Story

সাঁকো

October 21, 2026

44 views

ভোরের কোম্পানীগঞ্জ যেন এক ধ্যানমগ্ন দরবেশ। ফজরের আজানের ধ্বনি যখন ধলাই নদীর বুকে আছড়ে পড়ে, তখন কুয়াশার চাদর ভেদ করে এক অপার্থিব প্রশান্তি নেমে আসে মানবাত্মায়। প্রাকৃতিক এই সৌন্দর্যের মাঝে আবদুল্লাহ তার স্ত্রী এবং দুই কন্যাকে নিয়ে প্রাত্যহিক প্রাতঃভ্রমণে বের হয়েছেন। চারপাশের পরিবেশ ছিল নীরবতার শব্দে মুখরিত, যেন সৃষ্টিজগতের প্রতিটি ধূলিকণা নিঃশব্দে স্রষ্টার জিকিরে মশগুল। আবদুল্লাহর বড় কন্যা প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্য ফ্রেমবন্দি করতে ভালোবাসে। পিতার মুঠোফোন ব্যবহার করে সে ভোরের সূর্যোদয়ের দৃশ্যসহ নদী ও পারিপার্শ্বিক প্রকৃতির বেশ কয়েকটি চমৎকার ছবি তুলে নিল।

ক্যামেরার লেন্স যখন ভোরের প্রথম আলোর স্পর্শ পাচ্ছিল, তখন নৈসর্গিক বাস্তবতার সাথে এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটতে শুরু করে। নদীর শান্ত পানির ওপর ভোরের রোদের কণাগুলো যেন অনুতপ্ত মানুষের চোখের অশ্রু হয়ে নূরানী ঝরনার মতো বয়ে যাচ্ছিল। পারিপার্শ্বিক এই কাব্যিক দৃশ্য আবদুল্লাহর রূহকে এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরিয়ে তোলে। সুফিবাদের 'ফানা' বা নিজের অস্তিত্বকে স্রষ্টার প্রেমে বিলীন করে দেওয়ার এক ঐশ্বরিক অনুভূতি যেন তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। মেঘের দীর্ঘশ্বাসে যেন শুকনো মরুভূমিতেও বিশ্বাসের ফুল ফুটে ওঠে, ঠিক তেমনি ভোরের এই স্নিগ্ধতা আবদুল্লাহর মনের সব জাগতিক ক্লান্তি ধুয়ে দিচ্ছিল। নদীর জলের কলকল শব্দ আর পাতার মর্মর ধ্বনি মিলেমিশে এক ইশকে ইলাহির (ঐশ্বরিক প্রেমের) সিম্ফনি তৈরি করেছিল, যা প্রতিটি ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করা যায়। কিন্তু প্রকৃতির এই অপার্থিব প্রশান্তির রেশ মানুষের ভেতরের অন্ধকারের সংস্পর্শে এসে খুব দ্রুতই এক পরীক্ষার সম্মুখীন হয়।

ভ্রমণ শেষে পরিবারটি যখন তাদের বাসস্থানের দিকে ফিরছিল, তখন তাদের যাত্রাপথে একটি ছোট বাঁশের সাঁকো পার হওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। গ্রামীণ বাংলার এই সাঁকোগুলো নিছক কোনো পারাপারের মাধ্যম নয়; আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো যেন পরকালের পুলসিরাতের এক একটি ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি, যা পার হতে গিয়ে নফস (প্রবৃত্তি) এবং রূহের (আত্মার) নিরন্তর সংগ্রাম চলে। সাঁকোটি পার হওয়ার জন্য পরিবারটি যখন উদ্যত হলো, ঠিক তখনই সাত থেকে দশ বছর বয়সী একটি ছেলে তাদের পথ আগলে দাঁড়াল। ছেলেটির পরনে জীর্ণ পোশাক, চেহারায় দারিদ্র্যের সুস্পষ্ট ছাপ, কিন্তু চোখে এক অদ্ভুত এবং অপ্রাকৃতিক জেদ। সে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জানাল, সাঁকো পার হতে হলে জনপ্রতি দশ টাকা করে দিতে হবে।

আবদুল্লাহ অত্যন্ত শান্ত ও মার্জিত কণ্ঠে ছেলেটিকে প্রশ্ন করলেন, "কেন? এই সাঁকো পার হতে টাকা দিতে হবে কেন?"

