নীল চুক্তি
ভূমিকা
এই গল্প একজন তরুণীর গল্প যে স্বপ্ন দেখেছিল, হারিয়ে গিয়েছিল, এবং অবশেষে নিজেকে খুঁজে পেয়েছিল। তিথির গল্প কেবল তিথির একার নয় এ গল্প আমাদের সকলের, যারা কখনো না কখনো নিজেদের সাথে অচেনা হয়ে পড়েছি।
ঢাকার ভোরবেলা মানেই একটা বিশেষ গন্ধ রাস্তার চায়ের ধোঁয়া, ভেজা মাটি আর কোথাও না কোথাও পোড়া আবর্জনার কষ্টকর সুবাস মিলিয়ে একটা অদ্ভুত মিশ্রণ। তিথি এই গন্ধটাকে ভালোবাসত। সকাল ছটায় উঠে বারান্দায় দাঁড়িয়ে এক কাপ চা হাতে নিয়ে সে যখন চোখ বুজত, মনে হত পুরো ঢাকা শহরটা কেবল তার জন্য নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
কিন্তু সেই দিনগুলো এখন স্মৃতি।
তিথি রহমান। বয়স সাতাশ। মিরপুরের এক মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় মেয়ে। বাবা সরকারি চাকরিজীবী, মা গৃহিণী। ছোট ভাই পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে। সংসারে টানাটানি না থাকলেও স্বচ্ছলতাও নেই। তিথি ছোটবেলা থেকেই জানত তাকে নিজেকেই গড়তে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসা প্রশাসনে স্নাতক শেষ করে সে যোগ দিয়েছিল অ্যাজিউর কনসালটিং নামের একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে। নামটা শুনতে যেমন চকচকে, ভেতরটাও তেমনই কাচের দেয়াল, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত করিডর, বিদেশি বস, ইংরেজিতে সব কথাবার্তা। তিথির মনে হয়েছিল এটাই স্বপ্নের চাকরি।
প্রথম দিন অফিসে ঢুকে সে ভেবেছিল, এই নীল কাচের বিল্ডিংটা তার জীবনের নতুন অধ্যায়ের শুরু। লিফটে উঠতে উঠতে নিজের প্রতিফলন দেখেছিল সাদা শার্ট, কালো ট্রাউজার, চুল পিছনে বাঁধা। চেনা মনে হয়নি নিজেকে। তবু হেসেছিল।
তুমিই তিথি রহমান? রিসেপশনে বসা মেয়েটা জিজ্ঞেস করেছিল হাসিমুখে।
হ্যাঁ।
ওয়েলকাম টু অ্যাজিউর।
সেই ওয়েলকাম-এর ভেতরে একটা শর্ত লুকানো ছিল যেটা তিথি তখন বুঝতে পারেনি। বুঝেছিল অনেক পরে, যখন হারিয়ে ফেলার পর ফিরে পাওয়ার মতো কিছু আর বাকি নেই মনে হয়েছিল।
তিথির ছোটবেলাটা ছিল মিরপুরের সরু গলি আর ছাদের রোদের মিশেলে গড়া। বাবা রফিকুল রহমান প্রতিদিন সকালে অফিসে যেতেন পুরনো স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে, ফিরতেন সন্ধ্যায় ক্লান্ত মুখে। মা জোহরা বেগম সারাদিন রান্নাঘরে কাটাতেন, তবু সন্ধ্যায় চা বানিয়ে বারান্দায় বসতেন মেয়ের সাথে।
তিথি, বড় হয়ে কী হবি? মা একদিন জিজ্ঞেস করেছিলেন।
কিছু একটা বড়, আম্মু। এমন কিছু যাতে তোমাদের আর কষ্ট না হয়।
মা হেসেছিলেন। সেই হাসিতে গর্ব ছিল, কিন্তু একটু বেদনাও ছিল যে বেদনার নাম তিথি তখন জানত না।
ছোট ভাই তানভীর পড়াশোনায় দুর্বল, কিন্তু মনটা ভালো। সে সবসময় আপুকে বলত, আপু, তুই একদিন বড় হবি, আমি জানি।তিথি হাসত ভাবত হ্যাঁ, হব। হতেই হবে।
