে সারাবছরই প্রস্তুতির মধ্যে থাকি। অন্নপূর্ণা-১ বা মাকালুর ক্ষেত্রে আমার প্রস্তুতি সেটার ইনটেনসিটি আরও বাড়িয়েছে। আর মাকালুর ক্ষেত্রে একটা বিষয় যেটা অন্য মাউন্টেনগুলোর থেকে বেশ আলাদা, সেটা হচ্ছে এই পর্বতটা খুবই ঠান্ডা। পর্বত অবশ্যই ঠান্ডা থাকে, কিন্তু এই পর্বতটা মাত্রাতিরিক্ত রকমের ঠান্ডা এবং খুবই উইন্ডি, প্রচুর বাতাস চলে। অন্নপূর্ণা-১ যে কারণে বিখ্যাত আসলে—এটা খুবই খাড়া একটা পর্বত, খুবই steep slope এটার। টেকনিক্যালি খুবই নিখুঁত হতে হয় ক্লাইম্ব করতে।
প্রশ্ন : ২০২৫ সালে আপনি কোনো কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই মাউন্ট মানাসলু জয় করেছিলেন, যা বাংলাদেশের পর্বতারোহণে প্রথম। ডেড জোনে অক্সিজেন ছাড়া টিকে থাকা এবং ব্যাক-টু-ব্যাক এতগুলো বড় এক্সপিডিশনে নিজের শরীরকে প্রফেশনালি ফিট ও রিকভার রাখার রহস্যটা আসলে কী?
উত্তর : মাউন্টেনিয়ারিং বা পর্বতারোহণকে বলা হয়, সকল খেলার রাজা (King of Sports)। কিন্তু আমি মাউন্টেনিয়ারিংকে স্পোর্টসের চেয়ে একটু খানিকটা এগিয়ে দেখি। মাউন্টেনিয়ারিং আমার ক্ষেত্রে একটা লাইফস্টাইল। আমার আসলে সবসময় নিজের শরীরটাকে ফিট রাখতে হয়। এটা এমন না যে, আমি কোনো একটা মাউন্টেনে যাচ্ছি তখন এর এক মাস আগে বা দুই মাস আগে প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করলাম—এরকম না। আমি সারাবছরই নিজেকে প্রস্তুতির মধ্যে রাখি। এবং সেটা শুধু ফিজিক্যালি ফিট রাখা না, তার সাথে নিজের জিহ্বাটাকেও নিয়ন্ত্রণ করা। আমার বন্ধুবান্ধব অনেকেই এই মুহূর্তে অনেকগুলো অসংক্রামক রোগে ভুগছে। হাই কোলেস্টেরল তো প্রায় সবারই বলা যায়। ত্রিশের কোটা পেরোনোর আগেই অনেকেই ফ্যাটি লিভারে ভুগছে। তো সেই অনুযায়ী আমি অনেক আগে থেকেই চেষ্টা করি নিজেকে ফিট রাখার। মানাসলুর জন্য আমি একটু ভিন্ন স্ট্র্যাটেজি নিয়েছিলাম। আমি এমনিতে নিয়মিত দৌড়াই, ওই সময়টাতে আমি খুব ব্রিদিং এক্সারসাইজ করতাম। আসলে মানুষের বডি ওইভাবে বানানো হয় নাই যাতে আট হাজার মিটার উচ্চতায় টিকতে পারে। ওইরকম একটা জায়গায় আমি অক্সিজেন ছাড়া যাচ্ছি, ওইটার জন্য অবশ্যই আমার আলাদা প্রস্তুতি ছিল।
প্রশ্ন : বিশ্বের মোট ১৪টি ৮-হাজারি পর্বতের মধ্যে অলরেডি ৫টি আপনি জয় করে ফেলেছেন। আপনার এই মিশনের স্বপ্ন এখন পুরো বাংলাদেশের স্বপ্ন। বাকি ৯টি পর্বত জয়ের লক্ষ্যপূরণে আমাদের দেশের কর্পোরেট বা প্রাতিষ্ঠানিক স্পন্সরশিপের জায়গাটা কতটা প্রস্তুত বলে আপনি মনে করছেন?
