Story

জন্মদিনের স্মৃতি শোকাগদ্য ~ নাবিল নিশাত

October 26, 2026

131 views

রোজ বৃহস্পতিবার, বিকাল চারটায় প্রাইভেট শেষে হন্তদন্ত হয়ে ছুটছি।

কেউ অপেক্ষমান, আমার অপেক্ষায়।

গলি পেরোতেই বন্ধুর সাথে দেখা। বায়না তার একটাই, আজ তার প্রাইভেট নেই। তাকে সময় দিতে হবে।

আমার হাতে অবশ্য সময় নেই। নেই শব্দটা বোঝাতেই কেটে গেছে অর্ধঘন্টার অর্ধেক।

কিছুতেই আমায় ছাডবেনা, প্রয়োজনে সে আমার সাথেই যাবে। কিন্তু …

আমার অপেক্ষায় থাকা মানুষটি বিশেষ।

খুব যত্নে পৃথিবী থেকে লুকিয়ে রেখেছিলাম তাঁকে।

কেউ জানেনা, সে কেমন দেখতে।

তবে বন্ধুদের কাছে সে তাদের ভাবি।

‘যার সাথে ভাব হয়’ তাকেই ভাবি বলা যায়।

আমি ব্যতিত কেউ তাকে চেনেনা, তবুও তাদের ভাবি।

আমি এখনো এই কথাটাই ভাবি,

আমার ইতর বন্ধুরা কেনো আজও খুঁজে পায়নি তাদের হারানো ভাবিকে!

অথচ —

তার পরিচয় আমার থেকেই বহুবার শুনেছে বন্ধু — পরিজনেরা।

কিন্তু চিনতে পারেনি।

সে এসেছিলো, থেকেছিলো!

তবে বিশেষ মানুষটি আজো গোপনেই

হৃদয়ের করিডোরে থেকে গেলো।

বন্ধুকে অনেক কষ্টে রেখে চললাম, পাঁচ রাস্তার দিকে। সে বসে আছে চাঁ ফ্যান্টাসি’ তে।

পৌঁছে দেখি সে এখনো আসেনি।

খুব অবাক হলাম, মেয়েটা প্রচন্ড সময়প্রেমী।

সময়ের দাম তার থেকেই অনেকটা শিখেছি।

সে যেই সময়ের কথা বলেছে, সেই সময়ের মাঝে আসেনি তা কখনো হয়নি।

মনের মাঝে কু গাইছে, কিছু হলো নাকি?

আগের দিন সন্ধ্যার দিকে তার সাথে শেষবার কথা হয়েছিলো।

আমি মিসড কল দিয়েছিলাম।

পরে সে ব্যাক করে।

অনেক কথা, কথার শেষ নেই।

তবে কথাগুলো নেতিবাচক ছিলো।

ছাডাছাডির আঁচ খুব করেই হয়তো সে টের পেয়েছে।

আমি মানুষটা তার কাছে বরাবরের মতোই ভালো ছিলাম।

তার চোখে আমি শ্রেষ্ঠদের একজন।

যার জন্য সে বিলাসী জীবন পরিত্যাগ করার মতো সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিলো।

সে যেই মানুষটাকে অশেষ ভালোবাসতো,

সেই মানুষটা আমি।

অথচ ফোনকলে তাকে অকারণে অকথ্য ভাষায় কথা বলেছি।

হয়তো সে মেনে নিতে পারেনি।

বিশেষত মেয়ে মানুষ কোমল হৃদয়ের অধিকারি হয়ে থাকে।

তারা খুব সহজেই কষ্ট পায়।

অনেক ছোট কথাতেও তারা কাঁদে।

আমার জীবনের বিশেষ মানুষটি

শক্ত মনের হলেও —

আমার দেয়া অল্প দুঃখেও সে অজস্র সময় কাঁদতো।

তাই ভাবনা ভাবতে লাগলাম,

মেয়েটাকি কেঁদে অসুস্থ হয়ে গেলো নাকি?