স্কুল-কলেজে সবসময় ভালো রেজাল্ট। বন্ধুরা বলত মেধাবী, শিক্ষকরা বলতেন পরিশ্রমী। তিথি নিজে ভাবত এটা কেবল শুরু।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সে জেনেছিল পরিশ্রম একমাত্র পথ নয়, স্মার্টনেসও লাগে। ধীরে ধীরে সে বদলে গিয়েছিল। একটু বেশি কথা বলতে শিখেছিল, একটু বেশি হাসতে শিখেছিল, একটু বেশি মানুষের মন বুঝতে শিখেছিল।
অ্যাজিউরে চাকরি পাওয়ার দিন বাড়িতে ফিরে মা-বাবাকে জড়িয়ে ধরেছিল। বাবার চোখে জল এসেছিল।
আমার মেয়ে, বাবা বলেছিলেন শুধু এটুকু। তাতেই সব বলা হয়ে গিয়েছিল।
নীল কাচের ভেতরে
অ্যাজিউর কনসালটিং-এর অফিসটা গুলশানে। চারদিকে কাচ আর স্টিল। লবিতে ঢুকলেই একটা ঠান্ডা গন্ধ আসে এসি আর পারফিউমের মিশেল। প্রথম কদিন তিথি এই গন্ধটাকেও ভালোবেসে ফেলেছিল।
তার বস ছিলেন কামাল স্যার পুরো নাম কামাল আহসান। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি, টাক মাথা, সবসময় দামি স্যুট পরেন। কথাবার্তায় ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে বলেন। প্রথম দিনই বলেছিলেন, তিথি, এখানে পারফরম্যান্সই সব। বাকি কিছু ম্যাটার করে না।
তিথি মাথা নাড়িয়েছিল।
সহকর্মীরা বিভিন্ন রকম। রাফি ঝকঝকে চেহারা, সবসময় হাসিমুখ, কিন্তু পিঠে ছুরি মারতে দ্বিধা করে না। নাদিয়া শান্ত, ধীরস্থির, কাজ করে মাথা নিচু করে। সুমন কথাবার্তায় মিষ্টি, কিন্তু সবার আগে ক্রেডিট নেওয়ার চেষ্টা করে।
তিথি প্রথম প্রথম সবাইকে বন্ধু মনে করেছিল।
প্রথম তিন মাসে সে প্রমাণ করল নিজেকে। একটার পর একটা প্রজেক্ট সফলভাবে শেষ করল, বসের প্রশংসা পেল, টিমের মধ্যে নাম হলো। কিন্তু ভেতরে ভেতরে কিছু একটা বদলে যাচ্ছিল খুব ধীরে, খুব অলক্ষ্যে।
তিথি, তুমি কি একটু বেশি নরম না? কামাল স্যার একদিন বললেন।
স্যার?
মানে, ক্লায়েন্টের সামনে আরেকটু অ্যাসার্টিভ হও। বিজনেসে সেন্টিমেন্ট চলে না।
তিথি বুঝল। পরের মিটিং থেকে সে একটু বদলে গেল। একটু কঠিন হলো। একটু ঠান্ডা হলো।
ধীরে ধীরে সে শিখল কখন হাসতে হয়, কখন চুপ থাকতে হয়, কখন কথা বলতে হয়। শিখল কীভাবে নিজের কৃতিত্ব আদায় করে নিতে হয়, কীভাবে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হয়।
কিন্তু এই শেখার দামটা কী ছিল? সেটা তখন বোঝেনি।
দুই বছর কেটে গেল।
তিথির পদোন্নতি হলো। সিনিয়র কনসালট্যান্ট। বেতন বাড়ল, দায়িত্ব বাড়ল, মানুষের কাছে তার গুরুত্ব বাড়ল।
কিন্তু রাতে বাসায় ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে মনে হত এই মেয়েটা কে? চেনা মনে হয় না।
মা ফোন করতেন প্রতিদিন। কেমন আছিস, মা?
ভালো, আম্মু।
খাওয়া হচ্ছে?
হ্যাঁ।
রাত করে ঘরে ফিরিস না।
আম্মু, কাজ আছে।
মায়ের সাথে কথাবার্তা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে এসেছিল। মিনিট পাঁচেকের বেশি কথা হত না। তিথি ভাবত পরে বলব। কিন্তু পরে আর হত না।
বন্ধুরাও একে একে দূরে সরে গেল। কলেজের বন্ধু সুমাইয়া একদিন বলল, তিথি, তুই কি আর আগের মতো নেই?
তিথি হেসেছিল কী রকম?