ছেলেটি অবলীলায় উত্তর দিল, "এই সাঁকো আমরা ডেকে নিয়েছি (ইজারা নিয়েছি), তাই পার হতে হলে দশ টাকা করে দিতে হবে।"

আবদুল্লাহ ছিলেন আধ্যাত্মিক জ্ঞানে আলোকিত একজন মানুষ। ইমাম গাজ্জালির মনস্তত্ত্বের আলোকে তিনি খুব সহজেই মানুষের হৃদয়ের ভেতরের অন্ধকারকে পড়তে পারতেন। তিনি বুঝতে পারলেন, এই শিশুটির ভেতরে তার 'নফসে আম্মারা' (কুকর্মের নির্দেশদাতা প্রবৃত্তি) কথা বলছে। অভাব এবং দারিদ্র্য অনেক সময় মানুষের কালবের (হৃদয়ের) আয়নায় মরিচা ফেলে দেয়, যা আত্মাকে সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত করে। ছেলেটির হৃদয়ের সেই স্বচ্ছ আয়নায় এখন লোভ আর মিথ্যার ধুলো জমেছে। আবদুল্লাহ অত্যন্ত ধীর ও শান্ত কণ্ঠে বললেন, "তুমি যে এই সাঁকো ডেকে নিয়েছ, তার প্রমাণপত্র নিয়ে আসো।"

এই অকাট্য প্রশ্নে ছেলেটি ভেতরে ভেতরে ঘাবড়ে গেল। তার চোখের তারায় এক মুহূর্তের জন্য যেন এক শুষ্ক মরুভূমির বাতাস বয়ে গেল, যেখানে মিথ্যার ফুলগুলো ঝরে পড়তে শুরু করেছে। কিন্তু অহংকারের বশবর্তী হয়ে সে তার ঘাবড়ে যাওয়াটা বুঝতে দিল না। সে নাছোড়বান্দার মতো পথ আটকে দাঁড়িয়ে রইল। নফস যখন মানুষকে গ্রাস করে, তখন মানুষ তার ভুল বুঝতে পেরেও এক অন্ধ অহংবোধের কারণে মিথ্যার ওপর অটল থাকে। ততক্ষণে আবদুল্লাহর স্ত্রী আশপাশে থাকা স্থানীয় মহিলাদের কাছে জানতে চাইলেন, এই সাঁকো পার হতে সত্যিই কোনো টাকা দিতে হয় কি না। মহিলারা জানালেন যে, সাঁকো পার হতে কোনো প্রকার অর্থ প্রদান করতে হয় না।

সত্য যখন উন্মোচিত হয়, তখন মিথ্যার দেয়াল এমনিতেই ধসে পড়ে। কিন্তু ছেলেটি যেন কোনোভাবেই পথ ছাড়বে না। তার ছোট শরীরের ভেতরে যেন এক বিশাল অহংবোধ বাসা বেঁধেছে, যা আধ্যাত্মিক অন্ধত্বের এক চূড়ান্ত রূপ।

ইমাম গাজ্জালির 'কিমিয়ায়ে সাআদাত' এবং 'ইহয়াউ উলুমিদ্দীন' গ্রন্থের আলোকে মানুষের আত্মিক অবস্থাকে বিশ্লেষণ করলে এই ঘটনার অন্তর্নিহিত মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। গাজ্জালির মতে, মানুষের হৃদয় বা 'কালব' হলো একটি আয়নার মতো, যা স্রষ্টার তাজাল্লি (ঐশ্বরিক আলো) প্রতিফলিত করার ক্ষমতা রাখে। নফস বা প্রবৃত্তির দিক থেকে বিবেচনা করলে, শিশুটির ভেতরে ক্রিয়াশীল ছিল 'নফসে আম্মারা', যার ফলে সে লোভ ও মিথ্যার বশবর্তী হয়ে পথ আগলে রেখেছিল। অন্যদিকে আবদুল্লাহর ভেতরে বিরাজ করছিল 'নফসে মুতমাইন্না' বা প্রশান্ত আত্মা, যা উস্কানির মুখেও শান্ত থাকে। জাগতিক অভাবের কারণে শিশুটির কলুষিত কালব সত্য গ্রহণে অনাগ্রহী ছিল এবং তার হৃদয়ের আয়নায় মরিচা জমেছিল। বিপরীতে আবদুল্লাহর কালব ছিল ইশকে ইলাহির নূরে আলোকিত, যা অপরের প্রতি দরদ অনুভব করে এবং ঐশ্বরিক আলো ধারণ করে।

