বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন শুধু ক্ষমতার পালাবদলে নয়, ক্ষমতা ব্যবহারের সংস্কৃতিতেও প্রয়োজন। বাংলাদেশে সরকার বদলায়, স্লোগান বদলায়, ক্ষমতার চারপাশের মানুষও বদলায়। নতুন মুখ আসে, নতুন প্রতিশ্রুতি শোনা যায়, নতুন আশার জন্ম হয়। রাজনৈতিক মঞ্চে পরিবর্তনের কথা বলা হয়, মানুষের সামনে তুলে ধরা হয় নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—ক্ষমতা ব্যবহারের অভ্যাস কি সত্যিই বদলায়?
আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ক্ষমতার পালাবদল এ দেশের মানুষের কাছে নতুন কোনো ঘটনা নয়। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক দল, নেতৃত্ব ও শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। প্রতিবারই মানুষ নতুন প্রত্যাশা নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চেয়েছে। তারা চেয়েছে ন্যায়বিচার, সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে নাগরিকের মর্যাদা রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করবে না।
কিন্তু পরিবর্তনের প্রত্যাশা আর পরিবর্তনের বাস্তবতার মধ্যে প্রায়ই দূরত্ব তৈরি হয়।
ক্ষমতা বদলায়, মানসিকতা নয় কেন? ক্ষমতা অর্জনের আগে রাজনীতিতে জনগণের কথা বলা হয়। মানুষের অধিকার, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। বিরোধী অবস্থানে থাকলে যে অধিকারগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, ক্ষমতায় যাওয়ার পর কখনো কখনো সেগুলোর প্রতিই দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যেতে দেখা যায়। এখানেই মূল প্রশ্নটি সামনে আসে। সমস্যা কি শুধু কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের, নাকি আমাদের ক্ষমতাচর্চার মধ্যেই এমন কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে, যা বারবার একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করে?
একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতা হলো জনগণের দেওয়া দায়িত্ব, ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। কিন্তু যখন ক্ষমতাকে দায়িত্বের পরিবর্তে অধিকার, সুযোগ কিংবা আনুগত্য আদায়ের উপায় হিসেবে দেখা হয়, তখন পরিবর্তনের ভাষা থাকলেও শাসনের চরিত্রে মৌলিক পরিবর্তন আসে না।
ক্ষমতার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তখন বদলে যায়। নাগরিক হয়ে ওঠে অনুগ্রহপ্রার্থী, সরকারি সেবা পরিণত হয় বিশেষ সুবিধায়, আর প্রশ্ন করাকে কখনো কখনো দায়িত্বশীল নাগরিক আচরণের বদলে বিরোধিতা হিসেবে দেখা হয়।
এই সংস্কৃতি কোনো একটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। কার্যকর জবাবদিহির অভাব থাকলে যেকোনো ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর মধ্যেই এমন প্রবণতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
স্লোগানের গুরুত্ব আছে। স্লোগান মানুষের আশা, ক্ষোভ ও আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করে। একটি স্লোগান মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে, পরিবর্তনের আন্দোলনে অনুপ্রাণিত করতে পারে। কিন্তু স্লোগান নিজে কোনো প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিমূলক করে তোলে না, প্রশাসনের আচরণ বদলে দেয় না কিংবা আইনের শাসন নিশ্চিত করে না।বাস্তব পরিবর্তন বোঝা যায় অন্য জায়গায়।
একজন সাধারণ মানুষ থানায় গিয়ে ন্যায়সংগত আচরণ পাচ্ছেন কি না, সরকারি দপ্তরে কাজ করাতে অযৌক্তিক হয়রানির শিকার হচ্ছেন কি না, আদালতে ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে কি না, সাংবাদিক ও নাগরিকেরা ভয় ছাড়াই প্রশ্ন করতে পারছেন কি না, সরকারি অর্থের ব্যবহার সম্পর্কে তথ্য জানা যাচ্ছে কি না—এসব বিষয় দিয়েই রাষ্ট্রের পরিবর্তনকে মূল্যায়ন করা যায়।
শুধু ক্ষমতার কেন্দ্রে নতুন মানুষ এলেই সাধারণ মানুষের জীবনে পরিবর্তন এসেছে বলে ধরে নেওয়া যায় না। পরিবর্তন তখনই অর্থবহ হয়, যখন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো আরও নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে।
ক্ষমতার চারপাশের মানুষ বদলায়, কিন্তু নাগরিকের অবস্থান?
ক্ষমতার চারপাশে থাকা মানুষদের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, দলীয় পরিচয় কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তির সুপারিশ অনেক সময় মানুষের সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সরকার বদলালে এই বলয়ের মানুষও বদলাতে পারে।
কিন্তু সাধারণ নাগরিকের প্রশ্ন হলো, তাঁর অধিকার কি বদলায়?
একজন নাগরিককে কেন সরকারি সেবা পেতে পরিচয় বা সুপারিশের ওপর নির্ভর করতে হবে? কেন যোগ্যতার পরিবর্তে আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে? কেন আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হওয়ার বদলে কারও পরিচয় ও অবস্থান অনুযায়ী ভিন্ন আচরণের আশঙ্কা থাকবে?