জানি না। একটু… অন্যরকম।
তিথি তখনো বুঝতে পারেনি, সুমাইয়া আসলে সত্যিটাই বলেছিল।
তৃতীয় বছরের মাঝামাঝিতে অ্যাজিউরের হেড অফিস থেকে একটা অফার এলো লন্ডন অফিসে দুই বছরের জন্য কাজ করার সুযোগ। বেতন তিনগুণ, থাকার ব্যবস্থা কোম্পানির, প্রমোশনের নিশ্চয়তা।
কামাল স্যার ডেকে বললেন, তিথি, এই সুযোগ বারবার আসে না।
তিথি বাসায় ফিরে রাতের খাবার খেতে বসে বলল, আব্বু, আম্মু, একটা কথা বলার আছে।
বাবা মা দুজনেই চুপ করে শুনলেন।
লন্ডন যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। দুই বছরের জন্য।
ঘরে নীরবতা নামল।
মা প্রথমে বললেন, এত দূরে?
বাবা বললেন, কতদিনের জন্য?
দুই বছর।
তানভীর বলল, আপু, যা। এ সুযোগ ছাড়িস না।
মায়ের চোখে জল এলো। বাবা চুপ করে রইলেন।
সেই রাতে তিথির ঘুম হলো না। ছাদে উঠে আকাশ দেখল। ঢাকার আকাশে তারা দেখা যায় না, কিন্তু একটা ঝাপসা আলো থাকে। সেই আলোর দিকে তাকিয়ে ভাবল এটাই কি সে চেয়েছিল?
উত্তর পাওয়া গেল না। কিন্তু পরদিন সকালে সে কামাল স্যারকে বলল, স্যার, আমি যাব।
বিমানবন্দরে সেদিন পুরো পরিবার এসেছিল। মা কাঁদছিলেন, বাবা গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তানভীর মোবাইলে ছবি তুলছিল।
আম্মু, কেঁদো না। দুই বছর কেটে যাবে।
তুই ভালো থাকিস, মা।
বাবা এগিয়ে এসে মাথায় হাত রাখলেন। বললেন না কিছু। বলার দরকার ছিল না।
সিকিউরিটি গেট পার হয়ে তিথি পিছন ফিরে তাকাল। মা এখনো দাঁড়িয়ে, হাত নাড়ছেন। বাবা পাশে। তানভীর লাফ দিয়ে হাত নাড়ছে।
তিথির বুকের ভেতরে একটা কামড় দিল কে যেন। কিন্তু সে ফিরল না। এগিয়ে গেল।
হিথ্রো বিমানবন্দরে নামার পর প্রথমেই মনে হলো বাতাসটা অন্যরকম। ঠান্ডা, পরিষ্কার, হালকা। ঢাকার গরম ভেজা বাতাসের সাথে কোনো মিল নেই।
কোম্পানির গাড়ি অপেক্ষায় ছিল। ড্রাইভার ইংরেজিতে কথা বলল, তিথি ইংরেজিতে উত্তর দিল কিন্তু মনে হলো ভেতরে একটা অনুবাদ হচ্ছে, শুধু ভাষার নয়, অনুভবেরও।
ক্যানারি ওয়ার্ফের কাছে একটা ছোট ফ্ল্যাট। সাজানো, পরিপাটি। বড় জানালা দিয়ে টেমস নদী দেখা যায়। তিথি জানালার ধারে দাঁড়াল।
সন্ধ্যার আলোয় লন্ডন শহর এক অদ্ভুত রঙ ধারণ করেছে কমলা, সোনালি, ধূসর মিলিয়ে। নদীর জলে আলোর প্রতিফলন। দূরে লন্ডন ব্রিজ। সবকিছু সুন্দর।
কিন্তু এই সুন্দরের মাঝে তিথি অনুভব করল এখানে তার কেউ নেই। একদম কেউ না।
ফোন তুলল। মায়ের নম্বরে কল করল।
পৌঁছে গেছি, আম্মু।
ঠিকঠাক পৌঁছেছিস?
হ্যাঁ। সুন্দর জায়গা।
ঠান্ডা কেমন?
একটু।
গায়ে দিতে ভুলিস না।
আম্মু…
কী?
