ভার্জিনিয়ার শার্লটসভিলে অক্টোবর মাসের সোনালী বিকেলগুলো অদ্ভুত রকম বিষণ্ণ অথচ মায়াবী। ব্লু রিজ পর্বতমালার গায়ে তখন রঙের আগুন,লাল, কমলা আর হলুদের এমন এক মাতামাতি যা দূর থেকে দেখলে মনে হয় কোনো মহাজাগতিক ক্যানভাসে কেউ মুঠো মুঠো আবির ছড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার (ইউভিএ) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিল্ডিংয়ের তিনতলার ল্যাবে বসে থাকা ফাহিম মুনতাসিরের সেই প্রকৃতির রূপ দেখার মতো ফুরসত বা মানসিক শান্তি কোনোটাই ছিল না।
ফাহিম এসেছে ঢাকার মধ্যবিত্তের চিরাচরিত সংগ্রাম পেরিয়ে। বুয়েট থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে টপার হয়ে পুরো ফান্ডিং নিয়ে সে যখন ডক্টরাল প্রোগ্রামে পা রাখে, তার কাঁধে ছিল মা-বাবার আজন্মের স্বপ্ন আর নিজের অস্তিত্বের লড়াই। গবেষণা, কোডিং, নিউরাল নেটওয়ার্কের অ্যালগরিদম আর প্রফেসর হ্যারিসনের খিটখিটে মেজাজ সামলাতে গিয়ে তার পৃথিবীটা ছোট হতে হতে একটি ল্যাপটপের পর্দা আর কফির মগে এসে ঠেকেছিল। তার জীবনে কবিতা ছিল না, রোমান্টিকতা ছিল বাহুল্য, আর মেয়েদের সাথে কথা বলা ছিল নিছক এক অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু সেই দিনটি ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। দিনটি শুরুই হয়েছিল এক চরম বিভ্রান্তিকর ভুলের মধ্য দিয়ে।
প্রফেসর হ্যারিসন আগের দিন মিটিংয়ে কড়া নির্দেশ দিয়েছিলেন, ডিপ লার্নিং ও কম্পিউটার ভিশনের ওপর একটি বিশেষ রিসার্চ পেপারের হার্ডকপি এবং মূল এনোটেশন ফাইলগুলো লাইব্রেরির সেকেন্ড ফ্লোরের রিসার্চ ডেস্কে জমা দিতে হবে। নির্দিষ্ট কোডওয়ার্ড ছিল ‘প্রজেক্ট আইরিস’।
ফাহিম চশমাটা নাকের ডগায় ঠেলে প্রায় ছুটতে ছুটতে অ্যাল্ডারম্যান লাইব্রেরির দোতলায় পৌঁছাল। ঘড়িতে তখন চারটা পঞ্চান্ন। পাঁচটায় লাইব্রেরির আর্ট ও স্পেশাল প্রজেক্ট কাউন্টার বন্ধ হয়ে যাবে। সামনে দীর্ঘ কাঠের টেবিলের ওপর এলোমেলো ছড়ানো স্কেচবুক, তেলরঙের টিউব আর প্যাস্টেল পেপারের ভিড়ে বসে থাকা এক স্বর্ণকেশী তরুণীকে দেখে সে ধরে নিল এই বুঝি সেই রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট।
ফাহিম তার ভারি চামড়ার ফোল্ডারটা সশব্দে তরুণীর ড্রয়িং শিটের ওপর নামিয়ে রেখে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, "হাই! আই অ্যাম ফাহিম ফ্রম ডক্টর হ্যারিসনস ল্যাব। এই যে ‘প্রজেক্ট আইরিস’-এর সম্পূর্ণ ডেটাসেট আর এনালিটিক্যাল রিপোর্ট। প্রফেসর বলেছেন এই সপ্তাহের ভেতর এগুলোর কালার স্পেকট্রাম আর লেয়ারিং ক্রস-চেক করতে হবে।"
টেবিলে ঝুঁকে থাকা মেয়েটি চমকে মুখ তুলল। ফাহিমের চোখের চশমাটা যেন এক মুহূর্তের জন্য ঝাপসা হয়ে গেল। রোদে পোড়া বাদামি চুলগুলো অগোছালোভাবে একটি সাধারণ কাঠপেনসিল দিয়ে মাথার ওপর খোঁপা করা। পরনে ঢিলেঢালা একটা ডেনিম শার্ট, যার হাতায় আর কলারের কাছে লেগে আছে শুকনো নীল ও বেগুনি রঙের ছোপ। আর তার চোখ দুটো,একেবারে পরিষ্কার আকাশের মতো নীল, যাতে মিশে আছে এক অদ্ভুত কৌতুক আর রাজ্যের বিস্ময়।
মেয়েটি ফোল্ডারটার দিকে তাকাল, তারপর ফাহিমের দিকে চেয়ে ভুরু নাচিয়ে বিশুদ্ধ ভার্জিনিয়ান টানে বলল, "ওয়েল, মিস্টার হ্যারিসনস জিনিয়াস... আমি জানতাম না যে লিনিয়ার অ্যালজেব্রা আর নিউরাল নেটওয়ার্ক এখন ওয়াটার কালারের চেয়েও ভালো ল্যান্ডস্কেপ ফুটিয়ে তুলতে পারে!"
