Essay

সমাজের অর্ধাঙ্গিনীদের সম্মান করুণা নয়, প্রাপ্য

October 13, 2026

100 views

বেগম রোকেয়া প্রায় এক শতাব্দী আগে প্রশ্ন তুলেছিলেন, আমরা সমাজের অর্ধাঙ্গ; আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কিরূপে? এক পায়ে ভর করে কোনো মানুষ যেমন বেশিদূর হাঁটতে পারে না, তেমনি অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে পেছনে ফেলে কোনো জাতিও এগোতে পারে না। এই প্রশ্নের উত্তর আজও আমরা পুরোপুরি দিতে পারিনি।

বাংলাদেশ এক বিচিত্র বৈপরীত্যের দেশ। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের সরকারপ্রধান ও বিরোধীদলীয় নেতার পদে নারীরা ছিলেন। অথচ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৫ সালের জরিপ বলছে, বিবাহিত নারীদের প্রায় ৭৩ শতাংশ জীবনে অন্তত একবার স্বামীর হাতে কোনো না কোনো ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

শীর্ষ পদে একজন নারীর উপস্থিতি আর প্রতিটি নারীর ক্ষমতায়ন তাই এক বিষয় নয়। নারী অধিকারের প্রশ্নটি তাই কেবল সংসদ বা সচিবালয়ের নয়; এর শুরু রান্নাঘর থেকে, শেষ জাতিসংঘের মঞ্চে।

মানুষ প্রথম ক্ষমতার হিসাব শেখে পরিবারে। কে সিদ্ধান্ত নেবে, কে সেবা দেবে, কে খাবে আগে, কে পড়বে বেশি, এই পাঠ সে পায় ঘর থেকেই। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হিসাবে বিশ্বজুড়ে অবৈতনিক গৃহস্থালি ও পরিচর্যা কাজের প্রায় ৭৬ শতাংশ নারী করেন। রান্না, সন্তান লালন, বৃদ্ধ-অসুস্থের সেবা, এসব শ্রম জাতীয় আয়ের হিসাবে ধরা হয় না, তাই নীতিনির্ধারণেও এর দাম নেই। যে কাজের মজুরি নেই, সমাজ তাকে কাজ বলেই স্বীকার করে না। অথচ এই অদৃশ্য শ্রমের ওপর ভর করেই বাকি অর্থনীতি চলে।

পারিবারিক পরিসরের বৈষম্য আরও গভীর। বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার দক্ষিণ এশিয়ায়ই শুধু নয়, বিশ্বেও সর্বোচ্চগুলোর একটি। ইউনিসেফের তথ্যমতে, দেশের প্রায় অর্ধেক মেয়ের বিয়ে হয় আঠারো বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। এর অর্থ শুধু একটি অসমাপ্ত স্কুলজীবন নয়; কম বয়সে মাতৃত্ব, অপুষ্টি, মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে দারিদ্র্যের পুনরাবৃত্তিও।

যৌতুক নিষিদ্ধ করে আইন হয়েছে সেই ১৯৮০ সালে, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন হয়েছে ২০১০ সালে। কিন্তু ঘরের ভেতরের নির্যাতন ‘পারিবারিক বিষয়’ বলে চাপা থেকে যায়, কারণ আইনের দরজায় পৌঁছানোর আগেই লোকলজ্জা আর অর্থনৈতিক নির্ভরতার দেয়াল সামনে দাঁড়ায়।

উত্তরাধিকারের প্রশ্নটিও এড়ানো যায় না। সম্পত্তির মালিকানা নারীর দর-কষাকষির সক্ষমতার ভিত্তি। যে নারীর নিজের নামে জমি বা সম্পদ নেই, তার পক্ষে অপমানজনক সম্পর্ক ছেড়ে বেরিয়ে আসা কঠিন। পারিবারিক আইনের এই জায়গায় সংস্কারের আলোচনা প্রায়ই ধর্মীয় আবেগের আড়ালে হারিয়ে যায়। অথচ বিষয়টি মূলত ন্যায্যতা ও নিরাপত্তার। একটি পরিবার তখনই সুস্থ, যখন সেখানে প্রত্যেক সদস্যের কণ্ঠস্বর শোনা হয়।