তিথি কিছু বলতে চেয়েছিল। কিন্তু বলতে পারল না। বলল, কিছু না। ভালো থেকো।
কল কেটে দিল। জানালার ধারে ফিরে গেল। টেমস নদীর দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ।
লন্ডন অফিস ঢাকা অফিসের চেয়ে অনেক বড়। চারশোর বেশি কর্মী। পঞ্চাশটারও বেশি দেশ থেকে আসা মানুষ। ইংরেজিটাই একমাত্র সেতু।
তিথির নতুন বস মার্টিন কেলি আইরিশ, লম্বা, সোনালি চুল, তীক্ষ্ণ নীল চোখ। কথাবার্তায় সরাসরি, কোনো ঘোরপ্যাঁচ নেই। প্রথম মিটিংয়েই বলল, তিথি, আমি ঢাকা টিম থেকে তোমার রিপোর্ট পড়েছি ইম্প্রেসিভ।
থ্যাংক ইউ।
কিন্তু এখানকার স্ট্যান্ডার্ড আলাদা। তোমাকে আরও দ্রুত, আরও শার্প হতে হবে।
তিথি মাথা নাড়াল। আই আন্ডারস্ট্যান্ড।
গুড ওয়েলকাম টু লন্ডন।
সেই ওয়েলকামে আবার একটা শর্ত ছিল।
প্রথম কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল অফিস চেনা, সিস্টেম বোঝা আর নতুন সহকর্মীদের সাথে পরিচিত হওয়ায়। রাতে ফ্ল্যাটে ফিরে একা বসে খেত। রান্না করতে জানত না তেমন, তাই বেশিরভাগ সময় টেকঅ্যাওয়ে।
একদিন অফিসে পরিচয় হলো আনা-এর সাথে। পোলিশ মেয়ে, একই টিমে কাজ করে। হাসিখুশি, বন্ধুবৎসল।
তুমি বাংলাদেশ থেকে এসেছ? আনা জিজ্ঞেস করেছিল।
হ্যাঁ।
ঢাকা শহর কেমন?
তিথি একটু থামল। ঢাকার কথা ভাবল। ভিড়, ট্রাফিক, গরম, শব্দ। কিন্তু সেই সাথে আরও কিছু বাবার পুরনো স্যান্ডেলের শব্দ, মায়ের হাতের রান্নার গন্ধ, তানভীরের হাসি।
ক্যাওটিক, বলল তিথি। কিন্তু সুন্দর।
আনা হাসল। আমার ওয়ারসো শহরের মতো।
সেদিন থেকে দুজনের বন্ধুত্ব শুরু হলো।
ছয় মাস পার হলো।
তিথির ক্যারিয়ার উঠছিল। মার্টিন খুশি, টিম খুশি, হেড অফিস থেকে প্রশংসা আসছে। একটার পর একটা প্রজেক্টে সাফল্য।
কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা ফাঁকা জায়গা তৈরি হচ্ছিল।
কাজ করার ধরন বদলে গিয়েছিল। একসময় সে কাজ করত কারণ কাজটা ভালো লাগত। এখন করত কারণ করতে হবে। একসময় সহকর্মীদের সাথে মিলেমিশে কাজ করত। এখন সবাইকে সম্ভাব্য প্রতিযোগী মনে হত।
একটা ঘটনা মনে আছে। একদিন জুনিয়র কলিগ ড্যানিয়েল একটা ভুল করল রিপোর্টে। তিথি একসময় এটা চুপে চুপে ঠিক করে দিত, হয়তো পরে বলত। কিন্তু সেদিন সে মিটিংয়ে সবার সামনে ভুলটা ধরিয়ে দিল। ড্যানিয়েল লাল হয়ে গেল।
মিটিং শেষে আনা তাকে একপাশে ডেকে নিয়ে বলল, তিথি, এটা দরকার ছিল?
তিথি চমকে উঠল। কী?
ড্যানিয়েলকে ওভাবে
সে ভুল করেছিল।
জানি। কিন্তু সবার সামনে
তিথি একটু রুক্ষভাবে বলল, আনা, এটা অফিস। সেন্টিমেন্ট দিয়ে চলে না।
আনা আর কিছু বলল না। কিন্তু তার চোখের দিকে তাকিয়ে তিথির মনে হলো কী যেন বেঠিক হয়ে গেল।
রাতে ফ্ল্যাটে ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সেই কথাটা মনে পড়ল। সেন্টিমেন্ট দিয়ে চলে না।
এই কথাটা তো তার বসের কাছ থেকে শেখা। ঢাকায়। কামাল স্যার বলেছিলেন। তিথি তখন শিখেছিল। কিন্তু আজ যখন নিজের মুখ থেকে এটা বেরোল মনে হলো অন্য কারো কণ্ঠস্বর।
বছর শেষে বাড়িতে গেল তিথি। দুই সপ্তাহের ছুটি।
বিমানবন্দরে বাবা এসেছিলেন। একলা। বাসায় পৌঁছে মা জড়িয়ে ধরলেন। তানভীর বলল, আপু, চিনতেই পারছি না তোকে!
