Article

ওরিয়ন : মিনহাজুর রহমান জিহাদ

September 28, 2026

11 views

ভোররাতে বিভূতিভূষণের স্মৃতির রেখা পড়ছিলাম। সেখান থেকে দু-তিনটা লাইন উল্লেখ করি,

“গভীর রাত্রে রামচরিত যখন আমার ঘরে ঘুমিয়ে পড়ে তখন বাইরে উঠে নির্জন বনমাঠের ওপরকার নক্ষত্রভরা আকাশের দিকে চেয়ে থাকি। বহু দূরপারের গভীর কোন গহন রহস্য ধীরে ধীরে আমার মনে নেমে আসে, সে বলা যায় না, লেখা যায় না। জীবনের গভীর মুহূর্তে সেসব, কেবল তা মনে এই সত্য আনে যে, জীবন ওই দূর ছায়াপথের মতো দূরবিসর্পিত, একটু শেষ নয়। এখানে আরম্ভও না, সুদূর কোথা থেকে এসে সুদূরের কোন পারের দিকে তার ডিঙ্গার মুখ ফিরানো।

প্রাণের মধ্যে এই অনুভূতিটুকু যেন সকলের সত্য হয়ে ওঠে।”

সেই ছোটবেলায় যখন রাতের আকাশের দিকে তাকাতাম তখন মিটমিট করা তারাগুলো দেখতে ভালো লাগতো। তখন তো আর এই বিশাল মহাবিশ্বের সঙ্গে পরিচয় হয়নি।এখন যখন রাতের আকাশের দিকে চেয়ে দেখি তখন মনে কত বিস্ময়, কত প্রশ্ন উঁকি দিয়ে যায়।আসলেই কী এই বিপুল মহাবিশ্বের মাঝে আমরা একা।জীবন কী শুধু এই পৃথিবী নামক ক্ষুদ্র এক গ্রহে স্পন্দিত হয়। সে এক রহস্য! আর যেখানে রহস্য সেখানেই মানুষের প্রচন্ড কৌতূহল।সেই কৌতূহল এবং রহস্য থাক।

আজ আমার প্রিয় একটা নক্ষত্রমন্ডল ওরিয়ন নিয়ে কথা বলা যাক।

ওরিয়নকে বাংলায় বলা হয় “কালপুরুষ”। ওরিয়নকে চিনতাম আরো আগে থেকেই কিন্তু শহরের লাইট পলিউশনে খুব ভালো দেখা যেতো না। ২৫-এর শীতে কক্সবাজারে গিয়েছিলাম পরিবার সহ । আমার কয়েকমাস আগে একটা অপারেশন হয়েছে।শুরুতে যেতে চাইছিলাম না পরিবারের জোরাজুরিতে অগত্যা যেতে হলো।আহা! গিয়েছিলাম বলেই তো সেই অসাধারণ দৃশ্যের সাক্ষী হওয়া গেলো।

মধ্যরাত।ঠান্ডা পড়ছে। খাওয়া-দাওয়ার পর ঠিক হলো সাগরপাড়ে যাওয়া হবে।আকাশ তখন ঝকঝকে পরিষ্কার। পাড়ে মানুষ বলতে আমাদের পরিবার আর আমাদের থেকে কিছুটা দূরে আরো কিছু মানুষজন আছে। এই নির্জন সৈকতে সমুদ্রের গর্জন যেন অনেক বেশি স্পষ্ট কানে বাজতে লাগলো।ঢেউয়ের অগ্রভাগের সাদা সাদা ফেনা ছাড়া সমুদ্র অন্ধকার। চাঁদ নেই। সেই অন্ধকার বিশাল জলরাশির উপরে দাঁড়িয়ে আছে যেন পুরাণের বিশালদেহী শিকারী ওরিয়ন।আশ্চর্য! পুরাণমতে সমুদ্রের পানির ওপর দিয়ে অনায়াসে হেঁটে বেড়াতে পারতো ওরিয়ন। পুরো দৃশ্যটা এতো চমৎকার! মনে এমন এক অনুভূতির সঞ্চার করে যে বিভূতির মতো বলতে হয় যা বলা যায় না, লেখা যায় না।