শিশুটির রূহ বা আত্মা দুর্বল হয়ে নফসের কারাগারে বন্দি থাকায় সে মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু মুক্তির সন্ধানে রত সেই আত্মার বিপরীতে আবদুল্লাহর রূহ ছিল আধ্যাত্মিক শক্তিতে বলীয়ান, যা মারেফাতের আলো ছড়ায় এবং ফানার স্তরে বিরাজমান। এই পুরো ঘটনায় এক অপূর্ব প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। শিশুটির মিথ্যার আবরণে হৃদয়ের মরুভূমিতে যখন শুষ্ক বাতাসের হাহাকার বইছিল, ঠিক তখনই আবদুল্লাহর আধ্যাত্মিক পরশে মেঘের দীর্ঘশ্বাসে অনুতাপের নূরানী ঝরনা বয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। কালবের মরিচা খসে পড়ার এই অলৌকিক প্রক্রিয়া যেন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এটি স্পষ্ট যে, শিশুটির বাহ্যিক দারিদ্র্য তার অভ্যন্তরীণ আত্মাকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছিল যে, সে মিথ্যার মাধ্যমে অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করাকে নিজের অধিকার বলে মনে করছিল। অন্যদিকে, আবদুল্লাহর শান্ত আচরণ তার আধ্যাত্মিক পরিপক্বতার প্রমাণ দেয়।

অবশেষে আবদুল্লাহ যখন ছেলেটিকে পুলিশের ভয় দেখালেন, তখন ছেলেটি ভড়কে গিয়ে পথ ছেড়ে সরে দাঁড়াল। ভয় মানুষকে তার নফসের কারাগার থেকে সাময়িকভাবে হলেও মুক্ত করে। পুলিশের নাম শুনে ছেলেটির ভেতরের সেই মিথ্যার আবরণ খসে পড়ল। আবদুল্লাহর পরিবারের সবাই একে একে সাঁকো পার হলেন। পুলসিরাতের মতো এই ক্ষুদ্র সাঁকোটি পার হওয়ার পর আবদুল্লাহ ফিরে তাকালেন। ছেলেটি দূরে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে ভয় এবং একধরনের অপার্থিব বিষণ্ণতা।

আবদুল্লাহর কালবে তখন এক অদ্ভুত আলোড়ন শুরু হলো। তিনি স্মরণ করলেন রাসূলপ্রেম (সা.) এবং আহলুল বাইতের সেই মহান আত্মত্যাগের কথা। ইসলামি ইতিহাসে বর্ণিত আছে, একবার ইমাম হাসান ও হুসাইন (রা.) অসুস্থ হলে, তাদের আরোগ্যের জন্য মানত হিসেবে আলী (রা.) এবং ফাতেমা (রা.) টানা তিনদিন রোজা রেখেছিলেন। কিন্তু প্রতিদিন ইফতারের সময় যখনই তারা খাবার মুখে দিতে যাবেন, তখনই এতিম, মিসকিন এবং বন্দিরা তাদের দরজায় এসে খাবার প্রার্থনা করেছিল। আহলুল বাইতের এই মহান সদস্যরা নিজেদের সমস্ত খাবার সেই ক্ষুধার্ত মানুষদের দিয়ে দিয়েছিলেন এবং নিজেরা শুধু পানি পান করে রোজা ভেঙেছিলেন। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-ইনসানে তাদের এই নিঃস্বার্থ ইশকে ইলাহি (ঐশ্বরিক প্রেম) এবং ত্যাগের কথা অত্যন্ত মর্যাদার সাথে স্মরণ করা হয়েছে।

