স্কুল জীবনের দিনগুলো কতোই না মধুর ছিল! মনের মনিকোঠায় এখনো জ্বলজ্বলে সেই স্মৃতি। পিছু ডাকা সেই দিনগুলোর কথা ভেবেই লেখা..
*** স্মৃতির এপার ওপার ***
( ছবিঃ সংগৃহীত)
ছুটির ঘন্টা পড়ার সাথে সাথে হৈ হুল্লোড় করে ক্লাসরুম থেকে কথার খই ফোটাতে ফোটাতে বের হওয়াটা যেন স্কুল জীবনের নিত্যকার চিত্র। ক্লাস নাইনের একদল মেয়ের মাঝে দুই বেনী করা শ্যাম বর্ণের গোলগাল নীল নয়না মেয়েটির নাম রুনা। তার হাত ধরে থাকা মিষ্টি চেহারার লম্বা মেয়েটি শম্পা- উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, চুলগুলো কোঁকড়ানো । দুই বিনুনি তার ও। পরিচিতদের কাছে মানিকজোড় খ্যাত বান্ধবীদ্বয় ক্লাস ফোর থেকেই এক বেঞ্চে বসে, একরকম চুল বাঁধে।
আজ স্কুল বাস আসবে না। হেঁটেই বাসায় যেতে হবে। অসুবিধা কি? গল্প করতে করতে প্রায় দেড় কিলো পথ কখন শেষ হয়ে যাবে! টেরই পাবে না।
কিশোর বয়সের মনের রঙগুলো সবে বিচ্ছুরিত হতে শুরু করেছে। এ বয়সটায় অচেনা কোন তরুণকে দেখলে অজানা আশংকার লাল বাতি যেমন জ্বলে উঠে মনের কোণে, তেমনই অচেনা এক অনুভূতির আলোয় লাজে রাঙা হয় গাল দুটো। রাস্তার পাশে দোকানে প্রায়শ বসে থাকা কয়েকজন যুবককে দেখে রুনার বয়সীদের তেমনই অনুভূতি জাগে। পাশ থেকে এ কথা ও কথা শোনা যাচ্ছে। কেউ একজন 'খুকি' সম্বোধন করল। শুনে পিত্তি জ্বলে!
--- শম্পা, আমাদেরকে খুকি খুকি দেখা যায় বুঝি ?
---- দুই বেনী আর ফ্রক সিস্টেমের স্কুল ড্রেস এর কারণেই বোধ হয় খুকি খুকি দেখা যায়।
ঠিক তখনই দোকানে বসা একজন যুবক তাদের দলটির উদ্দেশ্যে বললো -- ডানে ঘুর্।
দলটির এক জুনিয়র বোন প্রত্যুত্তরে বললো --- উল্টো ফির্। সমবেত হাসির আওয়াজ শোনা গেল।
বাসায় আসার পর ভাত খেতে খেতে মায়ের কাছে স্কুলের কথা বলা ই শেষ হয় না রুনার। বান্ধবীদের কথা, শিক্ষক দের কথা..
----- আস্তে আস্তে! গলায় ভাত আটকে যাবে তো! মায়ের প্রশ্রয়মূলক বকুনি... ।
----- খেয়ে একটু বিশ্রাম নে, মা। সন্ধ্যায় পড়তে বসতে হবে।
...............
আজিজুল হক স্যার পড়ান ভুগোল। নোয়াখালী ভাষায় কথা বলে প্রচুর মজা করেন। আজ মেহেদী পড়া না পারায় স্যার বেত দিয়ে বাড়ি দেয়ার ভান করে বললেন ---- আব্বা বোলা। তই আর মাইত্তাম ন।
সত্যি সত্যি সে 'আব্বা' ডাকল। রাজু পড়া বলতে না পারলে ও 'আব্বা' ডাকলো না।
স্যার বেত দিয়ে রাজুকে হালকা বাড়ি মেরে বললেন ---- আঁই কি মারিনি? বেত এ না আঁরে দি মারায়। হালাই দি ইযারে। শুরু হলো হাসাহাসি।
পরবর্তী বাংলা ক্লাস মোসলেহ উদ্দীন স্যার এর । একটা গল্প পড়তে গিয়ে "চমৎকার" শব্দটিকে পড়ছেন "মচৎকার", 'লুটোপুটি ' কে " ফাটাফাটি', 'নরম' কে 'চরম'।
প্রথম প্রথম ভেবেছিল স্যারের চোখের প্রবলেম। পরে বুঝতে পারল এটা স্যারের পড়ানোর একটা টেকনিক - ছাত্রদের মনোযোগ আছে নাকি তা পরীক্ষা করার জন্য ইচ্ছাকৃত ভূল পড়েন!
