শহরে আসার পর বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ধীরে ধীরে বদলে গিয়েছিল। আগে বাবা ছিলেন খুব কাছের একজন মানুষ—সকালে ঘুম থেকে উঠলে যাঁকে দেখা যেত, রাতে ঘুমানোর আগে যাঁর সঙ্গে কথা হতো, কোনো সমস্যা হলে যাঁর কাছে ছুটে যাওয়া যেত। কিন্তু শহরে চলে আসার পর সেই মানুষটাই একদিন ফোনের ওপাশের একটি কণ্ঠস্বর হয়ে গেলেন। দেখা নেই, পাশে বসা নেই, মাথায় হাত রেখে বলা নেই—শুধু একটি ফোনকল, কয়েক মিনিটের কথা, তারপর দীর্ঘ নীরবতা।
প্রথম দিকে বাবা প্রায় প্রতিদিন ফোন করতেন। কখনো সকালে, কখনো সন্ধ্যায়। ফোন ধরলেই প্রথম প্রশ্ন থাকত, “কী করিস?” আমি বলতাম, “কাজে আছি।” তারপর তিনি জিজ্ঞেস করতেন, “খেয়েছিস?” আমি বলতাম, “হ্যাঁ।” তারপর একটু চুপ করে থাকতেন। মনে হতো, তাঁর বলার মতো আরও অনেক কথা আছে, কিন্তু কীভাবে শুরু করবেন বুঝতে পারছেন না। শেষ পর্যন্ত বলতেন, “ঠিক আছে, কাজ কর। পরে কথা হবে।”
আমি তখন বুঝতাম না, বাবা আসলে ফোন করেছিলেন কথা বলার জন্য নয়—আমার কণ্ঠস্বর শোনার জন্য।
একদিন অফিসে খুব ব্যস্ত ছিলাম। ফোনটা বারবার বাজছিল। স্ক্রিনে বাবার নাম দেখে আমি ফোন কেটে দিলাম। মনে হলো, পরে কথা বলব। কিছুক্ষণ পর আবার ফোন। এবারও ধরলাম না। তৃতীয়বার ফোন এলে বিরক্ত হয়ে ফোনটা সাইলেন্ট করে রাখলাম। কাজ শেষ হতে রাত হয়ে গেল। বাসায় ফিরে দেখি বাবার আরও একটা মিসড কল।
আমি ভাবলাম, “কাল ফোন করব।”
পরদিনও ব্যস্ততা।
তারপর আরও একদিন।
অবশেষে তিন দিন পর আমি নিজেই ফোন করলাম।
বাবা ফোন ধরেই বললেন, “কী খবর?”
আমি বললাম, “ভালো। তুমি কয়েকবার ফোন করেছিলে?”
তিনি বললেন, “হ্যাঁ, এমনিই।”
আমি বললাম, “কিছু হয়েছিল?”
বাবা বললেন, “না, কিছু হয়নি।”
আমি বললাম, “তাহলে ফোন করেছিলে কেন?”
তিনি একটু হেসে বললেন, “এমনিই তো। তোর সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছিল।”
কথাটা খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু ফোন রাখার পর আমি অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম। তিন দিন আমি ভেবেছিলাম, “পরে ফোন করব।” আর বাবা হয়তো তিন দিন ধরে শুধু আমার সঙ্গে একটু কথা বলার অপেক্ষা করেছিলেন।
সেদিন প্রথমবার বুঝলাম, আমাদের ব্যস্ততা আর বাবার অপেক্ষার মধ্যে কত বড় পার্থক্য।
আমাদের কাছে ফোন একটা যন্ত্র। বাবার কাছে ফোনটা ছিল সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র পথ।
বাড়িতে থাকতে বাবা আমার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকতে পারতেন। রান্নাঘর থেকে জিজ্ঞেস করতে পারতেন, “খাবি?” বাইরে গেলে ফিরে এসে বলতে পারতেন, “এত দেরি হলো কেন?” অসুস্থ হলে নিজের চোখে দেখতে পারতেন। কিন্তু শহরে চলে যাওয়ার পর তাঁর কাছে এসবের কোনো সুযোগ ছিল না। আমার কণ্ঠস্বরই ছিল তাঁর খবরের কাগজ। আমি “ভালো আছি” বললে তিনি বিশ্বাস করতেন। আমি একটু চুপ থাকলে তিনি বুঝতে চেষ্টা করতেন, কিছু হয়েছে কি না।
এক রাতে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিল। শহরের রাস্তা পানিতে ডুবে গিয়েছিল। অফিস থেকে ফিরতে অনেক দেরি হয়েছিল। ফোনের ব্যাটারিও প্রায় শেষ। বাসায় পৌঁছানোর পর দেখি বাবার কয়েকটা কল। আমি ফোন করতেই তিনি প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ধরলেন।
“কোথায় ছিলি?”