ফাহিম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। "মানে? আপনি কি আর্ট হিস্ট্রির ডেটা ম্যানেজমেন্ট করছেন না?"
মেয়েটি খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসির শব্দে লাইব্রেরির পিনপতন নীরবতা যেন এক নিমেষে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। পাশের টেবিলে বসে থাকা এক চশমাধারী বৃদ্ধ ভ্রূ কুঁচকে তাদের দিকে তাকালেন। মেয়েটি হাত দিয়ে মুখ চেপে হাসি থামানোর চেষ্টা করল, কিন্তু তার চোখের কোণার নীল দীপ্তিটুকু লুকোতে পারল না।
"আমি এলেনা," মেয়েটি হাত বাড়িয়ে দিল, "এলেনা কার্টার। ফাইন আর্টসের মাস্টার্সের স্টুডেন্ট। আর তোমার এই ‘প্রজেক্ট আইরিস’ যদি কোনো রোবটের চোখের অ্যানাটমি হয়ে থাকে, তবে দুঃখিত,আমি শুধু মানুষের চোখের মায়াটুকুই ক্যানভাসে তুলতে জানি, কোড দিয়ে নয়।"
ফাহিম টেবিলের কোণে তাকিয়ে দেখল, কাঠের ছোট্ট ফলকে লেখা,‘রিজার্ভড ফর ফাইন আর্টস গ্রেড থিসিস’। কম্পিউটার সায়েন্সের ডেস্কটি ছিল ঠিক উল্টোদিকের করিডোরে। লজ্জায়, অপমানে আর নিজের এমন নির্বুদ্ধিতায় ফাহিমের কান-মাথা গরম হয়ে উঠল। ঢাকা শহরের শান্ত, হিসেবি ছেলেটি আমেরিকার মাটিতে এসে এমন এক হাস্যকর কাণ্ড ঘটিয়ে বসবে, তা সে কল্পনাও করতে পারেনি। সে তড়িঘড়ি করে ফোল্ডারটা তুলে নিতে গেল, কিন্তু নার্ভাসনেসের চোটে তার হাত লেগে টেবিলের কোণায় থাকা একটি খোলা কালো কালির দোয়াত উল্টে গেল।
কালো গাঢ় কালি ছড়িয়ে পড়ল টেবিলময়। আর তার চেয়েও বড় বিপর্যয় ঘটল,কালির একটা বড় ফোঁটা গিয়ে ছিটকে পড়ল এলেনার আঁকা প্রায় শেষ হয়ে আসা একটি জলরং ছবির ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে। ছবিটি ছিল শার্লটসভিলের বিখ্যাত রোটুন্ডার ওপর বিকেলের সূর্যাস্তের। সেই উজ্জ্বল আকাশটার ঠিক মাঝখানে কালির এক বিশ্রী, কুৎসিত কালো ক্ষত তৈরি হলো।
"ওহ মাই গড!" ফাহিম আতঙ্কে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। "আই অ্যাম সো সরি! আই... আই রিয়ালি ডিডন্ট মিন টু,"
এলেনা এক মুহূর্ত ছবির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সে যা করল, তার জন্য ফাহিম পৃথিবীর কোনো অ্যালগরিদমে প্রস্তুত ছিল না। এলেনা চিৎকার করল না, রাগ দেখাল না। সে চট করে তার তুলিটা তুলে নিল, কালির ভেজা দাগটার ওপর আলতো করে পানি ছুঁইয়ে দিল, আর কয়েকটা দ্রুত টানে সেই কালো ছোপটাকে রূপ দিল একটি দূরবর্তী মেঘের আড়ালে উড়ে যাওয়া ডানা-মেলা চিলের অবয়বে!
