বৃদ্ধ বয়সের একাকীত্বের সময়ের স্মৃতি চারণের কথা ভেবেই লেখা গল্পটি...
শীত উষ্ণতায় মানবতা
-- -- খালাম্মা, দাদাজানরে নাস্তা দিয়া আসি। তারপর রান্নাঘরের সব ধুইয়া দিব। আপনি অসুস্থ। পানি টানি ধরিবেন না। -
- ঠিক আছে। আব্বা কে নাস্তা দিয়ে গ্লাসে পানি ঢেলে আসিস্।
নরম সুরে বললেন দিলরুবা বেগম।
সদ্য চল্লিশ উত্তীর্ণ গৃহিণী। দুই সন্তানের জননী।
স্বামী তারেক হোসেন চট্টগ্রামের এক নামী কলেজের সহকারী অধ্যাপক।
শশুর মোঃ আবদুল লতিফ ও উক্ত কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। আকস্মিক হার্ট অ্যাটাকে স্ত্রীর মৃত্যুর পর অনেকটাই ভেঙে পড়েছিলেন। বর্তমানে রিটায়ার্ড। স্মৃতিভ্রম রোগে ভুগছেন।
দিলরুবা বেগম আ্যজমা সমস্যায় আক্রান্ত।
ছুটা বুয়ার পাশাপাশি টুকটাক সাহায্য করার জন্য গ্রাম থেকে আনা হয়েছে ১১/১২ বছর বয়সী ফেন্সিকে।
প্রথম প্রথম কান্নাকাটি করতো। গ্রামে ফিরে যাওয়ার জন্য ধরতো নানান বাহানা।
-....... খালাম্মাগো! ভূত দাদীর রুপ ধরি দাদাজানরে আছর কইরছে। হারাদিন বিরবির করি হেতেনের লগে কি জানি কয়। আঁর ডর করে। আঁই থাইকতাম নয়। -
.... .. রাইতে দাদাজানরে আছর করা ভূত আঁরে চাপি ধরে..
অনার্স পড়ুয়া মেয়ে লিপির বদৌলতে ফেন্সির ধারণার হয়েছে পরিবর্তন। কথায় এসেছে কিছুটা সাধু ভাষা সংমিশ্রণে শুদ্ধতা।
--- ভূত টুত কিছু না। দাদী হঠাৎ মারা যাওয়ায় দাদাভাই খুব কষ্ট পেয়েছেন। মেনে নিতে পারছেন না। তাই কল্পনায় শুধু দাদীকে দেখে! তার সাথে কথা বলে।
তারপর থেকে আজ প্রায় দুই বছর অবধি ফেন্সি
বহাল তবিয়তে রয়েছে।
... .. .........
বয়স্ক লোকদের চামড়ার পুরুত্ব কমে যাওয়া, আয়রনের ঘাটতি, ওজন হ্রাস, ক্লান্তি... শীতাধিক্য --- উক্ত সমস্যাগুলোর জন্য একটি কারণকেই প্রধানত দায়ী করেন জনাব আবদুল লতিফ।
----- আমার হচ্ছে শীতালু শরীর। এর জন্য দায়ী- একাকীত্ব।
---- আম্মুর কাছে শুনেছিলাম- দাদী নাকি বলতো- আগে ও তোমার শীত বেশী ছিল। গোসল করতে গেলে হু হু করে চীৎকার করতে, গরমে ও ফ্যান ছাড়তে দিতে না।
দাদাভাইর খাটের চাদর টেনে দিতে দিতে বললো লিপি।
---- তোর দাদীর সাথে শুধু এই একটা ব্যাপারে ভিন্নতা ছিল। সবসময়ই তার গরম লাগতো। Even শীতকালে ও। বলতে বলতে চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো লতিফ সাহেবের।
শুরু করবেন বিরামহীন লম্বা স্মৃতি চারণ! শোনার সময় নেই। কেটে পড়ল লিপি।
............
