আব্বা,
আশা রাখি ভালো আছ। কেমন লাগছে অইখানে? কার কার সাথে দেখা হলো এখন পর্যন্ত। মুনির চৌধুরী, আহমদ শরীফ, নীলিমা ইব্রাহিম, আনিসুজ্জামান, কাজী দীন মুহাম্মাদ, কবীর চৌধুরী, শওকাত ওসমান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ। অথবা তোমার বন্ধুবরেষুরা… সরদার ফজলুল করিম, আহমদ ছফা, শামসুর রাহমান, গাজী শাহাবুদ্দিন, কাইয়ুম চৌধুরী, কামাল লোহানী, হাবিবুল্লাহ সিরাজী, গোলাম মঈনউদ্দিন… উনাদের খোঁজ পেলে? কেজি মুস্তাফা? কবি দিলওয়ার? কেমন আছেন উনারা? রণেশ দাশগুপ্ত, সত্যেন সেন... উনারা ভালো আছেন আশা রাখি।
আব্বা, তুমি যে এখন আর আমাদের সাথে নাই, আমার মনে থাকে না। সত্যি কথা বলি, রাত বাড়তে থাকলে আচমকা মনে হয়, আজকেতো বাসায় ফোন করি নাই। আম্মার সাথে কথা হয় নাই, তোমার সাথেও হয় নাই। তখন আম্মাকে ফোন করি, তোমাকে আর করিনা, তুমিতো এখন আর অতো রাত জাগো না। আব্বা তুমি যে নাই মনে থাকে না আমার। তুমি অতটাই এখনও রয়ে গেছো!!
ইদানিং খুব খোঁজ করে তোমার সবাই। অনেকেই। যাঁরা অনেকদিন হয়তো খোঁজ করেন নাই, বা কথা হয় নাই। দেখাতো অনেক দূরের কথা। আমি এই ভেবে বিস্মিত হই, উনাদের কাছ থেকে তুমি বিস্মৃত হয়ে যাও নাই। সবাই যে যার মতো ব্যস্ত থাকে আব্বা। এইটা নিয়ে মনে ব্যথা পাবার কিছু নাই। তুমি আমাকেই দেখ না আব্বা, আমিই কি রোজ তোমাকে দেখতে আসতাম? ফোন করতাম? এরকমই আব্বা। তুমি এগুলা নিয়ে মন খারাপ করতা। আমার খুব লজ্জা লাগতো। কিন্তু কিছু করার নাই। অথবা ছিলো। আমিই কুলিয়ে উঠতে পারি নাই। থাক।
আব্বা, বাংলাবাজারে প্রকাশনীগুলাতে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। কারও কারও সাথে কথাও হয়েছে। অনেকেই নিজেও ভুলে গেছে তোমার কি কি বই তাদের কাছে। কারও কারও কন্ঠে বিরক্তিও যে নাই, সেইটা স্বীকার না করলে- মিথ্যা কথা বলা হবে। আমি যা যা পারছি সংগ্রহ করে ফেলার চেষ্টা করছি। আমাদের যে এই সূত্রে অর্থনৈতিক কোনও চাহিদা বা দাবি-দাওয়া নাই, সেইটাই বেশিরভাগ প্রকাশক মানতে চাইছেন না। তুমিইতো নাই আব্বা। বইগুলাইতো এখন তুমি। বইগুলা নিয়মিতভাবে থাকলেই হবে। যেন কেউ তোমাকে খুঁজতে চাইলে বইগুলা অন্তত খুঁজে পায়।
তোমার পান্ডুলিপি বা বছরওয়ারি ডায়েরিগুলা কোথায় রাখা আছে, মনে আছে তোমার? কিছুই খুঁজে পেলাম না। আর সার্টিফিকেটসগুলা? পেনশান, ব্যাংক অ্যাকাউন্টস, এফডিআর কিংবা সিটি করপোরেশানে… বেশ কিছু তথ্য দেয় লাগে। কিছুই দিতে পারছি না। তুমি একসময় আর থাকবা না। আমি বা আমরা ঠিকই বুঝতাম। কিন্তু সময়টা যে এমন অসময়ে আসবে, বুঝি নাই আব্বা। বুঝলে হয়তো তোমার থেকে বুঝে রাখার চেষ্টা করতাম। আবার ভাবি, সেইটাও কি হয় নাকি। থাক। কোনও কিছুই আটকে থাকে না, সমাধান হবে একটা। তোমাকেইতো আটকে রাখা গেলো না!