কালো দাগটা যেন ছবির আকাশটাকে আরও বেশি গভীর ও জীবন্ত করে তুলল।
এলেনা তুলিটা নামিয়ে রেখে ফাহিমের আতঙ্কগ্রস্ত মুখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল। "দেখলে? লাইফে কোনো কোনো ভুল আসলে নতুন কিছু তৈরি করার জন্য ঘটে। ইটস ওকে, মিস্টার অ্যালগরিদম।"
ফাহিম নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। সে কেবল একটি কথাই ভাবতে পারল,এই ভুলটা কোনো সাধারণ ভুল ছিল না, এ ছিল কোনো এক আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস।
পরের দুই দিন ফাহিম ল্যাবে এক লাইন কোডও ঠিকমতো লিখতে পারল না। পর্দায় যখনই কোনো এরর মেসেজ আসত, তার চোখের সামনে ভেসে উঠত এলেনার সেই নীল চোখ আর হাসিমাখা মুখ। প্রাচ্যদেশীয় এক তীব্র অপরাধবোধ তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। যে মেয়েটি রাতের পর রাত জেগে একটি ছবি এঁকেছে, তার ক্যানভাসে কালির দাগ ফেলে দিয়ে সে কেবল একটা সরি বলে পার পেয়ে যেতে পারে না।
শুক্রবার বিকেলে ফাহিম অনেক খুঁজে শহরের ডাউনটাউন মলের সবচেয়ে নামি আর্ট সাপ্লাইয়ের দোকান থেকে প্রিমিয়াম কোয়ালিটির উইনসর অ্যান্ড নিউটন ওয়াটার কালার প্যালেট আর এক সেট দামি তুলি কিনল। পুরো মাসের গ্রোসারি খরচের প্রায় অর্ধেক টাকা এতেই চলে গেল, কিন্তু ফাহিমের ভেতরের অস্বস্তি দূর করতে এর কোনো বিকল্প ছিল না। লাইব্রেরির সেই ডেস্কে গিয়ে সে এলেনাকে পেল না। তবে আর্ট ডিপার্টমেন্টের এক ছাত্রের মাধ্যমে জানতে পারল, এলেনা এখন ইউনিভার্সিটি কর্নারের এক পুরোনো ক্যাফেতে বসে তার স্কেচ শেষ করছে।
ক্যাফে ‘গ্রাউন্ডস’-এর পেছনের খোলা চত্বরে যখন ফাহিম পৌঁছাল, তখন হালকা শীতের বাতাস বইছে। এলেনা একটা পুরোনো চামড়ার জ্যাকেট পরে বসেছিল, সামনে ধোঁয়া ওঠা ক্যাপুচিনো। ফাহিম গিয়ে তার টেবিলের সামনে দাঁড়াল, কাঠের ওপর উপহারের প্যাকেটটা নামিয়ে রাখল।
"এটা তোমার জন্য। সেদিন আমি যা করেছি, তার কোনো মাফ হয় না। তোমার ছবিটা আমি নষ্ট করে ফেলেছিলাম।"
এলেনা চমকে তাকাল। উপহারের মোড়কটা দেখে তার মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল, তারপর সে গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল, "তুমি কি সবসময় এত সিরিয়াস ফাহিম? আমি তো সেদিনই বলেছিলাম, ক্ষতি কিছু হয়নি।"
"আমার কাছে হয়েছিল," ফাহিম নিচু গলায় বলল, "আমাদের দেশে অন্যের পরিশ্রমে আঘাত লাগলে মানুষ ক্ষমা চায়, আর ক্ষতিপূরণ দেওয়ার চেষ্টা করে।"
এলেনার মুখটা নরম হয়ে এলো। সে প্যাকেটটা একপাশে সরিয়ে রেখে উল্টোদিকের চেয়ারটা দেখিয়ে বলল, "বোসো। তুমি যদি সত্যিই ক্ষতিপূরণ দিতে চাও, তবে এই প্যালেট দিয়ে হবে না। আমাকে তোমার এক ঘণ্টা সময় দিতে হবে। কফি খাও আমার সাথে।"
ফাহিম ইতস্তত করে বসল। সে কোনোদিন কোনো মেয়ের সাথে এভাবে ক্যাফেতে বসেনি, আমেরিকান মেয়ে তো দূরের কথা। তার সামাজিক বৃত্ত ছিল শুধু বাংলাদেশি বন্ধুদের সাথে বিরিয়ানি রান্না আর ল্যাবের চায়নিজ বন্ধুদের সাথে কোডিং ডিসকাশন। কিন্তু এলেনা ছিল অন্যরকম। সে ফাহিমের আড়ষ্টতা ভাঙতে সময় নিল না।
"তোমার দেশ কেমন ফাহিম? বাংলাদেশ... আমি ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকে দেখেছিলাম, খুব সবুজ, তাই না?"
