পদ্মার চরের ছোট্ট গ্রাম সোনাডাঙ্গা। সেখানে রহিমা বুড়ি সকালে উঠে উঠোন নিকোয়, হাঁসের ডিম গোনে, আর বিকেলে আমগাছের তলায় বসে পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। পথটা শহরের দিকে গেছে।
তার ছেলে করিম ঢাকায় রিকশা চালায়। প্রতি মাসের পাঁচ তারিখে মনিঅর্ডার আসে, সঙ্গে আসে না কোনো চিঠি। রহিমা পড়তে জানে না, তবু প্রতিবার পোস্টমাস্টার কাশেম মিয়াকে বলে, "বাবা, ফরমের পেছনে কিছু লেখা আছে কি না একটু দেখো তো।"
কাশেম মিয়া মাথা নাড়ে। সে জানে, মনিঅর্ডারের পেছনে কিছু লেখা থাকে না।
এবার বর্ষায় ঘরের চাল ফুটো হলো। পড়শিরা বলল, "টাকা তো আসছেই, চাল ছাওয়াচ্ছ না কেন?" রহিমা হেসে বলল, "ও টাকা জমানো আছে, করিমের বিয়ের জন্য।" আসলে সে একটা পয়সাও খরচ করেনি। টিনের কৌটোয় সব রেখে দিয়েছে, যেন ছেলে ফিরে এসে দেখে মা তার কষ্টের টাকা ছোঁয়নি।
আশ্বিনের এক ভোরে কাশেম মিয়া দৌড়ে এল। হাতে একটা খাম, ঢাকার ঠিকানা। সে কাঁপা গলায় পড়ল: "মা, আমি ভালো আছি। লজ্জায় আসতে পারি না। এ মাসে আর টাকা পাঠাতে পারব না, কাজটা গেছে।"
রহিমা অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর টিনের কৌটোটা খুলে সব টাকা কাশেমের হাতে দিয়ে বলল, "এগুলো ওকে ফেরত পাঠিয়ে দাও। আর লিখে দাও, মায়ের কাছে আসতে কোনো টাকা লাগে না।"
কাশেম মিয়া সেদিন খামের পেছনে কিছু একটা লিখল।
পরদিন থেকে রহিমা আর আমগাছের তলায় বসে না। সে উঠোনে বসে থাকে, ঠিক ঘরের দরজার সামনে। কারণ সে জানে, যে ছেলে পথ ভুলে যায়, সে একদিন দরজাই খুঁজে নেয়।
কিন্তু গ্রামের লোকেরা আজও একটা কথা ভেবে পায় না: সেদিন কাশেম মিয়া খামের পেছনে ঠিক কী লিখেছিল? আর কেনই বা সেই মনিঅর্ডার ফরমটা সে কাউকে আজও দেখায়নি?
সমাপ্ত