Travel

শেষ বিকেলের সমুদ্র

October 22, 2026

MD Zidan

7 views

সেদিন সকালটা ছিল অন্য সব দিনের চেয়ে আলাদা। আকাশে হালকা মেঘ, জানালার বাইরে শীতল বাতাস, আর দূরে কোথাও পাখির ডাক। ঘুম থেকে উঠেই মনে হলো, আজ কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করছে—এমন কোথাও, যেখানে গেলে মনের ভেতর জমে থাকা সব ক্লান্তি একটু হালকা হয়ে যাবে।

অনেকক্ষণ ভাবার পর ঠিক করলাম, সমুদ্র দেখতে যাব।

ছোটবেলা থেকেই সমুদ্রের প্রতি আমার একটা অদ্ভুত টান ছিল। টেলিভিশনে যখন নীল সমুদ্র দেখতাম, মনে হতো, বিশাল সেই পানির ওপারে নিশ্চয়ই অন্য রকম একটা পৃথিবী আছে। যেখানে মানুষ একটু ধীরে হাঁটে, বাতাসের শব্দ শোনে, আর জীবনের ছোট ছোট আনন্দগুলোকে অনুভব করে।

সকালে একটা ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ব্যাগে কয়েকটা কাপড়, একটা ডায়েরি, কলম আর ফোন ছাড়া তেমন কিছু ছিল না। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মা জিজ্ঞেস করলেন, “কোথায় যাচ্ছিস?”

আমি হেসে বললাম, “সমুদ্র দেখতে।”

মা একটু অবাক হয়ে বললেন, “এত সকালে?”

আমি বললাম, “হ্যাঁ, মা। অনেক দিন ধরে যাওয়ার ইচ্ছে।”

মা আর কিছু বললেন না। শুধু বললেন, “সাবধানে যাস, আর পৌঁছে খবর দিস।”

বাড়ি থেকে বেরিয়ে যখন রাস্তায় এলাম, তখন সূর্য সবে উঠেছে। রাস্তার পাশের দোকানগুলো খুলছে, চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে, আর মানুষজন যে যার কাজে বের হচ্ছে। একটা ছোট দোকানে দাঁড়িয়ে চা খেলাম। তারপর বাসস্ট্যান্ডের দিকে রওনা দিলাম।

বাসে উঠে জানালার পাশের একটা আসন পেলাম। বাস চলতে শুরু করল। শহরের পরিচিত রাস্তাগুলো ধীরে ধীরে পেছনে চলে যেতে লাগল। জানালার বাইরে কখনো সবুজ মাঠ, কখনো ছোট ছোট গ্রাম, কখনো পুকুরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছ দেখতে পাচ্ছিলাম।

একটা গ্রামের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম, কয়েকজন শিশু মাঠে খেলছে। তাদের হাসির শব্দ বাসের ভেতর পর্যন্ত ভেসে আসছিল। দৃশ্যটা দেখে আমার নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল।

একসময় আমিও কত সহজে আনন্দ পেতাম! বৃষ্টিতে ভেজা, বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে খেলা, বিকেলে বাড়ি ফেরার পথে গল্প করা—এসব ছোট ছোট মুহূর্তই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার।

বড় হতে হতে আমরা কত কিছু শিখি, কত স্বপ্ন দেখি, কত দূর যেতে চাই। অথচ কখনো কখনো সেই ছোট ছোট আনন্দগুলোই হারিয়ে ফেলি।

বাসের জানালায় মাথা ঠেকিয়ে ভাবছিলাম, জীবনটা যদি একটু সহজ করে দেখা যেত!