ঋতুমশাই চাদরটা সবে গায়ে জড়িয়ে শীতের আমেজ ছড়িয়ে দিতে শুরু করেছে। উত্তরের কনকনে হাওয়ায় ও ঋতুটির আগমনী বার্তা।
নিত্যদিনের মতো সকালের মিষ্টি রোদের নরম আলোয় বসে আছেন লতিফ সাহেব।
ছাদে ফোটা হরেক রকমের গাঁদা ফুলের দিকে আনমনা দৃষ্টি ---
........ . . .. .
কুয়াশাচ্ছন্ন এক শীতের সকালে ছোট চাচীর ডাকে কম্বলের তলার আরামের ঘুমকে বিদায় জানাতে হলো।
বললেন --- বাবু, রেডি হও। এক জায়গায় যাইতে হবে। যার আঁচলে তোমারে বাইন্ধা রাখবো। তারে দেখবা।
অনেকটা জোরাজোরি করেই নেয়া হলো তাকে।
তাকাবে না জেদ করে ও তাকালো।
সারল্যে ভরা এক মায়াকাড়া মুখ.. নাসরীন জাহান মুক্তা।
সাদা মাটা গ্রামীন পরিবেশে বিয়ে পড়ানো হলো। শীতকাতুরে জীবনটা উষ্ণতার ছোঁয়া পেল যেন।
ভাবি শ্রেণীর এ নিয়ে ও হাসিহাসি।
----- বউ কে কাছে পাই বাবুর শীত দুঃখে পালাইছে। ------- মুক্তার মালার যাদুময় পরশে বাবু র শীত হইছে কাবু।
.....
--- মশাই! আপনার নাম রাখা উচিত ছিল 'শীত বাবু'। মুক্তার খিলখিল হাসি।
----- ওহো! একমাত্র ছেলে তো! আদর করে সবাই 'বাবু' ডাকে। তুমি অন্তত ঐ নামে ডেকো না, প্লিজ।
........
শীতকালীন নারকেল গুড়ের ম্যারা পিঠা বানানোর সময় এক খালা বলেছিলেন --- পিঠার কোণা বার করতে পারলে বোঝা যাবে নতুন বউ গুণী।
কয়েকবার প্রচেষ্টার পর সফল হলো... -- দ্যাখেন! দ্যাখেন! কোনা বের করতে পারছি। চেষ্টায় সবই হয়।
--- সত্যিই আমার লক্ষী বৌমার অনেক গুণ।
শাশুড়ির গুণগানে মুক্তার সাদা দাঁতগুলো ঝিকমিকিয়ে উঠলো যেন।
........
দিন গড়িয়ে পেরুলো দু' বছর।
লতিফ সাহেবের জীবন বৃত্তান্তে বাবা পরিচয় যুক্ত হবে আর কয়েকমাস পর - --
বর্ণময় স্বপ্নিল দিনগুলোয় হাঁসের মাংস খাওয়ার শখ হলো মুক্তার।
-- - শীতকালে চর্বি জমা হাঁসের মাংস বেশ সুস্বাদু। এই মাংস খেলে শরীর সতেজ ও চাঙা হয় । মা, হাঁস রান্না করো আজ। ছেলের কথায় রান্না করা হলেও খেতে গিয়ে ঘটলো বিপত্তি।
--- বৌমা, তুমি এখন গর্ভবতী। তোমার খাইতে হবে বাছা খাবার। হাঁসের মাংস খাইয়ো না।
--- কেন, আম্মা?
--- মুরুব্বি রা বলতেন , হাঁসের মাংস খাইলে বাচ্চার কন্ঠে হাঁসের আওয়াজ চলি আসে। গলায় ঘ্যারঘ্যারানি শব্দ হয়।
শাশুড়ির এমন নিষেধাজ্ঞায় প্রিয় খাবার খেতে পারবে না ভেবে অনেকটাই চুপসে গেল মুক্তা।
চোখ এড়ালো না স্বামীর।
--- তোমার ছেলে শিক্ষক, স্বামী ছিল শিক্ষক। শিক্ষক পরিবারে থেকে এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করো কেনো, মা?
