পাহাড়ঘেরা এক ছোট্ট উপত্যকা। বর্ষায় সেখানে মেঘগুলো নিচু হয়ে নেমে আসে, যেন আকাশ নতজানু হয়ে ভূমিস্পর্শের আস্বাদ গ্রহণের জন্য নেমে এসেছে। পাখিদের ডাক এখানে প্রকৃতির নীরবতাকে ডেকে বলে, এখানে আমরা থাকি। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা ঝরনায় শুধু গোড়ালি ভিজে। তবু সেখানে নিরবিচ্ছিন্ন স্রোতের ধারা। কাছেই সিন্দুকছড়ি। এখানে উপত্যকার এক পাশে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে শতাব্দীপ্রাচীন একটি বৌদ্ধ বিহার, আর তার আধমাইল দুরে ধানের মাঠ পেরিয়ে, তালগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এক মসজিদ, যার মিনারে একটি ধাতব সোনালি চাঁদের অর্ধবৃত্ত বিকেলের আলয় খুব বেশী ঝলমল করে।
বৌদ্ধবিহারে থাকেন ভান্তে অনিন্দ্য—একজন অতি বৃদ্ধ বৌদ্ধ ভিক্ষু। তাঁর মুখে গাঢ় নীরবতা, সেটি যেন ওই পাহাড়ের মত স্থির, অথচ তার চোখ যেন দিগন্ত ছুঁয়ে ফেলা বাতাসের মতো মুক্ত। তিনি কথা কম বলেন, হাঁটেন ধীরে, আর প্রতিটি সন্ধ্যায় ধূপের ধোঁয়ার পাশে বসে ধ্যান করেন, যেন নিঃশব্দে নিঃশ্বাসের শব্দ দিয়ে সময়ের বুননে রাতের অন্ধকার তৈরি করেন।
অন্যদিকে, মসজিদের ইমাম বারেক মিয়াঁ। বয়সে তরুণ, কণ্ঠস্বর গভীর, তার চোখে অন্য এক জ্যোতি। মসজিদের প্রতিটি আজান যেন তার কণ্ঠে তরঙ্গ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে পুরো উপত্যকায়। তিনি প্রতিদিন ঠিক সময়মতো আজান দেন, নামাজ পড়ান, আর অবসর সময়ে মসজিদের পাশে তালগাছটির নিচে বসে একা একা জগত এবং স্রষ্টার ব্যাখ্যা নিয়ে ভাবেন। তিনি মানুষকে ধর্ম শেখান, কিন্তু নিজের বিশ্বাস নিয়ে উচ্চকণ্ঠ নন। বরং আল্লাহকে নিয়ে তার নীরব ধ্যান ধারণাকে নিয়েই তার দিনকাল পেরোয়।
এই দুইজন, একে অপরের সম্পর্কে জানেন, কিন্তু কোনোদিন তাদের দেখা হয়নি, স্বভাবতই তাদের কোন কথোপকথনও হয়নি।
একদিন দুপুর গড়িয়ে যাবার পর আকাশের এক কোণে খানিকটা মেঘ আর বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ। ভান্তে অনিন্দ্যর মনে হলো, আজ বাতাসটা খুব ভালো লাগছে। তিনি বিহার থেকে বের হয়ে হাঁটতে লাগলেন। তাঁর হাতে কাঠের লাঠি, আর কাঁধে একটা পুরনো ঝোলা ব্যাগ। তাঁর চোখে আজ কোন গন্তব্য নেই। পাহাড় থেকে নেমে সবুজ ধানক্ষেতের মাঝখানের পায়ে চলা পথ ধরে আনমনে হাঁটতে লাগলেন।
হঠাৎ বৃষ্টি নামতেই তিনি অনেকটা অপ্রস্তুত হয়ে চারপাশে তাকিয়ে আশ্রয় খুঁজতে থাকেন। কাছেই মসজিদটা দেখে মসজিদের বারান্দায় উঠে এসে বসলেন।
মসজিদের ভেতর তখন ইমাম বারেক মিয়াঁ আজানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বারান্দায় এসে দেখতে পেলেন একজন বৃদ্ধ ভিক্ষু, বৃষ্টিতে ভিজে, সেখানে বসে আছেন।
ইমাম একটু থমকে দাঁড়ান, তারপর এগিয়ে এসে বললেন,
আসুন, ভিতরে আসুন। ঠান্ডা লেগে যাবে।
ভান্তে কিছু না বলে মাথা নাড়লেন। তারপর ধীরে পা বাড়িয়ে মসজিদের ভেতর এক কোনায় বসে পড়লেন।
ইমাম সাহেব কি জিজ্ঞেস করবেন, ভাবছিলেন। তিনি কিছু বলার আগে ভিক্ষু নিজেই মুখ খোলেন।
এই বৃষ্টির শব্দ অনেকটা আজানের ছন্দের মতো, অদ্ভুত অচেনা ছন্দের মতো অন্তরের ভিতরে ঢুকে পড়ে।
ইমাম একটু অবাক হয়ে বলেন, আজান শুনেছেন আগে আপনি?