কয়েক ঘণ্টা পর বাস সমুদ্রের শহরে পৌঁছাল।

বাস থেকে নেমে প্রথমেই একটা অদ্ভুত গন্ধ পেলাম—লবণাক্ত বাতাসের গন্ধ। দূরে মানুষের কোলাহল, রাস্তার পাশে দোকান, আর পর্যটকদের ব্যস্ততা। সবকিছু দেখে বুঝতে পারছিলাম, সমুদ্র খুব বেশি দূরে নেই।

আমি ধীরে ধীরে সৈকতের দিকে হাঁটতে লাগলাম।

হঠাৎ দূর থেকে সমুদ্র দেখতে পেলাম।

বিশাল নীল জলরাশি চোখের সামনে ছড়িয়ে আছে। ঢেউগুলো একের পর এক তীরে এসে আছড়ে পড়ছে, আবার ফিরে যাচ্ছে। আকাশ আর সমুদ্রের মাঝখানে দিগন্তরেখা এমনভাবে মিশে আছে, যেন দুটো আলাদা জগৎ এক হয়ে গেছে।

আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম।

এত দিন ছবিতে সমুদ্র দেখেছি, ভিডিওতে ঢেউয়ের শব্দ শুনেছি। কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে সেই বিশালতা অনুভব করা একেবারেই আলাদা।

জুতা খুলে বালুর ওপর দিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। নরম বালু পায়ের নিচে বসে যাচ্ছিল। ঢেউ এসে পায়ের কাছে পানি ছড়িয়ে দিচ্ছিল। বাতাসে চুল এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু সেদিকে কোনো খেয়াল ছিল না।

মনে হচ্ছিল, পৃথিবীটা যেন একটু বড় হয়ে গেছে, আর আমার ছোট ছোট চিন্তাগুলো অনেক দূরে সরে গেছে।

আমি সৈকতের একটা নিরিবিলি জায়গায় বসে পড়লাম।

সামনে সমুদ্র। পাশে কিছু মানুষ নিজেদের মতো করে সময় কাটাচ্ছে। কয়েকজন শিশু বালু দিয়ে ঘর বানাচ্ছে, কেউ ছবি তুলছে, কেউ পরিবারের সঙ্গে হাসছে।

একটা ছোট ছেলে বালু দিয়ে দুর্গ বানাচ্ছিল। ঢেউ এসে একবার তার দুর্গটা ভেঙে দিল। ছেলেটা কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল। তারপর আবার নতুন করে বানাতে শুরু করল।

দৃশ্যটা দেখে আমি মুচকি হাসলাম।

আমরা বড়রা কত সহজে হাল ছেড়ে দিই! একটা পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে মনে করি সব শেষ। কোনো স্বপ্ন পূরণ না হলে ভাবি, হয়তো আর কিছু হবে না।

অথচ সেই ছোট ছেলেটা জানে, ঢেউ আবার আসবে। তবুও সে দুর্গ বানাচ্ছে।

হয়তো জীবনও এমনই। সবকিছু নিজের মতো হবে না, সব স্বপ্ন একবারে পূরণ হবে না। তবুও আবার শুরু করতে হয়।

দুপুরের দিকে একটা ছোট দোকানে গিয়ে খাবার খেলাম। দোকানদার খুব আন্তরিক ছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “ভাই, কোথা থেকে এসেছেন?”

আমি নিজের এলাকার কথা বললাম।

তিনি বললেন, “সমুদ্র দেখতে একা এসেছেন?”

আমি হেসে বললাম, “জি, একটু নিজের মতো সময় কাটাতে।”

হয়তো কিছু জিনিসকে চলে যেতে দেওয়াও জীবনের একটা অংশ।

বিকেলের দিকে আকাশের রং বদলাতে শুরু করল। সূর্য পশ্চিম আকাশে নিচে নেমে আসছিল। সমুদ্রের ওপর সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়ল। দূরের ঢেউগুলো যেন সোনার রেখা নিয়ে তীরে আসছিল।

আমি উঠে একটু সামনে এগিয়ে গেলাম।

চারদিকে তখন বিকেলের নরম আলো। বাতাস আগের চেয়ে ঠান্ডা। মানুষের কোলাহলও যেন কিছুটা কমে এসেছে।

একজন বৃদ্ধ লোক আমার কাছাকাছি বসেছিলেন। তাঁর হাতে একটা পুরোনো ছাতা, পাশে ছোট একটা ব্যাগ। তিনি চুপচাপ সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

আমি তাঁর পাশে কিছুটা দূরে বসে পড়লাম।

কিছুক্ষণ পর তিনি নিজেই কথা বললেন, “বাবা, সমুদ্র ভালো লাগে?”

