এক.
টঙ্গীর সেই বিকেলটা ছিল ধূসর পর্দার মতো ভারী। আকাশের গায়ে ধুলো আর ধোঁয়ার এমন এক প্রলেপ, যেন কেউ সূর্যটাকে ময়লা কাপড়ে মুড়ে রেখেছে। স্কুল ছুটির ঘণ্টা বাজতেই পিঁপড়ের সারির মতো ছোট ছোট নীল-সাদা ইউনিফর্ম ছড়িয়ে পড়ল রাস্তায়।
তাদের ভিড়ে ছিল তনয়, ক্লাস ফাইভের তনয়, পিঠে তার ভারী ব্যাগ, হাতে মায়ের বানিয়ে দেওয়া ছোট্ট টিফিন বাক্স, যেটা সে সবসময় শেষ না করেই ফিরিয়ে আনত, কারণ শেষ টুকরোটা মায়ের জন্য রেখে দেওয়াই ছিল তার গোপন খেলা।
রাস্তার ওপারে বাড়ি। মাঝখানে শুধু একটা সরু মোড়, আর তার বুকের ওপর দিয়ে ছুটে চলা পণ্যবোঝাই ট্রাকের অন্ধ গর্জন।
তনয় এদিক-ওদিক তাকিয়েছিল। এটুকু নিশ্চিত। শুধু সে জানত না, কিছু কিছু গাড়ি ডাকে না, জানান দেয় না, মৃত্যুর মতোই নিঃশব্দ গতিতে এসে পড়ে।
হাসপাতালের করিডোরে সুরাইয়া যখন পৌঁছলেন, তখন তাঁর শাড়ির আঁচল মাটিতে লুটাচ্ছে, পায়ে একপাটি স্যান্ডেল। ডাক্তার মাথা নিচু করে বললেন, "মাথায় আঘাতটা বড্ড গভীর ছিল।" এই একটা বাক্যই সুরাইয়ার সমস্ত পৃথিবীকে দু'ভাগ করে দিল, একদিকে তনয়ের থাকা, অন্যদিকে তনয়ের না-থাকা।
দুই.
শোক নাকি সময়ের সাথে পুরনো হয়। কথাটা যে বলেছিল, সে বোধহয় কখনও সন্তান হারায়নি। সুরাইয়ার কাছে শোক পুরনো হলো না, বরং ঘরের দেয়ালে জমা স্যাঁতসেঁতে দাগের মতো দিনে দিনে আরও গভীরে বসে গেল।
তিনি তনয়ের ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখতেন। সেখানে বিছানার চাদরটা ভাঁজ হয়ে আছে সেই সকালের মতোই, টেবিলে অসমাপ্ত অঙ্ক খাতা, আর জানালার পাশে ঝুলছে একটা ছোট্ট নীল সোয়েটার। প্রতিদিন ভোরে ওই ঘরে গিয়ে তিনি বসে থাকতেন, যেন কেউ ফিরে এলে প্রথম দেখাটা তাঁরই পাওয়া চাই।
আর ওদিকে, তিনটে ঘর পেরিয়ে, আট বছরের অর্ণব বসে থাকত একা, ঠিক যেন নিভে যাওয়া প্রদীপের পাশে ভুলে ফেলে যাওয়া সলতে। দাদাকে সে ভালোবাসতো। দাদার সঙ্গে ঝগড়া করত, কেড়ে নিত তার ক্রিকেট ব্যাট। এখন সে বুঝতে পারে না, দাদা গেছে, মা কেন তাকেও হারিয়ে ফেলল?
সে মায়ের আঁচল টেনে বলত, "মা, ক্ষুধা লেগেছে।"
মা তাকিয়ে থাকতেন, কিন্তু সে দৃষ্টি অর্ণবকে ভেদ করে চলে যেত অনেক দূরে, অন্য এক মোড়ে, অন্য এক বিকেলে।
শিশুরা অবহেলার ভাষা জানে না, কিন্তু তার স্বাদ চেনে। সে স্বাদ তেতো, আর তেতো জিনিস শিশুরা একসময় আর গিলে ফেলে না, উগরে দেয়।
তিন.