----- পড়ার ভুল! তাও আবার স্যারের! ভুল শুধরিয়ে স্টুডেন্ট রা বেশ মজা পায়। ক্লাসফ্রেন্ডদের সাথে সুর মিলিয়ে রুনা ও চীৎকার করছিল- 'চমৎকার', 'লুটোপুটি', 'নরম'।
পাশে বসা শম্পার নিস্পৃহতায় অবাক হলো। ওর মন যেন কোন্ সুদূরে। হালকা ধাক্কা দিয়ে ইশারায় কারণ জানতে চাইলো। শম্পা ও আশ্বস্ত করল, নিস্পৃহতার কারণ পরে জানাবে। ওদের বন্ধুত্ব এমন যে- একজনের কষ্ট অন্যজনকে ও ছোঁয়। কিছু তো ঘটেছে! জানার প্রবল ইচ্ছেটা রুনার পড়ার মনোযোগ কেড়ে নিল। আচমকা শম্পা ছোট্ট একটা চিরকুট গুঁজে দিল রুনার হাতে।
---- স্কুলে বলা যাবে না। সন্দেহ করবে সবাই। বিকেলে ছাদে বলব। ব্যাপারটা সিকরেট।
ফিসফিস করে রুনা বলল---- তুই কি ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছিস্? আজ বৃহস্পতিবার - হাফ ক্লাস। আরো দু' ঘন্টা পর ছুটি!
কি আর করা!
ধৈর্য ধরা ছাড়া!
একই বিল্ডিং এর দোতলা আর চারতলায় দুজনের বাসা। বিকেলের ছাদ যেন দুই বান্ধবীর উচ্ছ্বলতায় আরো প্রাণবন্ত হয়ে উঠে।
শম্পার হাত থেকে প্রেম পত্রটা নিয়ে পড়ল রুনা ------
" শম্পা,
সাহসের অভাবে
পারছি না মনের ভাব প্রকাশ করতে।
জানি না, কেন এমন হয়?
তোমাকে দেখলেই উদাস উদাস
ভাব জাগে মনে।
মনে হয়, পৃথিবীটা যদি- -- হতো শুধু দু'জনার।
❤️রাসেল ❤️"
---- দশম শ্রেণির রাসেল ভাই! অল্প বয়সেই পেকে গেছে দেখছি! উত্তেজিত কন্ঠে বলল রুনা।
---- আস্তে কথা বল্। আশে পাশের লোকজন শুনে ফেলবে।
----- কি বলিস্! এই বয়সেই প্রেম করার শখ! দাঁড়া! স্যারকে বলে শখ কে শকে পরিণত করবো।
---- বাদ দে। সামনে পরীক্ষা উনার। ভালো লেগেছে, প্রকাশ করেছে।
---- ওরে আল্লাহ! দরদ দেখি উথলে পড়ছে।
--- দুর! তা নয়। আম্মু টের পেলে দোষ দেবে আমাকে। আব্বু ও স্কুল যাওয়ার উপর ১৪৪ ধারা জারি করবে।
হঠাৎ কি মনে করে হাসতে হাসতে রুনার চোখে পানি চলে এলো। শম্পাও হাসলো-- তবে- না বুঝে। দু' জনার হাসি থামতে সময় লাগলো। বয়সজনিত রোগ!
--- হাসছিস কেন?
