Post

ডিজিটাল নিরাপত্তার চরম ঝুঁকি: দেশের প্রথম বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবলে বিগত স্বৈরাচারী বলয়ের থাবা

October 9, 2026

37 views

বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত এবং জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম সংবেদনশীল স্তম্ভ হলো সাবমেরিন ক্যাবল নেটওয়ার্ক। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)-এর একটি প্রকল্প থেকে বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনে ১৬ মিলিয়ন ডলার ঋণ আবেদন সংক্রান্ত বিষয় ঘিরে তুমুল চঞ্চলতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এই ঋণের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপের চাপ এবং প্রকল্পটির নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিবর্গের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশ পাওয়ার পর দেশের সচেতন মহলে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

‘মেটাকোর ডিজিটাল কানেক্টিভিটি প্রজেক্ট’ (এডিবি প্রকল্প নম্বর ৫৯৩৩৪-০০১)-এর অধীনে বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্যাবল সিস্টেম কনসোর্টিয়াম (বিপিসিএস) নামে ৩টি প্রতিষ্ঠানের একটি যৌথ দল এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। প্রায় ১৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ক্যাবল লাইনটি কক্সবাজারকে সিঙ্গাপুর ও মিয়ানমারের মূল ডাটা নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত করবে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে— জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত এই কৌশলগত অবকাঠামো পরিচালনার দায়িত্বে আসলে কারা রয়েছেন?

তিন প্রতিষ্ঠানের নেপথ্যে ক্ষমতার বলয়: কার হাতে দেশের ডিজিটাল চাবিকাঠি?

অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিটিআরসি কর্তৃক অনুমোদিত বিপিসিএস কনসোর্টিয়ামের তিনটি মূল প্রতিষ্ঠানের নেপথ্যেই ছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারক ও বিতর্কিত ব্যক্তিত্বদের সরাসরি ছায়া:

[বাংলাদেশি ডাটা ও জাতীয় নিরাপত্তা]
               │
               ▼
   [বিপিসিএস কনসোর্টিয়াম (৩ প্রতিষ্ঠান)]
   ├── ১. সামিট কমিউনিকেশনস (আওয়ামী প্রভাবশালী পরিবার ও সজীব ওয়াজেদ ঘনিষ্ঠতা)
   ├── ২. সিডিনেট কমিউনিকেশনস (সাজাপ্রাপ্ত পলাতক সাবেক মন্ত্রী ও চৌধুরী নাফিজ বলয়)
   └── ৩. মেটাকোর সাবকম (সাবেক রাষ্ট্রপতির সন্তান ও সাবেক এমপি)

১. সামিট কমিউনিকেশনস 📡

সামিট গ্রুপের পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন সাবেক আওয়ামী লীগ মন্ত্রী ফারুক খানের ছোট ভাই মুহাম্মদ ফরিদ খান, যিনি শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার হস্তান্তর ও রাজস্ব ফাঁকি নিয়ে বিতর্ক বহুদিনের। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সামিটের চেয়ারম্যানসহ বিটিআরসির সাবেক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ১০ কোটি ২৪ লাখ টাকার রাজস্ব ক্ষতির অভিযোগে মামলা দায়ের করার পর তড়িঘড়ি করে সেই অর্থ সরকারি কোষাঘারে জমা দেওয়া হয়।

২. সিডিনেট কমিউনিকেশনস 🔗

২০২২ সালে নিবন্ধিত এই প্রতিষ্ঠানটির প্রাথমিক শেয়ারধারীদের অন্যতম ছিলেন মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত। অনুসন্ধানী তথ্য অনুযায়ী, সিডিনেটের শেয়ারের প্রায় ৮০ শতাংশ কেনা হয়েছিল ক্ষমতাঘনিষ্ঠ বিতর্কিত ব্যবসায়ী চৌধুরী নাফিজ সরাফাতের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এবং বাকি ২০ শতাংশ কেনা হয়েছিল আরাফাত সংশ্লিষ্ট ওয়েবের মাধ্যমে। এই রাজনৈতিক সংযোগ কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠার মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় বিটিআরসি থেকে ক্যাবল নেটওয়ার্কের লাইসেন্স হাসিল করে তারা।

৩. মেটাকোর সাবকম 🌐

২০২২ সালে আত্মপ্রকাশ করা এই ক্যাবল কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে যুক্ত করা হয় কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের পুত্র রেজওয়ান আহমেদ তৌফিককে। অর্থাৎ কারিগরি যোগ্যতার চেয়ে দলীয় ও পরিবারতান্ত্রিক প্রভাবকেই এখানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

নীতিমালা নাকি রাজনৈতিক নির্দেশ? বিটিআরসির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

২০২০ সালের অক্টোবরে তৎকালীন টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিটিআরসির এক বৈঠকে সজীব ওয়াজেদ জয়ের প্রত্যক্ষ প্রেসক্রিপশনে বেসরকারি খাতে এই লাইসেন্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

প্রতিযোগিতা সৃষ্টির অজুহাতে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ শিথিলের কথা বলা হলেও আদতে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের অত্যন্ত ঘনিষ্ট ৩টি প্রতিষ্ঠানকে।

  • স্বচ্ছতার ঘাটতি: কী প্রক্রিয়ায় আবেদনকারী ৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে এই ৩টি সংস্থাকে বেছে নেওয়া হলো?

  • মূল্যায়ন প্রশ্নবিদ্ধ: কারিগরি ও আর্থিক সামর্থ্য, আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব কিংবা জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি মূল্যায়নে বিটিআরসি কোন মানদণ্ড ব্যবহার করেছিল?

আগামী দিনের করণীয় ও জরুরি পদক্ষেপ

জাতীয় সুরক্ষার খাতিরে এই ক্যাবল প্রকল্পকে কোনো বিশেষ দলের বা বিতর্কিত ব্যক্তির স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার হতে দেওয়া যায় না।

  • নথি জনসমক্ষে প্রকাশ: বিটিআরসি এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের উচিত অবিলম্বে এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের আবেদন মূল্যায়নপত্র, লাইসেন্স অনুমোদন কমিটির সুপারিশ এবং চূড়ান্ত মালিকানার বিস্তারিত তথ্য শ্বেতপত্র আকারে প্রকাশ করা।

  • জবাবদিহিতা ও আইনি সংস্কার: যদি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কিংবা জাতীয় নিরাপত্তাকে তোয়াক্কা না করে এই লাইসেন্স প্রদান করা হয়ে থাকে, তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

  • মালিকানা পুনর্গঠন: মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা দেশদ্রোহী রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের হাত থেকে কৌশলগত ডিজিটাল অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে এনে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও পেশাদার কর্তৃপক্ষের কাছে ন্যস্ত করতে হবে।

সাবমেরিন ক্যাবল নিছক ইন্টারনেট ব্যবসার কোনো উপায় নয়, এটি দেশের সার্বভৌমত্বের ডিজিটাল সীমান্ত। এই সীমান্তে কোনো চিহ্নিত অপরাধী বা রাজনৈতিক চক্রের পদচারণা সহ্য করা মানেই গোটা জাতির নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলা।

লিখেছেন , তোফায়েল ইসলাম

লেখক, ধর্ম-রাজনীতি বিশ্লেষক | সচেতন নাগরিক

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+40 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login