আম্মা ভালো আছে। চিন্তা করো না। এখনতো বৈশাখ চলে। তুমি চলে যাবার কয়েক সপ্তাহ পর থেকেই শুরু হলো ঝড়-বৃষ্টি। মাঝখানে একদিন তুমুল শিলাবৃষ্টি। সাথে ঠান্ডা বাতাস। আম্মা একটু পর পর সেকি কান্না। তোমার আব্বা এই ঠান্ডার মধ্যে কিভাবে থাকবে!! সর্দি লেগে যাবে। বুকে কফ বসে যাবে। অই যে আব্বা, গত বছর এই সময়ে তোমার যে সিভিয়ার নিউমোনিয়া হইলো, আইসিইউ থাকলা পনের দিন। অই সময়ে কথা মনে করে আম্মা টেনশান করছিলো আরকি। আম্মাকে বোঝানো যাচ্ছিল না। তুমিতো এখন এইসব কিছুর উর্দ্ধে। চাইলেই এখন জোর করে গায়ে কাঁথাটা দিয়ে দেয়া যাচ্ছে না। অথবা খুব গরমে চুপি চুপি এসিটা বাড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। এইসব জাগতিক যত্ন থেকে তোমার মুক্তি মিলেছে। মুক্তি বললাম এই কারণে, আমরাতো শেষের দিকে আসলে বুঝতাম না, কোনটায় তোমার আনন্দ হচ্ছে, কোনটা তোমার বিরক্তির কারণ হচ্ছে। সত্যিই বুঝতাম না। বুঝতে পারতাম না বলে এক পর্যায়ে নিজেরই বিরক্তি লাগতো। আব্বা তুমি কি আমাদের বিরক্তি বুঝতে পারতা? কেমন লাগতো তোমার তখন? আচ্ছা, আমি যে তোমাকে বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলতাম! তুমি কি বুঝে ফেলতা? অমুক ফোন করেছিলো, অমুক তোমার কথা জিজ্ঞাসা করলো, অমুকতো সন্ধ্যায় আসতে চাচ্ছে, অমুকতো এসে বসে ছিলো- তুমি ঘুমিয়ে ছিলা দেখে চলে গেলো… তুমি কি এগুলা বুঝতা আব্বা? আমার ধারণা তুমি ঠিকই বুঝতা আর মনে মনে হাসতা। তোমাকে ফাঁকি দেয়া কঠিন। আমি জীবনে যতবার তোমাকে কিছু নিয়ে ফাঁকি দিয়েছি, পরে কোনও না কোনও সময় বুঝতে পেরেছি, ফাঁকিটা আসলে হয় নাই। তোমার সবকিছু জানা ছিলো, তুমি ঠিক বুঝে ফেলে ছিলা!!