যদি অসুস্থ হয়, তাহলে আমার পরিকল্পনাতো ভেস্তে যাবে !

কেমনে কি করবো?

ফোনেও টাকা নেই।

পরে খেয়াল করে দেখি, ওয়াইফাই কানেক্ট হয়ে আছে।

অনেক অনেকবার তার সাথে এই স্থানে বসে চা খেয়েছি।

স্পেশালি দশ বা পনেরো টাকার আদা চা।

তাই কোনও সময় হয়তো ওয়াইফাই কানেক্ট করেছিলাম।

ওয়াট্সএপে কল দিলাম,

দ্বিতীয়বারে ধরে বললো —

‘গাডী গ্যারেজ থেকে বের করতেছি। ড্রাইভার আজ বের করেনি। আসতে সবমিলিয়ে দশ মিনিট লাগবে’।

‘আচ্ছা’ বলে কল কেটে বসে রইলাম।

কিভাবে শুরু করবো কথা?

কথায় কতটা কষ্ট পাবে সে!

আমি কি তার সাথে প্রতারণা করছি?

সে আমাকে কতোটা ভালোবাসে, আর আমি কিনা …!

আমার কি আবারো নতুন করে ভাবা উচিত?

সে আমার জন্য সঠিক মানুষ।

এটা নিঃসন্দেহে সঠিক। কিন্তু

আমি কি তার সঠিক মানুষ?

সে নিশ্চয়ই আমার থেকে ভালো কারুকে

পাওয়ার যোগ্যতা রাখে!

এসব ভাবতে ভাবতেই দেখি সে গাডি একপার্শে পার্ক করে নামছে।

নামার সাথে সাথেই আমার দিকে তাকিয়ে একটি নির্মল হাসি দিলো।

আমার দেখা তার মুখের শেষ হাসি এটাই।

তারপর —

মুখোমুখি বসে আছি।

আমি যেমন করে কথা শুরু করার ভাবনা ভেবেছি,

তার একটি শব্দও আমি পেশ করতে পারছিনা।

তারপর সে ই কথার প্রারম্ভ করলো!

তোমায় চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন?

আমার চিন্তা ও ভাবনার কথা তাকে কিভাবে বলি?

এই দুঃসাহসিক মনোভাব আমার কি আদোতে আছে?

কোনো উত্তর নেই আমার। বললো কিছু অর্ডার দিয়েছো?

বললাম, না।

সে অর্ডার দিলো, দুই কাপ আদা চা।

সেদিন আমিই বিল দিয়েছিলাম।

এটা অবাক করার মতো কথা!

দেরি করার কারণ জানতে চাইলে সে বললো, তার মা একটু অসুস্থ। তাই দেরি হয়েছে।

বললাম, কি বলে এসেছো বাসা থেকে?

আমার সাথে দেখা করার কথাই বলেছে।

সে মিথ্যার আশ্রয় খুব কম নেয়। এটা তার মহৎ গুন।

আমার ভাবনাতেই ছিলোনা যে,

আমাদের কথা অনেক সিনিয়ররাই জানে।

দু-পক্ষের মানুষ ই কমবেশি অবগত আমাদের বিষয়ে।

পরিবারের জানার কারণ সে।

সে ই আমার কথা প্রথম তার মাকে জানিয়েছে।

আন্টির সাথে আমার দু বার দেখা হয়েছে।

তিনি আমাকে আদর করতেন,

আমাকে স্বপ্ন দেখাতেন,

আমার প্রতি ইতিবাচক ধারণা ছিলো তার।

এতোসবের মাঝে কিভাবে সব বলবো, তাই ভেবে উঠতে পারছিনা।

কিন্তু বলাটা প্রয়োজন।

যতোটা সময় আমি নিবো, ততোটা সময় জুডেই আরো মোহ - মায়া - ভালোবাসার জন্ম হবে। যা পরবর্তীতে হয়তো আরো খারাপ পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে।