----- বাস্তবে দেখা। আমার ভাইয়ের বৌ গর্ভবতী অবস্থায় হাঁসের মাংস খাওয়ায় এখন ছেলের কন্ঠ হাঁসের মতো।
--- আমার বাচ্চা 'প্যাক প্যাক' আওয়াজে কথা বলবে। ভাবতেই অন্যরকম লাগছে। আনকমন বাচ্চা! সবাই একনামে চিনবে। দাও,দাও মা। মুক্তাকে ও দাও। মজা করে খাবো তোমার রান্না করা বিখ্যাত হাঁসের মাংস।
হবু নাতির কন্ঠ নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হলেও ছেলের একরোখা স্বভাব জানেন বিধায় কথা না বাড়িয়ে হাঁসের মাংস খেতে দিলেন দুজনকেই।
বৌমার উপর মনঃক্ষুণ্ন হলেন...
-- 'কি যে দিনকাল আসছে! প্রতি কথা স্বামীকে না জানালে পেটের ভাত হজম হয় না আজকালকার মেয়েদের!'
................
বাড়ির উত্তর দিকের বিশাল সরিষা ক্ষেত দেখে মুক্তার চোখে মুগ্ধতার দৃষ্টি!
--- হলুদের বিশাল মেলা! হলুদ পরীরা যেন মহা সমাবেশ করে শীতের রিক্ততায় রং ও প্রাণের স্পন্দন নিয়ে আসেছে।
---- সারা ক্ষেত ভরা মুক্তার ঝিকিমিকি। সরিষা ফুল ফল হয়ে বীজে পরিণত হয়। ঐ বীজের উপকারিতা প্রচুর। ক্যান্সার প্রতিরোধে, রিউম্যাটিক আর্থ্রাইটিসের ব্যথা কমাতে, মাথায় চুলের পরিমাণে বাড়াতে..... -
-- লেকচার বাদ দাও। ওটা ক্লাসের জন্য বরাদ্দ রাখো। তোমার ভান্ডারে আজ কোন ছড়া বা কবিতা নাই? ..
--- আছে। শোন- -
" জানিনা কোন্ মিছে মায়ায়
মন ছুটে যায় বারে বারে,
আমার সরিষা ক্ষেতের ধারে
প্রকৃতির সৌন্দর্য আছে ভরে।
মনটা নিয়েছে কেড়ে
সরিষা ফুলের সুগন্ধি প্রাণে
মৌমাছি মধু সংগ্রহ করে ফুলে
পাগল করেছে তাদের মিষ্টি গানে।
মন চায় থাকি আরো কিছুক্ষণ
এই অপরুপ সৌন্দর্যের মাঝে
মাঠের পর মাঠ সৌন্দর্য আছে ভরে
তাই আমার খুশীতে মন সাজে।
এদের নেই কোন স্বার্থকতা
বিলিয়ে দেয়া আপন মনে
তাদের অপরুপ সৌন্দর্য আমরা
উপভোগ করছি আপন প্রাণে।
-- কবির নাম বলো। বেচারার কষ্ট করে লেখা কবিতাখানি!
--- লেখকের নাম! Wait. ডায়রীতে লিখে রেখেছিলাম। .. পেয়েছি- মোঃ বুলবুল হোসেন।
..........
চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে নিজেদের দোতলা বাড়ীটায় প্রথম আগমনের দিন মুক্তার খুশী যেন বাঁধ মানছিল না। তারেক আর সুমি ছিল ছোট।
--- ছাদ বাগান করার শখ আমার অনেকদিনের। পুরো ছাদ জুড়ে থাকবে হরেক রকমের গাছপালা। ফুল, ফল, সবজি গাছ... উল্লসিত মুক্তার উচ্ছাস উক্তি!