বছর দুই গড়াতে না গড়াতেই অর্ণবের নামে স্কুল থেকে নালিশ আসতে লাগল। প্রথমে ছোট ছোট, টিফিন কেড়ে নেওয়া, খাতা ছেঁড়া। তারপর বড় বড়, সহপাঠীর মাথা ফাটানো, দেয়ালে অশ্লীল কথা লেখা, ক্লাস পালিয়ে মোড়ের দোকানে বসে বড় ছেলেদের সাথে আড্ডা।
প্রধান শিক্ষক বাবা মাহফুজকে ডেকে পাঠাতেন। মাহফুজ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতেন, ঠিক যেমন কোনো আসামি দাঁড়ায় এমন অপরাধের জন্য, যা সে করেনি অথচ যার দায় তারই।
"আপনার ছেলের এই এলাকায় এখন নাম হয়ে গেছে," শিক্ষক বললেন। "যেকোনো গোলমালে সবার আগে ওর নামটাই আসে।"
নামটা সত্যিই আসত। কিন্তু মাহফুজ জানতেন, অন্য কিছুও আসত, যেটা কেউ শুনতে চাইত না। রাতে ঘুমের ঘোরে অর্ণব ডুকরে উঠত, "দাদা..." আর সকালে উঠে বলত সে কিছু মনে করতে পারছে না। যে ছেলে এমন ঘরে বড় হয়, যেখানে এক মা মৃতের জন্য বেঁচে আছেন আর এক জীবিতকে মেরে ফেলছেন নীরবতায়, সে কি অন্য কিছু হতে পারে?
মাহফুজ সুরাইয়াকে বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন। প্রথমে নরম গলায়, তারপর অনুনয়ে, শেষে চিৎকারে।
"তোমার একটা ছেলে এখনও বেঁচে আছে, সুরাইয়া! সে চোখের সামনে হারিয়ে যাচ্ছে!"
সুরাইয়া শুধু বলেছিলেন, "আমার তনয়ের ঘরটা তুমি ছুঁয়ো না।"
চার.
ভাঙন কখনও এক দিনে আসে না। সে আসে বর্ষার নদীর মতো, প্রতিদিন একটু একটু করে পাড় খেয়ে। একদিন মাহফুজ দেখলেন, নদীর ওপারে পৌঁছানোর আর কোনো সাঁকো নেই।
বিচ্ছেদের কাগজে সই করার দিন সুরাইয়া একটাও কথা বললেন না। শুধু একবার জানতে চাইলেন, "তনয়ের ঘরের জিনিসগুলো?"
"ওগুলো তোমার," মাহফুজ বললেন। "শুধু অর্ণবকে আমি নিয়ে যাচ্ছি।"
ছেলেটি দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ছিল, ছোট একটা ব্যাগ হাতে। সে একবার মায়ের দিকে তাকাল। হয়তো আশা করছিল, মা এবার অন্তত একবার ডাকবেন, থামতে বলবেন, কিংবা কেঁদে উঠবেন। সুরাইয়া জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে রইলেন, যেখান থেকে সেই মোড়টা দেখা যায়।
অর্ণব সেদিন কাঁদেনি। ছেলেদের যে-বয়সে কাঁদতে শেখা উচিত, সে-বয়সে সে শিখে নিয়েছিল না-কাঁদতে। ওটা নাকি পুরুষের ধর্ম। আসলে ওটা ছিল তার অভিমানের শেষ আশ্রয়।
পাঁচ.
সংবাদটা এল এক বর্ষণমুখর রাতে।
টেলিফোনের ওপারে অচেনা কণ্ঠ বলল, "আপনি কি সুরাইয়া বেগমের পরিচিত? টঙ্গীর সেই মোড়ে একটা ট্রাক... "
মাহফুজের হাত থেকে ফোনটা খসে পড়ল।
ঠিক সেই মোড়, সেই একই জায়গা, যেখানে সাত বছর আগে এক বিকেলে নীল-সাদা ইউনিফর্ম লুটিয়ে পড়েছিল। পুলিশ বলল, সুরাইয়া নাকি অনেক রাত পর্যন্ত রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকতেন। কেউ জানে না তিনি কি রাস্তা পার হতে চাইছিলেন, নাকি অপেক্ষা করছিলেন। বৃষ্টির পর্দা ভেদ করে ট্রাকের হেডলাইট যখন তাঁর ওপর পড়ল, তিনি নাকি নড়েননি। ওই আলোর দিকে তাকিয়ে ছিলেন, যেন বহুদিন পর কেউ তাঁকে ডাকছে।
অর্ণব তখন পনেরো বছরের কিশোর। খবরটা শুনে সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল বৃষ্টির মধ্যে, কাউকে কিছু না বলে।
সে ছুটতে ছুটতে এসে দাঁড়াল সেই মোড়ে। পুলিশের ফিতা তখনও ঝুলছে। রাস্তার কালো পিচে বৃষ্টির জল মিশে যাচ্ছে একটা লালচে রেখার সঙ্গে। সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
"মা," সে বলল। সাত বছর পর প্রথমবার। "আমি তো এখানেই ছিলাম, মা। এই তো আমি। তুমি একবারও ফিরে তাকালে না কেন?"
