এক গ্রামের মধ্যে হরিশ নামে এক লোক সাধারণভাবে জীবনযাপন করত। তার পরিবারের পাঁচ জন সদস্য। বাবা হাবু, মা রিতু, স্ত্রী রিনা ও ছোট বোন রুশা। সকলে অনেক মিলেমিশে জীবনযাপন করে।
হরিশের বিয়ের কিছুদিন পরেই রুশার বিয়ে ঠিক হয়। সবাই অনেক আনন্দের সাথে রুশার বিয়ে দিল। রুশা শ্বশুরবাড়ি গিয়ে ঘর-সংসার করে। হরিশ ছিল কর্মঠ লোক। সে সব সময় টাকা ইনকাম করে, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
হরিশের স্ত্রীর ছেলে বাচ্চা হলো। রিনা তার স্বশুর-শাশুড়িকে খুব ভালোবাসত। ছেলের নামকরণ করল, নাম রাখল হৃদয়। এভাবে বেশ কিছুদিন যায়। ছেলের বয়স দুই বছর পার হয়।
তখন বেশ কিছুদিন রিনা ও হরিশের পারিবারিক তর্ক হয়। একদিন অতিরিক্ত ঝগড়া হলো, অথচ কারো দোষ ছিল না। হরিশ তার স্ত্রীকে অনেক মার দিয়ে হৃদয়কে রেখে রিনাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। হরিশ বলে, "কোনোদিন এ বাড়িতে আসবি না।" তখন রাত।
রিনার তো কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, শুধু বাপের বাড়ি। বাপের বাড়ি অনেক দূর, হাতে কোনো টাকা-কড়ি নেই। ছেলেকে ছেড়ে যেতেও ইচ্ছে করে না। ও বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। মনের দুঃখে বাপের বাড়ি যাওয়ার রওনা দিল হেঁটে হেঁটে। সারা রাত, সারা দিন কাঁদতে কাঁদতে সন্ধ্যার সময় বাপের বাড়ি পৌঁছাল। গেটে ডাকে, "মা, মা।"
মা গেট খুলে। রিনা দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে। মা-বাবাকে রিনা সকল সমস্যার কথা বলে। বলে, "মা, মুরগির ডিম নষ্ট, আমি কী জানি! ডিম সিদ্ধ দিছি, ডিম ফুটছে। এই নিয়ে আমার বাচ্চা কেড়ে নিয়ে আমাকে মেরে বের করে দিছে।"
মা বলে, "রিনা মা, মন খারাপ করিস না। জামাই তোকে ঠিক নিতে আসবে।" রিনা সৃষ্টিকর্তার কাছে কাঁদে। ভাবে, তাকে একদিন ঠিক নিতে আসবে।
এদিকে হরিশ রাগ করে ভাবে, বের করে দিছি, চলে গেল, আর আনতে যাব না। হৃদয়কে হরিশ যত্নের সাথে বড় করে। স্কুলে ভর্তি করে দেয়। হৃদয় দেখে সবার মা আছে, তার মা নেই। সে মাঝে মাঝে বাবাকে, দাদু-ঠাকুমাকে জিজ্ঞেস করে, "আমার মা কই?" ওরা বলে, "মারা গেছে।" তাদের বাসার কাজের লোকদের জিজ্ঞেস করে, "আমার মা কই?" কেউ বলে মারা গেছে, আবার কেউ বলে জীবিত, আবার তার মায়ের নামে
নিন্দা করে।
হৃদয় সকলের সঙ্গে মিশত। বেশি করে যারা হৃদয়ের মায়ের নামে ভালো বলত, তাদের জিজ্ঞেস করে, "আমার মা কোথায় আছে? তার ঠিকানা কী?" শুনে নিত। এভাবে তার বেশ কিছুদিন কেটে গেল। তাদের সম্পত্তি অনেক হয়েছে, এখন ধনী বললেই চলে। হৃদয়ও বড় হয়।