তিথি হাসল। মোটা হয়েছি?
না। অন্যরকম লাগছে।
খাবার টেবিলে বসে মায়ের হাতের রান্না খেতে খেতে তিথির বুকের ভেতরে কী যেন নড়ে উঠল। এই স্বাদ ঝোলের ভেতর কাঁঠালবীচির গন্ধ, ভাতের সাথে ডালের সরলতা এই স্বাদ তো কোনো লন্ডনের রেস্টুরেন্টে পাওয়া যায় না।
কেমন আছিস আসলে, মা?মা জিজ্ঞেস করলেন।
ভালো।
সত্যিই?
তিথি থামল। মায়ের চোখের দিকে তাকাল। মা সবসময় বুঝে যান। বরাবরই।
ক্লান্ত একটু,স্বীকার করল।
মা হাত রাখলেন তিথির হাতে। বললেন না কিছু। কিন্তু সেই স্পর্শে এতটুকু উষ্ণতা ছিল যে তিথির চোখ জলে ভরে গেল। দ্রুত সরিয়ে নিল মুখ।
দুই সপ্তাহ কেটে গেল দ্রুত। আবার লন্ডন। আবার কাচের দেয়াল।
দ্বিতীয় বছরের মাঝামাঝিতে একটা ঘটনা ঘটল।
একটা বড় প্রজেক্টে তিথির টিম কাজ করছিল। প্রেজেন্টেশনের আগের রাতে আনা এলো তার ফ্ল্যাটে। বলল, তিথি, একটা কথা বলব?
বলো।
তুমি আজকাল কেমন যেন হয়ে যাচ্ছ।
তিথি ঠান্ডা চোখে তাকাল। মানে?
মানে… তুমি আগে অন্যরকম ছিলে। মিষ্টি, যত্নশীল। এখন মনে হয় তুমি একটা মেশিনের মতো কাজ করছ।
আনা, কাল বড় প্রেজেন্টেশন আছে। এই সময়ে
এই সময়েই বলছি কারণ পরে সুযোগ থাকবে না।আনা একটু থেমে বলল, তোমাকে মনে আছে প্রথম দিন তুমি ঢাকার কথা বলেছিলে? ‘ক্যাওটিক, কিন্তু সুন্দর।’ সেই হাসিটা এখন নেই তোমার মুখে।”
তিথি কিছু বলল না।
আনা চলে গেল।
তিথি একা বসে রইল। জানালার বাইরে লন্ডনের রাত। টেমসের জলে আলো।
সত্যিই কি সে বদলে গেছে? কখন? কীভাবে?
কর্পোরেট চুক্তিটা ছিল সাফল্যের বিনিময়ে নিজেকে দিয়ে দাও। তিথি সেই চুক্তিটাই মেনে নিয়েছিল। ধীরে ধীরে। অজান্তে।
পরদিন প্রেজেন্টেশন ভালো হলো। মার্টিন খুশি। ক্লায়েন্ট খুশি। তিথির নাম উঠল।
কিন্তু সেই রাতে অফিস থেকে বের হয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিথি একটা পার্কে বসল। ঠান্ডা বাতাস। চারদিকে গাছ। কেউ নেই।
হঠাৎ কাঁদতে শুরু করল।
কেন কাঁদছে জানে না। কিন্তু থামতে পারছে না।
অনেকক্ষণ কেদে। তারপর থামল। মুখ মুছে। উঠে দাঁড়াল।
আকাশের দিকে তাকাল। লন্ডনের আকাশেও তারা দেখা যায় না। কিন্তু একটা ঝাপসা আলো আছে।
ঢাকার মতো।
ফ্ল্যাটে ফিরে পুরনো ব্যাগ খুলল তিথি। সেই ব্যাগে যা যা এনেছিল ঢাকা থেকে কিছু বই, কিছু ছবি। একটা পুরনো ডায়েরি।
ডায়েরিটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়ের। পাতা উল্টাল।
একটা পাতায় লেখা:
আজকে সুমাইয়ার সাথে চা খেলাম। সে বলল আমি খুব ভালো মানুষ। আমি বললাম, ভালো মানুষ হওয়াটাই তো সবচেয়ে বড় কাজ। সে হাসল।
আরেক পাতায়:
আজকে একটা বৃদ্ধ মানুষকে রাস্তা পার হতে সাহায্য করলাম। কারণ নেই, শুধু মনে হলো করা দরকার।
আরেক পাতায়:
আম্মু আজ কাঁদছিলেন। বললেন কষ্ট আছে। আমি পাশে বসে ছিলাম। কথা বলিনি, শুধু পাশে ছিলাম। সেটাই হয়তো যথেষ্ট।
তিথি ডায়েরিটা বুকে চেপে ধরল।
এই মেয়েটা কোথায় গেল?