তিন চার বছরেই ফুল, ফল, সবজি গাছে ছাদের রুপ গেল পালটে। পরিকল্পনা মাফিক বাগান।
বেলা না গড়াতেই শীতকালে বিকেল!
ছাদ বাগানে মুক্তার তৎপরতায় প্রশংসনীয় দৃষ্টি লতিফ সাহেবের।
---- দেখো! গোলাপ আর গাঁদা ফুলগুলোর পাপড়ি জুড়ে- কি বাহারি শিল্পকলা! হলুদ, লাল, কমলা রঙ! ছন্দের দোলায় দোলে মন! ---
" গোলাপ হাসে পাপড়ি মেলে কি বাহারি ফুল সে,
হলুদ বরণ মিষ্টি গাঁদা সাজায় খুকুর চুল যে।' - কে যেন লিখেছে ছড়াটা!
--- কবে থেকে ছড়াকার হলে? সুন্দর তো!
-- ( ডায়রী দেখে) বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় সেদিন পড়েছিলাম। লেখকের নাম- 'শাহজাহান আবদালি'।
---- সাহিত্যপ্রেমী তুমি! হলে জুওলজির শিক্ষক!
বাংলা র শিক্ষক হলেই বোধ হয় মানাইতো বেশী।
--- তুৃমি পাশে থাকলে সাহিত্যমনা হয়ে যাই।
--- নিজে তো কখনো একটা কবিতা ও লিখতে পারো নাই!
--' তোমায় যখন কাছে পাই,
ভাষাগুলো হয় এলোমেলো বিক্ষিপ্ত -
কোথায় যেন হারিয়ে যায়,,
তোমায় যখন কাছে পাই
আমি নিজেই যেন কবিতা হয়ে যাই,
যার নেই কোন শব্দ
নেই কোন শুরু - নেই কোন শেষ' -- নির্বাক.. নিস্তব্ধ..
-- চলনসই। 'কবিতা ' হবে তোমাকে দিয়ে। তবে আমার মনে হয় যখন আমি থাকবো না তখন তোমার কবিতার ভাষা বিরহের সুরে আরো প্রাণময় হয়ে উঠবে।
-- কি অলুক্ষনে কথা বলো,, মুক্তা। তুমি না থাকলে কবিতা লেখা, শুনা, পড়া -- সবকিছু কে দিয়ে দেবো ছুটি। তবে তুমি জানো না, আমি তোমাকে নিয়ে লুকিয়ে একটি কবিতা ও লিখেছি। শুনবে? ডায়রি নিয়ে আসি?
--- না থাক্। এখন সময় নাই। নিশ্চয়ই অনেক বড়! সংসারে কত কাজ! দিও পরে - অবসর সময়ে পড়বো।
..........
স্মৃতিগুলো ও যেন আজ তাল সুর হারিয়ে ভবঘুরে টাইপ.. খন্ড খন্ড রুপে মনের কুঠরির এখানে ওখানে হানা দেয় .. তারপর ... হঠাৎই... উদ্বিগ্ন স্বর..
--- ওগো! শরীর কেমন যেন লাগছে! বুকটায় কষ্ট হচ্ছে... শীতকালীন সান্ধ্য কুয়াশায় মিলিয়ে যেতে থাকলো মুক্তার কন্ঠ। কতোই বা বয়স হবে তখন! পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই! পৃথিবী কে এ্যাতো তাড়াতাড়ি বিদায় জানালো!...
---- যেও না, প্রিয়তমা! তুমি ছাড়া বড় lonely feel করি। শারীরিক অবস্থা ও দিনকে দিন deteriorate করছে। Please, যেও না। আমায় তোমার সাথে নিয়ে যাও..
. ---- দাদাজান! ও দাদাজান! বিরবির করিয়া কি বলিয়া যাইতেছেন?
