- কোথায় যাবেন?
- উত্তরা।
- সেতো মেলা দূর। এতোটা পথ হেঁটে যাবেন?
- দূরত্ব তো পথের হয় না। দূরত্ব হয় মনের। আমি যেখানে যেতে চাই সেটা আমার মনের ভিতরেই আছে। কেবল এক পা দু'পা করে এগোলেই ঠিক পৌঁছে যাবে এই শরীরটা।
- আপনি কি কবি নাকি। কেমন কাব্য করে কথা বলেন?
- আমি কবি নই। কাব্য করেও কথা বলছি না। কথা গুলো আপনার চেনা নয়। তাই আপনার মস্তিষ্ক আপনাকে আস্বস্ত করছে যে এভাবে হয়তো কবিরা কথা বলে৷ মস্তিষ্ক চায় না আপনি দ্বিধাগ্রস্থ হন আমার কথায়।
- গুছিয়েও বলেন বেশ৷ চলুন আমার সাথে। আজ নাহয় চার চাকায় ভর দিয়েই গেলেন। আমার রাস্তাও ঐদিকে।
- কিন্তু সিগারেটের ধোঁয়ায় আপনার গাড়ি গন্ধ হয়ে যাবে। সেই সাথে আপনারও ফুসফুস চাইবে না সেই গন্ধ।
- আজ নাহয় খেলেন না।
- "আজ নাহয়" নামক নিয়ম ভাঙার আসরে কেবল একটা নিয়মই ভাঙা হোক। হয় হেঁটে যাবো নাহয় সিগারেট খাবো।
- আসুন।
- আপনার অভ্যাস আছে?
- কিসে?… সিগারেটে?… নাহ বাবা! সখের বশে দু'চারবার বান্ধবীদের সাথে। ঐ পর্যন্তই।
- দুইবার না চারবার?
- আপনি তো বেশ জেরাবাজ মানুষ… হুম…মনে হয় চার বারই হবে। সেও তো হলো অনেক দিন আগে। এতো কি আর মনে থাকে।
- সেই ভালো। মনে যত মনে না থাকা কথা থাকবে, মন ততো হালকা থাকবে। মানুষ তো ক্লান্ত হয় মন ভর্তি অমুক তমুক কথার মিছিল জমিয়ে।
- একটা কথা জিগ্যেস করতে পারি?
- যদি বলি না পারেন না তাহলে কি আর জিগ্যেস করবেন না?
- অদ্ভুত লোক আপনি… না বললেও তো জিগ্যেস করার জন্য মন উশখুশ করবে।
- তাহলে জিগ্যেস করুন। এতো কিছু ভাবতে হবে না।
- আমি আপনাকে চিনি না। আপনিও আমাকে চিনেন না। অপরিচিত এক মেয়ে আপনাকে গাড়িতে উঠতে বলল আর আপনিও উঠে গেলেন। মনে হয়নি একবারো কোনো বিপদ হবে না তো?
- হুট করে তো উঠিনি। তার আগে কিছু কথা তো হয়েছে। আর এই ভয় তো আপনার পাওয়ার কথা। না চিনে একটা অচেনা মানুষকে এভাবে গাড়িতে তুলে নেওয়া।
- আসলে এই হাইওয়েতে কাউকে তেমন একটা হাঁটতে দেখিনি আমি। মনে হয়েছে আপনি হয়তো রাস্তা ভুলে হাঁটছেন। কিন্তু আপনার হাঁটা দেখে কেমন যেন মনে হচ্ছিলো খুব আনন্দে হাঁটছেন। এই জন্য কৌতূহলী হয়ে গাড়ি থামালাম। আপনার কথায় কি যেন একটা আছে। যার কারণে এতোকিছু আর মনে আসেনি। ভাবলাম এক সাথে যাওয়াই যায়।
- ব্যস এরপর আপনিও আটকে গেলেন।
- ঠিক আটকে না। বলতে পারেন এডভেঞ্চার শুরু করলাম।
- এডভেঞ্চার? এটা কিভাবে?