পরের দিন তিথি আনার কাছে গেল। বলল, তুমি ঠিকই বলেছিলে।
আনা তাকাল।
আমি বদলে গেছি। কোথাও হারিয়ে ফেলেছি নিজেকে।
আনা চুপ করে শুনল।
কিন্তু কীভাবে ফিরব জানি না।
আনা বলল, তুমি কি জানো তুমি আসলে কে ছিলে?
ছিলাম একসময়।
তাহলে সেটাই মনে করো।
সহজ কথা। কিন্তু এই সহজ কথাটাই যেন একটা দরজা খুলে দিল।
পরিবর্তন রাতারাতি হয় না।
তিথি বুঝল সেটা। তবু শুরু করল।
প্রথমে ছোট ছোট জিনিস। ড্যানিয়েলকে একদিন ডেকে বলল, সেদিন মিটিংয়ে যা হয়েছিল, সরি। ওভাবে বলা উচিত হয়নি।
ড্যানিয়েল অবাক হলো। বলল, থ্যাংক ইউ।
এতটুকুতেই বুকের ভেতরে হালকা লাগল।
মাকে ফোন করতে শুরু করল বেশি বেশি। আগে পাঁচ মিনিট কথা হত, এখন পনেরো মিনিট, বিশ মিনিট। মা কথা বলতেন বাড়ির গল্প পাড়ার কথা, তানভীরের পড়ার কথা, বাবার চায়ের কথা। তিথি শুনত। শুধু শুনত।
রান্না করতে শুরু করল। প্রথমে খিচুড়ি। পরে ডাল। ধীরে ধীরে মায়ের রেসিপি মনে করে করে রান্না করত। একদিন ডাল রান্না করে প্রথম মুখে দিতেই চোখ জলে ভরে গেল। মায়ের হাতের ডালের মতো হয়নি, কিন্তু গন্ধটা অনেকটা কাছাকাছি।
সপ্তাহান্তে পার্কে যেতে শুরু করল। একা বসে বই পড়ত। একসময় বই পড়ত, সেই অভ্যাস কখন ছেড়ে দিয়েছিল মনেই নেই। এখন আবার ফিরে এলো।
একদিন পার্কে একটা বাংলাদেশি পরিবারকে দেখল মা, বাবা, ছোট মেয়ে। মেয়ে দৌড়াচ্ছে, মা হাসছেন। তিথির বুকে একটা কামড় লাগল। তবু হাসল।
মার্টিন একদিন জিজ্ঞেস করল, তিথি, তুমি কি ঠিক আছ?
হ্যাঁ, কেন?
তুমি একটু… আলাদা মনে হচ্ছ আজকাল।
তিথি একটু ভাবল। বলল, ভালো অর্থে না খারাপ অর্থে?
মার্টিন হাসল। জানি না। কিন্তু আলাদা।
তিথিও হাসল। আমি ফিরে আসছি, মার্টিন। মানে, আসল আমি।
মার্টিন বুঝল কিনা জানা নেই। কিন্তু তিথি নিজে বুঝল।
দ্বিতীয় বছর শেষ হওয়ার দুই মাস আগে হেড অফিস থেকে অফার এলো আরও দুই বছর লন্ডনে থাকার সুযোগ। আরও ভালো পোস্ট, আরও ভালো বেতন।
তিথি চিঠিটা বারবার পড়ল।
আনা জিজ্ঞেস করল, কী করবে?
জানি না।
মন কী বলছে?
তিথি জানালার বাইরে তাকাল। টেমস নদী। সুন্দর শহর। ভালো ক্যারিয়ার। কিন্তু…
রাতে ঘুম হলো না। তানভীরকে মেসেজ করল। ভাই, তুই কি জেগে আছিস?
হ্যাঁ আপু। কেন?
কথা বলব?
বল।
কল করল তানভীরকে।
ভাই, আমি কি দেশে ফিরে আসব?
তানভীর একটু থামল। বলল, আপু, তুই কী চাস?