--- তোর হাসি দেখে।
হাসাহাসির কারণটা জানা গেল খানিক পরই।
তোকে বকাবকি করার সময় আন্টির মুখের ভাষার কি হাল হবে তা ভাবতেই হাসি পায়।
রুনা অভিনয় করে দেখালো ---- তোর ভোঁদাই ( আন্টি বোকাদেরকে ভোঁদাই বলেন) মার্কা চালচলনের কারণে এই ছেলেটা সাহস পেয়েছে পত্র লেখার। আর এরকম গোবেচারা টাইপ থাকিস না। মাথা টানটান করে মুখে কঠিন ভাব নিয়ে থাকবি। যেন কোন ছেলে কাছে ঘেঁষা তো দুরের কথা, চোখ তুলে ও যেন তাকাতে না পারে।
---- পারিস্ ও তুই! মা ঠিক এমনই বলতেন।
---- আন্টিই ঠিক। মা বলেন উল্টোটা - -- তার ভাষায় -- পুরুষালী ভাব কেন থাকবে মেয়েদের মধ্যে? চলা, কথায় মেয়েরা হবে নম্র, সংসার দেখভাল করার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করার জন্য হবে ধৈর্যশীল।
ঐ ঘটনার পর থেকে রাসেল ভাইয়ের সাথে খুব কমই দেখা হতো। অ্যাভয়েড করে চলেন - ভয় পেয়েছেন সম্ভবত! আচমকা একদিন দুই বান্ধবীর মুখোমুখি হয়ে লন্ডভন্ড অবস্থা হলো বেচারার। 'কেমন আছেন?' জিজ্ঞেস করা হয়নি স্বত্তেও নার্ভাস কন্ঠে বললেন, "ভালো আছি।" পরক্ষণেই শোনা গেলো , "সরি।" তবে সরি শব্দটা নিয়েই দুই হাস্যরত বান্ধবীর মতানৈক্য ঘটলো---
---- ক্লাসের টপ স্টুডেন্ট। ভালো লাগার মানুষের সামনে কেমন নার্ভাস! 'সরি' কে 'চরি' বললো, দেখেছিস্! রুনা বলল।
--- না! সরিই বলেছে। তুই না! শুধু দোষ খুঁজিস্।
--- খুব দরদ, তাই না? জীবনের প্রথম অফার তো! দাঁড়া, আরো অবজার্ব করি... যদি 'স' কে 'চ' উচ্চারণ করে তবে উনার নামকরণ করবো 'রাচেল'।
এর প্রায় সাত/ আটদিন পর স্কুলের পাক্ষিক উপস্থিত বক্তৃতায় প্রথম হয়ে রাসেল ভাই তার নতুন নামকরণের বিরোধিতা করলেন যেন।
শম্পা বলল ---- দেখেছিস্! কতো পারফেক্ট উচ্চারণ! যা ভেবেছিস্ তা নয়।
---- সত্যিই আমি মুগ্ধ! কি স্মার্টলি বলেছেন! বক্তব্যেই মেধার পরিচয় পাওয়া গেছে।
ঝুড়ি নিয়ে বিক্রয় করতে বসা হারুন কাকার কাছ থেকে মজার জলপাই কিংবা বরইর আচার কিনে স্কুলের কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে আড্ডারত বান্ধবীদের সাথে কাড়াকাড়ি করা, টিফিন পিরিয়ডে টিফিন ভাগাভাগি করে খাওয়া, দৌড়াদৌড়ি - গল্পে- আড্ডায় কেটে গেল আরো প্রায় ছয় মাস। ইতিমধ্যেই নবম শ্রেণী থেকে উত্তীর্ণ হয়ে রুনারা দশম শ্রেণিতে উঠেছে।
...............
পনের দিন পর এস এস সি পরীক্ষা। বিদায় সংবধর্নায় দশম শ্রেণির পক্ষ থেকে ফুলের ডালা ও বিদায়ী শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু গিফট দেয়া হলো। অনুষ্ঠানে রুনা একটি কবিতা আবৃত্তি করলো। শম্পা গাইলো গান।
অনুষ্ঠান চলাকালে শম্পার কানে কানে ফিসফিস করে বলল রুনা ----- যখন গান গাইছিলি রাসেল ভাইর চোখ চুম্বকের মতো আটকেছিল তোর দিকে।
---- দেখলি কি করে? সারাক্ষণই কি তার দিকে তাকিয়েছিলি?
--- ছিলামই তো!
পরীক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে রাসেল ভাই, কনক ভাই ও মিনারা আপা বক্তব্য রাখলেন। হঠাৎই ঘটলো ঘটনাটি। বিদায় প্রোগ্রাম শেষে বেরিয়ে যাওয়ার পথে রাসেল ভাই সামনে এসে বললেন ---- শম্পা! মাশাল্লাহ! সুন্দর গান গেয়েছ। প্র্যাকটিস চালিয়ে যেও। একদিন সুফল পাবে। খ্যাতনামা হয়ে উঠবে।
তারপর খানিকটা ইতস্তত করলেন ---- যদি কখনো আমার কারণে কোন কষ্ট পাও, ক্ষমা করো। 'To error is human' -- জানোই তো! দোয়া করো। সামনে পরীক্ষা! আম্মু আব্বু র আমার প্রতি এক্সপেক্টেশনস অনেক। যেন তাদের মনের আশা পূরণ হয়।
তারপর একটু মুচকি হেসে বললেন, আল্লাহ হাফেজ। আবার দেখা হবে। ভালো থেকো।
ফর্সা সুন্দর চেহারার সাথে হাসিটা মানিয়েছে বেশ! আকস্মিক আগমনে অপ্রস্তুত দুই বান্ধবী মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিল ---- আচ্ছা! দোয়া করবো তো অবশ্যই। ভালো থাকবেন।
' তবে অল্প বয়সের পাকামি স্বভাবটা ঝেঁটিয়ে বিদায় করেন' --- মনে মনে বলল রুনা।
বাসায় পৌছার ঠিক ত্রিশ / চল্লিশ মিনিট পর শম্পা দৌড়ে এলো রুনার কাছে--
----- কি হয়েছে? এমন অস্থির আর ফ্যাকাশে লাগছে কেন আমার প্রিয় বান্ধবীকে।
কান্না জড়ানো কন্ঠে উত্তর দিল ---- খবর শুনেছিস্? বলতে বলতে ছাদে টবে লাগানো বড় আম গাছটার পাশের নির্ধারিত সেই নির্জন জায়গায় রুনাকে হাত ধরে নিয়ে গেল। ---- রাসেল ভাই নাকি বাসায় ফেরার পথে বাস চাপায় মারা গেছেন!
