Story

যে শহরে প্রিয়তম থাকে না

October 1, 2026

46 views

পোস্টবক্সে হারিয়ে যাচ্ছে ঠিকানা বিহীন চিঠি। শুধুমাত্র প্রাপকের ঘরে 'প্রিয়তম' লিখলে কোনো চিঠি কোনো ঠিকানায় পৌঁছে দিতে পারে না ডাকপিয়ন। প্রেরকের ঘরে লিখা 'আমি'টার কাছে চিঠি ফেরৎ পাঠাবার জন্য কোনো 'আমি' কে এই শহরের কেউ চিনে না।

ছেলেটি মেয়েটির লম্বা চুল চেয়েছিলো। সাথে চেয়েছিলো ঘামে ভিজে শুকিয়ে যাওয়া রুমালের অর্ধেক অংশ। কথা ছিল যেদিন দেখা হবে দু'জনে মিলিয়ে নিবে পুরো রুমালটা। মেয়েটি রুমালের ভাজে সাজিয়ে দিয়েছিলো ওর লম্বা চুল। খামের মুখ আঠা দিয়ে বন্ধ করে প্রাপকের নামের উপর দিয়েছিলো আলতো চুমু। মেরুন রঙের লিপস্টিকের চুমুর দাগটা দিন দিন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। মেয়েটি চিঠিটা পোস্টবক্সে ফেলার আগে একবার বুকে চেপে ধরেছিলো। অদৃশ্য সেই বুকের দীর্ঘশ্বাসটুকু আজো তেমনই আছে।

হলুদ খামটা ডাকপিয়ন ব্যাগে করে এই শহরে রোজ ঘুরে বেড়ায়। চেনা অচেনা গলিতে সাইকেলের টুংটাং শব্দে ঢুকে পরে এ বাড়ি ও বাড়ির জানালায় তাকায়- বারান্দায় তাকায়। রাস্তায় কোন যুবকের দিকে গভীর ভাবে তাকায়। মনে মনে ভাবে- এই যুবক কি সেই 'প্রিয়তম!' ডাকপিয়নের মাঝেমাঝে খুব ইচ্ছে করে ডাক দিয়ে জিগ্যেস করতে, 'আপনাগো বাড়িত প্রিয়তম বইল্যা কেউ কি আছে? উনার নামে একখান চিঠি আইছে!'

ডাকা হয়ে উঠে না। হলুদ খাম ব্যাগের ভিতরে প্রাচীন হতে থাকে। দিন দিন হলুদ খামের কোণ গুলো ক্ষয়ে যাচ্ছে। মাঝরাতে ডাকপিয়ন চিঠির খামটা হাতে নিয়ে ভাবে; কি আছে ভিতরে খুলে দেখবে নাকি? মেয়েটা এমন পাগলী কেন? কোন ঠিকানা না লিখে শুধু প্রিয়তম কেন লিখলো? ডাকপিয়ন কোন উত্তর খুঁজে পায় না। ডাকপিয়নের স্ত্রী খাট থেকে উঠে এসে পাশে বসে বলেন, 'কি দ্যাখেন প্রেত্যেক রাইতে এই খাম হাত লইয়্যা?'

ডাকপিয়ন চিঠির খামে প্রেরকের ঘরে স্নেহের হাত বুলিয়ে বলেন, 'এক পাগলী মাইয়্যার ভালবাসা। কাইলকার পরে আর তো দেখা হইবো না হাতে লইয়্যা।'

ডাকপিয়নের বুকে দীর্ঘশ্বাস গুলো আটকে থাকে। বের হয় না। সকালে শেষবারের মতো যাচ্ছে সাইকেলে উঠে পোস্ট অফিসের উদ্দেশ্যে। সে আজকের পরে আর কোনদিন অলিগলিতে টুংটুং শব্দে হলুদ খাম বয়ে নিবে না। চিঠির অপেক্ষায় থাকা মানুষ গুলো নতুন ডাকপিয়নের জন্য অপেক্ষা করবে।

ডাকপিয়নের সময় শেষ। অবসরে চলে যাচ্ছেন। চিঠিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। চোখের কোলটা ভিজে ভিজে যাচ্ছে। বুকটা কেমন যেন করছে। একটা ভালবাসার চিঠি সে পৌঁছে দিতে পারেনি গন্তব্যে। মেয়েটার চেহারা কল্পনা করার চেষ্টা করছে। কিন্তু ঝাপসা লাগে সব। প্রেরকের ঘরে 'আমি'র উপরে শেষ বারের মতো স্নেহের হাত বুলিয়ে কেঁদেই উঠলো, 'মাফ কইরা দিস মা। তোর প্রিয়তমরে আমি খুইজা পাই নাই। মাফ কইরা দিস মা।' চিঠিটা বুকে চেপে ডাকবক্সে ফেলে দ্রুত পা চালিয়ে বাসার পথ ধরলো ডাকপিয়ন।

একবারো পিছন ফিরে তাকালো না পোস্টবক্সের দিকে। পোস্টবক্সে হারিয়ে যাবে ঠিকানা বিহীন চিঠি। হারিয়ে যাবে প্রিয়তম। হারিয়ে যাবে আমি।

Picked up where you left off

Comments

robin ahmed was this story’s first reader

+20 XP

    Please login to post comment. Login

  • robin ahmed 3 weeks ago First reader

    ভালো লিখেছেন। প্রেরকের ঘরে 'আমি'র উপরে শেষ বারের মতো স্নেহের হাত বুলিয়ে কেঁদেই উঠলো, 'মাফ কইরা দিস মা- এ বাক্যটাতো দারুণ। শুভেচ্ছা।

    • শাকিল রনি 3 weeks ago

      অনেক অনেক শুকরিয়া ভাই