স্মৃতির জানালায় ধেয়ে আসে একাত্তরের চৈত্রদুপুর,
রক্তের দাগে যখন ভেসে গিয়েছিল আমার চেনা আঙিনা।
সবুজ ঘাসে লুটিয়ে পড়েছিল ঘর বাঁধার শেষ সম্বল,
আর কোল খালি করে নিভে গিয়েছিল আমার ভোরের সূর্য।
জীবনের ঘড়ির কাঁটা থমকে গেছে সেই রক্তাভ দিনটিতে,
পাঁচটি দীর্ঘ দশক ধরে আমি এক স্থির মৃত্যুর মিছিলে একা।
প্রতিটি ভোরে ঘরজুড়ে খেলা করে নিস্তব্ধতার হাহাকার,
ভাঙা আয়নায় দেখে মনে হয়, আমিও তো মরে গেছি সেদিনই।
উঠোনের আমগাছটায় আজও বাজে খোকার অবুঝ হাসি,
দরজার চৌকাঠে ভেসে ওঠে স্বামীর সেই শেষ স্পর্শ।
সিন্দুকে তোলা আছে ছেলের বইগুলো আর রক্তভেজা জামা,
আঙুল ছুঁতেই বুকের বাষ্প নোনা নদী হয়ে ঝরে পড়ে।
সবাই বলে স্বাধীনতা এসেছে, লাল-সবুজ পতাকা উড়ছে আকাশে,
কিন্তু আমার আঁধার ঘরে পৌঁছায়নি একচিলতে আলো।
স্বজনহারানো এই বৃদ্ধার আক্ষেপ কেবল একটুখানি মমতার,
উৎসবের কোলাহলে কে মনে রাখে নিঃস্ব মায়েদের আত্মত্যাগ?
আমার সমস্ত ক্ষোভ আর অনুযোগ ওই নীরব ঈশ্বরের কাছে
কেন বাঁচিয়ে রাখলে আমায় এমন প্রকাণ্ড এক শূন্যতায়?
রাতের অন্ধকারে যখন জীর্ণ বালিশ ভিজে ওঠে অশ্রুতে,
আমি শুধু প্রতীক্ষা করি, কখন শেষ হবে এই দীর্ঘ নির্বাসন।
একাত্তরের সেই ক্ষত চিরতরে খণ্ডবিখণ্ড করে গেছে আমায়,
আমি এক বিষণ্ণ ছায়া, বয়ে চলেছি ইতিহাসের সবচেয়ে ভারী শোক।