এ ভেবেই সাহস জমালাম,

আজ, এখন, এই মূহুর্তেই আমি তাকে জানাবো।

বলার জন্য আশ্রয় নিলাম,

কঠিন শব্দ / জটিল কবিতার ভাষা।

(সব বাক্য মনে নেই, তবে এমন ছিলো অনেকটা)

পৃথিবীতে অনেক মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে, ঘটছে, ঘটবে।

তোমার সাথে নিশ্চয়ই আমার দুরালোকের কোনও প্রান্তে —

রুহের জগতে ভাব হয়েছিলো

কিংবা আমাদের বন্ধুত্তও হয়েছিলো।

তাই হয়তে পৃথিবীতে আমাদের আবার দেখা হলো,

হলো বন্ধুত্ত থেকে প্রেম এবং সংসার গডার অজস্র স্বপ্ন।

আমার ধারণা হয়, রুহের জগতে তোমার সাথে আমার কোনও সন্ধি হয়নি।

হলে নিশ্চয়ই পরিণতি মঙ্গল হতো।

আমাদের সংসার হলে মন্দ হবেনা।

কিংবা একসাথে এই জন্মের শেষে

অনন্তের পর মিলিত হবার প্রত্যাশারো

কমতি থাকবেনা —

তবুও পৃথিবীর জটিল সিস্টেম,

অমিমাংসিত নিয়ম

আমাদের হয়তো বাধা হবে।

ভবিষ্যৎ দেখার ক্ষমতা শ্রষ্টা আমাদের না দিলেও অনুমান করার ক্ষমতা আমাদের দিয়েছে।

এ থেকেই ধরা যেতে পারে …

এতসব শুনে সে ‘স্তিমিত’

ভেবে উঠতে পারছেনা, কেনো কি বলছি!

আমি কি নতুন কোনও উপন্যাস কিংবা গল্পের সংলাপ বলছি নাকি?

সে বললো, কি হয়েছে তোমার?

বললাম, আগে চা আসুক পরে বলি।

একটু পরে চা আসলো।

এর মাঝে আমাদের আর কথা হলোনা।

উভয়ের চায়ের প্রথম চুমুক শেষে বললাম

- আমি তোমার কতটা যোগ্য?

- সবটায় যোগ্য।

- আমার জীবনের অনেকটা জুডেই তুমি

কিন্তু আমি কি তোমার জন্য সঠিক মানুষ?

- ভুল সঠিকের হিসাব এতোদিনে?

- তুমি কি ভুলকে ফুল ভাবো?

- কি বোঝাতে চাইছো তুমি?

- তুমি আমার থেকে অনেক ভালো একটা ছেলে প্রত্যাশা কর। অথবা পাওয়ার মতো যোগ্য তুমি।

- আমি কখনো তোমায় বলেছি?

- কিছু কথা বলার অপেক্ষায় থাকেনা।

আমি জানি, আমি তোমার জন্য সঠিক নই।

- কেন?

- তুমি যেই জীবনের মাঝে দিন যাপন করো, সেই জীবন আমার থেকে না পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

- একদিন হবে ইন শা আল্লাহ।

- যদি না হয়?

-লাগবেনা।

ভালো থাকতে ভালোবাসার প্রয়োজন হয়। আল্লাহ রুজির ব্যবস্থা করবেই।

- তা বলে অনিশ্চয়তাকে কেন সঙ্গী করবে?

- তুমি আমাকে ভালোবাসো?

- শেষ অবধি বাসবো এবং ভালোবাসি বলেই তোমাকে মুক্তি দিতে চাই

- আমি কি মুক্তি চাই তেমার কাছে?

- আজ চাওনা। কাল যখন বাস্তবতার মাঝে পডবে তখন?