আবদুল্লাহ ভাবলেন, এই ছেলেটি তো একজন অভাবী শিশু। তার নফস তাকে পথভ্রষ্ট করেছে ঠিকই, কিন্তু তার এই অপরাধের পেছনে রয়েছে সমাজের এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা। তিনি যদি আজ এই ছেলেটিকে শুধু ভয় দেখিয়ে চলে যান, তবে ছেলেটির কালবের আয়নায় জমে থাকা মরিচা কখনোই পরিষ্কার হবে না। বরং এই ভয় একদিন ক্ষোভে পরিণত হতে পারে। রাসূল (সা.) শিশুদের প্রতি যে সীমাহীন মমতা প্রদর্শন করতেন, সেই সুন্নাহর অনুসরণে আবদুল্লাহ অত্যন্ত শান্ত ও কোমল কণ্ঠে ছেলেটিকে কাছে ডাকলেন।

ছেলেটি ধীর পায়ে, কিছুটা দ্বিধা আর ভয় নিয়ে তার কাছে এসে দাঁড়াল। আবদুল্লাহ তার পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে ছেলেটির হাতে দিলেন। এই টাকা কোনো চাঁদা বা ইজারা ছিল না; এটি ছিল একজন আলোকিত মানুষের পক্ষ থেকে একটি পথভ্রষ্ট আত্মার প্রতি ভালোবাসার হাদিয়া, যা তার ভেতরের অন্ধকারকে দূর করার একটি আধ্যাত্মিক প্রচেষ্টা।

টাকাটা হাতে দিয়ে আবদুল্লাহ ছেলেটির চোখের দিকে তাকালেন। সেই চোখে তখন নীরবতার শব্দ শোনা যাচ্ছিল, যা আধুনিক সাহিত্যের ম্যাজিক রিয়ালিজমের এক অপূর্ব নিদর্শন। আবদুল্লাহ অত্যন্ত দরদমাখা কিন্তু তীক্ষ্ণ কণ্ঠে তাকে বোঝাতে শুরু করলেন, "তুমি আজ যেটা করতে চেয়েছিলে, তা অন্যায়। এটি একটি অপরাধ, এবং এমনটা করা একেবারেই ঠিক নয়। তোমার চেহারা আর পোশাক দেখে আমি বুঝতে পারছি যে তোমরা অভাবী মানুষ। কিন্তু এভাবে মিথ্যা বলে, মানুষকে জিম্মি করে অর্থ আদায় করার মানে হলো চাঁদাবাজি করা, যা কোনোভাবেই শরীয়াহ ও নৈতিকতার মানদণ্ডে ঠিক নয়। আজ তুমি অনেক ছোট মানুষ বলে তোমাকে আমি ছেড়ে দিলাম। কিন্তু তুমি যদি ছোট না হয়ে একজন বড় মানুষ হতে, তাহলে আমাকে তোমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হতো, যা আসলেই তোমার জন্য ভালো হতো না।"

আবদুল্লাহর প্রতিটি শব্দ যেন ছেলেটির হৃদয়ের গহীনে গিয়ে আঘাত করল। তার কথাগুলো ছিল ছোট, তীক্ষ্ণ, কিন্তু তাতে মিশে ছিল এক গভীর হিউম্যান টাচ (মানবিক স্পর্শ), যা যান্ত্রিকতার ঊর্ধ্বে উঠে সরাসরি আত্মার সাথে কথা বলে। এই শব্দগুলো যেন রোদের কান্নার মতো ছেলেটির ভেতরের জমাট বাঁধা অন্ধকারকে গলিয়ে দিচ্ছিল। এক শৈল্পিক মিশ্রণে মনে হচ্ছিল, আবদুল্লাহর এই দরদমাখা কথাগুলো শুনে ছেলেটির কালবের আয়না থেকে মরিচাগুলো আক্ষরিক অর্থেই ঝরে পড়ছে। ছেলেটি কোনো কথা বলল না, শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখের কোণে জমে থাকা অনুতপ্ত অশ্রু যেন নূরানী ঝরনা হয়ে গাল বেয়ে নামতে শুরু করল। কারো দীর্ঘশ্বাসে শুকনো মরুভূমিতে বিশ্বাসের ফুল ফুটে ওঠার যে অলৌকিকতা, তা যেন সেই মুহূর্তে ছেলেটির নীরবতায় মূর্ত হয়ে উঠল।