ফাহিমের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে বলতে শুরু করল তার পদ্মা-মেঘনার কথা, বর্ষার অবিশ্রান্ত বৃষ্টির কথা, ঢাকার ব্যস্ত গলির রিকশার টুংটাং শব্দের কথা। এলেনা কোনো কথা না বলে চিবুকে হাত দিয়ে তন্ময় হয়ে শুনছিল। তার চোখের তারায় প্রতিফলিত হচ্ছিল এক অচেনা দেশের রূপকথা।
"তুমি জানো ফাহিম," এলেনা তার কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল, "আমেরিকান ছেলেদের মধ্যে আমি যা দেখি, তার বেশিরভাগই কৃত্রিম আত্মবিশ্বাস আর স্থূল অহংকার। কিন্তু তোমার কথার মধ্যে অদ্ভুত একটা মাটির গন্ধ আছে। একটা গভীর মায়া আছে।"
ফাহিমের গায়ের রোমকূপ শিউরে উঠল। সে দ্রুত চোখ নামিয়ে নিল। বিদেশের এই অচেনা শহরে, এক পড়ন্ত বিকেলে, তার শেকড়ের গল্প যে কোনো ভিনদেশি তরুণীর হৃদয় এভাবে স্পর্শ করতে পারে, তা তার ধারণার অতীত ছিল। দিনগুলো খুব দ্রুত তাদের খোলস বদলাতে লাগল। যে শার্লটসভিলকে ফাহিমের কাছে এতদিন স্রেফ এক নির্বাসনের মতো মনে হতো, সেই শহরটাই হঠাৎ করে বর্ণিল হয়ে উঠল। এলেনা আর ফাহিমের দেখা হওয়াটা আর কোনো ভুলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না। প্রতি উইকেন্ডেই তারা নিয়ম করে বের হতে শুরু করল। এলেনা ফাহিমকে নিয়ে যেত শেনানডোহা ন্যাশনাল পার্কের ট্রেইলে। উঁচু পাহাড়ি চূড়ায় দাঁড়িয়ে যখন ঠান্ডা হাওয়া তাদের শরীর ছুঁয়ে যেত, এলেনা চোখ বন্ধ করে শ্বাস নিত, আর ফাহিম অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত এলেনার বাতাসের সাথে খেলা করা সোনালী চুলের দিকে।
একদিন বিকেলে মন্টিচেলোর পাহাড়ি ঢালে বসে এলেনা ফাহিমের একটি প্রতিকৃতি আঁকছিল চারকোল দিয়ে।
"একদম নড়বে না," এলেনা নির্দেশ দিল, "তোমার ওই ভ্রু কুঁচকে গভীর কিছু ভাবার ভঙ্গিটা আমি ক্যানভাসে ধরতে চাই।"
ফাহিম স্থির হয়ে বসে রইল। তার চোখ এলেনার মুখের ওপর নিবদ্ধ। "এলেনা, তুমি রঙের ভেতর কী খোঁজো?"
