বৃদ্ধাশ্রম থেকে...
খোকন, বৃদ্ধাশ্রম থেকে মা বলছি...
কেমন আছিস রে তুই?
জানিস, ইদানীং আমার দেহখানা আর ভালো থাকে না,
বুকের ব্যথাটা বাড়ছে ধীরে ধীরে।
নিরাময় হবে কাতরের জ্বালা, তবে যেতে হবে বৈদ্যের বাড়ি—
যা ভব নদীর ওই পারে।
জানিস খোকা, ভবের ঘাটের বোকা মাঝি বৈঠা হাতে নিয়ে
মাটিতে সে আঁকছে দাগ, গুনছে শুধু দিন।
ধরায় ঝরিল বুক-পুষ্প, যা সময়ের সাথে সাথে হয়ে যাচ্ছে বিলীন।
ওই যে খোকা, মালতি বু ওই দিন আমার অসুখের কথা শুনে
বানিয়ে সে দুধ-মিঠা, অনেকখানি দিয়েছিল মোর পাতে।
তুই তো জানিস খোকা, আমি মিষ্টিপ্রিয়;
তবে ওই দিন কেন জানি আমার রুচি হয়নি তাতে।
তোর মনে পড়ে খোকা? উনুনপাড়ে পাতামাঝে—
চর্বির তেলে ভেজে রাখা আমার হাতের মাছের পিঠা?
লুকিয়ে তুই করতি চুরি, আর হাসতি মিঠা মিঠা!
মাঝে মাঝে তুই নিঃশ্বাসে দেখতিস যখন আমি নেই তোর পাশে,
কণ্ঠ ফাটিয়ে ডাকতি মোরে— “মা রে, তুই কত দূরে?”
এই যে খোকন, আশ্রমে আমি আজ এক যুগ হলো ফেলে রেখে গেছিস,
কই, আসিসনি তো নিতে মোরে!
রাত্রিবেলা দেখিয়ে গগন বলতি আমায় কাঁপিয়ে ভবন—
"চন্দ্রমাঝে ভাসছে বুঝি তোমার মায়াবী মুখ!"
আজও তো আকাশে ভীষণ পূর্ণিমা,
তার মানে তুই আমাকেই দেখছিস— তাতেই তো আমাদের সুখ।
জানিস খোকা, দেহের খাঁচায় ধরেছে জং,
ভাঙবে শৃঙ্খল, উড়বে পাখি,
চিরনিদ্রায় যাবে মোর দেহ আঁখি।
আঁখির জ্যোতি ও যাচ্ছে কমে,
হয়তো আর বেশি সময় নেই মোর ধরে।
তাই কাল সকালে খুব ভোরে, ঘাটের মাঝির নায়ে চড়ে
চলে যাব বৈদ্যের বাড়ি— যা ভব নদীর ওই পারে।
জানিস খোকা, ওই পারেতে মানুষ নাকি নিদ্রায় মাটিতে বিছায়ে বাঁশের চাটাই?
ওই নিদ্রায় আছে আমৃত্যু সুখ, ঘুম নাকি সেখানে ভীষণ খাঁটি!
আমি জানি রে খোকন, তুই বড্ড হিসাবি,
তাই যাওয়ার আগে তোকেই শুধু বলি—
আশ্রমে মোর খাটের তলে আছে যে লাল থলি।
সেই থলিতে তোর বাপের দেওয়া মোর হাতের দুইখানা কাঁকন,
তুই সেগুলো বেচে আমার জন্য কিনে আনিস কাফন।
আর মোরে এমন স্থানে দিস কবর—
যেখানে পুরাতনকে খনন করে নতুনকে করা হয় দাফন।
অস্তিত্ব মুছে যাক মোর এই ধরামাঝে,
আমার জন্য তোর ওই রাস্তার ধারের জমিটা করতে হবে না রে নষ্ট,
ওটা যেন লাগে তোরই কোনো এক বিশেষ কাজে...
ইতি
মা