---- কে তুমি? মুক্তা! ফ্যালফ্যালিয়ে চেয়ে বললেন।
---- দাদীজান তো মারা গিয়াছিল। অনেক বছর হইল.. এখন ঘরে চলেন। ম্যলা ক্ষণ রইদ পোহাইতেছেন।
.... ......
সন্ধ্যায় লিপি রুমে পড়ছিল। ফেন্সি মুখে চাপা হাসি নিয়ে ঢুকল।
-- আপাগো, এই বয়সে ও দাদাজান একটা 'রসের হাঁড়ি'!
--- কি করে বুঝলি?
-- সকালে ছাদে রইদ পোহাইবার সময় প্রিয়তমা, ডেটিং - এই সব বলিয়াছিল।
-- আচ্ছা! তুই কি বয়স লুকিয়েছিস্? এই অল্প বয়সে এতো সব জানলি কি করে?
--- আমার খালাতো বইনের সাথে পাশের বাড়ির কামাল ভাইয়ের ' ইয়া' হইয়াছিল। সে এইসব কথা বলিত।
-- আচ্ছা এখন যা! পড়া আছে।
হাসি পেল লিপির। হায়! ভাষার কি হাল! অবশ্য ভাষার এই পরিবর্তন ওর মুখে মানিয়েছে বেশ!
ফেন্সির জন্য মায়া হয়! অভাবের তাড়নায় মা বাবার সঙ্গ বঞ্চিত। খেলার বয়সটায় অন্যের ঘর সংসারের কাজ নিয়ে ব্যস্ততা! কোথায় 'জাতীয় শিশুনীতি'? মুখ থুবড়ে পড়ে আছে যেন নীতিটি ।
তিনদিন পর...
দিলরুবা বেগমের চীৎকার চেঁচামেচিতে শীতল হাওয়া থেকে গরম ভাঁপ বের হতে লাগলো যেন।
--- -- এ্যাই শুনছ? আব্বার ঘড়িটা পাচ্ছি না। যেটা সোহেল পাঠাইছিল কানাডা থেকে। আহারে! কত শখ করে ছেলেটা দাদা ভাইকে দিছিল!
লিপির ভাই সোহেল স্টুডেন্ট ভিসায় কানাডায় লেখাপড়া করে।
--- ভাল করে খুঁজেছ? খাটের তলায়, তোষকের নীচে, আলমিরার পিছন ও দেখো।
--- ওলট পালট কথা বলো না তো! ঘরে কি ছোট কোন বাচ্চা আছে নাকি- যে এদিক সেদিক ছুঁড়ে মারবে? মেজাজ খারাপ হলো দিলরুবা বেগমের।
-- কি জানি? কে আর নিবে?
--- যাও তো! নিজের কাজে যাও।
ধমক শুনে তারেক সাহেব সরে গেলেও একটা কথা মনে আসায় আবার ফিরে এলেন..
বললেন--- ইদানিং বাবা জিনিসপত্র মানুষজনকে দিয়ে দেন। এই তো সেদিন নিজের মোবাইল আর ছাতা রাস্তার এক ভিক্ষুককে দিয়ে দিলেন। মোস্তফা ভাই না বললে জানতে ও পারতাম না। ঘড়িটা ও কাউকে দিয়ে দিলেন কিনা?
-- কি যে সব কথা! এসব অলুক্ষণে কথা বলি ও না তো! ছেলেটার কতো কষ্টের রোজগারের টাকায় কেনা ঘড়িটা..
গেইটের সামনের মুদি দোকানদার গোলাম মোস্তফা। লতিফ সাহেবের ফ্যান!