“অফিসে।”
“এত রাতে?”
“বৃষ্টি হয়েছিল, তাই দেরি হয়েছে।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বাবা বললেন, “রাস্তায় সাবধানে থাকবি। এমন বৃষ্টিতে বাইরে বের হোস না।”
আমি হেসে বললাম, “বাবা, আমি তো বাসায় পৌঁছে গেছি।”
তিনি বললেন, “তাই তো বলছি। পৌঁছানোর আগে ফোন ধরিস না কেন?”
তাঁর গলায় একটু রাগ ছিল। কিন্তু সেই রাগের নিচে যে ভয় ছিল, সেটা সেদিন খুব স্পষ্ট শুনেছিলাম।
আমি বললাম, “সরি বাবা।”
তিনি বললেন, “ঠিক আছে। খেয়ে ঘুমা।”
ফোন কেটে গেল।
বাইরে তখনও বৃষ্টি পড়ছিল। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আমার হঠাৎ মনে হলো, আমি শহরের একটা ছোট্ট ঘরে দাঁড়িয়ে আছি, আর কয়েকশো কিলোমিটার দূরে একজন মানুষ শুধু আমার নিরাপদে বাড়ি ফেরার খবরের জন্য জেগে ছিলেন।
বাবারা দূরত্ব মাপেন না।
তাঁরা শুধু অপেক্ষা করেন।
কখনো ফোনের পাশে।
কখনো দরজার পাশে।
কখনো জানালার পাশে।
একসময় আমার ফোনে বাবার কলের সংখ্যা কমে গেল। আগে তিনি প্রায় প্রতিদিন ফোন করতেন। পরে একদিন পরপর। তারপর দুই-তিন দিন পরপর। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো তিনি ব্যস্ত হয়ে গেছেন। পরে বুঝলাম, তিনি হয়তো আমাকে বিরক্ত করতে চান না।
একদিন আমি নিজেই বললাম, “বাবা, তুমি এখন কম ফোন করো কেন?”
তিনি বললেন, “তুই তো ব্যস্ত থাকিস। বেশি ফোন করলে বিরক্ত হোস।”
আমি বললাম, “না, তুমি ফোন করবে।”
তিনি বললেন, “সময় পেলে করিস।”
আমি বললাম, “তুমিই আগে ফোন করবে।”
তিনি হাসলেন।
সেদিনের পর বাবা আবার ফোন করতে শুরু করলেন।
কিন্তু একটা পরিবর্তন হয়েছিল।
তিনি আর কখনো ফোন করে বলতেন না, “কোথায় ছিলি?”
বরং বলতেন, “ব্যস্ত থাকলে পরে কথা বলিস।”
আমি বুঝলাম, বাবা হয়তো ধীরে ধীরে শিখে গেছেন কীভাবে দূর থেকে সন্তানকে ভালোবাসতে হয়।
কিছুদিন পর আমার কাজের জায়গায় একটা বড় সমস্যা হলো। আমি মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়েছিলাম। কারও সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। বন্ধুদের ফোন ধরিনি। কারও সঙ্গে নিজের সমস্যার কথা বলিনি। কিন্তু সেই রাতে বাবার ফোন এল।
আমি ফোন ধরলাম।
বাবা বললেন, “কী হয়েছে?”
আমি বললাম, “কিছু হয়নি।”
বাবা বললেন, “তোর গলার আওয়াজ ভালো লাগছে না।”
আমি চুপ।
তিনি আবার বললেন, “কিছু হয়েছে?”
আমি তখন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। সব কথা বলে ফেললাম। কাজের সমস্যা, মানুষের আচরণ, নিজের ভয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব।
বাবা অনেকক্ষণ চুপ করে শুনলেন।
তিনি আমাকে কোনো বড় উপদেশ দিলেন না। শুধু বললেন, “একটা কথা মনে রাখিস—একটা খারাপ সময় মানেই খারাপ জীবন না।”
আমি চুপ করে শুনছিলাম।
তিনি বললেন, “আজ যা হচ্ছে, কাল তা থাকবে না। তুই নিজের কাজটা ঠিকভাবে কর। মানুষের কথা নিয়ে বেশি ভাবিস না।”
তারপর একটু থেমে বললেন, “আর মনে রাখিস, সমস্যা যত বড়ই হোক, তুই একা না।”
এই কথাটা শুনে আমার চোখে পানি চলে এসেছিল।
কারণ বাবা তখন আমার পাশে ছিলেন না।
তিনি আমার ঘরে বসে ছিলেন না।
আমার কাঁধে হাত রাখেননি।
তবুও তাঁর একটা বাক্য আমার ভেতরের ভয়টাকে অনেকটা কমিয়ে দিয়েছিল।
তখন বুঝলাম, বাবার উপস্থিতির জন্য সবসময় শরীরের কাছে থাকা দরকার হয় না।
কিছু মানুষ দূরে থেকেও খুব কাছে থাকে।
কিছু কণ্ঠস্বর ফোনের স্পিকারের ভেতর থেকেও হৃদয়ের গভীরে পৌঁছে যায়।
সময় যেতে থাকল। আমার জীবন ব্যস্ত হতে থাকল। বাবার বয়স বাড়তে থাকল। একদিন ফোনে কথা বলার সময় তাঁর কণ্ঠস্বর একটু কাঁপা কাঁপা লাগছিল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “বাবা, শরীর খারাপ?”
