শহরের এক কোণে পুরোনো এবং কিছুটা নির্জন একটি দোতলা বাড়িতে একা থাকে অবন্তী। ফ্রিল্যান্সিং এবং রাতজাগা তার দীর্ঘদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সেদিনও ঘড়ির কাঁটা যখন গভীর রাতে স্থির, চারপাশটা সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ। তীব্র গরমে ফ্যানের ঘড়ঘড় শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। অবন্তী তার ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে কাজ করে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই তার টেবিলের ওপর উপুড় করে রাখা সাইলেন্ট করা ফোনটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
অবন্তী প্রথমে ভেবেছিল হয়তো কোনো দূর দেশের ক্লায়েন্টের জরুরি মেসেজ বা নোটিফিকেশন। কিন্তু স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই তার রক্ত যেন এক মুহূর্তে জমে গেল, পিঠ বেয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। ফোন কলটি আসছে তার নিজেরই ব্যবহৃত ফোন নম্বর থেকে! অথচ তার নিজের ফোনটি তো ঠিক এই মুহূর্তে তার চোখের সামনে টেবিলের ওপরই রাখা আছে।
হাত দুটি সামান্য কেঁপে উঠল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। সে কি তবে অতিরিক্ত ক্লান্তির কারণে হ্যালুসিনেশন দেখছে? নাকি অন্য কিছু? কৌতূহল এবং ভয়ের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ নিয়ে সে ফোনটি হাতে তুলে নিল এবং রিসিভ করে লাউডস্পিকার অন করে টেবিলের ওপর রেখে দিল।
ওপাশ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো কথা এল না। শুধু কয়েক সেকেন্ড একটানা ভুতুড়ে নীরবতা, আর ফিসফিস শব্দের মতো কিসের যেন প্রতিধ্বনি শোনা গেল। এরপর ভেসে এল একটি অদ্ভুত ধাতব কণ্ঠস্বর—ঠিক যেন তারই নিজের গলার স্বর, কিন্তু বহু দূর কোনো পাতালপুরী বা অন্ধকার কোণ থেকে প্রতিধ্বনিত হয়ে আসছে!
গলার স্বরটি স্পষ্ট বলে উঠল, "অবন্তী, আর এক মুহূর্তও দেরি করো না। খুব সাবধানে ঘরের সামনের মূল দরজাটা খোলো... বাইরে এই মুহূর্তে এমন কেউ একজন তোমার জন্য দাঁড়িয়ে আছে, যাকে তুমি আজ থেকে ঠিক পাঁচ বছর আগে নিজ হাতে কবর দিয়ে এসেছিলে!"
কথাটা শেষ হওয়ামাত্রই কোনো উত্তর দেওয়ার সুযোগ না দিয়ে ওপাশ থেকে লাইনটি কেটে গেল। ঘরের ভেতরে থাকা দেয়ালঘড়িটার টিকটিক শব্দটাও যেন হঠাৎ খুব জোরালো হয়ে কানে বাজতে লাগল। অবন্তীর হাত থেকে ফোনটা খসে পড়ার উপক্রম হলো। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল পাঁচ বছর আগের সেই মর্মান্তিক গাড়ি দুর্ঘটনার দৃশ্য, যে দুর্ঘটনায় সে হারিয়েছিল তার একমাত্র আপন মানুষটিকে। পুলিশ তো বলেছিল কেউ বেঁচে নেই! তবে কি সে ভুল শুনেছিল?
ভয়ে বুক কেঁপে উঠলেও কৌতূহল এবং অজানা এক টানে অবন্তী চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার পা দুটো যেন মাটিতে আটকে যাচ্ছিল। সে ধীরে ধীরে পায়ের শব্দ না করে ড্রয়িংরুমের দিকে এগিয়ে গেল। জানালার ভারী পর্দার ফাঁক দিয়ে কাঁচের ওপারে অন্ধকারের দিকে তাকাতেই তার সমস্ত শরীর বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেল।
রাস্তার ঠিক যে ল্যাম্পপোস্টের আলোটা টিমটিম করে জ্বলছে, ঠিক তার নিচে অবয়বহীন ছায়ার মতো কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। আর তার হাতে জ্বলছে অবন্তীরই হারিয়ে যাওয়া সেই পুরোনো লাল রঙের লাইটারটি, যা পাঁচ বছর আগের সেই দুর্ঘটনার রাতে চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিল বলে সে জানত!