আমি বললাম, “খুব ভালো লাগে। এত সুন্দর আগে কখনো দেখিনি।”

তিনি হেসে বললেন, “প্রথমবার দেখছেন বুঝি?”

“জি।”

তিনি আবার সমুদ্রের দিকে তাকালেন।

“আমি অনেক বছর ধরে এখানে আসি। কখনো মন ভালো থাকলে, কখনো মন খারাপ থাকলে। জানেন, সমুদ্রের একটা জিনিস আমার খুব ভালো লাগে।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী?”

তিনি বললেন, “এখানে এসে মানুষ কিছুক্ষণের জন্য নিজের পরিচয় ভুলে যায়। কে ধনী, কে গরিব, কে সফল, কে ব্যর্থ—এসবের কোনো মানে থাকে না। সবাই একই আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে একই ঢেউ দেখে।”

কথাটা শুনে আমি চুপ হয়ে গেলাম।

বৃদ্ধ লোকটি কিছুক্ষণ পর আবার বললেন, “জীবনে অনেক কিছু অর্জন করতে হয়, এটা ঠিক। কিন্তু শুধু অর্জন করতে করতে যদি বেঁচে থাকার আনন্দটাই ভুলে যাও, তাহলে এত কিছুর মানে কী?”

আমি তাঁর দিকে তাকালাম। তাঁর মুখে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না, কোনো অভিযোগও ছিল না। যেন অনেক বছর ধরে জীবনকে দেখে তিনি কথাগুলো শিখেছেন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি এখানে প্রতিদিন আসেন?”

তিনি বললেন, “যতটা পারি। আমার স্ত্রী সমুদ্র খুব ভালোবাসতেন। বহু বছর আগে আমরা একসঙ্গে এখানে এসেছিলাম। তিনি বলতেন, সমুদ্রের সামনে দাঁড়ালে মনে হয় পৃথিবীটা কত বিশাল, আর আমাদের দুঃখগুলো কত ছোট।”

কথাটা বলতে বলতে তিনি একটু থামলেন।

তিনি বললেন, “যতটা পারি। আমার স্ত্রী সমুদ্র খুব ভালোবাসতেন। বহু বছর আগে আমরা একসঙ্গে এখানে এসেছিলাম। তিনি বলতেন, সমুদ্রের সামনে দাঁড়ালে মনে হয় পৃথিবীটা কত বিশাল, আর আমাদের দুঃখগুলো কত ছোট।”

কথাটা বলতে বলতে তিনি একটু থামলেন।

তারপর বললেন, “এখন আমি একাই আসি। মানুষ চলে যায়, কিন্তু কিছু জায়গা স্মৃতি ধরে রাখে। এখানে এলে তাঁর কথা মনে পড়ে। খারাপও লাগে, আবার ভালোও লাগে।”

আমি কী বলব বুঝতে পারছিলাম না।

বৃদ্ধ লোকটি মৃদু হেসে বললেন, “সব সুন্দর স্মৃতির সঙ্গে একটু কষ্ট থাকতেই পারে, বাবা। তাই বলে স্মৃতিগুলোকে সুন্দর মনে করা বন্ধ করতে নেই।”

সেদিন প্রথমবার অনুভব করলাম, ভ্রমণ শুধু নতুন জায়গা দেখার নাম নয়। কখনো কখনো অচেনা একজন মানুষের কয়েকটা কথা আমাদের ভেতরের অনেক বন্ধ দরজা খুলে দেয়।

সূর্য তখন ধীরে ধীরে দিগন্তের কাছে নেমে এসেছে।

আকাশ কমলা, গোলাপি আর বেগুনি রঙে ভরে উঠল। সমুদ্রের ওপর আলো পড়ে এমন একটা দৃশ্য তৈরি করল, যা দেখে মনে হচ্ছিল, পৃথিবী যেন দিনের শেষ ছবিটা আঁকছে।

আমি বৃদ্ধ লোকটির দিকে তাকিয়ে বললাম, “আপনার সঙ্গে কথা বলে খুব ভালো লাগল।”

তিনি হাসলেন।

“আমারও ভালো লাগল। তবে একটা কথা মনে রাখবেন—জীবনকে খুব বেশি তাড়াহুড়ো করে পার করবেন না। সব সময় সামনে তাকিয়ে থাকলে পাশের সৌন্দর্যগুলো চোখে পড়বে না।”