নারীদের সামাজিক চিত্রে আশা ও হতাশার মিশ্রণ রয়েছে। শিক্ষায় বাংলাদেশের অর্জন প্রশংসনীয়। উপবৃত্তি কর্মসূচির সুবাদে মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের ভর্তির হার ছেলেদের ছাড়িয়ে গেছে, যা অনেক উন্নত দেশের জন্যও ঈর্ষণীয়।

ক্ষুদ্রঋণ আন্দোলনে নারীরা হয়ে উঠেছেন প্রধান ঋণগ্রহীতা ও উদ্যোক্তা। তৈরি পোশাক খাতের প্রায় চল্লিশ লাখ শ্রমিকের বড় অংশই নারী, আর এই নারীদের উপার্জনই দেশের রপ্তানি আয়ের মেরুদণ্ড। ঘরের আঙিনা থেকে কারখানার সারিতে এই যাত্রা নীরব এক সামাজিক বিপ্লব।

কিন্তু অর্জনের পাশেই রয়েছে অসম্পূর্ণতার ছায়া। শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ প্রায় ৪৩ শতাংশ, পুরুষের ক্ষেত্রে তা ৮০ শতাংশের কাছাকাছি। শিক্ষিত হয়েও অনেক মেয়ে চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না, কেউ প্রবেশ করলেও মাঝপথে ঝরে পড়ছে।

কারণগুলো আমাদের অজানা নয়: নিরাপদ গণপরিবহনের অভাব, কর্মস্থলে হয়রানি, শিশুদিবাযত্ন কেন্দ্রের অপ্রতুলতা, আর সংসার ও চাকরি একসঙ্গে সামলানোর অসম বোঝা। ২০০৯ সালে হাইকোর্ট যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নির্দেশনা দিয়েছিলেন, কিন্তু এত বছরেও এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ আইন নেই। অনলাইন জগতে নারীর বিরুদ্ধে চরিত্রহনন ও সাইবার সহিংসতা নতুন মাত্রায় বাড়ছে।

সবচেয়ে বড় বাধা সম্ভবত মনস্তাত্ত্বিক। নির্যাতনের শিকার নারীকেই দোষারোপ করার সংস্কৃতি, ‘লোকে কী বলবে’র ভয়, আর নারীর সাফল্যকে ‘ব্যতিক্রম’ ভেবে নেওয়ার অভ্যাস আমাদের সমাজে গভীরে গাঁথা। ধর্ম ও ঐতিহ্যের নামে নারীর চলাফেরা, পোশাক বা পেশা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও ঘুরেফিরে আসে।

অথচ ইতিহাস সাক্ষী, এ ভূখণ্ডের নারীরা কখনো নিছক দর্শক ছিলেন না। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার থেকে সুফিয়া কামাল, ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, আর সাম্প্রতিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নারী শিক্ষার্থীদের সম্মুখসারির ভূমিকা, প্রতিটি বাঁকে নারী ছিলেন ইতিহাসের কর্তা।

সংবিধানের ২৮(২) অনুচ্ছেদে বলা আছে, রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষ সমান অধিকার লাভ করবেন। এই সাংবিধানিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে স্থানীয় সরকারে নারীর জন্য সংরক্ষিত আসনে ১৯৯৭ সাল থেকে সরাসরি ভোট শুরু হয়েছে, যা তৃণমূলে হাজার হাজার নারীকে নেতৃত্বে এনেছে। সংসদে সংরক্ষিত আসন এখন ৫০টি। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (২০০০), জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি, জেন্ডার-সংবেদনশীল বাজেট বিশ্লেষণ, এসবও অগ্রগতির দলিল।