রাস্তা কোনো উত্তর দিল না। রাস্তা কখনও দেয় না। সে শুধু গিলে নেয়, আর ভুলে যায়।
সেই রাতে অর্ণব বুঝল এক নিষ্ঠুর সত্য: শোক মানুষকে বাঁচতে শেখায় না, শুধু বেছে নিতে শেখায় কাকে সে ভালোবাসবে, মৃতকে না জীবিতকে। আর যারা ভুল বেছে নেয়, তাদের কাছে সময় কোনো ক্ষমা রেখে যায় না।
ছয়.
অনুশোচনা এক অদ্ভুত আগুন। সে কাউকে পোড়ায়, কাউকে গলিয়ে নতুন আকার দেয়। অর্ণবকে সে দ্বিতীয় পথে নিয়ে গেল।
সে স্কুলের আড্ডা ছাড়ল, বখে যাওয়া বন্ধুদের ছাড়ল। বাবার সাথে বহুদিন পর বসে ভাত খেল, আর একদিন ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, "আমি একটা কিছু করতে চাই, বাবা। এমন কিছু, যেন আর কোনো মায়ের আঁচল মাটিতে না লোটায়।"
মাহফুজ ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সেই চোখে তিনি দেখলেন এক অন্য আলো, ভেজা, কিন্তু জ্বলন্ত।
এরপর থেকে যেখানে "নিরাপদ সড়ক চাই" নামের যত সংগঠন, যত স্বেচ্ছাসেবী দল, অর্ণব সবখানে নাম লেখাল। লাল-সাদা ভেস্ট গায়ে, হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে সে দাঁড়াত স্কুলের সামনে, বড় সড়কের মোড়ে। ছোট ছোট শিশুদের হাত ধরে রাস্তা পার করাত। কেউ ধন্যবাদ জানালে সে হাসত, কিন্তু সে হাসিতে এক ধরনের শূন্যতা থাকত, যেন সে হাত ধরে রাস্তা পার করাচ্ছে না, ফিরিয়ে আনছে হারিয়ে যাওয়া একজনকে।
অনেক সময় সন্ধ্যায় সে একা চলে যেত সেই পুরনো মোড়ে। দাঁড়িয়ে থাকত। হিসাব করত ট্রাকগুলো কত গতিতে যায়, কতক্ষণ পর পর যায়, কতজন পথচারী সেখানে পার হয়। সে খাতায় লিখত, যেমন কোনো বৈজ্ঞানিক কোনো ভয়ংকর রোগের লক্ষণ লেখে।
সাত.
বছর গড়াল। অর্ণব বড় হলো। পড়াশোনা করল প্রকৌশলে, তারপর সড়ক ও জনপথ বিভাগে চাকরি পেল। প্রথম দিন অফিসে ঢুকে সে যা চাইল, তা কোনো পদোন্নতি নয়, কোনো বিদেশ সফর নয়। সে চাইল টঙ্গীর সেই মোড়ের নথিপত্র।
ফাইল এল। পুরনো, হলদে, পোকায় কাটা কাগজ। তার ভেতরে পঁয়ত্রিশটা দুর্ঘটনার বিবরণ, সাতাশ জনের মৃত্যু। অর্ণব একে একে সবগুলো নাম পড়ল। দ্বিতীয় নামটা তনয়ের, উনিশতমটা সুরাইয়া বেগমের।
একটা মোড়, যেটা সাত বছরের ব্যবধানে মা আর ছেলে দুজনকেই খেয়ে নিয়েছে, এবং ক্ষুধা তার মেটেনি।
সে এক বছর লড়ল। ফাইল ঠেলল টেবিল থেকে টেবিলে, ঝগড়া করল ঠিকাদারের সাথে, কান্নাকাটি করল কর্তাদের সামনে। শেষে সে ওভারব্রিজ বানাল, গতি-নিরোধক বসাল, বাতি লাগাল, আর মোড়ের মুখে লাগাল এক বিশাল লোহার সাইনবোর্ড।
সাইনবোর্ডে বড় বড় সাদা অক্ষরে লেখা ছিল: "হায়েনা স্ট্রিট"।
উদ্বোধনের দিন সাংবাদিকরা প্রশ্ন করল, "এমন নাম কেন?"
