৮ অক্টোবর সুইডিশ একাডেমি ঘোষণা করে যে ২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পাচ্ছেন কানাডার লেখক অ্যান কার্সন, যিনি এই সম্মান পাওয়া দ্বিতীয় কানাডীয় লেখক। একাডেমির মূল্যায়নে তাঁর সাহিত্যকর্ম সাহসী ও উদ্ভাবনী। ধ্রুপদী ঐতিহ্যের সঙ্গে কৌতুকময় সংলাপের মধ্য দিয়ে তিনি সমকালীন সাহিত্যের জন্য নতুন আঙ্গিক গড়েছেন। পুরস্কারের অর্থমূল্য ১২ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা।
১৯৫০ সালে টরন্টোয় জন্ম নেওয়া কার্সন মূলত ইংরেজিতে লেখেন। কবিতা, অনুবাদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা তিনি সারা জীবন একসঙ্গে চালিয়েছেন। তাঁর প্রায় সব লেখার কেন্দ্রে আছে ভাষাতাত্ত্বিকের শব্দ-মোহ আর কবির নতুন অর্থের তৃষ্ণা। শব্দের উৎপত্তিই তাঁর সব কাজের সূচনাবিন্দু বলে তিনি নিজেই জানিয়েছেন।
তাঁর সবচেয়ে পরিচিত বই Autobiography of Red (১৯৯৮)। এটি একটি ভার্স নভেল, আর ২০০১ সালের The Beauty of the Husband তাঁর আরেক প্রধান কাজ, যার উপশিরোনাম "২৯টি তাঙ্গোয় একটি কাল্পনিক প্রবন্ধ"। প্রথমটিতে তিনি গ্রিক পুরাণের দানব গেরিয়নকে আধুনিক সমকামী কিশোরের আত্মপরিচয়ের রূপক বানিয়েছেন।
Nox (২০১০) বইটি আকোর্ডিয়নের মতো ভাঁজ করা এক দীর্ঘ কাগজের স্ক্রল, যেখানে মৃত ভাইয়ের স্মৃতি কোলাজ, অনুবাদ আর শব্দের ব্যুৎপত্তির মধ্য দিয়ে ফিরে আসে। এখানে বইয়ের শরীরটাই শোকের অংশ হয়ে ওঠে। Eros the Bittersweet (১৯৮৬) প্রেমের ধারণাকে সাফো ও প্রাচীন গ্রিক কবিদের মধ্য দিয়ে বিশ্লেষণ করে। সেখানে প্রবন্ধ আর কবিতার সীমারেখা প্রায় মুছে যায়।
২০২৫ সালে পুরস্কার পেয়েছিলেন হাঙ্গেরির লাসলো ক্রাসনাহোরকাই, সুসান সন্ট্যাগ যাঁকে "মহাপ্রলয়ের ওস্তাদ" বলেছিলেন। ক্রাসনাহোরকাইয়ের দীর্ঘ, বিরতিহীন বাক্য আর অবক্ষয়ের দর্শনের পর এবার একাডেমি গিয়েছে প্রায় উল্টো দিকে। কার্সনের লেখা খণ্ডিত, খেলাচ্ছলে গড়া, আর পাণ্ডিত্য ও রসিকতা সেখানে পাশাপাশি চলে।
নোবেলের বিচার আসলে একটি তুলনারই খেলা। বর্তমান সময়ের কয়েকজন বড় লেখক এখনো এই স্বীকৃতির বাইরে।
মার্গারেট অ্যাটউড: কার্সনের স্বদেশী। The Handmaid’s Tale (১৯৮৫) ও The Testaments (২০১৯) এ সময়ের রাজনৈতিক কল্পকাহিনির মানদণ্ড, আর পাঠকসংখ্যায় তিনি কার্সনের চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে। কিন্তু কার্সন ভাষা ও আঙ্গিক নিয়ে যে ঝুঁকি নেন, অ্যাটউডের গদ্য সেই ঝুঁকিতে যায় না। একাডেমি এবার জনপ্রিয়তার চেয়ে নিরীক্ষাকে প্রাধান্য দিয়েছে বলেই মনে হয়।
হারুকি মুরাকামি: তিনি বৈশ্বিক পাঠকের কাছে অত্যন্ত প্রিয়, কিন্তু তাঁর সমালোচনা হয় পুনরাবৃত্তিমূলক মোটিফ আর অতি-সরল গদ্যের জন্য। কার্সনের তুলনায় তাঁর বইগুলো সহজপাঠ্য, আর সেটাই তাঁর শক্তি ও সীমা দুই-ই।
কান জুয়ে: চীনা পরাবাস্তববাদী এই লেখকের গদ্য কার্সনের মতোই আঙ্গিক-ভাঙা। কিন্তু অনুবাদের সীমিত প্রসার ও রাজনৈতিক-ভৌগোলিক কারণে তিনি বিশ্বমঞ্চে কম আলোচিত।
আদোনিস: সিরীয়-লেবাননি এই আরবি কবি ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সংলাপ নিয়ে কাজ করেছেন, ঠিক যে বিষয়ে কার্সনের পুরস্কারের উদ্ধৃতি জোর দেয়। দীর্ঘদিন নোবেলের আলোচনায় থাকা সত্ত্বেও তিনি পাননি। তাঁকে ছাড়িয়ে কার্সনের এগিয়ে যাওয়া প্রমাণ করে, ইংরেজি ভাষার সুবিধা এখনো কত বড় ফ্যাক্টর।