উত্তর : আমি বলব, আমরা আসলে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছি। আমরা যারা মাউন্টেনে যাচ্ছি তাদের ক্ষেত্রে, বা সামগ্রিকভাবে মাউন্টেনিয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে আমাদের মূল 'ড্র ব্যাক' (Drawback) বা সীমাবদ্ধতা হলো পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। হ্যাঁ! আমার অবশ্যই কিছু পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান আছে, যারা আমাকে আমার সবগুলো অভিযানে হেল্প করেছে। কিন্তু যেহেতু আমার লক্ষ্যটা অনেক বড়—বিশ্বের ১৪টি ৮-হাজারি পর্বত জয় করা। ইতিমধ্যে এভারেস্ট, লোৎসে, অন্নপূর্ণা-১, মানাসলু এবং মাকালুর মতো পাঁচটা মাউন্টেন ক্লাইম্ব করতে গিয়ে টাকার অঙ্কে খরচটা এক কোটি ছাড়িয়ে গেছে।
এই স্পোর্টসটা প্রচণ্ড ব্যয়বহুল। যেসব কাপড়-চোপড়, গিয়ার্স লাগে, এগুলো খুব স্পেশালাইজড এবং দামি। একই সাথে মাউন্টেনগুলো ক্লাইম্ব করতে গেলে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারকে—সেটা নেপাল হোক, তিব্বত হোক বা পাকিস্তান হোক—একটা বড় অঙ্কের টাকা পারমিট ফি বাবদ দিতে হয়। সবকিছু লজিস্টিক্যালি অ্যারেঞ্জ করা খুবই মুশকিল, একটা বড় অঙ্কের ফান্ড লাগে। এটা নিজের একার পক্ষে তো সম্ভব না। আমি পেশায় একজন চিকিৎসক; চাকরি-বাকরি করে যত টাকা জমিয়েছি, "I've spent most of my money on these mountains"।
আমার তো আর অন্য কোনো আগ্রহের জায়গা নেই—যেমন আমার গাড়ি থাকতে হবে, বাড়ি থাকতে হবে, এরকম কোনো চাওয়া নেই। আমি চাকরি-বাকরি করে টাকা জমিয়েছি, যাতে করে আমি আমার অ্যাডভেঞ্চার অ্যাক্টিভিটিজগুলো নির্বিঘ্নে করতে পারি। যেহেতু আমার স্পোর্টসটা একটু ভিন্ন ঘরানার, তাই কর্পোরেট বা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে এলে আমার জন্য পথ চলা সুগম হয়। আমি যখনই যেকোনো পর্বতের চূড়ায় যাই, আমার দেশের পতাকা আমার ব্যাকপ্যাক থেকে সবার আগে বের হয়। আমি ভাবি যে, দেশটাও আমার সাথে খানিকটা উপরে উঠল। তো এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোকে পাশে পেলে স্বপ্নপূরণের পথে আমার এই যাত্রা আরও সহজ হবে।
প্রশ্ন : আপনার এভারেস্ট ও লোৎসে অভিযান নিয়ে একটা বই আছে—"এভারেস্ট ও লোৎসে শিখরে", আমরা কি সামনে বাকি যে পর্বতগুলো জয় করেছেন সেগুলোর উপরও বই পেতে যাচ্ছি?
উত্তর : এই মুহূর্তে আমার মনে হয় না পর্বত অভিযান নিয়ে নতুন কোনো বই করতে পারব। আমার হাতে বেশ কয়েকটা পেন্ডিং কাজ আছে। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী সাইকেল রাইড, যেটা আমি ২০২৩ সালে করেছিলাম—সেটা নিয়ে একটা বই করার ইচ্ছে আছে; পাণ্ডুলিপিও অনেকটুকু এগিয়েছে। আমি ২০২৪ সালে শ্রীলঙ্কার এক মাথা থেকে আরেক মাথা হেঁটেছি, সেটারও একটা পাণ্ডুলিপি আছে। এছাড়া আরেকটা অনুবাদ গ্রন্থ আছে। তো, পর্বত অভিযান নিয়ে বই মনে হয় এগুলোর পরেই আসবে।
প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন ভাইয়া, আমাদের দেশে এখন তরুণদের মধ্যে ট্রেকিং বা পাহাড় চড়ার আগ্রহ দারুণভাবে বাড়ছে। যারা ভবিষ্যতে আপনার মতো হিমালয়ের বড় কোনো চূড়ায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে, তাদের উদ্দেশ্যে আপনার একদম প্রথম ও প্রধান পরামর্শ কী হবে?
উত্তর : অনেকেই এখন আগ্রহী হচ্ছে। আমি বলব যে, "Follow your wildest ideas।" হয়তো এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে সেটা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব না। কিন্তু আপনার চাওয়ার ইনটেনসিটিটা যদি অনেক বেশি থাকে, তাহলে সেটা অসম্ভব কিছু না।