তবু কাগজের অধিকার আর বাস্তবের অধিকারের মাঝখানে ফাঁক রয়ে গেছে। সংরক্ষিত আসন ছাড়া সরাসরি নির্বাচনে সংসদে নারীর সংখ্যা মোট আসনের এক-দশমাংশেরও কম। রাজনৈতিক দলগুলোকে সব স্তরের কমিটিতে এক-তৃতীয়াংশ নারী রাখার যে বিধান নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন-বিধিতে ছিল, তার লক্ষ্যমাত্রা কার্যত পূরণ হয়নি। সংরক্ষিত আসনও অনেক ক্ষেত্রে নারীর স্বাধীন নেতৃত্ব গড়ার বদলে দলীয় অনুগ্রহের বিতরণ হয়ে দাঁড়ায়, এই সমালোচনা উপেক্ষা করার মতো নয়।

ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ধর্ষণ ও নির্যাতনের মামলায় দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংরক্ষণের দুর্বলতা, থানায় অসংবেদনশীল আচরণ ও চিকিৎসা পরীক্ষার জটিলতার কারণে সাজার হার অত্যন্ত কম। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীকে সাহস জোগায়, আর ভুক্তভোগীকে করে তোলে নিশ্চুপ।

নারী অধিকারের প্রশ্ন বাংলাদেশের একার নয়। ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘ একটি প্রস্তাবে শান্তি ও নিরাপত্তা আলোচনায় নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানায়, আর টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের পঞ্চম লক্ষ্যই লিঙ্গসমতা। কিন্তু ঘোষণা আর বাস্তবায়নের দূরত্ব এখনো বিশাল।

বিশ্বব্যাংকের ‘উইমেন, বিজনেস অ্যান্ড দ্য ল’ ২০২৪ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে নারীরা আইনিভাবে পুরুষের প্রাপ্য অধিকারের মাত্র প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোগ করেন। আন্তঃসংসদীয় ইউনিয়নের হিসাবে বিশ্বের সংসদগুলোতে নারী সদস্য প্রায় ২৭ শতাংশ। ত্রিশটিরও কম দেশে সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধান নারী। আবার উল্টো উদাহরণও আছে। রুয়ান্ডার সংসদে নারীরা ৬০ শতাংশের বেশি আসনে, যে দেশ গণহত্যার ক্ষত থেকে উঠে নারীর নেতৃত্বকে পুনর্গঠনের শক্তিতে পরিণত করেছে।

পশ্চাৎগামিতার দৃষ্টান্তও আমাদের চোখের সামনে। ২০২১ সালে ক্ষমতা দখলের পর আফগানিস্তানে তালেবান মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা ও বহু পেশা নিষিদ্ধ করেছে। ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর ইরানের নারীরা ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ স্লোগানে রাস্তায় নেমেছেন। এগুলো মনে করিয়ে দেয়, নারীর অধিকার একবার অর্জিত হলেই স্থায়ী নয়; একে প্রতিনিয়ত রক্ষা করতে হয়।

অর্থনীতির যুক্তিও এখানে অকাট্য। কর্মক্ষেত্রে ও সমাজে নারী-পুরুষের সমতা এগিয়ে নিলে বিশ্ব অর্থনীতিতে লক্ষ কোটি ডলার যুক্ত হতে পারে। অর্থাৎ নারীর ক্ষমতায়ন কোনো দানশীলতা নয়; এটি সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগগুলোর একটি।

নারী অধিকারের আলোচনায় একটি প্রচলিত আপত্তি হলো, এতে নাকি পুরুষের অধিকার খর্ব হয় কিংবা পরিবারের বন্ধন নষ্ট হয়। এই ধারণা তথ্যের চেয়ে ভয়ের ওপর দাঁড়ানো। যে পরিবারে নারী সম্মানিত ও আর্থিকভাবে সক্ষম, সেখানে শিশুর পুষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ভালো থাকে, সংসারে আয়ের উৎস বাড়ে, আর পুরুষও একক উপার্জনকারীর চাপ থেকে মুক্তি পায়।