এলেনা স্কেচ করতে করতে থামল। একটু হেসে বলল, "আমি সংযোগ খুঁজি ফাহিম। আমার বাবা একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা ছিলেন, সবসময় শৃঙ্খলার বেড়াজালে আমাদের আটকে রাখতেন। মা ছিলেন কর্পোরেট জগতের মানুষ। তাদের মধ্যে কোনো উষ্ণতা ছিল না, কোনো স্পর্শ ছিল না। আমি ছোটবেলা থেকেই নিঃসঙ্গ। যখন রঙ তুলি হাতে নিলাম, বুঝলাম রঙ কাউকে বিচার করে না। রঙ সবাইকে জড়িয়ে ধরে। আর তুমি... তুমি ল্যাবের অন্ধকারের ভেতর থেকেও কেমন করে যেন এই অদ্ভুত আলো ছড়াও। তোমার ওই অ্যালগরিদমের ডাটার চেয়ে তোমার মনটা অনেক বেশি জীবন্ত।"
ফাহিম স্তব্ধ হয়ে গেল। এলেনা তার স্কেচবুকটা নামিয়ে রেখে ফাহিমের খুব কাছে এগিয়ে এলো। তার নীল চোখের মণিতে তখন শরতের আকাশের সমস্ত স্বচ্ছতা।
"তুমি কি জানো ফাহিম, আমি কেন প্রতিদিন লাইব্রেরিতে যেতাম?" এলেনার কণ্ঠস্বর ফিসফিসের মতো শোনাল।
"কেন?"
"আমি তোমার ওই গম্ভীর মুখটা দেখতাম প্রতিদিন। দূর থেকে। তুমি যখন চশমা ঠিক করে কপালে হাত দিয়ে কোড দেখতে, আমার মনে হতো ওই ছেলেটার ভেতরে এক বিশাল নিঃশব্দ সমুদ্র আছে। আমি সেই সমুদ্রে ডুব দিতে চেয়েছিলাম। সেদিন তুমি যে ভুল করে আমার টেবিলে ফাইল রেখেছিলে, ওটা কোনো ভুল ছিল না ফাহিম... ওটা ছিল নিয়তি।"
ফাহিমের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো। ভার্জিনিয়ার কনকনে শীতেও তার বুকের ভেতর এক উষ্ণ লাভাস্রোত বয়ে গেল। সে এলেনার নরম, ঠান্ডা হাতদুটো নিজের শক্ত আঙুলের ভেতর টেনে নিল।
"এলেনা, আমি অত্যন্ত সাধারণ এক পরিবারের ছেলে। আমার পৃথিবী তোমার মতো এত রঙিন নয়। আমার সামনে কেবল দায়িত্ব, গবেষণা আর এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।"
এলেনা তার অন্য হাতটি দিয়ে ফাহিমের চিবুক ছুঁয়ে দিল। "আমি তোমার ভবিষ্যৎ সাজাতে আসিনি ফাহিম। আমি শুধু তোমার বর্তমানের নিঃসঙ্গতাকে ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে দিতে এসেছি। তুমি কি আমাকে ভালোবাসো না?"
শব্দগুলো বাতাসের সাথে মিলিয়ে গেল। কোনো যুক্তি, কোনো সামাজিক ব্যবধান, কোনো ভৌগোলিক দূরত্বের দেয়াল সেই মুহূর্তে টিকল না। ফাহিম এলেনাকে জড়িয়ে ধরল নিজের বুকের ভেতর। বুনো বাতাসে ঝরে পড়া ওক আর ম্যাপেল পাতার বৃষ্টি তাদের ঢেকে দিল এক অপার্থিব ভালোবাসার চাদরে। একটি ভুলের হাত ধরে শুরু হওয়া যাত্রা পূর্ণতা পেল প্রেমের পবিত্র এক অমলিন ফুলে।
প্রেমের জোয়ার যত তীব্রই হোক, বাস্তবের তটরেখায় এসে তা প্রায়শই আছড়ে পড়ে। শীতের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে ফাহিমের জীবনে নেমে এলো এক গভীর দ্বন্দ্ব। বাংলাদেশ থেকে মা যখন প্রতি রবিবার ইমোতে ভিডিও কল দিতেন, তখন তার মুখে থাকত শুধুই ক্লান্তির রেখা আর ছেলের ফেরার অপেক্ষা।
