Story

বাসে ঘুমাবেন না

October 15, 2026

20 views

ঢাকা শহরে সন্ধ্যাটা যেন আজকাল হঠাৎ করেই নামে। এই কিছুক্ষণ আগে শহর জুড়ে আলো ছিল। সূর্যের উষ্ণ আলোয় বাড়ি ফেরার ডাক ছিল। হঠাৎ করে আকাশটা অন্ধকার হয়ে এলো। আর সাথে সাথেই চলে উঠলো হাজার হাজার নিয়ন আলো। নিয়ন আলোয় উদ্ভাসিত আভায় কোথায় যে হারিয়ে গেছে আকাশের বুকে জোনাকির মতো মিটমিট করে জ্বালা তারা গুলো। খুব চেষ্টা করেও দু-একটার বেশি তারা দেখা যায় না। অথচ আকাশ জুড়ে সহস্র কোটি আলোক বছর দূরের তারাগুলি আলো দিয়ে যাচ্ছে দিব্যি। আমাদের চোখে ধরা দিচ্ছে না সেই আলো।

গ্রামের আকাশে এখনো অজস্র তারা দেখা যায়, মাঠের মধ্যে দেখা যায় ধুলতে থাকা জোনাকি পোকা।

কলেজের পাশেই একটা বাসায় টিউশন করায় আবির। সেখান থেকে ছয় তালার এই চিলেকোঠা ঘরে পৌঁছাতেই সন্ধ্যা গড়িয়ে প্রায় রাত হয়ে যায়। অনেক খুঁজেও কলেজের আশেপাশে কোথাও ঘর পাওয়া যায়নি।

গ্রামের মানুষ যে খুব ভালো আছে, তাও কিন্তু বলা যায় না। তাদের তালগাছ তলের জমিটা নিয়ে আজ কয়েকদিন ধরে বেশ ঝামেলা চলতেছে। কেউ কাউকে ছাড় দেয়ার পাত্র নয়। জান দিব জমি দিব না, এমন একটা অবস্থা।

বাসায় এসে যা জানতে পারে, আর বসে থাকতে পারেনি। ওই ঝামেলা যখন বেশ দূর অবদি গড়িয়েছে। তার বাবা চাচা দুইজনই থানায়। কিভাবে কি হলো তা জানানো হয়নি, হয়তো বাড়ি গেলে জানতে পারবে। তার এখন বাড়ি যাওয়াটা জরুরী। মুগদার ওখান থেকে বাসে উঠলে এতক্ষণে ঢাকা ছেড়ে যেতে পারত, তবে সে খবরটা পায় বাসায় আসার পরে। ফোনে চার্জ ছিল না বলে যদি করে সকালে ফোনটা নিয়ে বের হয়নি। তাছাড়া এই ছেলেটার একটা বদ অভ্যাস হলো, সে প্রায় সময় ফোন ছাড়া বের হয়। অনেক জরুরী ফোনই তার ফাঁকা ঘরে বাজতে বাজতে নিঃশেষ হয়ে যায়।

লিংক রোড এর এখানে যেই বাস কাউন্টারটা আছে, ওখানে নোয়াখালীর যাত্রী খুব কমই আসে। আবির কাউন্টারে পৌঁছে জানতে পারে, একটু আগেই নাকি নোয়াখালীর বাস চলে গেছে। পরের বাস আসতে সময় লাগবে আধা ঘন্টার মত। কিন্তু তার আগেই বাস আসে, বাংলাদেশের কোন কিছুই সময়মতো হয় না। এই বাসটা সময়ের আগে এলো। দশ মিনিট আগে, অর্থাৎ +১০ । পরের বাস ১০ মিনিট লেট করবে। প্লাসে মাইনাসে কাটাকাটি করে ব্যালেন্স করা হবে।