বৈষম্যের বোঝা শুধু নারীকে নয়, পুরুষকেও কাঁদায়। তাকে শেখানো হয় আবেগ লুকাতে, কর্তৃত্ব দেখাতে, আর অসমতাকেই স্বাভাবিক ভাবতে। নারী-পুরুষের সম্পর্ক প্রতিযোগিতার নয়, অংশীদারির। নারীর অগ্রগতির জন্য আবেগের চেয়ে বেশি দরকার সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ।

প্রথমত, আইনের বাস্তবায়ন- নতুন আইনের চেয়ে বেশি জরুরি বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ। থানায় নারী পুলিশ সদস্য ও ভিকটিম সাপোর্ট ইউনিট বাড়ানো, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালকে কার্যকর করা এবং যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, অবৈতনিক শ্রমের স্বীকৃতি- গৃহস্থালি কাজের অর্থনৈতিক মূল্য জাতীয় হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা, কর্মক্ষেত্রে ও শিল্পাঞ্চলে শিশুযত্ন কেন্দ্র বাধ্যতামূলক করা এবং বাবাদের জন্য পিতৃত্বকালীন ছুটির সুযোগ বাড়ানো দরকার, যাতে পরিচর্যা শুধু মায়ের দায় না থাকে।

তৃতীয়ত, নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ- নিরাপদ গণপরিবহন, নারী উদ্যোক্তার জন্য জামানতবিহীন ঋণ ও ডিজিটাল প্রশিক্ষণ, আর কর্মজীবী মায়ের জন্য নমনীয় কর্মসময় নারীর শ্রমবাজারে ফেরা ও টিকে থাকার পথ প্রশস্ত করবে।

চতুর্থত, রাজনৈতিক নেতৃত্বে প্রকৃত অংশগ্রহণ- দলগুলোকে সরাসরি নির্বাচনে অধিক নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিতে হবে, আর সংরক্ষিত আসনের নির্বাচনপদ্ধতি নিয়ে সংলাপের মাধ্যমে নারীর স্বাধীন প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।

পঞ্চমত, মানসিকতার পরিবর্তন- পাঠ্যপুস্তক, গণমাধ্যম ও ধর্মীয় আলোচনায় সমতা ও পারস্পরিক সম্মানের বার্তা জোরদার করতে হবে। ছেলেদের শৈশব থেকেই শেখাতে হবে, নারীর সম্মান করুণা নয়, প্রাপ্য।

বেগম রোকেয়া শুধু প্রশ্ন তোলেননি; পথও দেখিয়েছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, শিক্ষা ও আত্মমর্যাদাই নারীর মুক্তির ভিত্তি। আজ আমাদের হাতে তাঁর চেয়ে অনেক বেশি উপকরণ আছে: সংবিধান, আইন, আন্তর্জাতিক সনদ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা। যা এখনো দুর্লভ, তা হলো রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি ও সামাজিক সদিচ্ছা।

নারীর ক্ষমতায়ন কোনো একদিনের স্লোগান নয়, এক দীর্ঘ সামাজিক চুক্তি। এই চুক্তিতে রাষ্ট্র দেবে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার, সমাজ দেবে সম্মান ও সুযোগ, আর পরিবার দেবে সমান মর্যাদা। যেদিন একটি মেয়ে নির্ভয়ে স্কুলে যাবে, নিজের পছন্দের পেশা বেছে নেবে, নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নেবে, সেদিনই বোঝা যাবে আমরা সত্যিই সমাজের দুই পায়ে ভর করে দাঁড়িয়েছি।

সমাপ্ত

Picked up where you left off

Comments

    Please login to post comment. Login

  • অনেক সুন্দর একটি লেখা। অনেক সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। অনেক অনেক শুভকামনা।

    • Sadia Shobnam 2 weeks ago

      আপনার মূল্যবান মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

  • Habib Rahman 3 weeks ago

    বাহ। নারী অধিকার এই লেখাটি অসাধারণ। প্রত্যেকের উচিত এই লেখাটি পড়া।

    • Sadia Shobnam 2 weeks ago

      আপনার মূল্যবান মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।