- চাইবোনা

- পাগলামো করোনা।

হঠাৎ তার দুচোখ থেকে অনর্গল সাত সমুদ্রে ঠাই না পাওয়া পানি ঝরতে শুরু করলো।

মানুষটা আমার জন্য খুব স্প্যাশাল এবং ভাগ্যের কারণ ছিলো।

তারপর ব্যক্তিগত কিছু দৃষ্টিান্ত দিয়ে বললাম,

আমার জীবনে তুমি নিঃসন্দেহে অন্যতম নারী। তোমার মতো কাউকে পাবো বলে মনে হয়না।

তবুও ……

— মুল কথা বলো! কোথায় সমস্যা?

— সব সমস্যা তোমার পরিচয় এবং আমার থেকে তোমার উত্তম যাপিত জীবন।

— আমি তোমায় ভালোবাসি। তাই চাই,

তোমার সংসার এমন একজনের সাথে হোক!

যে তোমাকে আমার থেকে বেশি ভালোবাসবে এবং আরো সমৃদ্ধ জীবন উপহার দিবে।

তুমি প্রচন্ড মেধাবী। আশাকরি তুমি আমার না হলেও দুজনে যেমন স্বপ্ন দেখতাম, সেই স্বপ্ন তুমি পুরণ কর।

আমি এটা দেখেই খুশি হবো।

আর তুমি পারলে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করো।

— ভুলে যাওয়া খুব সহজ?

— মিথ্যা নাটক করতে পারো ভুলে যাওয়ার।

আমি চাই তুমি ভালো থাকো।

আমাদের যতো কথা হবে, ততোই মায়া বাডবে।

আমাদের আর কথা না হোক।

তুমি নিজেকে মানিয়ে নিও।

আমার একটা শেষ কথা রাখবা?

— কেন রাখবো?

— ভেবে নাও এটা আমার শেষ আবদার।

— বলো…

— পারলে মাফ কইরা দিও।কখনো ভেবোনা আমি প্রতারণা করেছি। আসলে তোমার এমন পরিচয় প্রথমে জানলে আমি তোমার সাথে ভালোবাসার বন্ধন গডতাম নাহ। আর হ্যা, আমার জন্য নিজেকে দুঃখ দিওনা।

কথা দেবে?

— কী?

— নিজেকে দুঃখ দেবেনা!

— আচ্ছা। তুমিও ভালো থেকো।

তোমার প্রথম কথাগুলো সুন্দর। আরেকটা কথা!

— কী?

— রুহের জগতে দেখা হলেও, এ জন্মে যদি তোমার না হতে পারি, তাহলে আর কখনোই তোমার হতে পারবোনা।

— মেনে নিয়েছি। মানিয়ে নিতে জানলেই জীবন সুন্দর।

— আমাদের শেষ দেখা। ভাবতে কষ্ট লাগছে। তবে তুমিও ভালো থেকো।

সব জায়গা থেকে তুমি ব্লক দেবে নাকি আমি?

— ইচ্ছা!

কেউ কাউকে ব্লক দেইনি। আজো একই শহরে থাকি। কিন্তু কথা হয়না।

আজ অনেকদিন পর তাকে দেখলাম।

অলক স্যারের প্রাইভেট শেষে বের হতেই দু পা এগিয়ে গিয়ে দেখি, রিকশায় চডে কালো বোরকা, নিকাব, হাত মোজা পরে বাসার দিকে যাচ্ছে।

আজ চোখাচোখি হলো কিন্তু কথা হলোনা।

তার চোখ দুটো দেখেই আমার বিকাল বিরহে ডুবে গেলো।

না জানি তার কেমন অনুভব হয়েছে মনের মাঝে!

সে কি আজো আমায় ভালোবাসে?

সব প্রশ্নের উত্তর থাকতে নেই।

নাটকের মতো নাটকীয়তায় কাটছে জীবন।

তাকে দেখে মুচডে উঠা বুকে কয়েকটি কবিতার লাইন আসলো।

আমি হারিয়ে গেলাম কতিপয় ভাবনার ঘরে।

আমাদের সংসার হলে কী এমন হতো?