এত রাতেও অনেক মানুষ নোয়াখালী যাচ্ছে । আবিরের সিটটা পড়েছে দরজার দিকটার প্রথম সিট। A2, A1 এ বসা ভদ্রলোক ঝিমাচ্ছেন। উঠার সময় অন্ধকারে খুব বেশি কিছু না দেখলেও আবিরের মনে হয়েছিল বাসে তার একটা সিট ব্যতীত সবগুলা সিটেই লোক আছে। ঢাকার জ্যাম ভেঙে নারায়ণগঞ্জ পার হতে হতে বারোটার কাছাকাছি বেজে যায়।

বাস ছুটছে 80-90 স্প্রিড এ। ভেক্টর না পড়লে বলা যেত, ডিভাইডার এর উপরের গাছগুলো যেন সজোরে পিছনের দিকে চলে যাচ্ছে। এই ব্যাপারটার একটা দারুন বৈজ্ঞানিক নাম আছে, একে বলে আপেক্ষিকতা। আসলে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবকিছুই আপেক্ষিক। আবিরের দৃষ্টিতে বাইরের যে গাছগুলো পিছনের দিকে সরে যাচ্ছে, ওই গাছ ধরে দাঁড়িয়ে থাকা লুঙ্গি পরা লোকটার জন্য গাছ তো ঠিকই দাঁড়িয়ে আছে, ছুটে যাচ্ছে আবির। আবার পৃথিবীর বাইরে থেকে যদি কেউ তাকায়, তার জন্য লুঙ্গি পরা লোকটার গতি অনেক। এভাবে সূর্যের সাপেক্ষে পৃথিবী গতিশীল, সৌরজগতের বাইরে থেকে দেখলে সূর্য। আসলে কোন কিছুই স্থির নয়। পরম স্থিতি বলে এখনো কোনো কিছু বিজ্ঞান দেখাতে পারেনি।

ড্রাইভার আর হেলপার কি নিয়ে জানি হাসাহাসি করছে।

পিছন থেকে পাঁচ ছয় বছরের একটা বাচ্চা ছেলে সামনে এসে হেল্পারের সাথে বসেছে। তার মা তাকে ধমক দিয়ে বলছে ফিরে আসতে, সে কথা শুনছে না। বাবার ডাকের সাথে সাথে শান্ত ছেলের মত ফিরে গেল।

হেলপার ড্রাইভারকে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক লোকের দিকে দেখিয়ে বলল,

" ওস্তাদ, মারি দেন।"

ড্রাইভার বলল,"দিব ?"

বলেই দুজনে বিস্তর হাসাহাসি করল। যেন ব্যাপারটা তাদের জন্য খুব মজার। পারিবারিক দুশ্চিন্তা কাটাতে আবির পরম যত্নে এই বিষয়গুলো লক্ষ্য করছে।

ড্রাইভার আবার বলল,

" কি কস, দিমু নি মারি ? "

"সাহস আছে?"

"আছে নি মানি!"

"থাকলে মারি দেন।"

ততক্ষণে লোকটা প্রায় গাড়ির কাছে চলে এসেছে। মুহূর্তের মধ্যে বাসটা রাস্তা ছেড়ে ফুটপাতে উঠে আবার রাস্তায় নেমে গেল। প্রচন্ড চিৎকারে একটা আর্তনাদ বাতাস কে কাঁপিয়ে দিল। হেল্পার ছুটে গেল বাসের পিছন দিকে, পিছনের জানলা দিয়ে দেখার চেষ্টা করল লোকটা বেঁচে আছে কিনা। ড্রাইভার জিজ্ঞেস করলেন,

" মাইরচে নি রে ?"

হেল্পার হতাস কনঠে বললো,

"ওস্তাদ, মরে নাই।"

ড্রাইভার তাকে বললো,

আরেকটা আইতেছে, দাড়া।

এই সব দেখছিল আবির, সে নিজের চোখ কে বিশ্বাস করতে পারছে না, সে কি দেখছে। একটা মানুষকে এরা ইচ্ছা করে মেরে ফেললো, মেরে রাস্তায় ফেলে চলে যাচ্ছে কেউ তাদের কিছু বলছে না, ঘটনা কি!