আমি… আমি জানি না।
আপু, তুই যখন এখানে ছিলিস, আম্মু রাতে তোর ঘরে গিয়ে বসে থাকতেন। আমি দেখেছি। কিছু বলতেন না, শুধু বসে থাকতেন।
তিথি কথা বলতে পারল না।
আব্বু তোর ছবি ফ্রেমে লাগিয়েছেন। ড্রেসিং টেবিলে রেখেছেন।
কান্না এসে গেল। চুপ করে রইল।
কিন্তু আপু, এটা তোর সিদ্ধান্ত। তোর জীবন তোর। আমরা আছি, থাকব।
কল কাটল তিথি। বালিশে মুখ গুঁজে অনেকক্ষণ কাঁদল।
তারপর শান্ত হলো।
উঠল। ডায়েরি খুলল। একটা নতুন পাতায় লিখল:
আমি কে, সেটা আমি বুঝে গেছি। এখন প্রশ্ন হলো আমি কোথায় থাকতে চাই।
পরদিন মার্টিনকে বলল, মার্টিন, আমি আর থাকব না।
মার্টিন অবাক হলো। কেন? তোমার ক্যারিয়ার
ক্যারিয়ার হবে। কিন্তু দেশে গিয়ে।
বাংলাদেশে এই ধরনের সুযোগ…
তৈরি করে নেব।
মার্টিন তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, তুমি নিশ্চিত?
হ্যাঁ।
সেই মুহূর্তে তিথির মনে হলো —এটাই প্রথমবার সত্যিকারের নিশ্চিত উত্তর দিল সে।
যাওয়ার আগের সন্ধ্যায় আনা রান্না করল। পোলিশ স্যুপ, ব্রেড, রেড ওয়াইন।
দুজন বসল টেবিলে।
তুমি সত্যিই যাচ্ছ,”আনা বলল।
হ্যাঁ।
আমি মিস করব।
আমিও।
আনা হাসল। তুমি জান, তুমি যখন প্রথম এসেছিলে, আমি ভেবেছিলাম তুমি অহংকারী।
তিথি হাসল। সত্যিই?
হ্যাঁ। কিন্তু পরে বুঝলাম তুমি ভয় পেয়েছিলে। নতুন জায়গা, নতুন মানুষ। সেই ভয়টা ঢেকে রাখতে কঠিন হয়ে গিয়েছিলে।
তিথি চুপ করে রইল।
কিন্তু এখন তুমি সেই ভয়টা দেখাতে শিখেছ। সেটাই সাহস।
দুজন চুপ করে বসে রইল। বাইরে লন্ডনের রাত। টেমস নদীর জলে আলো।
তোমার সাথে থেকে আমিও অনেক কিছু শিখলাম,তিথি বলল।
কী?
বন্ধু থাকা মানে সত্যি কথা বলতে পারা।
আনা হাত বাড়াল তিথি ধরল।
হিথ্রো বিমানবন্দরে লাইনে দাঁড়িয়ে তিথি ভাবল কী নিয়ে যাচ্ছি?
একটা ক্যারিয়ার হ্যাঁ। অনেক অভিজ্ঞতা হ্যাঁ। একজন ভালো বন্ধু হ্যাঁ। আর নিজেকে অবশেষে, হ্যাঁ।
বিমান উড়ল। লন্ডন শহর ছোট হতে থাকল। মেঘের আড়ালে মিলিয়ে গেল।
তিথি চোখ বুজল।
শাহজালাল বিমানবন্দরে নামার পর প্রথমেই নাকে এলো সেই পরিচিত গন্ধ। ঢাকার বাতাস একটু ভারী, একটু গরম, একটু ধোঁয়াটে। কিন্তু পরিচিত।
বুকের ভেতরে কিছু একটা খুলে গেল।
বাইরে বেরিয়ে দেখল মা, বাবা, তানভীর। তিনজনই এসেছেন।
মা দৌড়ে এলেন। জড়িয়ে ধরলেন।
আমার মেয়ে।
তিথি চোখ বুজল। মায়ের গায়ের গন্ধ সরষের তেল আর সাবানের মিশেল। এই গন্ধটা কোনো পারফিউমে নেই।
বাবা কাছে এলেন। কাঁধে হাত রাখলেন।
তানভীর বলল, আপু, চিনতে পারছি আবার।
তিথি হাসল। সত্যিকারের হাসি যে হাসি অনেক মাস মুখে ছিল না।
বাসায় ফিরে সেই বারান্দায় দাঁড়াল তিথি। হাতে এক কাপ চা মায়ের বানানো।
ঢাকার ভোরবেলার গন্ধ আসছে। রাস্তার চায়ের ধোঁয়া, ভেজা মাটি। ঠিক আগের মতো।
কিন্তু এবার এই গন্ধটাকে আরও বেশি ভালো লাগল।
সে বুঝল কিছু জিনিস হারিয়ে গেলে তবেই বোঝা যায় সেগুলো আসলে কতটা মূল্যবান ছিল।
দুই সপ্তাহ বিশ্রাম নিল। মায়ের সাথে বাজারে গেল। বাবার সাথে সন্ধ্যায় বসল। তানভীরের সাথে ছাদে উঠে আকাশ দেখল। পুরনো বন্ধুদের সাথে দেখা করল।
সুমাইয়া বলল, তিথি, তুই আবার তুই হয়ে গেছিস।
তিথি হাসল হ্যাঁ।
তৃতীয় সপ্তাহে চাকরির খোঁজ শুরু করল। লন্ডনের অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা নিয়ে ঢাকায় অনেক সুযোগ আছে। একটা স্থানীয় কনসালটিং ফার্মে ইন্টারভিউ দিল।
ইন্টারভিউ বোর্ডে বসা মানুষটি জিজ্ঞেস করলেন, লন্ডনের মতো সুযোগ কি এখানে পাবেন?