"বাবা ফাহিম, তুই কবে ফিরবি রে? তোর চাচা বলছিল বিদেশের মেয়েরা নাকি বড় বেপরোয়া হয়, ঘরসংসার বোঝে না। তুই কিন্তু মন দিয়ে পড়াশোনাটা শেষ করিস বাবা। তোর জন্য গ্রামের খালাতো বোন সুমাইয়াকে সবাই পছন্দ করে রেখেছে। কী লক্ষ্মী মেয়ে, তোকে ছাড়া কিছু বোঝে না।"
মায়ের সেই সরল অথচ সনাতন কথাগুলো ফাহিমের বুকের ভেতর সিসার মতো ভারী হয়ে বিঁধত। সে কীভাবে বোঝাবে তার মাকে যে, সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারের এক শ্বেতাঙ্গ মেয়ে তাকে এমনভাবে ভালোবেসেছে, যা কোনো ভৌগোলিক বা সাংস্কৃতিক মাপকাঠিতে মাপা যায় না? এলেনা তো কোনো বেপরোয়া মেয়ে নয়; সে এক নিঃস্বার্থ, পবিত্র আত্মার অধিকারী, যে ফাহিমের এক চিলতে হাসির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।
একই সময়ে এলেনার পরিবারেও ঝড় উঠল। ক্রিসমাসের ছুটিতে এলেনা ফাহিমকে নিয়ে গিয়েছিল তার রিচমন্ডের পৈতৃক বাড়িতে। সেখানে এলেনার বাবা,কর্নেল কার্টার, ডিনার টেবিলে বসে ফাহিমকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করলেন এক শীতল দৃষ্টিতে।
"সো, মিস্টার মুনতাসির," কার্টার তার ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিয়ে কাঠখোট্টা গলায় বললেন, "তুমি পিএইচডি শেষ করে নিশ্চয়ই তোমার থার্ড-ওয়ার্ল্ড দেশে ফিরে যাবে? সেখানে আমার মেয়ে গিয়ে কী করবে? হিজাব পরবে, আর মাটির ঘরে বসে রান্না করবে?"
ফাহিমের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। অপমানে তার গায়ের রক্ত টগবগ করে ফুটতে লাগল। সে ভদ্রতা বজায় রেখে সোজা হয়ে বসল।
"কর্নেল কার্টার, আমার দেশ দরিদ্র হতে পারে, কিন্তু সেখানে মানুষের হৃদয়ের অভাব নেই। আর এলেনা আমার দেশে গেলে তাকে কোনো খাঁচায় বন্দি হতে হবে না, সে থাকবে রানীর মতো সম্মানে। তবে আপনার জানা উচিত, আমি কোনো গ্রিন কার্ডের লোভে বা আমেরিকায় স্থায়ী হওয়ার জন্য এলেনার হাত ধরিনি। আমি তাকে ভালোবেসেছি তার আত্মার জন্য।"
টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল এলেনা। তার চোখে ছিল জল আর ক্ষোভ। "ড্যাড! ইউ হ্যাভ নো রাইট টু ইনসাল্ট হিম! ফাহিম তোমার চেয়ে অনেক বেশি জেন্টলম্যান।"
সে রাতেই তারা রিচমন্ড ছেড়ে শার্লটসভিল ফিরে এসেছিল। গাড়ির ভেতর এলেনা অঝোরে কাঁদছিল, আর ফাহিম একহাতে স্টিয়ারিং ধরে অন্যহাতে শক্ত করে চেপে রেখেছিল এলেনার বরফশীতল হাত। সংস্কৃতির সংঘাত, পরিবারের রক্ষণশীলতা আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা,সব মিলিয়ে প্রেমের পথ যেন এক দুর্ভেদ্য মরুভূমি হয়ে দাঁড়াল।
জানুয়ারি মাসের এক তুষারঝড়ের রাতে চরম সংকটটি নেমে এলো। ফাহিমের মা হঠাৎ স্ট্রোক করে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি হলেন। খবরটি যখন ফাহিমের কাছে পৌঁছাল, তখন পুরো পূর্ব আমেরিকা বরফে স্থবির হয়ে গেছে। ফ্লাইটের টিকিট পাওয়া দুষ্কর, আর বাবার কান্নায় ভাঙা কণ্ঠ ফোনে ভেসে আসছিল,"ফাহিম, তুই একবার আয় বাবা... তোর মা তোকে একবার দেখতে চায়..."