কিছুক্ষনের মধ্যেই আরেকজন তাদের এই ভয়ানক খেলার শিকার হলো। পিছন থেকে হেল্পার চিতকার করে বললো,

"ওস্তাদ, মরছে বেটা। মাথা শেষ।"

এই কথা শোনা মাত্র এতক্ষন কবরের নিস্তব্ধতায় থাকা পুরো বাস এক জ়োগে সজাগ হয়ে উঠলো। সবাই এক জোগে বলে উঠলো,

'এক"

হ্যা, এক। এরা মরা দের সংখা গুনছে। আবিরের মনে হচ্ছে যেন সে স্বপ্ন দেখছে। এটা কোনো ভাবেই বাস্তব হতে পারে না। তার মানুষ সত্ত্বা চিতকার করে উঠে, এই অমাবিকতা সে আর নিতে পারছে না। ড্রাইবারকে বলে বাস থামাতে। কেঊ যেন তার কথা শুনছে না। কারো কানে যাচ্ছে সে কি বলছে। এই চলন্ত বাস যেন এক টুকরো জাহান্নাম। সে বললো,

"আপনারা মানুষ হয়ে এভাবে করতে পারেন কিভাবে?"

"পিছন থেকে তখন কে জানি বলে উঠলো, তোমাকে কে বলেছে আমরা মানুষ। সব মানুষ নরকের কিট। এদের বেচে থাকার কোনো অধিকার নেই। "

তখন আবারও সবার বলে বলে উঠলো, "কোনো অধিকার নেই।"

আবিরের হৃদস্পন্দন বাড়তে শুরু করেছে। অপার্থিব এই যাত্রা তার কাছে এখন আর স্বপ্ন মনে হচ্ছে না। যেন কতগুলা দানব গিরে আছে তাকে। তার হৃদস্পন্দন যেন হাই বেস দেয়া সাউন্ড বক্সে চলছে। দুপ দুপ শব্দে কেপে উঠছে চারপাশ। পিছন থেকে যেই হেল্পার এতক্ষন লাশ গুনছিল, সে বলে উঠলো,

"এ তো মানুষ।"

হঠাত শান্ত হয়ে গেলো চারপাশ। একটা আচমকা ধাক্কার মত যেন লাগলো। অনেক জোরে ব্রেক করে বাস থাকলো। ড্রাইবারের চোখে মুখে আতঙ্ক। সে হাত বাড়িয়ে একটা বাটন ধরতে চাচ্ছে, যেটা চাপলে হয়ত বাসের দরজা খুলবে। কেউ একজন তার আগেই ড্রাইবারের হাত ধরলো। সেই লোক ড্রাইবারকে বললো,

" এদের খিদা আপনি কি দিয়ে মিটাবেন? "

ড্রাইবারের চোখে একটা ভয় স্পষ্ট হয়ে উঠে, সেই লোক আবার বলে,

"দরজা খুলবেন না।"

ততক্ষনে আবিরকে ঘিরে ধরেছে অনেক গুলো ছায়া মুর্তি। তাদের হাত পায়ের পাতা অব্দি লম্বা, এক একটা আগুল যেন হাতের কব্জির সমান। সবাই একসাথে জাপিয়ে পরে আবিরের উপর। সে হাত পা নাড়তে পারছে না, যেন তার সমস্ত শক্তি এদের কাছে নসসি। এই মুহুর্তেই হয়ত এরা একে একে হিংস্র হয়ে উঠবে।

ড্রাইবার বাতি জ্বালালেন। এই আলোয় যাত্রিদের ঘুম ভাঙ্গানো হয়। আলো পরলে অন্ধকার যেভাবে বিলিন হয়ে যায়, সেই ভাবে ছায়া মুর্তি গুলো বিলিন হয়ে জেতে শুরু করেছে। তার সাম

নে চকচকে আলোয় জ্বলছে চৌরাস্তার ভাস্কর্যটি।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+30 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login