একটি কার্যকর রাষ্ট্রে নাগরিকের অধিকার নির্ভর করার কথা আইন ও নীতির ওপর, ক্ষমতাবান ব্যক্তির ব্যক্তিগত সদিচ্ছার ওপর নয়।
যে ব্যবস্থায় মানুষ অধিকার হিসেবে সেবা পায়, সেখানে সরকার পরিবর্তিত হলেও তার মৌলিক অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকার কথা। আর যে ব্যবস্থায় সেবা ব্যক্তিগত অনুগ্রহের মতো বিবেচিত হয়, সেখানে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সুযোগ-সুবিধাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
এ কারণে ক্ষমতার চারপাশের মানুষ কারা, সেই প্রশ্নের পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্রের নিয়মকানুন কি সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর?
জবাবদিহি ছাড়া পরিবর্তন টেকসই হয় না
ক্ষমতার অপব্যবহার রোধের জন্য শুধু সৎ নেতৃত্বের প্রত্যাশা যথেষ্ট নয়। সৎ নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু রাষ্ট্রকে কেবল ব্যক্তির সততার ওপর নির্ভরশীল করে রাখা যায় না।
কারণ ব্যক্তি বদলায়, সরকার বদলায়, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলায়। তাই এমন প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, যেগুলো ক্ষমতাসীনদের কাজেরও হিসাব চাইতে পারে।
সংসদের কার্যকর ভূমিকা, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা, দায়িত্বশীল গণমাধ্যম, কার্যকর দুর্নীতি প্রতিরোধব্যবস্থা, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম নজরদারি প্রতিষ্ঠান—এসবই জবাবদিহির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
একই সঙ্গে নাগরিকেরও প্রশ্ন করার অধিকার থাকতে হবে। সরকারকে সমর্থন করা যেমন নাগরিকের অধিকার, তেমনি সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করাও তার অধিকার। সমালোচনা মানেই শত্রুতা নয়, আর প্রশ্ন মানেই ষড়যন্ত্র নয়।
একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক, তা শুধু নির্বাচনের আয়োজন দিয়ে বোঝা যায় না। নির্বাচনের বাইরেও নাগরিকের অধিকার, প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা এবং ক্ষমতার ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কতটা রয়েছে, তা বিবেচনা করতে হয়।
ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করার নিয়ম যদি দুর্বল থাকে, তাহলে ক্ষমতাসীনদের সদিচ্ছার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি হয়। আর সদিচ্ছা পরিবর্তিত হলে পুরো ব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়ে।
দায় কি শুধু রাজনীতিবিদদের?
রাজনীতিবিদদের দায়িত্ব অবশ্যই বড়। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ তাঁদের হাতে থাকে। তাই ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাঁদের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
তবে সমাজের অন্যান্য অংশের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।
যখন আমরা ব্যক্তির যোগ্যতার চেয়ে তার রাজনৈতিক পরিচয়কে বেশি গুরুত্ব দিই, যখন নিজের পক্ষের অন্যায়কে ন্যায্যতা দিই, যখন প্রতিপক্ষের জন্য যে নিয়ম চাই নিজের পক্ষের জন্য তা মানতে চাই না, তখন আমরা অজান্তেই দ্বৈত মানদণ্ডকে শক্তিশালী করি।
একই অন্যায় নিজের পক্ষ করলে সমর্থনযোগ্য, আর অন্য পক্ষ করলে অগ্রহণযোগ্য—এই মানসিকতা ন্যায়বিচারের ধারণাকে দুর্বল করে।
গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি শুধু রাজনৈতিক দলের ভেতরে তৈরি হয় না। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, সামাজিক সংগঠন এবং নাগরিক আচরণের মধ্যেও এর চর্চা প্রয়োজন।
আমরা যদি ছোট পরিসরে প্রশ্ন সহ্য করতে না পারি, ভিন্নমতকে সম্মান করতে না শিখি এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছে হিসাব চাইতে অস্বস্তি বোধ করি, তাহলে জাতীয় পর্যায়ে জবাবদিহিমূলক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
আমাদের আসলে কী বদলানো প্রয়োজন?
প্রথমত, ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম নয়, জনসেবার দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে পরিচালিত করতে হবে, যাতে ব্যক্তি বা দল পরিবর্তিত হলেও তাদের নিয়মিত কার্যক্রম, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি বজায় থাকে।
তৃতীয়ত, আইনের প্রয়োগে রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক অবস্থান কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে বৈষম্যের সুযোগ কমাতে হবে।
চতুর্থত, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, সরকারি ব্যয় ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সম্পর্কে নাগরিকের তথ্য পাওয়ার সুযোগ বাড়াতে হবে।
পঞ্চমত, রাজনৈতিক ভিন্নমতকে রাষ্ট্রের জন্য স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় বিষয় হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। কারণ ভিন্নমতহীন পরিবেশে ভুল সিদ্ধান্ত চিহ্নিত করা এবং ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সবশেষে, নাগরিক হিসেবে আমাদেরও মনে রাখতে হবে, কোনো দল বা নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন দেওয়ার অর্থ তার প্রতিটি কাজকে প্রশ্নাতীত বলে মেনে নেওয়া নয়। বরং যে নেতৃত্বের প্রতি আমাদের আস্থা রয়েছে, তার কাছেই নীতি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রত্যাশা থাকা উচিত।
শেষ কথা
বাংলাদেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা কেবল নতুন সরকার দেখা নয়। তারা এমন একটি রাষ্ট্র চায়, যেখানে সাধারণ মানুষ মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারবে, ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য প্রভাবশালী কারও দ্বারস্থ হতে হবে না, নিজের মত প্রকাশের জন্য অযৌক্তিক ভয়ের মধ্যে থাকতে হবে না এবং সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে নাগরিক পরিচয়ই হবে প্রধান বিবেচনা।