একদিন হৃদয় তার বাবাকে বলে, "বাবা, আমার মা তো বেঁচে আছে, তুমি আমার মাকে এনে দাও।" হরিশ ভাবে, ছেলে বড় হয়েছে, সে সব বুঝে, জানতেও পেরেছে। তাই চুপ করে রইল। হৃদয় বলল, "বাবা, তুমি যদি আমার মাকে না এনে দাও, তবে আমি আমার মাকে খুঁজতে গেলাম। যতদিন না আমি আমার মাকে খুঁজে নিয়ে আসতে পারছি, ততদিন আমি এই বাড়ি আসব না।"
এই বলে হৃদয় তার জমানো কিছু টাকা নিয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বের হয়ে গেল। হরিশ চুপ করে থ হয়ে ছেলের দিকে চেয়ে রইল।
হৃদয় যে তার মায়ের ঠিকানা পেয়েছে, সেই ঠিকানায় রওনা দিল। হৃদয় পৌঁছে দেখে একটা পুরাতন বাড়ি। সে দরজায় ডাক দিল। বের হলো এক লোক। জিজ্ঞেস করল, "রিনা নামে কেউ আছে?" লোকটি বলল, "ওরা তো এই বাড়ি পনেরো বছর আগে বিক্রি করে চলে গেছে।"
হৃদয় বলে, "কোথায় গেছে? গ্রামের নাম কী?" লোকটি বলল, "বাবা, ও তো জানি না। তবে শুনছিলাম এখান থেকে প্রায় একশো সতেরো কিলোমিটার দূরে দত্ত বাড়ি নাকি।" এই শুনে রওনা দিল দত্ত বাড়ি। সেখানে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, "দত্ত বাড়ি কোনটা?" সবাই বলে, "আগে ছিল, এখন নাই। ওরা সবাই চলে গেছে।" "কোথায় গেছে?" সবাই বলে, "জানি না, ওরা কোথায় গেছে।"
হৃদয় অনেক চিন্তায় পড়ে। তার কাছে জমানো যা কিছু টাকা ছিল, তা শেষের পথে। খাবে কী, আর কোথায় যাবে মাকে খুঁজতে? কারণ বাবাকে বলেছে, মাকে যতদিন খুঁজে না পাবে, ততদিন বাসায় ফিরবে না।
এভাবে ভাবতে ভাবতে যায় আর খোঁজ করে, "দত্ত বাড়ির কাউকে কি চেনেন? তারা কোথায় গেছে?" যেতে যেতে খিদেও লেগেছে। যা টাকা ছিল, তা দিয়ে চিড়া কিনে খেল। ক্লান্ত তবুও যায়। দেখে একটা বিশাল বাড়ি, চারপাশে ফলের বাগান, দিঘি।
হৃদয় দিঘিটার ঘাটে গাছের ছায়ায় দম নেয়। চিন্তা করে, আর টাকা নেই। কোথায় খুঁজব আমার মা? আমার মা যে কেমন দেখতে! এইভাবে চিড়া খায়। চিড়া খাওয়া শেষে জল পিপাসা লাগে। সে দেখে দিঘির জল কাঁচের মতো পরিষ্কার। হৃদয় দিঘির জল মুখ দিয়ে খেতে গিয়ে দেখে জলে একটা সুন্দরী মেয়ের ছবি। ভাবে, কে মেয়েটা? পেছনে তাকায়, দেখে মেয়েটা বন্দুক ধরে তার দিকে তাকিয়ে আছে। বলে, "তুমি কে? কোথা থেকে কেন এসেছ?"
তখন বলে, "আমি হৃদয়। আমি আমার মাকে খুঁজতে এসেছি হাওড়া থেকে।" "তোমার মায়ের নাম কী?" "রিনা। বাবার নাম হরিশ।"
তখন মেয়েটি বন্দুক ফেলে দৌড়ে এসে "বাবা" বলে জড়িয়ে ধরে বলে, "বাবা, আমিই তোর মা।" ছেলেকে বাবার বাড়ি নিয়ে দাদু-দিদার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। বেড়ায়, অনেক আনন্দ করে।
হৃদয় তার মাকে ঘোড়ার পিঠে চড়িয়ে তার বাড়িতে নিয়ে আসে। বাবা অবাক। তারপর সবাই মিলেমিশে একসাথে আনন্দের সাথে বসবাস
করে।
সমাপ্ত।
গল্পটি কেমন লাগলো কমেন্ট করুণ
01348129558