- এ কাজ আমি আগে কখনোই করিনি৷ বলতে পারেন নিরাপত্তার কারণেই৷ অচেনা মানুষকে এভাবে গাড়িতে তোলা। আজই প্রথম এমন কাজ করে ভয় তো লাগছেই না উলটো এডভেঞ্চার ফিল হচ্ছে। আপনার ঐ একটা লাইন আমাকে আটকে ফেলেছে বলতে পারেন- দূরত্ব তো পথের হয় না। দূরত্ব হয় মনের।
- কে যে কবে কিসে আটকে যায় এ বড় রহস্য।
- কি করেন আপনি?
- পৃথিবীতে বিচরণ করি। সার্ভাইব করার জন্য অন্যের মজদুরি করি। বাকিটা সময় নিজের সাথে। কিছুটা সময় পরিচিত আড্ডায়। আর কখনো সুযোগ হলে কিছু পাপ কিছু পূণ্য করি। আমি কেবল তখনই বেশ ভালো যখন আমি ঘুমাই।
- আপনি কি সব সময় এভাবেই কথা বলেন। হেঁয়ালি করে?
- সব সময় বলি কিনা জানি না৷ নোটিশ করিনি কখনো। আজ থেকে নোটিশ করতে হবে।
- থাক অতো কাজ নেই। আপনি হয়তো এভাবেই ঠিক আছেন৷
- সব মানুষ তার নিজের মতো করেই ঠিক। বেঠিক হয় তো অন্য কেউ ঠিক করে দিতে এলে।
- আমাকে একটা সিগারেট দেন। আমিও খাই।
- কেউ দেয় সুখের ভাগ। কেউ দেয় দুঃখের ভাগ। আমি নাহয় আপনায় দিলাম নিকোটিনের ভাগ। নেন।
- উত্তরায় কি একা থাকেন নাকি ফ্যামিলি সহ।
- আমি তো উত্তরায় থাকি না।
- তাহলে? হেঁটে হেঁটে উত্তরায় যাচ্ছিলেন কেন? বাসা কোথায় আপনার?
- হাঁটতে ভালো লাগে তাই ভাবলাম উত্তরা পর্যন্ত হেঁটে যাই৷ ক্লান্ত হয়ে বাসে করে ফিরবো আধাঘুম আধা জাগরণ আবহে। মাঝে আপনি এসে আমায় ছিনতাই করে এই চার চাকার চলন্ত খাঁচায় তুলে নিলেন।
- বাসা কোথায় আপনার?
- যে পাখি খাঁচা ভালবাসে, সে পাখি আকাশ ভুলে যায়।
আধাঘণ্টা ধরে গাড়ি ট্রাফিক সিগনালে আটকে ছিল। শাহানার এ এক পুরনো অভ্যাস৷ সিগন্যাল লম্বা হলেই মাথার মাঝে আজগুবি সব গল্প সাজায়। গল্প মাথায় সাজাতে সাজাতে একটা আবহে চলে যায়। ট্রাফিক জ্যামের ক্লান্তি আর তখন ক্লান্তি লাগে না। ঘরে ফিরে একটা গল্প নিয়ে।
আজকের গল্পটা বেশ সত্যি সত্যি মনে হচ্ছে শাহানার কাছে। যেন এতক্ষণ গাড়িতে বসে মাথার ভিতরে গল্প না; কোনো এক ভুলে যাওয়া স্মৃতি রোমন্থন করছিলো। শুধু গল্পে সেই মানুষটার নাম জিগ্যেস করা হলো না। শাহানা মনে মনে ভাবছে, আচ্ছা আমিই যদি একটা নাম দিয়ে দেই মানুষটার। কি নাম দেওয়া যায়… ক্ষ্যাপাকবি। হুম এই নামটাই বেশ।