কথাটা আমার মনে গেঁথে গেল।

কিছুক্ষণ পর তিনি উঠে চলে গেলেন।

আমি একা বসে রইলাম।

সূর্য ডুবে গেল। আকাশের সোনালি রং ধীরে ধীরে মুছে গেল। সৈকতের বাতিগুলো জ্বলে উঠল। ঢেউয়ের শব্দ আগের মতোই চলতে থাকল।

ব্যাগ থেকে ডায়েরিটা বের করলাম। দিনের প্রথম পাতায় লিখলাম—

“আজ আমি সমুদ্র দেখতে এসেছিলাম। কিন্তু ফিরে যাওয়ার আগে বুঝলাম, আমি আসলে নিজের জীবনটাকেও নতুন করে দেখতে শিখছি।”

তারপর আরও লিখলাম—

“সব প্রশ্নের উত্তর এখনই পেতে হবে না। সবাইকে নিজের মতো করে বোঝাতেও হবে না। সব স্বপ্ন একদিনে পূরণ হবে না। কিন্তু যত দিন পথ চলার সুযোগ আছে, তত দিন পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখব, নতুন মানুষদের সঙ্গে কথা বলব, আর নিজের ছোট ছোট আনন্দগুলোকে হারিয়ে যেতে দেব না।”

ডায়েরিটা বন্ধ করে সমুদ্রের দিকে শেষবারের মতো তাকালাম।

রাত বাড়ছিল। ফিরে যাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছিল।

পরদিন সকালে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলাম।

ফেরার বাসে জানালার পাশে বসে আবার সেই পরিচিত মাঠ, গ্রাম, গাছপালা দেখতে লাগলাম। যাওয়ার সময়ও এই দৃশ্যগুলো দেখেছিলাম, কিন্তু এবার যেন অন্য রকম লাগছিল।

হয়তো দৃশ্যগুলো বদলায়নি। বদলেছিল আমার দেখার চোখ।

বাড়ি পৌঁছানোর পর মা দরজা খুলে দিলেন।

তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন ঘুরে এলি?”

আমি হাসলাম।

“অনেক সুন্দর, মা। খুব ভালো লেগেছে।”

মা বললেন, “ছবি তুলেছিস?”

আমি ফোন বের করে কয়েকটা ছবি দেখালাম। তারপর বললাম, “ছবি তো তুলেছি, কিন্তু সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তটার ছবি তুলিনি।”

মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কেন?”

আমি হেসে বললাম, “কারণ কিছু স্মৃতি ফোনে রাখার চেয়ে মনে রাখতেই বেশি ভালো লাগে।”

সেদিন রাতে ঘুমানোর আগে ডায়েরিটা খুলে শেষ পাতায় লিখলাম—

“একদিন আবার যাব। হয়তো পাহাড়ে, হয়তো নদীর ধারে, হয়তো এমন কোনো অচেনা গ্রামে যেখানে সন্ধ্যা নামলে মানুষের বাড়িতে আলো জ্বলে উঠবে। আবার নতুন পথ দেখব, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হব। কারণ পৃথিবীটা অনেক বড়, আর আমার দেখার বাকি এখনো অনেক কিছু।”

তারপর জানালার বাইরে তাকালাম।

আকাশে চাঁদ ছিল। বাতাসে রাতের নীরবতা।

আমার মনে হচ্ছিল, সেই সমুদ্রের ঢেউগুলো এখনো যেন আমার ভেতরে বয়ে যাচ্ছে।

আর আমি জানতাম, কোনো একদিন আবার ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ব।

কোনো তাড়া থাকবে না। কোনো নির্দিষ্ট উত্তর খোঁজার প্রয়োজনও থাকবে না।

শুধু পথ থাকবে, নতুন দৃশ্য থাকবে, অচেনা মানুষের গল্প থাকবে।

আর থাকবে সেই সুন্দর অনুভূতি—

পৃথিবীটা এখনো অনেক সুন্দর, আর আমার সামনে এখনো অনেক পথ বাকি। 🌊

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login