ওংবার পরিবার হলে এক সুখী ভূতের পরিবার। ওংবা পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য।ওরা প্রতিদিন বিকেলে সবাই একসঙ্গে খেতে বসত। খেতে খেতে আগের রাতে কে, কীভাবে মানুষকে ভয় দেখিয়েছে, সেই গল্প বলে।
ভূতেদের ডিউটি শুরু হতো সন্ধ্যায়, চলত সারারাত। ভোরে আজান হলে ডিউটি শেষ।
ওংবার পরিবার ভূত সমাজে বেশ নামকরা। তবে ইদানীং মানুষকে ভয় দেখানো কঠিন হয়ে উঠেছে। মানুষ অনেক চালাক হয়েছে। কেউ ভূত বিশ্বাসই করে না। আবার একই কায়দায় প্রতিদিন ভয় দেখালেও মানুষ আর ভয় পায় না।
তবু ওংবার পরিবার তাদের সুনাম ধরে রেখেছিল।
কিন্তু ওংবা ছোট বলে তাকে কখনো ভয় দেখানোর কাজে পাঠানো হতো না। কেউ তাকে সঙ্গে নিতও না।
একদিন খাবার শেষে সবাই কাজে বেরিয়ে গেল। ওংবার দাদু অসুস্থ বলে বাড়িতেই রইল।
ওংবা দাদুর কাছে গিয়ে বলল, — দাদু, মানুষ কেমন প্রাণী? আমি কি ওদের ভয় দেখাতে পারব?
দাদু বলল, মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে চালাক প্রাণী। ওরা অনেক ভূতকে বোতলে ভরে মাটির নিচে পুঁতে রাখে।
ওংবার মুখ শুকিয়ে গেল।
দাদু বলল, — ভয় পেয়ো না। তোমার বড় মামা গোংলাকে এক মানুষ বোতলে ভরে রেখেছিল। তবে সে ছিল বদমেজাজি আর বোকা। তাই ধরা পড়েছিল। তুমি তো তার মতো বোকা নও।
ওংবা সঙ্গে সঙ্গে সাহস ফিরে পেয়ে বললো-
দাদু, একদিন তোমার সঙ্গে আমাকে নেবে? আমি শুধু দেখব, তুমি কীভাবে মানুষকে ভয় দেখাও।
দাদু রাজি হয়ে গেল।
পরদিন রাত দশটা। কবরস্থানের পাশে বড় তাল গাছের মাথায় ওংবা ও তার দাদু অপেক্ষা করছে। পাশের রাস্তা দিয়ে কারা যেন আসছে।
ওংবা দেখলো তিনজন ছোটো মানুষ।
এরা আসলে তিন বন্ধু-রাজু,মামুন ও মেহেদ। তারা স্কুল হোস্টেল থেকে পড়াশোনা করে।রাতে বাসায় এসে ঘুমোয়।
ওংবা ফিসফিস করে বলল, — দাদু, তুমি কি ওদের ভয় দেখাবে?
— না। ওরা ছোট,সবে হাইস্কুলে উঠলো। আমি ছোটদের ভয় দেখাই না। বড় কেউ এলে দেখাব।
ওংবা হতাশ হয়ে বসে রইল।
হঠাৎ তিন বন্ধুর একজন বলল, এখন যদি ওই গাছ থেকে একটা ভূত নেমে আসে?
অন্যজন টর্চ তুলে বলল, এই টর্চ দিয়ে কষে একটা মারব!
আরেকজন বলল, আমি ব্যাগ ছুড়ে মারব!
এ কথা শুনে ওংবা ভয়ে দাদুর পকেটে ঢুকে পড়ল।
দাদু বলল, ভূত হয়ে মানুষকে ভয় পাচ্ছিস?
— ওরা যে মারবে বলল!