তার ভাষায় -- স্যার হইতেছে জ্ঞানের ডিব্বা। তার কাছ থেকে শিখনের অনেক কিছুই আছে। যদি জীবনের শুরুতে স্যারকে পাইতাম! অনেক কিছু জানতে পারতাম। এরকম মনোযোগী শ্রোতা পেয়ে লতিফ সাহেব ও খুশী। প্রায় বিকেলে দোকানে কিছুক্ষণ বসে জ্ঞানমূলক কথা শুনিয়ে গোলাম মোস্তফার জ্ঞানের তৃষ্ণা মেটানোর প্রয়াস চালান।
তারেক সাহেব তৎক্ষনাৎ দোকানে ছুটে গেলেন। রহস্য উদঘাটন দ্রুত করতে হবে। নচেৎ দিলরুবা বেগমের হুলস্থুল কান্ডে বাসায় থাকা মুশকিল হবে....
--- মোস্তফা ভাই, বাবাকে কি হাতঘড়িটা ইদানিং কাউকে দিতে দেখেছেন?
-- স্যারের হইলো দয়ার শরীর। কারো কোন অভাব দেখলে সাহায্য করতে চান। না, এর মধ্যে স্যারকে কাউকে কোন ঘড়ি দিতে দেখি নাই।
দিলরুবা বেগম রোষ ঝাড়লেন শশুরের উপর
- -আব্বা! ঘড়িটা কি কাউকে দিছেন? কত দামী ঘড়ি! আপনার নাতির স্মৃতি!
-- কি জানি, মা! ঘড়িটা যে কোথায় রেখেছি! মনে পড়ছে না। বাথরুমে নাকি ছাদে...
-- অনেক কথাই তো মনে থাকে। আর ঘড়ির কথা ভুলে গেলেন? কি যে সব ঝামেলা তৈরি করেন এই বয়সে ও ! কন্ঠে উস্মা।
দিলরুবা বেগমকে একপাশে ডেকে রাগত স্বরে জনাব তারেক বললেন --- বাবার সাথে এভাবে কথা বলছ কেন? বাবা আলঝেইমার্সজনিত ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত। মস্তিষ্কের ক্ষয়জনিত এক নিঃশব্দ ঘাতক রোগ- যা মস্তিষ্কের আশে পাশের স্নায়ুকোষগুলোকে অস্বাভাবিক করে দেয়। এ ধরণের রোগীরা অতীতের তুলনায় সাম্প্রতিক ঘটনাবলী কে বেশী ভুলে যেতে শুরু করেন।
শশুর তাকে নিজ মেয়ের মতোই আদর করেন। এভাবে ঝাড়ি মেরে কথা বলায় নিজের ও খারাপ লেগেছে। তাই স্বামীর কথায় কোন প্রত্যুত্তর করেনি।
.... ….….....
ঘড়ি খোঁজাকালীন ফেন্সির ফ্যাকাশে মুখ লিপির চোখ এড়ালো না। সন্দেহ হলো। রুমে ডেকে বন্ধ রুমে শুরু হলো জিজ্ঞাসাবাদ।
---- সত্যি করে বল্! দাদাভাইর ঘড়িটা কি তুই নিয়েছিস্?
তোকে কি আমরা কম আদর করেছি? যখন যা চেয়েছিস্ দেয়ার চেষ্টা করেছি..
হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল ফেন্সী।
-- আপাগো, ইহাতে দাদাজানের কোন দোষ নাই । আমার মা, ভাই, বইনদের শীতের কম্বল নাই। তোশক ও নাই। তক্তার উপর ছিঁড়া খ্যাতা বিছাইয়া শোয়। এইসব শুনিয়া দাদাজান আমারে ঘড়িটা দিয়া বলিল --- এইটা বিক্রয়ের টাকা দিয়া যেন কম্বল আর শীতের কাপড় কিনি।
--- দে! ঘড়িটা আমার কাছে দে!
..….......