ছেলেটি ধীর পায়ে তার বাড়ির দিকে চলতে শুরু করল। তার প্রতিটি পদক্ষেপে যেন মিশে ছিল এক দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্ণতা আর অনুশোচনা, যা তাকে ভবিষ্যতের এক নতুন আলোকিত পথের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আবদুল্লাহ তার পরিবারের সাথে বাসার দিকে পা বাড়ালেন। কিন্তু তার মনের ভেতর ভোরের সেই আনন্দময় প্রশান্তি তখন এক গভীর মন খারাপের রূপ নিয়েছে। পারিপার্শ্বিক পরিবেশের কাব্যিকতায় মনে হচ্ছিল, ধলাই নদীর ঢেউগুলো যেন তখন মানুষের জীবনের এই অসহায়ত্ব আর নফসের বন্দিদশা দেখে নীরবে কাঁদছিল, ঠিক যেমন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর উপন্যাসে নদী মানুষের দুঃখে কেঁদে ওঠে।

প্রকৃতি যেন তার নিজস্ব ভাষায় কথা বলছিল। গাছের পাতায় বাতাসের মর্মর ধ্বনি, নদীর জলের কলকল শব্দ, আর ভোরের স্তব্ধতা—সব মিলেমিশে এক অদ্ভুত মায়াজালের জন্ম দিয়েছিল, যা ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করতে বাধ্য করে। আবদুল্লাহর মনে হচ্ছিল, তিনি যেন শুধু একটি বাঁশের সাঁকো পার হননি, তিনি যেন পার হয়েছেন মানুষের ভেতরের এক অদৃশ্য পুলসিরাত, যেখানে প্রতিনিয়ত আলো আর অন্ধকারের, রুহ আর নফসের অনন্তকাল ধরে যুদ্ধ চলছে।

মানুষের জীবন আসলে এক জটিল যাত্রা। এই যাত্রায় কখনো কখনো মানুষ নফসের তাড়নায় মিথ্যার আশ্রয় নেয় এবং অভাবের কাছে আত্মসমর্পণ করে নিজের কালবকে কলুষিত করে। কিন্তু যখনই কোনো আধ্যাত্মিকভাবে আলোকিত মানুষ তার মারেফাতের আলো দিয়ে সেই পথভ্রষ্ট আত্মাকে স্পর্শ করেন, তখন সেই আত্মার ভেতরে জমে থাকা মরিচা খসে পড়ে এবং সেখানে নতুন করে ইমানের ফুল ফুটে ওঠে।

আবদুল্লাহর এই অভিজ্ঞতাটি কেবল একটি সামাজিক সংঘাতের চিত্র নয়, বরং এটি সুফিবাদের 'ইশকে ইলাহি' এবং আহলুল বাইতের ত্যাগের এক বাস্তব প্রতিফলন। ছেলেটিকে পুলিশে না দিয়ে, তাকে ভালোবেসে সত্যের পথ দেখানোই হলো প্রকৃত মুমিনের দায়িত্ব। ছেলেটির সেই ধীর পায়ে ফিরে যাওয়া আর আবদুল্লাহর মন খারাপ করে বাসায় ফেরা—উভয়ের মাঝেই লুকিয়ে আছে এক চিরন্তন সত্য। দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী মোহ এবং দারিদ্র্যের কশাঘাতে মানুষ যতই নিজেদের হারাক না কেন, পরম করুণাময়ের নূরের পরশ এবং মানুষের প্রতি মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই আত্মাকে প্রকৃত প্রশান্তির পথে ফিরিয়ে আনতে পারে। এই দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্ণতা ও প্রশান্তির রেশ পাঠকের হৃদয়ে এমন এক আলোড়ন সৃষ্টি করে, যা তাকে জীবনের প্রকৃত অর্থ খুঁজতে এবং নফসের বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করবে।

Picked up where you left off

Comments

    Please login to post comment. Login