এই ধ্বংসের কারিগর নিশ্চয়ই আমি!

আমি চাইলেই কি পরিস্থিতি অনুকূলে আসতোনা?

তার সাথে এই জীবনে কথা হওয়ার সুযোগ নেই। অথবা তার সাথে কথা বলে,

আমার নিজেকে অথবা তাকে কষ্ট দেবার সাধ নেই।

তবে চাই, সে ভালো থাকুক।

পৃথিবীর সব সুখ তার হোক।

কিন্তু …

এই বাক্য সবথেকে বেশি কষ্ট দেয়!

এই পৃথিবীতে কিংবা অনন্তকালের জীবনে তার সাথে কোথাও সংসার গডা হবেনা।

তার জন্য আমার পক্ষ থেকে শুধুই দোয়া ও শুভকামনা।

সে সবসময় ভালো থাকুক।

এটা জানি আমি, তাকে আমি যেই কষ্ট দিয়েছি। সেই কষ্টের জন্য ক্ষমা চাওয়াটাও হাস্যকর বিষয়।

সে ভালো থাকুক। পৃথিবীর সব সুখ তার হোক।

তার জীবনে যেই মানুষটি আসবে সে তাকে ভালো রাখুক।

ভাবনার মাঝে আমার বন্ধু শেওলা এসে বললো,

কি খাবা?

আমি হঠাৎ বললাম,

চা খাবো, চা ফ্যান্টাসি তে যাই চলো।

মুখ ফসকে কেনো সেই জায়গায় বললাম?

তার জন্মদিন উপলক্ষে ট্রিট দিলো।

কিন্তু তাকে ধন্যবাদও জানাতে পারিনি।

হয়তো সে অন্যকিছু ভেবেছে!

কিন্তু আমার দুনিয়া তখন ভিন্ন ছিলো।

সেই শেষ বিকেলের স্মৃতিগুলো ভেসে উঠলো, সেই শেষ বিকেলের স্মৃতিজডিত স্থানে। বিধ্বস্ত মন নিয়ে তৎক্ষণাৎ লিখলাম,

লুকায়িক জীবনের “শেষ বিকেলের স্মৃতি”

| বাস্তব জীবনের অলিখিত ডায়েরি |

২১শে আগস্ট, ২০২৫

জামালপুর, বাংলাদেশ]

//তবুও সেদিনও, একটি অনিশ্চিত, একটি অবাস্তব স্বপ্ন, একটি ইচ্ছা জেগে থাকলো প্রতিটি রাতে। সে হয়তো আমার হবে। একদিন দিন বদলে গেলে তাকে পেতেও পারি। কতো সারল্য মনে কুটিল ভাবনা জেগে থাকতো…/

{আত্মকলঙ্ক }

তাকে ফিরে পাবার আর কোনও আশা নেই। পরিসংখ্যানে সম্ভাবনা এখন কেবলই শূণ্য। নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহের রোজ রবিবার তার বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে অ্যাডমিন ক্যাডারে সদ্য সুপারিশপ্রাপ্ত সুপাত্রের(!) সাথে।

শনিবার, দুপুর দুই ঘটিকার ঠিক কিছু সময় পর…

অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোনকল এসেছে।

মেয়েলি কন্ঠ শুনে কিছুটা বিব্রত হলাম, পরিচিত কিন্তু তবুও অপরিচিত লাগছে।

ফোন করেছে বোনের মতো এক সহপাঠী।

বছরখানেক আগে মেয়েটির সাথে আমার খুব ভাব জমে উঠেছিলো। প্রায় সময়ই কথা হতো। কথা না হলেও সপ্তাহে অন্তত তিন দিন কথা হতোই।

হঠাৎ করেই তার সাথে পরিচিত হই।

প্রিয় মানুষের প্রিয় বান্ধবীদের মাঝে সে অন্যতম।

মেয়েছেলের মন মানষিকতা বোঝা কঠিন।

তবে যতোদূর তার সাথে কথা বলেছি, আড্ডা দিয়েছি তাতে মেয়েটার মাঝে ইতিবাচক গুনই বেশি পেয়েছি।