কই থেকে কই চলে গেলাম। তুমি চলে যাবার পর পর আমরা কিছুদিন ছিলাম গাজী ভবন। আম্মার সাথে। আম্মা কিছুদিন পর খুলনা গেলো, দিদি-র কাছে। ফিরে এসে ঈদ করলো আমার বাসায়। এরপর গেলো ময়মনসিংহ। অনেকদিন থাকলো। এখন গাজী ভবন। আম্মা আরো রোগা হয়ে গেছে। তোমার রিক্লাইনিং বেড, হুইল চেয়ার এগুলা কিছুই সরাতে দিচ্ছে না। কী মুসিবত। সারাদিন এগুলা ঝাড়পোছ করে। এগুলো কোনও কথা! আম্মা ভালো আছে। ভালো থাকা ছাড়া উপায়ওতো নাই। আম্মা একা হয়ে গেছে, এইটা ভেবে আবার অস্থিরতা শুরু করে দিও না। আমরা নিয়মিত যাওয়া আসা করছি।
ভালো কথা। আব্বা, সিলেট যাচ্ছি। এমসি কলেজে তোমার যাঁরা ছাত্র ছিলেন, উনারা মিলে তোমার কথা গল্প করবে, স্মরণ করবে। এরকম একটা ইচ্ছা উনাদের। নিজেরাই সব করছেন। আমি প্রথমে জানতে পেরেছি অনলাইনে। পরে অনুষ্ঠানের খব জানিয়ে অনেকেই ফোন করলেন। আমরাও মনে মনে চাইছিলাম, সিলেটে কিছু একটা হোক। একটা স্মৃতি থাকুক। আমি সেইসব স্মৃতিকথন শুনতে যাচ্ছি সিলেটে। তোমার অনেক অনেক গল্প নিয়ে ফিরবো। উনাদের অনেক গল্পে শিশু বয়েসের আমিও হয়তো আছি, পার্শ্বচরিত্র হয়ে। না চাইতেও অনেক মুহূর্ত, অনেক গল্প আর অনেক ঘটনার সাক্ষ্য আমি।
আব্বা তুমি নিজের খেয়াল রেখো। আস্তে আস্তে লেখালেখি শুরু করো আবার। শেষদিকে লিখতে পারতানা বলেতো মন খারাপ করতে। এখনতো আর কোনও অসুবিধা নাই। যত খুশী পড়ো, লেখো, রাত জাগো… কেউ বিরক্ত করবে না তোমাকে। ঘরভর্তি বই/কাগজ/পেপার কাটিং/ফটোকপি/আঠা এইসব ছড়িয়ে নোংরা করে রাখলেও… আম্মা কিছু বলার সুযোগ নাই!!
আব্বা, তুমি হয়তো ভাবো, তুমি চলে যাবার পর তোমাকে বেশি ভালোবাসছি, সেরকম কিন্তু না!! আমার উপর রাগ করে থেকো না। আমি এখন যা যা করছি বা করার চেষ্টা করছি, সেগুলা তুমি থাকতেই শুরু করেছি। ধরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে তোমার নামে ছোট্ট একটা বৃত্তি, তোমার রচনাবলী প্রকাশনা, তোমার প্রথমদিকে বইগুলা নতুন করে করা… এইসবকিছুর আলাপ শ্রেণীমতন হয়ে আছে বছর দুয়েক ধরেই। কিন্তু তোমার সাথে অইসব নিয়ে আমি বা দিদি আলাপ করি নাই। কিন্তু অনেকদিন ধরেই, একটু একটু করে তোমাকে জমিয়েছি আব্বা। সেই জমানো সব গল্প এখন জমাট বাধা দুঃখ হয়ে যে উঁকি মারে না তা না। কিন্তু একটা পরিতৃপ্তি আছে আব্বা। আমরা ভাইবোনেরা তোমাকে কোথাও প্রতিপন্ন হতে দিই নাই। তুমি জানলে হয়তো মনে ব্যথা পাবে, আমার সাফল্যের পথ সহজ করে দিতে, যত জায়গায় যত চিঠি লিখেছো- আমার হাতে দিয়েছো, একটা চিঠিও আব্বা কোথাও দিই নাই আমি। দিদি-র জন্য লিখা যত চিঠি, তুমি আমার কাছে দিয়েছো, সেগুলা একটাও আমি কুরিয়ারে দিই নাই, পোস্ট করি নাই। দিদি জানে এইসব গল্প!! আমি বিশ্বাস করি আব্বা, নিজের যোগ্যতায় দাঁড়িয়ে যেতে পারবার যে আত্মতৃপ্তি, সেইটা কোথাও বিকোয় না, কিনতে পাওয়া যায় না। অর্জন করে নিতে হয়। তুমিতো পেরেছিলা আব্বা, তোমার থেকেই শিখেছি আমরা। আমি সেই চেষ্টাতেই আছি।
পুনশ্চ: আমাকে একটা চিঠি লিখবা আব্বা? আমাকে লিখবার সুযোগ থাকলেও, সেইটে আমার কাছে পৌঁছে দেবার সুযোগ আছে কিনা জানা নাই আমার। তুমিই ভালো বলতে পারবা। অন্যভুবনের কলাকৌশল সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আমরাতো এই মর্ত্যে কিছুই জানি না তার। তুমি সেই বিষ্ময় উপভোগ করতে পারছো, অভিজ্ঞতা নিতে পারছো, তোমাকে ঈর্ষা হচ্ছে আমার, আব্বা!!