মা র হাতে ঘড়িটা দিয়ে বললো --- ফেন্সির কাছে পেয়েছি। ওর কষ্টের কথা শুনে দাদাভাই ওকে এটা দিয়েছিল। ওর তেমন দোষ নেই।
--- মেয়েটি তো বদের বদ। একবার জানাতে তো পারতো! যে রকম সরল ভেবেছি তা নয়! এখন থেকে সতর্ক থাকতে হবে।
তারপর দিলরুবা বেগম ফেন্সিকে ডেকে বললেন--
---- নিজের মেয়ের মতো আদর করছি তোকে , বিনিময়ে এই প্রতিদান দিলি?
---- খালাম্মাগো, মাফ করিয়া দ্যান। শয়তানে আমারে দিয়া ভুলাই ভালাই এই কাজ করাইয়াছে। কাঁদতে কাঁদতে বলল ফেন্সি।
অনুশোচনার পাশাপাশি অভিমানের ঝড় ও বইতে লাগলো মনে।
" ড্রেসিং টেবিলের উপর প্রায়ই টাকা পয়সা, স্বর্ণের কতো জিনিস পড়িয়া থাকে। এতোদিন ধরিয়া কাজ করি। কোন জিনিস এইদিক-- সেইদিক কুনদিন করি নাই। সামান্য একটা ঘড়ির জন্য খালাম্মা এইরকম অবিশ্বাস করিল! ... "
................
বাবা আর মেয়ের কর্মকান্ড দিলরুবা বেগমের কাছে ধোঁয়াটে লাগলো। দরজা বন্ধ করে অনেকক্ষণ আলোচনার পর প্রাইভেট গাড়ী নিয়েে কোথায় যেন বের হলো। বিস্ময়ের মাত্রা চরমে উঠলো - বড় বড় কিছু প্যাকেট নিয়ে বাবা মেয়ে সহ ড্রাইভার খলিল মিয়াকে বাসায় ঢুকতে দেখে।
একদিন পর...
একটি সাদা প্রাইভেট কার কে বিকাল চারটায় ফেন্সিদের বাড়ীর পাশে থামতে দেখে শুরু হলো গ্রামে গুজগুজ ফিসফিস।
খলিল মিয়া কম্বল আর একটা বড় ব্যাগ ফেন্সির বাবার হাতে দিল।
. ---- "এই ব্যাগে শীতের জামাকাপড় সহ চাল, ডাল, তেল, কিছু ফলমূল আছে। এখন থেকে ফেন্সি তোমাদের কাছেই থাকবে। স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিও। প্রতি মাসে ওর পড়ার খরচ হিসেবে কিছু টাকা পাঠাবো"--তারেক সাহেব বললেন।
আবেগাপ্লুত নির্বাক ফেন্সির বাবা পা ছুঁয়ে সালাম করার জন্য এগুতেই বাধা দিলেন।
---- আহা! করো কি? যা করছি, ফেন্সির কথা ভেবেই করছি। ঘরের সবাই ওকে ভালবাসে। আর, এই পাঁচ হাজার টাকা রাখো। ফেন্সির বেতন।
ছনের ছাউনি দেয়া মাটির ঘরে চার ছেলেমেয়ে নিয়ে বসবাস এই হতদরিদ্র পরিবারটির। বেড়ার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারা সূর্যটা যেন নতুন কোন স্বপ্নের ছোঁয়ায় আজ আরো বেশী আলো ছড়াচ্ছে। সেই আলোয় উচ্ছ্বসিত পরিবারটির স্বপ্নগুলোর ডানা যেন বিস্তৃত হলো।
ফেন্সীদের ঘরের ভেতর ও আশপাশের পরিপাটির ছাপ দিলরুবা বেগমকে সন্ত্তষ্ট করলো।
--- তোমার ঘর, চারপাশ বেশ পরিচ্ছন্ন। ভাল লাগতেছে। অল্প যা আছে, সেটুকুই পরিস্কার করে রাখছো--- এটা একটা বড় গুণ।