ফাহিম ল্যাবের মেঝেতে বসে মাথায় হাত দিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। তার পিএইচডির কোয়ালিফাইং এক্সাম মাত্র তিন দিন পর। এই পরীক্ষা মিস করা মানে তার পাঁচ বছরের স্কলারশিপ বাতিল হওয়া, তার ডিগ্রি শেষ হয়ে যাওয়া। একদিকে মায়ের জীবন-মৃত্যুর টানাপোড়েন, অন্যদিকে নিজের সারাজীবনের ক্যারিয়ার আর স্বপ্ন।
সে যখন চরম মানসিক ট্রমার মধ্যে নিজের চুল ছিঁড়ছিল, ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
দরজা খুলতেই সে দেখল বরফে ঢাকা এলেনা দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখখানা ফ্যাকাশে, শরীর কাঁপছে, কিন্তু চোখে এক অটল দৃঢ়তা। সে ভেতরে ঢুকেই ফাহিমের পাসপোর্ট আর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাতে তুলে নিল।
"এলেনা? তুমি এই ঝড়ের মধ্যে কীভাবে এলে?"
"কথা বোলো না ফাহিম," এলেনা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, "আমি ওয়াশিংটন ডুলস এয়ারপোর্টের একটা টিকিট ম্যানেজ করেছি। এমিরেটসের একটা ফ্লাইট ভোর ছয়টায় ছাড়বে, যদি আবহাওয়া একটু ভালো হয়। আমার গাড়িতে স্নো-টায়ার লাগানো আছে। আমরা এখনই ড্রাইভ করব।"
"কিন্তু আমার পরশুদিন কোয়ালিফাইং এক্সাম এলেনা! আমি যদি এখন যাই, আমার প্রফেসর আমাকে ড্রপ আউট করে দেবে। আমার ফান্ডিং চলে যাবে!" ফাহিম কান্নায় ভেঙে পড়ল। এক পূর্ণবয়স্ক পুরুষের সেই অসহায় কান্না দেখে এলেনার বুক ভেঙে গেল।
এলেনা ফাহিমের দুই কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে বলল, "ডিগ্রি আবার হবে ফাহিম, কিন্তু মা চলে গেলে আর ফিরে আসবে না। তোমার মাকে তোমার এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি দরকার। আর প্রফেসরের ব্যাপারটা আমার ওপর ছেড়ে দাও। আমি কাল সকালে ডিন আর হ্যারিসনের অফিসে গিয়ে মেডিকেল এমার্জেন্সির জন্য আবেদন করব। আমি ফাইন আর্টস থেকে লড়াই করব তোমার জন্য। তুমি শুধু তোমার মায়ের কাছে যাও।"
ঝড়ের রাতে আড়াই ঘণ্টা ড্রাইভ করে এলেনা নিজে ফাহিমকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিল। বিদায়ের মুহূর্তে ফাহিম যখন সিকিউরিটি গেটের দিকে এগোচ্ছিল, এলেনা তার হাত টেনে ধরে তার কপালে একটি দীর্ঘ, পবিত্র চুম্বন এঁকে দিল।
"গো, সেভ ইউর মাদার। অ্যান্ড রিমেম্বার, নো ম্যাটার হোয়াট হ্যাপেনস, মাই হার্ট ইজ উইথ ইউ।"
ফাহিম অশ্রুসজল চোখে বিমানের সিটে গিয়ে বসল। সে বুঝতে পারল, ভালোবাসা কেবল কোনো বিকেলের কফির টেবিলে রূপকথা শোনানো নয়; ভালোবাসা হলো ঝড়ের রাতে নিজের সর্বস্ব দিয়ে অন্যের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়ানো।
ঢাকায় ফিরে এক মাস ফাহিম হাসপাতালের করিডোরে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে। আল্লাহর অশেষ রহমতে এবং উন্নত চিকিৎসায় তার মা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন। জ্ঞান ফেরার পর মা যখন ফাহিমের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, ফাহিম আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে মায়ের কোলের ওপর মুখ রেখে এলেনার সব কথা খুলে বলল। সে বলল কীভাবে এক আমেরিকান মেয়ে তুষারঝড়ের রাতে নিজের জীবন বাজি রেখে তাকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিয়েছিল, কীভাবে সে প্রফেসরের সাথে লড়াই করে ফাহিমের পরীক্ষার তারিখ পিছিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে, আর কীভাবে সে প্রতিদিন ঢাকা সময় ভোর চারটায় ফোন করে মায়ের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিয়েছে।