— ওরা তোকে ধরতেই পারবে না। চল, আজ তোকে ভয় দেখানো শেখাই।
ওংবার সাহস হচ্ছিল না। কিন্তু দাদু বলল, ভয় দেখানোর আগে নিজের ভয়কে জয় করতে হয়।
কথাটা ওংবার মনে ধরল।
সে ধীরে ধীরে গাছের আড়ালে গিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, কে... কে ওখানে?
তিন বন্ধু থেমে গেল।
মেহেদী বলল, কে?
ওংবা বলল, আমি... এই গাছের ভূত!
মামুন বলল, ভূত হলে সামনে আয়!
ওংবার বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
তবু সাহস করে বললো, সামনে এলে তোরা ভয়ে মূর্ছা যাবি!
রাজু হেসে বলল,এই ভূত দেখি বেশ ভদ্র!
মেহেদী বলল, তাহলে একটু ভয় দেখান তো!
ওংবা চোখ বন্ধ করে গাছ এমনভাবে ঝাঁকানো শুরু করলো-
ঝপাং করে কয়েকটি পাকা তাল পড়লো।
মেহেদী তার হাতের টর্চলাইট ফেলে দিলো।রাজু চিৎকার করে বললো,
ও মাগো,আমি মরে গেছি গো,কবর খুঁড়ে আমায় কবর দিয়ে দাও ?
ওংবা গলা ভারী করে ভয়ংকর আওয়াজে হাসতে চাইলো।
কিন্তু ভয়ংকর হাসির বদলে বেরিয়ে এল, হা... হা... হাঁচু!
মামুন, হাসি শুনে বুঝলো ও পিচ্চি ভূত।ভয় পাওয়া চলবে না।অবশ্য বড়ো ভূতকেও মামুন ভয় পায় না।সে রাজুকে,ধমক দিয়ে বললো,তুই ভয়ে আবোল তাবোল বকছিস কেন?
তুইতো বেঁচে আছিস,শুনলি না? এটা একটা পিচ্চি ভূতের হাসি ছিলো।মেহেদী ততোক্ষণে তার টর্চ কুড়িয়ে নিলো।
এসব দেখে ওংবার মন খারাপ হয়ে গেল।দাদু সবই দেখলো।
ওংবা বলল- মামুন, তুমি ভয় পাও না কেন?
মামুন বলল,ভূতকে ভয় পাবার কী আছে? আমার মা বলেন, বোকারাই কেবল ভূতকে ভয় পায়।আমিতে বোকা না।
রাজু বলল, তুমি সত্যিই ভূত?কী নাম তোমার?
ওংবা গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল।
— হ্যাঁ। আমার নাম ওংবা।
মামুন বলল, তুমি যেহেতু আমাদের বয়সী, চলো তবে তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করি।
ওংবা অবাক হয়ে গেল। মানুষগুলো তাকে ভয় না পেয়ে বন্ধু হতে চেয়েছে।ওংবা লজ্জায় আর এগোলো না। দাদুর সঙ্গে বাড়ি ফিরল।
পরদিন বিকেলে ওংবার পরিবার যখন খেতে বসলো,সে বলল,
গতরাতে আমি তিনজন মানুষকে ভয় দেখিয়েছি।
সবাই অবাক।
— সত্যি?
ওংবা হেসে বলল, ওরা প্রথমে একটু ভয় পেলেও কিছুক্ষণ পর আর ভয় পায়নি।আর আমিও..
দাদু বললো, তুমিও প্রথমে ওদের ভয় পেয়েছো। পরে আর পাওনি।
ওংবা যেন লজ্জা পেল।দাদু বললো, মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করতে লজ্জা নেই। তবে মানুষ থেকে সাবধান থাকা ভালো।
ওংবা খুব খুশি হলো।
ওংবার বাবা-মা বললো, আমরা কেবল বোকাদের ভয় দেখাই। তুমি বড়ো হলে,মানুষ সম্পর্কে অনেক কিছু জানবে।ওংবা ছোটো হলেও এটা বুঝে গেছে -
আসল ভূত সে নয়।
আসল ভূত হলো মানুষের মনের ভয়।
~রাসেল হোসেন