---- কতোক্ষণ আগেই তো কথা হলো। ভালো করে শুনেছিস্ তো? কে বলেছে? কাঁপা কন্ঠে বলল রুনা।
----- এইমাত্র হেড স্যার ল্যান্ড ফোনে আব্বুকে জানালেন। স্পট ডেথ। দু'জনই মন খুলে কাঁদল কতক্ষন।
--- প্রায় সাত বছর ধরে দুই বান্ধবীর হাসি গল্পে অভ্যস্ত ছাদটির প্রাণ থাকলে নিশ্চয় বলতো ---- কিগো? আজ দেখি একেবারে নিশ্চুপ! ঝুলির মধ্যকার হাসি - গল্প কি ফুরিয়ে গেছে?
শুধু সেই দিন নয়, তারপর থেকে প্রতিদিনই ছাদটি একই প্রশ্ন করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়তো! জীবনের রুঢ় বাস্তবতায় উচ্ছলতার জোয়ার যেন পরিণত হয়েছে ভাটায়। '১৯৯২ সালের এগার মার্চ! তারিখটি গাঢ় লাল কালিতে দাগান্কিত থাকবে 'জীবন গল্পে'।
অষ্টম শ্রেণীতে পড়ুয়া ছেলে রাসেল এর স্বরচিত 'স্কুল জীবন' রচনাটি দেখতে দেখতে হারিয়ে গিয়েছিল বেসরকারি কলেজের শিক্ষিকা এক ছেলে ও এক মেয়ের জননী রুনা । আজ কত তারিখ? ৯ মার্চ। আর দুইদিন পরই মৃত্যু বার্ষিকী রাসেল ভাইয়ের।
"কেমন হয়েছে?" ছেলের এ প্রশ্নের উত্তরে অন্যমনস্ক ভাবে "ভালো" বলেই মোবাইল ফোনটি হাতে নিল।
--- হ্যালো! শম্পা, কি করিস্?
---- হ্যালো, রুনা। এখনো ব্যাংকে। একটা মিটিং আছে। এক্ষুনি শুরু হবে। তোকে কিছুক্ষণ পর কল ব্যাক করবো।
--- আচ্ছা! তাড়াতাড়ি ফোন রেখে নিজের উপর বিরক্ত হলো। মনে ছিল না। শম্পার বাসায় ফিরতেই বাজে রাত আটটা। প্রাইম ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার। দুই মেয়ের মা। ভেবেছিলো, ছেলে হলে নাম রাখবে রাসেল। নিজের ছেলে হয়নি দেখে প্রিয় বান্ধবীর ছেলের নাম রাখলো ' রাসেল'। ব্যাংক থেকে ফেরার পর ফ্রেশ হয়ে শম্পা ফোন করবে, জানে রুনা। প্রায় প্রতিদিনই ঘটে এমন, কথাই শেষ হয় না দুজনার! এখনো একজনের কষ্ট আরেকজনকে ছুঁয়ে যায়- যেন একই আত্মার দুটো শরীর। তাদের সম্পর্কের এ গভীরতা অনুপ্রাণিত করে পরিচিত জনদের ও।
ঘড়ির কাঁটা র সাথে সাথে গড়িয়ে যাওয়া অলস কোন বেলায় কখনো কখনো মৃত রাসেল জীবিত রাসেলের চেয়ে শক্তিশালী রুপে হানা দেয় মন কুঠুরি তে।
প্রায় ২৯/ ৩০ বছর পর ও জীবন স্মৃতির পাতায় 'স্কুল জীবন' যেন আজ ও দাঁড়িয়ে দাপুটে ভঙ্গিমায়।
সমাপ্ত
কলমে- ফয়জুন্নেসা জেসমিন