অর্ণব অনেকক্ষণ উত্তর দিল না। তারপর বলল, "হায়েনা মৃতদেহ খায়, কিন্তু সে খেতে খেতে হাসে। এই রাস্তাও এতদিন তা-ই করেছে। হেসে হেসে খেয়েছে আমার দাদাকে, আমার মাকে, আরও পঁচিশটা ঘরের আলো। আমি চাই, যে-ই এই পথে পা রাখুক, নামটা পড়ে যেন একবার থমকে দাঁড়ায়। সতর্কতা শুরু হয় ভয় দিয়ে, আর ভয় শুরু হয় একটা নাম দিয়ে।"
হাততালি পড়ল। ফিতে কাটা হলো। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ জ্বলল। অর্ণব ভিড়ের ওপর দিয়ে দূরে তাকাল, সেই রাস্তার ওপারে, যেখানে তাদের পুরনো বাড়িটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। দোতলার জানালার ধারে এক টুকরো নীল কাপড় বাতাসে দুলছিল।
সে থমকে গেল। কেউ কি ও-বাড়িতে থাকে? বছর পনেরো ধরে তো ওটা তালাবন্ধ।
আট.
সন্ধ্যা নামছিল। জনতা ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে এল। সাংবাদিকরা গাড়িতে উঠল। আকাশ আবার সেই ধূসর রঙে ফিরে গেল, ঠিক যে-রঙে একদিন সব শুরু হয়েছিল।
অর্ণব একা দাঁড়িয়ে রইল সাইনবোর্ডের নিচে। হঠাৎ তার চোখ পড়ল রাস্তার ওপারে। নীল-সাদা ইউনিফর্ম পরা একটা ছোট ছেলে, পিঠে ভারী ব্যাগ, হাতে একটা টিফিন বাক্স, কিনারে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটি এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে না। তার দৃষ্টি স্থির, সাইনবোর্ডের দিকে। ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি।
আর ঠিক তখন, বহু দূর থেকে, একটা পরিচিত গর্জন ভেসে এল, ভারী, ক্রুদ্ধ, ক্ষুধার্ত। বাঁকের ওপার থেকে একজোড়া হেডলাইট লাফিয়ে উঠল।
ছেলেটি এক পা বাড়াল।
অর্ণবের গলা শুকিয়ে গেল। সে চিৎকার করতে চাইল, পারল না। তার পা যেন পিচের সাথে গেঁথে গেছে, ঠিক যেমন বছর আগে এক বৃষ্টির রাতে এক মায়ের পা গেঁথে গিয়েছিল। ট্রাকের আলো ছেলেটির মুখে পড়ল, আর সেই মুখ, ওই চোখ, ওই চিবুকের ভাঁজ, অর্ণবের বুকের ভেতরে কী যেন ছিঁড়ে ফেলল।
কারণ সে এই মুখ চিনত। একে সে আজও প্রতিদিন আয়নায় দেখে না, দেখে সেই ছবিতে, যা সে এখনও পকেটে নিয়ে ঘোরে। ছবির তনয়ের মুখের সাথে এই ছেলের মুখের কোনো তফাত নেই।
ছেলেটি এবার সরাসরি অর্ণবের দিকে তাকাল। হাত তুলে নাড়ল, যেমন করে ভাই ডাকে ভাইকে।
আর তার ঠোঁট নড়ল, নিঃশব্দে, কিন্তু অর্ণব স্পষ্ট বুঝল প্রতিটি অক্ষর- "এবার তুই পার করিয়ে দে আমাকে।"
ট্রাকের হর্ন চিরে দিল সন্ধ্যার উষ্ণ বাতাস।
অর্ণব প্রাণপনে দৌড় দিল।