রাতের আকাশে কাছাকাছি থাকা উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলো কাল্পনিক রেখার মাধ্যমে যুক্ত হয়ে যখন কোনো নির্দিষ্ট প্রাণী, বস্তু বা পৌরাণিক চরিত্রের আকৃতি তৈরি করে, তখন তাকে নক্ষত্রমণ্ডল বা তারামণ্ডল বলে।

প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দিক নির্ণয় এবং ঋতু পরিবর্তনের জন্য নক্ষত্রমণ্ডলগুলো কল্পনা ও নামকরণ করেছিলেন।আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান সংস্থা (IAU) কর্তৃক স্বীকৃত মোট নক্ষত্রমণ্ডলের সংখ্যা ৮৮টি।

ওরিয়নকে খুঁজে পাওয়া খুব সহজ। আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রথমে তিন তারার বিখ্যাত সরলরেখাটি খুঁজে বের করুন, যাকে বলা হয় 'ওরিয়নস বেল্ট' বা কালপুরুষের কোমরবন্ধ।এই তিন তারাকে কেন্দ্র করে একটু দূর দিয়ে তাকালেই চার কোণায় চারটি উজ্জ্বল তারা চোখে পড়বে—যা শিকারির দুই কাঁধ এবং দুই পা তৈরি করে। ব্যস! চোখের সামনে মূর্ত হয়ে উঠবে এক বিশাল শিকারি!

গ্রিক পুরাণে ওরিয়ন ছিলো এক কিংবদন্তিতুল্য শিকারি—অসাধারণ শক্তি, অতুলনীয় দক্ষতা এবং অনিন্দ্য সৌন্দর্যের জন্য যে দেবতা ও মানুষের কাছে সমানভাবে পরিচিত ছিলো। বলা হয়, যেখানেই শিকারে বের হত, সেখানেই তার সাফল্যের গল্প ছড়িয়ে পড়ত। ধীরে ধীরে নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে ওরিয়ন। একসময় অহংকারভরে ঘোষণা করে যে পৃথিবীর এমন কোনো প্রাণী নেই, যাকে সে পরাস্ত বা শিকার করতে পারবে না।

এই ঔদ্ধত্য পৃথিবীদেবী গাইয়া-র ক্রোধের কারণ হয়ে ওঠে। প্রকৃতির সকল জীবের রক্ষক হিসেবে গাইয়া মনে করলেন, ওরিয়নের এই অহংকারকে শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন। তাই তিনি এক বিশাল, ভয়ংকর এবং বিষাক্ত বিচ্ছু সৃষ্টি করে অরিয়নের বিরুদ্ধে পাঠালেন। শুরু হলো এক অসম্ভব রোমাঞ্চকর লড়াই। সাহস ও শক্তিতে অতুলনীয় ওরিয়ন প্রাণপণ যুদ্ধ করলেও শেষ পর্যন্ত বিচ্ছুটির বিষাক্ত দংশন থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি। পরাজিত হয়ে মৃত্যুবরণ করে।

তবে ওরিয়নের কাহিনি সেখানেই শেষ হয়নি। তার বীরত্ব, দক্ষতা ও করুণ পরিণতির স্মৃতি অমর করে রাখতে দেবরাজ জিউস তাকে আকাশে নক্ষত্রমণ্ডল হিসেবে স্থান দেন। একই সঙ্গে সেই বিচ্ছুকেও আকাশে স্থান দেওয়া হয়, যা আজ স্করপিয়াস নক্ষত্রমণ্ডল নামে পরিচিত। আকাশের বিস্ময়কর এক বিন্যাসে এই দুই নক্ষত্রমণ্ডলকে এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে যে ওরিয়ন যখন পূর্ব আকাশে উদিত হয়, তখন স্করপিয়াস দিগন্তের নিচে লুকিয়ে থাকে; আবার স্করপিয়াস যখন আকাশে দৃশ্যমান হয়, তখন ওরিয়ন অস্ত যায়। যেন মৃত্যুর পরও শিকারি ও বিচ্ছুর সেই প্রাচীন সংঘাত শেষ হয়নি—তারা আজও মহাকাশের অসীম প্রান্তরে একে অপরকে তাড়া করে চলেছে।

