ছোটবেলা থেকেই মাসিক ‘আল-কাউসার’ পত্রিকার প্রশ্নোত্তর পর্বের মাধ্যমে মুফতি আব্দুল মালেক সাহেবের পাণ্ডিত্য ও গভীর জ্ঞানের সাথে পরিচয়। কওমি অঙ্গনে তাকে 'গ্র্যান্ড মুফতি' হিসেবে সম্মান জানানো হয়—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিতাবি ইলম ও জটিল ধর্মীয় বিষয়ে তার অগাধ দখল তাকে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে আলেম সমাজের কাছেও এক অনন্য উচ্চতায় বসিয়েছে।
গত বছরের ৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বায়তুল মোকাররমের তৎকালীন খতিব যখন আত্মগোপনে গেলেন, তখন অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে মুফতি আব্দুল মালেক সাহেবকে খতিব পদে স্থলাভিষিক্ত করা হয়। দেশের সাধারণ তৌহিদী জনতার মতো এই সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগতভাবে আমিও ভীষণ আনন্দিত হয়েছিলাম।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক একটি দলকে (জামায়াতে ইসলামী) কেন্দ্র করে তার দেওয়া একটি ফতোয়া নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি মন্তব্য করেছেন—দেওবন্দি আকিদার সাথে আদর্শগত বিরোধ থাকার কারণে উক্ত দলের সাথে যুক্ত থাকা বা সমর্থন করা ভ্রান্তির শামিল। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে কোনো আলেমদের ফতোয়ার ভুল-ত্রুটি ধরা আমার কাজ নয়, কিন্তু সমাজ ও দেশের সার্বিক প্রেক্ষাপটে কিছু যৌক্তিক প্রশ্ন তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
আকিদার প্রশ্ন বনাম অন্যান্য রাজনৈতিক ভাবাদর্শ ⚖️
যদি দেওবন্দি আকিদার সাথে অমিলের কারণে কোনো রাজনৈতিক দলকে বর্জন করার কথা বলা হয়, তবে দেশের প্রধান রাজনৈতিক ভাবাদর্শগুলোর অবস্থান ইসলামে কোথায়?
ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ: একটি দল চর্চা করে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি, অন্য দল ধারণ করে কঠোর জাতীয়তাবাদ। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এই আদর্শগুলোর গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু, তা সাধারণ শিশুরাও বোঝে। কিন্তু এসব ভাবাদর্শের রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে কেন স্পষ্ট কোনো সামাজিক বা ধর্মীয় দিকনির্দেশনা দেখা যায় না?
রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও ওয়াদা ভঙ্গ: রাজনৈতিক দলগুলোর বারবার অবস্থান পরিবর্তন এবং ক্ষমতার স্বার্থে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা ইসলামের দৃষ্টিতে স্পষ্ট মুনাফেকির শামিল। এই জাতীয় রাজনৈতিক অসদাচরণের বিরুদ্ধে কি কখনো মিম্বর থেকে জোরালো ফতোয়া এসেছে?
সামাজিক অনাচার ও সমসাময়িক সংকট 🛑
আজকে সমাজজুড়ে যে ভয়াবহ সামাজিক অবক্ষয় চলছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে ধর্মীয় অভিভাবকদের নীরবতা সাধারণ মানুষকে চিন্তিত করে তোলে:
নৃশংসতা ও অপরাধ: চাঁদাাবাজি, গুম, খুন, নারী নির্যাতন কিংবা শিশুদের ওপর অন্যায়ের মাত্রা যখন চরম আকার ধারণ করে, তখন আলেম সমাজের পক্ষ থেকে তা প্রতিরোধে জোরালো কোনো যৌথ ফতোয়া বা আন্দোলন কেন সামনে আসে না?
সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়: সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ধারণার দোহাই দিয়ে যখন ধর্মীয় সংস্কৃতি ও পারিবারিক কাঠামোর পরিপন্থী কোনো আদর্শ প্রচারের চেষ্টা করা হয়, যা ইসলামি অনুশাসনের সম্পূর্ণ বিরোধী—তখনও কি আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় নেতৃত্ব থেকে দৃশ্যমান প্রতিবাদ আশা করা যায় না?
ইতিহাস থেকে শিক্ষা: ধর্ম ও নেতৃত্বের দূরত্ব 📜
ইউরোপের ইতিহাস পর্যালোচায় দেখা যায়, একসময় চার্চের পোপ ও ধর্মীয় যাজকরা নিজেদের সুবিধামতো নীতি নির্ধারণ এবং সাধারণ মানুষের ওপর আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব (Spiritual Abusing) চালাতে শুরু করেছিলেন। সাধারণ মানুষ যখন এই রাজনৈতিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ফতোয়াবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে, তখন সেখানে জন্ম নেয় 'রেনেসাঁ' বা নবজাগরণ।
পরিণামে, চার্চের প্রতি ক্ষোভ একসময় ধর্মীয় আস্থার ওপর আঘাত হানে। ফলে আজকের আধুনিক ইউরোপে বিপুলসংখ্যক মানুষ কাগজ-কলমে খ্রিষ্টান হলেও ব্যবহারিক জীবনে ধর্ম থেকে অনেকাংশে বিচ্ছিন্ন।
ভাবনার খোরাক: জাতীয় সংকট কিংবা রাজনৈতিক দোলাচালে আলেমসমাজ যদি কেবল নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু বানায় আর সার্বিক অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে নীরব ভূমিকা পালন করে, তবে তা সাধারণ মানুষের মনে আলেমদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা বা একপক্ষীয় ফতোয়ার এই সংস্কৃতি দিনশেষে ইসলামি ভাবাবেগের জন্য মোটেই শুভকর কোনো বার্তা বহন করে না।
লিখেছেন , তোফায়েল ইসলাম
লেখক, ধর্ম-রাজনীতি বিশ্লেষক | সচেতন নাগরিক