--- আফা, আপনার ভাল লাগছে, এইটাতেই আমি খুশী।
অতিথি আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়লো ফেন্সির মা- বাবা। খেজুর রসের পায়েস, ভাঁপা পিঠা পরিবেশের সাথে মানানসই খাবারগুলো খেল সবাই তৃপ্তি নিয়ে।
বড় বড় গাছের নীচে, পুকুর পাড়ে, ধান ক্ষেত... সরিষা ক্ষেতের পাশে ছবি তোলায় কেটে গেল পরবর্তী এক ঘন্টা।
লতিফ সাহেব ও বেশ উপভোগ করছেন। সরিষা ক্ষেত, ধান ক্ষেত, পুকুর-- এগুলোর সাথে যেন তার আত্মার সম্পর্ক। অতীত হানা দিলো তার মনে! সাবলীল ভঙ্গিতে উঠানের মাঝখানে আসরের মধ্যমনি হয়ে একটা চেয়ারে বসে গল্পে মেতে উঠলেন। শীতল পাটিতে বসা সামনে কিছু মনোযোগী শ্রোতা।
দেখতে দেখতে বিদায়ের সময় এসে গেলো। খলিল মিয়া লতিফ সাহেবের কাছে গেলেন।
---- দাদাজান, চারঘন্টার পথ পাড়ি দিতে হবে। এইবার উঠেন।
---- আরো কিছুক্ষণ থাকলে হয় না! ছেলেবেলার কাহিনীটাই শেষ করতে পারলাম না।
----- শীতকালের বেলা। তাড়াতাড়ি গড়ায়। যাইতে যাইতে অনেক রাত হই যাবে। স্যারকে বলে আরেকদিন আসতে পারবেন।
. ... বুড়া মানুষ টা অনেক কিছু জানে। জ্ঞানী মানুষ.. !
... কথা কি সুন্দর! বারবার শুনতে ইচ্ছে করে।
.... আহা! পুরোটা শুনতে পারলাম না!
শ্রোতাদের মাঝে গুঞ্জন শোনা গেল!
................
লতিফ সাহেবকে দেখে প্রচন্ড হাসি পেল সবার। নতুন চাদরটা গায়ে নেই, চামড়ার জুতার পরিবর্তে পায়ে ক্ষয়ে যাওয়া পুরনো স্পঞ্জের স্যান্ডেল।
বিব্রত কন্ঠে বললেন--- বেচারারা খুব অভাবে আছে। দিয়ে দিছি। আমার তো অনেক আছে..
সবাইকে অবাক করে দিলেন তার প্রিয় বৌমা।
--- ভাল কাজ করছেন, বাবা। জানতাম, আপনি এই কাজ করবেন। তাই ডাবল ডাবল আনছি আপনার সব জিনিসপত্র ।
ফেন্সিকে বিদায় জানাতে গিয়ে সবারই চোখে পানি এলো।
---- আপনাদের জন্য সবসময় আমার পরাণ কাঁদিবে। স্কুল বন্ধ হইলেই চলিয়া যাইবো।
--- ফেন্সি, তুই সবসময় এভাবেই কথা বলিস্। মজা লাগে শুনতে। হেসে বলল লিপি।
---- আপা, আপনার বিবাহের সময় অবশ্যই আমি উপস্থিত থাকিব। দোয়া করি, আপনার হাজবেন্ড যেন দাদাজানের মতো 'রসের হাঁড়ি' হয়।
দাদাভাইর উচ্চ হাসিতে সবাই শরিক হলো।
কিছু মানবিক মানুষের সরব উপস্থিতি শীতকালের হিমেল হাওয়ায় উষ্ণতার পরশ বুলিয়ে শুস্ক প্রায় নিরাভরণ প্রকৃতিকে রঙিন সাজে সাজিয়ে দিল।
সেই সাজ মানব সেতু বন্ধনের আলোয় আলোকিত করে তুলল চারদিক।
কলমে-- ফয়জুন্নেসা জেসমিন