ওরিয়ন বেল্টের সেই তিন তারা (কোমরবন্ধ):আমরা খালি চোখে যে তিনটি তারা এক লাইনে দেখি, তাদের নাম যথাক্রমে—আলনিটাক (Alnitak), আলনিলাম (Alnilam) এবং মিনটাকা (Mintaka)।

এরা সবাই কিন্তু একেকটি 'নীল দানব' (Blue Giant / Supergiant) নক্ষত্র।

এর মধ্যে মাঝখানের তারা 'আলনিলাম' আমাদের সূর্য থেকে প্রায় ৪০ গুণ বেশি ভারী এবং কয়েক লক্ষ গুণ বেশি উজ্জ্বল!

পৃথিবী থেকে এই বেল্টের তারাগুলোর দূরত্ব প্রায় ১,০০০ থেকে ১,৩০০ আলোকবর্ষ। এর মানে হলো, আজ রাতে আমরা যে আলোটি দেখছি, তা আসলে আজ থেকে প্রায় হাজার বছর আগে, অর্থাৎ পৃথিবীর ইতিহাসের মধ্যযুগে ওই তারাগুলো থেকে রওনা হয়েছিল!

বেটেলজিউস (Betelgeuse) — ডান কাঁধের লাল দানব:

কালপুরুষের ওপরের বাম কোণে (আমাদের দেখার কোণ থেকে ডান কাঁধ) জ্বলজ্বল করতে থাকা লালচে-কমলা তারাটি হলো 'বেটেলজিউস'। এটি একটি লাল অতিদানব (Red Supergiant) তারা।এর আকার এতটাই বিশাল যে একে যদি আমাদের সূর্যের জায়গায় এনে বসানো হতো, তবে এটি বুধ, শুক্র, পৃথিবী,মঙ্গল ছাড়িয়ে প্রায় বৃহস্পতি গ্রহের কক্ষপথ পর্যন্ত প্রায় সবকিছুকে গিলে ফেলত!

এটি তার জীবনের একদম শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, যেকোনো মুহূর্তে (তা আজ রাতেও হতে পারে বা হাজার বছর পরেও হতে পারে) এই তারাটি এক বিশাল বিস্ফোরণের মাধ্যমে বা 'সুপারনোভা' হয়ে মারা যাবে। তখন রাতের আকাশে কয়েক সপ্তাহ ধরে চাঁদের মতোই উজ্জ্বল আলো দেবে এই একটিমাত্র তারা, যা দিনের বেলাতেও খালি চোখে দেখা যাবে!

রিজেল (Rigel) — বাম পায়ের নীল দানব:

কালপুরুষের নিচের ডান কোণে (আমাদের দেখার কোণ থেকে বাম পা) তীব্র নীলচে-সাদা আলো ছড়ানো তারাটি হলো 'রিজেল'। এটি ওরিয়ন নক্ষত্রমণ্ডলীর সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা। এটি আমাদের সূর্য থেকে প্রায় ১ লক্ষ গুণেরও বেশি উজ্জ্বল এবং এর দূরত্ব প্রায় ৮৬০ আলোকবর্ষ।

.ওরিয়ন নেবুলা (M42) —যেখানে প্রতিনিয়ত নক্ষত্রের জন্ম হচ্ছে

বিজ্ঞানের সবচেয়ে সুন্দর চমকটি লুকিয়ে আছে এই তিন তারার ঠিক নিচেই, যেখানে কালপুরুষের তলোয়ারটি ঝুলে থাকে। খালি চোখে সেখানে আবছা একটু কুয়াশার মতো দেখায়, কিন্তু হাবল বা জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ দিয়ে তাকালে সেখানে দেখা যায় এক জাদুকরী রঙিন আলো। এর নাম 'ওরিয়ন নেবুলা' বা কালপুরুষ নীহারিকা (M42)। এটি মহাকাশের গ্যাস আর ধূলিকণার এমন এক বিশাল মেঘ, যেখানে প্রতিনিয়ত জন্ম নিচ্ছে হাজার হাজার নতুন নক্ষত্র।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login