কার্সনের পক্ষে যেমন যুক্তি আছে, তেমনি প্রশ্নও আছে। তাঁর লেখা প্রায়ই ধ্রুপদী শিক্ষায় শিক্ষিত পাঠক ধরে নেয়। এতে লেখার গভীরতা বাড়ে, কিন্তু পাঠকগোষ্ঠী সংকীর্ণ হয়। আবার নোবেল তালিকায় ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার প্রাধান্য আবার প্রমাণিত হলো।
আরেকজন ইংরেজিভাষী কবি পুরস্কার পাওয়ায় আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া ও আরবি জগতের লেখকদের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হলো। এই সমালোচনা কার্সনের প্রতিভাকে খাটো করে না, তবে পুরস্কার-ব্যবস্থার ভারসাম্যহীনতার দিকে আঙুল তোলে।
বাংলা ভাষার একমাত্র সাহিত্য নোবেল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৯১৩), যিনি অবিভক্ত বাংলার মানুষ। বাংলাদেশের স্বাধীন ভূখণ্ডের কোনো লেখক এখনো এই পথে পৌঁছাননি। এর কারণগুলো সাহিত্যিক ও কাঠামোগত দুই ধরনেরই। কারণগুলো নিয়ে এবার একটু আলোচনা করি-
অনুবাদের সংকট: এটিই সবচেয়ে বড় বাধা। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লালসালু, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা ও চিলেকোঠার সেপাই, হাসান আজিজুল হকের গল্প, শামসুর রাহমানের কবিতা মৌলিক শক্তিতে বিশ্বমানের। কিন্তু ইংরেজিতে এগুলোর মানসম্পন্ন, ধারাবাহিক অনুবাদ খুবই কম। ইলিয়াসের ভাষা আঞ্চলিক শব্দ ও ব্যঙ্গে ঠাসা, তাই অনুবাদ কঠিন, আর অনুবাদ ছাড়া নোবেল কমিটির কাছে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব।
প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাব: কোরিয়া সাহিত্য অনুবাদ ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে নিয়মিত অনুবাদক তৈরি ও অর্থায়ন করে, আর ২০২৪ সালে হান কাং-এর নোবেলপ্রাপ্তি সেই কাঠামোর ফল হিসেবেও পড়া যায়। বাংলাদেশে বাংলা একাডেমি বা অন্য সংস্থার এমন পরিকল্পিত অনুবাদ-কূটনীতি নেই বললেই চলে। ভারতের ভাষাগুলোর ক্ষেত্রেও দেখা যায়, গীতাঞ্জলি শ্রী (২০২২, হিন্দি) ও বানু মুশতাক (২০২৫, কন্নড়) আন্তর্জাতিক বুকার পেয়েছেন মূলত সফল অনুবাদের জোরে।
বাজার ও পাঠকসংস্কৃতি: আমাদের বইমেলা-কেন্দ্রিক প্রকাশনা মৌসুমি, সম্পাদনা ও এজেন্সি-ব্যবস্থা দুর্বল। আন্তর্জাতিক প্রকাশকদের কাছে বাংলাদেশি লেখকের বই পৌঁছানোর কোনো সুসংগঠিত পথ নেই।
রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ: লেখকের স্বাধীনতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন ওঠে। তসলিমা নাসরিনের নির্বাসন বা ব্লগার হত্যার ঘটনা সৃজনশীল পরিবেশের ওপর ভয়ের ছায়া ফেলেছে, আর সেই পরিবেশে সাহসী সাহিত্য জন্মানো কঠিন।
একাত্তর, ভাষা আন্দোলন, নদীভাঙন ও জলবায়ু সংকটের মতো অনন্য অভিজ্ঞতা আমাদের হাতে আছে, যা বিশ্বসাহিত্যে কম বলা হয়েছে। কার্সনের মতো আমাদের লেখকেরাও নিজেদের ঐতিহ্যের, অর্থাৎ পুঁথি, মঙ্গলকাব্য ও বাউল দর্শনের সঙ্গে আধুনিক আঙ্গিকের সংলাপ গড়তে পারেন।
কার্সনের নোবেল আমাদের একটি শিক্ষা দেয় তা হলো- নিজের ঐতিহ্যকে গভীরভাবে চিনে তাকে নতুন রূপে সাজালেই সাহিত্য বিশ্বজনীন হয়। বাংলাদেশের নোবেলের পথ একজন প্রতিভার অপেক্ষায় যতটা, তার চেয়ে বেশি অপেক্ষায় অনুবাদক, প্রকাশক ও নীতিনির্ধারকদের নীরব সমন্বয়ের। যেদিন আমরা আমাদের শ্রেষ্ঠ বইগুলো বিশ্বের পাঠকের হাতে পৌঁছে দিতে পারব, সেদিন নোবেল হয়তো আর স্বপ্ন থাকবে না, একেবারে হাতে এসে পৌঁছাবে।
সমাপ্ত