তিথি বলল, লন্ডনে একধরনের সুযোগ আছে। এখানে অন্যরকম সুযোগ আছে। এখানে আমি কিছু গড়তে পারব, শুধু কারো বানানো জিনিস চালাব না।
মানুষটা মুগ্ধ হলেন।
চাকরি হলো।
ছয় মাস পরে।
তিথি এখন নতুন অফিসে কাজ করছে। ছোট টিম, বড় স্বপ্ন। মাঝে মাঝে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, কিন্তু নিজেকে হারিয়ে নয়।
একদিন একজন জুনিয়র কলিগ এলো, মুখ মলিন।
আপু, রিপোর্টে একটা ভুল হয়েছে।
তিথি বলল, কোথায়?
কলিগ দেখাল।
তিথি বলল, ঠিক করে ফেলো। পরে একসাথে দেখব কেন হলো।
কলিগ অবাক হলো। ভেবেছিল বকা খাবে। তিথি হাসল।
সেদিন বিকেলে মায়ের সাথে বারান্দায় বসল। চা হাতে।
আম্মু, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
বল।
তুমি কি কখনো নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলে?
মা চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, হারিয়েছিলাম। তোর জন্মের পরে।
কীভাবে?
সব মা হারান। বাচ্চার জন্য সব ছেড়ে দিতে দিতে কখন নিজেটা ছেড়ে দেওয়া হয়ে যায়।
তারপর?
তারপর তোদের দেখতে দেখতে ফিরে পেলাম। তোরা বড় হলে, আমিও আবার বড় হলাম।
তিথি মায়ের হাত ধরল।
বাইরে ঢাকার সন্ধ্যা নামছে। রাস্তায় গাড়ির শব্দ, দূরে আজানের সুর, পাশের বাসা থেকে রান্নার গন্ধ।
অগোছালো, কোলাহলময়, ভরা ঢাকা।
তিথি বুকভরে শ্বাস নিল।
এটাই বাড়ি।
একটা নোটবুক বের করল। লিখল:
নীল কাচের বিল্ডিংয়ে যে চুক্তি হয়েছিল, সেটা ছিল নিজেকে বিক্রি করার চুক্তি। আমি সেই চুক্তি ভেঙে ফেলেছি।
নতুন চুক্তি করেছি নিজের সাথে। ভালো কাজ করব, কিন্তু নিজেকে হারিয়ে নয়। এগিয়ে যাব, কিন্তু শিকড় ছেড়ে নয়।
এই চুক্তিতে কোনো নীল কাচ নেই। আছে শুধু আকাশ যা এখান থেকেও দেখা যায়।
সূর্য ডুবছে। আকাশ লাল-কমলা। ঢাকার আকাশে তারা দেখা যায় না, কিন্তু একটা ঝাপসা আলো থাকে।
তিথি সেই আলোর দিকে তাকাল।
হাসল।
তিথির গল্প শেষ হলো না শুধু একটা অধ্যায় শেষ হলো। জীবন চলতে থাকে, বদলাতে থাকে।
কিন্তু যে মানুষ একবার নিজেকে চিনে নেয়, সে আর হারায় না। পথ ভুল হতে পারে, কিন্তু নিজেকে হারানো হয় না।
নীল চুক্তি ভাঙা গেছে।
নতুন চুক্তি নিজের সাথে।
এটাই তিথির জয়।
সমাপ্ত