জীবনের শেষ দিনটি বড় অদ্ভুত। সেদিন মানুষ আর কিছু অর্জন করতে চায় না, শুধু ফিরে তাকাতে চায়। আর তাকিয়ে সে দেখে, যা নিয়ে সারা জীবন দৌড়েছে সেগুলো ঝাপসা হয়ে গেছে, আর যেগুলো গুরুত্ব দেয়নি, সেগুলোই স্পষ্ট হয়ে জেগে আছে।
সবচেয়ে বেশি আফসোস হবে সেই সকালগুলোর জন্য, যেগুলো আমি তাড়াহুড়োয় কাটিয়েছি। চায়ের কাপ হাতে জানালার পাশে বসে সূর্য ওঠা দেখার সময় আমার ছিল না। মা যখন ভাত মেখে মুখে তুলে দিতে চাইতেন, আমি বলেছি, "দেরি হয়ে যাচ্ছে।" আজ বুঝি, সেই দেরিটা কোথাও পৌঁছায়নি, কিন্তু সেই ভাতের স্বাদ চিরতরে হারিয়ে গেছে।
আমি মানুষের সঙ্গে ছিলাম, কিন্তু তাদের সঙ্গে থাকিনি। পরিবারের সঙ্গে খেতে বসেও মন পড়ে থাকত ফোনের পর্দায়। বন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়েছি "পরে কথা হবে" বলে, আর সেই "পরে" কখনো আসেনি। সন্তানের প্রথম হাঁটা দেখিনি, কারণ অফিসে মিটিং ছিল। অথচ সেই মিটিংয়ের একটি কথাও আজ মনে নেই। মানুষ ভাবে সময় অফুরন্ত, তাই ভালোবাসাকে সে তুলে রাখে ভবিষ্যতের জন্য। কিন্তু ভালোবাসা তুলে রাখলে বাসি হয় না, হারিয়ে যায়।
বৃষ্টির দিনে ভিজতে ইচ্ছে করত, কিন্তু ভেবেছি লোকে কী বলবে। জোছনা রাতে ছাদে শুয়ে থাকার সাধ ছিল, কিন্তু ঘুম দরকার ছিল কাল সকালের কাজের জন্য। এভাবে আমি নিজের ছোট ছোট আনন্দগুলোকে প্রতিদিন একটু একটু করে গলা টিপে মেরেছি। আমি নিজের সঙ্গেই কখনো ঠিকভাবে বসিনি, জিজ্ঞেস করিনি, "তুমি আসলে কী চাও?"
আমি পদ চেয়েছি, প্রতিপত্তি চেয়েছি, ব্যাংকের হিসাবে সংখ্যা বাড়াতে চেয়েছি। কিছু পেয়েছিও। কিন্তু শেষ দিনে এসে দেখি, কোনো সংখ্যাই আমার হাত ধরে বসে নেই। যে হাতটি ধরে আছে, সেটি তার, যাকে আমি সবচেয়ে কম সময় দিয়েছি। এই উপলব্ধি যেমন মধুর, তেমনি নির্মম।
কারও কাছে ক্ষমা চাইনি, অভিমান বুকে পুষে রেখেছি বছরের পর বছর। ভেবেছি, আগে ওকে বলতে দিই। অহংকার জিতেছে, সম্পর্ক হেরেছে। আজ সেই অভিমানের কোনো কারণ মনে নেই, শুধু মনে আছে একজন মানুষ, যে আর ফিরবে না।
জীবন আমাকে অনেক কিছু দিয়েছিল, আমি শুধু গ্রহণ করতে শিখিনি। সে প্রতিদিন নতুন সকাল পাঠিয়েছে, আমি সেগুলো খুলে দেখিনি। সে সম্পর্কের উপহার দিয়েছে, আমি মোড়ক খুলতে ভুলে গেছি।
আজ এই শেষ বিকেলে আমি আর কিছু চাই না। শুধু আরেকটি সকাল, যেখানে মায়ের হাতে ভাত খাব, সন্তানের হাত ধরে হাঁটব, আর বৃষ্টিতে ভিজব মন ভরে। কিন্তু জীবন সুযোগ দেয় একবারই।