মা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে রইলেন। প্রাচ্যের হাজার বছরের সংস্কার আর ভিনদেশি সংস্কৃতির প্রতি ভয় যেন মুহূর্তের মধ্যে গলে জল হয়ে গেল মাতৃত্বের পরম কৃতজ্ঞতায়।
মা ফাহিমের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বললেন, "যে মেয়ে আমার ছেলের এমন বিপদে নিজের সুখ ভুলে পাশে দাঁড়াতে পারে, সে কোনো পরদেশি হতে পারে না রে বাবা। সে তো স্বয়ং আল্লার পাঠানো রহমত। তুই ওরে ফেলে আসিস না। ওরে আমার কাছে নিয়ে আয়।"
বসন্তের শুরুতে ফাহিম যখন আবার শার্লটসভিলের মাটিতে পা রাখল, তখন ব্লু রিজের বরফ গলে পাহাড়ি ঝরনাগুলো সজীব হয়ে উঠেছে। গাছে গাছে চেরি ব্লসম আর ডগউডের সাদা-গোলাপি ফুলের মেলা।
সে সরাসরি চলে গেল অ্যাল্ডারম্যান লাইব্রেরির সেই চিরচেনা সেকেন্ড ফ্লোরে। এলেনা সেখানেই বসেছিল। কিন্তু আজ তার সামনে কোনো ক্যানভাস ছিল না। সে শুধু জানালা দিয়ে তাকিয়ে ছিল বসন্তের রোদের দিকে। তার মুখটা কিছুটা রোগা হয়ে গেছে, চোখে ক্লান্তির ছায়া।
ফাহিম নিঃশব্দে গিয়ে তার পেছনে দাঁড়াল। তারপর খুব পরিচিত সেই চামড়ার ফোল্ডারটা টেবিলের ওপর রাখল।
"এক্সকিউজ মি মিস, ‘প্রজেক্ট আইরিস’-এর চূড়ান্ত রিপোর্টটা কি জমা নেওয়া যাবে?"
এলেনা চমকে পেছনে তাকাল।
এক মুহূর্তের জন্য যেন পুরো পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর এলেনা কোনো কথা না বলে এক ঝটকায় চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে ফাহিমের বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার দুচোখ দিয়ে অশ্রুর বাঁধভাঙা ধারা নেমে এলো।
"ইউ কেইম ব্যাক... তুমি ফিরে এসেছ ফাহিম!"
ফাহিম তাকে পরম ভালোবাসায় বুকের সাথে চেপে ধরল। সে এলেনার কানের কাছে মুখ নিয়ে বাংলায় ফিসফিস করে বলল, "আমি তোমায় ভালোবাসি এলেনা।"
এলেনা চোখ তুলে তাকাল, "তার মানে কী?"
ফাহিম হাসল, সেই শান্ত, মিষ্টি হাসি যা এলেনাকে প্রথম দিন মুগ্ধ করেছিল। "তার মানে,আমার ভুলের শুরু যেখানে হয়েছিল, আমার জীবনের সমস্ত ফুলের প্রস্ফুটন সেখানেই শেষ হয়েছে। আমার মা তোমাকে দেখতে চেয়েছেন এলেনা। তুমি কি আমার সাথে আমার দেশে যাবে?"
এলেনার মুখে ফুটে উঠল এক অপার্থিব, স্বর্গীয় আলো। সে ফাহিমের হাতটা নিজের বুকের বাঁ পাশে চেপে ধরে বলল, "তোমার সাথে আমি পৃথিবীর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত যেতে রাজি।"
লাইব্রেরির জানালার কাঁচ চিরে তখন সকালের সোনালী রোদ এসে পড়ছিল তাদের দুজনের ওপর। দুটি ভিন্ন মহাদেশ, দুটি ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতি এক অভিন্ন বিন্দুতে এসে মিলে গেছে। জীবনের একটি অসতর্ক ‘ভুল’ কীভাবে ভাগ্যের অমোঘ নিয়মে রূপ নিতে পারে ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর ‘ফুলে’,শার্লটসভিলের সেই শান্ত লাইব্রেরিটি আজন্ম তার সাক্ষী হয়ে রইল।