কিছু অবাক করা ঘটনা ঘটেছে। যে ছেলের সাথে সাবিত্রীর বিয়ের কথা হচ্ছে, তার বাবা নারায়ণ বসাক দিন দুয়েক আগে বাজারে এসে হাজির। কয়েকদিন বাড়িতে থাকার পর সেদিনই হরিপদ বাজারে এলো। দুপুরের ঠিক আগে আগেই নারায়ণ বসাককে তার দোকানে আসতে দেখেই হরিপদ যারপরনাই অবাক।
তার মনে একটা অমঙ্গল ভাবনা এলো সে মূহুর্তে। মুখখানা স্বাভাবিক রেখেই বললো,
নমস্কার।
নারায়ণ বসাক শাহজাদপুরের বড়ো ব্যবসায়ী। তার নিজের অনেকগুলো তাঁতও আছে। তিনি প্রতিউত্তরে নমস্কার বলেই শুরু করলেন,
আমি শুনেছি দোকানে চুরি হয়েছিলো। আপনি এর মধ্যেই মেয়ের বিয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তায় পরেছেন বলেও শুনেছি। আমি সেজন্যেই এসেছি আপনার কাছে।
এর জবাবে কী বলতে হবে বুঝতে পারলো না হরিপদ।
নারায়ণ বসাক খানিক চুপ থেকে আবার বলা শুরু করলেন,
বছর দুয়েক আগে আমার মেয়ের বিয়ের ঠিক আগে আগে আমি নিজেও ব্যবসাতে বড়ো ক্ষতির মুখে পড়েছিলাম। আমি জানি আপনার মানসিক অবস্থা। আমি আপনাকে গোপনে কিছু টাকা দিতে এসেছি। তাই আপনার বাড়ি গেলাম না। এখানে বাজারে দোকানে বসেই এ আলাপটা আমরা নির্বিঘ্নে করতে পারবো।
কথাগুলো বলেই পাঞ্জাবির পকেট থেকে কাগজে মোড়া একটা প্যাকেট বের করে হরিপদের দিকে এগিয়ে দিলেন। হরিপদ কিছুটা দ্বন্দ্বে পড়ে গেলো। নারায়ণ বাবু বললেন,
আপনি ভাববেন না। এটি আপনাকে ফেরত দেয়ার ভাবনা ভাবতে হবে না। আমার বাবা আপনার বাবার সাথে দীর্ঘদিন ব্যবসা করেছেন। আমাদের ব্যবসার আজ যে অবস্থা, তার পেছনে আপনার বাবার অবসান কম নয়। উনি আমার বাবাকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করে টাকা ছাড়াই বছরের পর বছর শাড়ি দিতেন। আপনাদের পরিবারের সকল ইতিহাস আমার জানা আছে। আমরাতো সব জেনেশুনেই আপনার পরিবারের সাথে সম্বন্ধ করতে এসেছই। নিন, টাকাগুলো রাখুন।
হরিপদ ভ্যাবাচেকা খেয়ে টাকাগুলো নিলো।
নারায়ণ বসাক বললেন, এ টাকাটা আপনার মেয়ের বিয়েতে আমার ক্ষুদ্র উপহার হিসেবে বিবেচনা করবেন।
আপনি বসুন। হরিপদ বললো।
নাহ, আজ বসবো না। ছেলের বিয়ের জন্যে অনেক কাজ আছে। আপনারও অনেক কাজ আছে। নেমে পড়ুন। বিয়েতে কোথাও কমতি যেন না হয়। আমি আপনার পেছনে সারাক্ষণ আছি।
কথাটুকু বলেই নারায়ণ বাবু চলে গেলেন।
হরিপদ চুপ করে দোকানে বসে রইলো। কেমন করে কোথা থেকে কি হয়ে গেলো! হরিপদের মাথায় আবার তার ভেতরের পুরনো জিজ্ঞাসাগুলো ফিরে এলো। যা ঘটেছে, তা কি আসলে সত্যি নাকি সব কল্পনা? সত্যিই কি নারায়ণ বসাক এসেছিলো? হাতে ধরা টাকাগুলোর দিকে তাকিয়ে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। ঈশ্বর এমন কেন? অথবা ঈশ্বর কেন এমন করেন?
ইদের পরপরই সাধ্যানুযায়ী অনুষ্ঠান আচারাদি শেষ করে সাবিত্রীর বিয়েটা হয়েই গেলো। সাবিত্রী চলে যাবার পড় থেকেই হরিপদের ভেতরে একটা অন্যরকম ভাবনা এসে হাজির হলো। সন্তানেরা একসময় বাবা মাকে ছেড়ে চলে যায়। চলে যাবার রীতিই যদি হয়, তাহলে সন্তানেরা আসে কেন পৃথিবীতে? এ রীতিগুলোতো মানুষেরই তৈরি। মানুষ এসব রীতি বানালো কেন?
ছোট মেয়ে অরিত্রিও সারাদিন একা একা মন ভার করে থাকে। হরিপদের বউটাও মন খারাপ করে থাকে বড়ো মেয়েটার চলে যাবার পর থেকে। বাড়িতে সবার এরকম মানসিক অবস্থার পাশাপাশি নিজের দোকান নিয়ে ভাবনাটা আরও জেঁকে বসেছে তার মনে।
সবকিছুকে অর্থহীন মনে হতে লাগলো তার। ঘর সংসার, সন্তানাদি, ব্যবসা সব কিছু। সারাদিন চুপচাপ বসে থাকে হরিপদ। নিজের মনে হাজার হাজার ভাবনা এসে হাজির হতে লাগলো। জগত সংসার নিয়ে বিচিত্র প্রশ্নেরা এসে দিনরাত তাকে ব্যাতিব্যাস্ত করে তুললো। তার মনে হলো, সে কেন সংসারের ঘেরাটোপের ভেতর আটকে রইলো? এ জায়গাটা তার নয়। তার ঠিকানা এটি নয়। নিজের ঠিকানা কোনটি, ভেবে কূল কিনার পেলোনা হরিপদ। নিজে নিজে একটা সিদ্ধান্তে চলে এলো সে, এই বাড়িঘর ছেড়ে চলে যাবে সে। পথে পথে ঘুরবে সে।
(চলবে)
Comments
Be this story’s first reader
+25 XPNobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.
Sign in to claimFirst reader
You were first.
+0 XP
Yours is the first word this story has heard. Its writer will see it.
You also earned the First Reader honour.