তিনি বললেন, “না, কিছু না।”
আমি বললাম, “ডাক্তার দেখিয়েছ?”
তিনি বললেন, “সামান্য ব্যাপার।”
আমি বললাম, “সামান্য ব্যাপার হলে গলা এমন কেন?”
তিনি হেসে বললেন, “তুই এখন ডাক্তার হয়ে গেছিস?”
আমি হাসলাম।
কিন্তু ফোন রাখার পর মনটা খারাপ হয়ে গেল।
সেদিন মনে হলো, এতদিন বাবা আমার কণ্ঠস্বর শুনে বুঝেছেন আমি কেমন আছি। আজ আমি কি তাঁর কণ্ঠস্বর শুনে বুঝতে পারছি তিনি কেমন আছেন?
আমি পরদিনই বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।
বাড়ি পৌঁছে বাবাকে দেখে মনে হলো, তিনি আগের মতোই আছেন। কিন্তু এবার আমি তাঁকে একটু অন্যভাবে দেখছিলাম। তাঁর হাঁটার গতি, চুলের সাদা রং, চোখের নিচের ক্লান্তি—সবকিছু যেন হঠাৎ স্পষ্ট হয়ে উঠল।
আমি বললাম, “বাবা, তুমি আমাকে ফোন করে সবসময় জিজ্ঞেস করো—আমি ভালো আছি কি না। কিন্তু আমি কি তোমাকে কখনো জিজ্ঞেস করেছি?”
বাবা হেসে বললেন, “তুই তো আমার ছেলে। তুই ভালো থাকলেই আমি ভালো।”
আমি বললাম, “এটা উত্তর না।”
তিনি কিছু বললেন না।
আমি তাঁর পাশে বসে হাতটা ধরলাম।
অনেক বছর পর।
সেই হাত, যে হাত একদিন স্কুলের গেটের সামনে আমাকে সাহস দিয়েছিল। সেই হাত, যে হাত আমার জন্য বাজারের ব্যাগ বহন করেছিল। সেই হাত, যে হাত আমার মাথায় রেখে বলেছিল, “ভয় পাস না।”
আজ সেই হাতটা আগের চেয়ে অনেক শুকনো মনে হলো।
আমি আস্তে করে বললাম, “বাবা, তুমি কেমন আছ?”
তিনি আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
বললেন, “এখন ভালো আছি।”
আমি বুঝলাম, এই “এখন” শব্দটার মধ্যে অনেক কিছু আছে।
কারণ সন্তানের উপস্থিতি কখনো কখনো বাবার জন্য ওষুধের মতো।
সেদিন রাতে ঘুমানোর আগে বাবার ফোনটা টেবিলের ওপর দেখেছিলাম। পুরোনো ফোন। স্ক্রিনে কয়েকটি নম্বর। আমার নামটাও সেখানে ছিল।
আমি ভাবলাম, এই ছোট্ট যন্ত্রটার মাধ্যমে বাবা কত বছর ধরে আমাকে ধরে রেখেছেন।
দূরত্বের ওপারে থেকেও।
ব্যস্ততার ভেতর থেকেও।
আমার নীরবতার মাঝেও।
আমি হয়তো অনেকবার তাঁর ফোন ধরিনি। অনেকবার বলেছি, “পরে কথা বলব।” অনেকবার ব্যস্ততার অজুহাতে কথা ছোট করেছি। কিন্তু বাবা কখনো আমার সঙ্গে সম্পর্ক ছোট করেননি।
আজ যখন ফোনটা বেজে ওঠে এবং স্ক্রিনে বাবার নাম দেখি, আমার ভেতরটা অদ্ভুতভাবে নরম হয়ে যায়।
আমি ফোনটা সঙ্গে সঙ্গে ধরি।
কারণ এখন জানি—
একটা ফোনকল হয়তো মাত্র দুই মিনিটের।
কিন্তু সেই দুই মিনিটের জন্য কেউ হয়তো সারাদিন অপেক্ষা করে থাকে।
আর ফোনের ওপাশে যদি বাবা থাকেন, তাহলে সেই কল কখনোই ছোট নয়।
কারণ বাবার কণ্ঠস্বর শুধু শব্দ নয়—এটা শৈশবের সেই নিরাপদ হাত, যা দূরত্ব পেরিয়েও বলে যায়, “ভয় পাস না, আমি আছি।”