ভিক্ষু মৃদু হাসেন, এখানে আমি আছি চল্লিশ বছর।
আঙ্গুল বাড়িয়ে বৌদ্ধ বিহারে দিক দেখিয়ে বললেন,
ঐখানে থাকি। আজান প্রতিদিন শুনি। আজান শোনাও আমার এখন নিয়মিত অভ্যাস। কোনদিন আজান না শুনলে বরং আপনার জন্য ভাবনা হয়।
একথার পর কেন যেন সেখানে নীরবতা নেমে এলো। বাইরের বৃষ্টির শব্দ এসে সেই নীরবতাকে যেন আরো প্রগাড় করে দিচ্ছে।
ইমাম সাহেব তার রুম থেকে চা বানিয়ে আনলেন। দুজন মানুষ মসজিদে বসে আছেন। একজন ভিক্ষু, অন্যজন ইমাম। এই প্রথম তারা পাশাপাশি, অথচ কোনো তর্ক নেই, কোনো দৃষ্টিভেদ নেই। কেবল বৃষ্টির শব্দ, আর দুজন মানুষের ভেতরের প্রশান্তির শিকড়।
ভান্তে বললেন, আমাদের দুজনের প্রার্থনার ভাষা আলাদা, কিন্তু লক্ষ্য এক।
ইমাম জিজ্ঞেস করলেন, "কী লক্ষ্য?"
ভান্তে চোখ বন্ধ করে বললেন, নিজেকে হারানো। নিজের অহংকে খুলে ফেলা।
ইমাম জবাব দিলেন, আমার প্রার্থনাও সে চেষ্টাই করে। শব্দের ভিতর দিয়ে আমরাও আল্লাহর বিশালত্বের মাহাত্ম্য খুঁজি। আপনাকে কিছুক্ষণ বসতে হবে। এখন আজানের সময় হয়েছে। আমি আজান দিয়ে আসি। আজ বৃষ্টি হচ্ছে, মনে হয় কেউই মসজিদে আসবে না।
মসজিদের পেছনে মিনারে আজান দিতে গেলেন ইমাম সাহেব। ভিক্ষু একা একা মসজিদের ভেতর বসে চোখ বন্ধ করে রইলেন।
ইমাম সাহেব আজান শেষ করে আসতেই ভিক্ষু বললেন,
আজানের সুরের ভেতর একটা পথ যেন ডাক দেয়, যেখানে ঈশ্বরের গন্ধ থাকে। সে গন্ধটাই হয়তো সবাইকে আত্মসমর্পনের জন্য আহবান করে।
ইমাম আর কিছু বলেন না।
ইমাম সাহেব মাগরেবের নামাজ পড়লেন। ভান্তে তার পেছনে চোখ বন্ধ করে বসে রইলেন, যেন তিনিও কোন প্রার্থনায় বসেছেন।
ইমাম সাহেব নামাজ শেষ করে এসে ভিক্ষুর পাশে এসে বসলেন। ভান্তে তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। কেন যেন হঠাৎ ইমাম সাহেব প্রশ্ন করলেন, আপনি প্রতিদিন কিসে শান্তি খোঁজেন?
ভান্তে অনিন্দ্য বললেন, প্রতিদিনের অসন্তোষে।
ইমাম চমকে উঠলেন। তিনি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন ভিক্ষুর দিকে।
তিনি জবাব দিলেন, যা অশান্তি, তাকেই বোঝার চেষ্টা করলেই শান্তি হয়।
ইমাম জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে আল্লাহ্? আল্লাহ্ বা স্রষ্টা বলতে আপনি কী ভাবেন?
ভান্তে বললেন, আপনার আজান আমাকে যার কথা মনে করিয়ে দেয়, তিনিই মহাপ্রভু।
ইমাম বললেন, আর নির্বাণ?
ভান্তে বললেন, গভীর ধ্যানের পর যখন আপনার অন্তর নিঃশব্দ এবং স্থির হয়ে থাকে। সেখানে জন্ম মৃত্যু, জরা ব্যাধি, শোক হতাশা, কিছুই নেই, আলো নেই- অন্ধকারও নেই, চন্দ্র সুর্য গ্রহ নক্ষত্র কিছুই নেই, সেই পরম অবস্থাটিই নির্বাণ।
কথাগুলো শুনে ইমাম সাহেব ভান্তের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর ধীর কণ্ঠে বললেন,
পরম সমর্পণের মাধ্যমেই সেটি সম্ভব এবং স্বীয় অস্তিত্বকে পাশ কাটানোর সামর্থ না ঠেকলে সেটি সম্ভব নয়। আমরাও আল্লাহর কাছে সেভাবেই জাগতিক সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে সমর্পিত হবারই চেষ্টা করি।
কথাটি শুনে ভান্তে মুচকি হাসলেন।
এদিকে তখন বৃষ্টি থেমে গেছে। পরিষ্কার আকাশে তারা দেখা যাচ্ছে। তারা দুজন পাশাপাশি হাঁটতে থাকেন ধানক্ষেতের মাঝের সে রাস্তা ধরে। কেউ কারো ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন করলেন না আর, কারো মতবাদের প্রশ্নও হলো না আর। নীরবে পাশাপাশি হাঁটতে থাকলেন দুজনে।
বৌদ্ধ বিহারটির কাছে এসে একটাই কথা হয় বিদায়ের আগে। ইমাম সাহেব বললেন,
আমাদের দুজনের গন্তব্যই তাহলে এক।
ভান্তে স্মিত হাসি দিয়ে বললেন, অবশ্যই।
Comments
Be this story’s first reader
+25 XPNobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.
Sign in to claimFirst reader
You were first.
+0 XP
Yours is the first word this story has heard. Its writer will see it.
You also earned the First Reader honour.