ম্যাক্সিকেনে আমাদের অনেক স্মৃতি আছে।

হারানো মানুষের সাথে ম্যাক্সিকেনে অনেক দুপুরে খেতে যাওয়া হতো। যদিও ফাস্টফুড় স্বাস্থের জন্য ভালো না, তবে প্রায়ই ম্যাক্সিকেনে সাবওয়ে খেতাম।

আমার কাছে সাবওয়ে ভালো লাগতো সে সময়।

মাঝেমাঝেই আমরা যখন আড্ডা দিতাম তখন তৃতীয় মানুষ হিসিবে হঠাৎ আগমন ঘটতো তার। কাবাবে হাড্ডি হবার স্বভাব ছিলোনা মেয়েটার। মেয়েটার এই গুন আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছে।

আমি হলক করে বলতে পারি, আমার জানা মতে। এই অবধি আমার এক টাকাও মেয়েটি খায়নি।

মোটেও আমার কৃপনতা কিংবা হিসাবিপনা এর পেছনে দ্বায়ী নয়।

আমি অনেকদিন জোর করেও কিছু খাওয়াতে পারিনি, বলেছি অনেকবার। কিন্তু তার একটাই কথা “পরে একদিন”, “পরে অন্যদিন”।

একদিন স্ট্রিট ফুড খাচ্ছিলাম আমি আর হারানো মানুষ। এর মাঝে পেছন ফিরে লক্ষ করি সে প্রাইভেটে যাচ্ছে।

আমিই ডাক দিয়ে বললাম, আজ মুক্তি নাই, খেতেই হবে।

কিন্তু বেচারি অসুস্থ। জ্বর ঠান্ডা। কিছুতেই খাবেনা। শরীরের কথা ভেবে চা অফার করলাম। এবারেও বলে পরে - পরে।

কিন্তু এবার আর পরে খাবার সুযোগ না দিয়ে জোর করে চা খাওয়ালাম।

ভাবলাম, এবার অন্তত মেয়েটাকে কিছু খাওয়াতে পারলাম।

ও-মা। সেবারেও দেয়ার সুযোগ হলোনা।

সেও দিতে পারেনি। আবার তার বান্ধবী, হারানো মানুষটাও দেয়নি। দিয়েছে চতুর্থজন!

বটতলার নিকটবর্তী একটা মাদরাসায় আমার সু-নাম ছিলো, ছাত্ররা আমাকে অনেক ভালোবাসে। ভালোবাসা থেকেই মাঝেমাঝে যেতাম, গাইতাম, শুনতাম। ওদের স্বার্থহীন ভালোবাসা আজও আমায় মুগ্ধ করে।

এখন অবশ্য সেদিক গেলেও যাওয়া হয়না।

ছোট বিষয় নিয়ে একদিন অভিমান করে চলে আসি কোনো অভিযোগ ছাডাই। তারাও জানেনা আসল কারণ।

এখনো ছাত্র ভাইদের সাথে দেখা হলে যেতে বলে, অনুরোধ করে। যাবো বলে কথা না দিলেও বলি ইনশাল্লাহ।

সেই মাদরাসার জনৈক ছাত্র, সে দোকানেই চা খাচ্ছিলো। তেমন খেয়াল না করলেও সে-ই চায়ের বিল পরিশোধ করে যাওয়ার সময় সালাম দিয়ে বলে ভাইয়া চায়ের বিল দেয়া হয়েছে।

আমি তো অবাক!

অনেকবার না করেও মানলোনা, মাদরাসার সময় হয়েছে বলে চলে গেলো।

সে বারেও আর দিতে পারলাম না…

মেয়েটি ফোন করেই সালাম দিলো আমি উত্তর দিয়ে বললাম, কে বলছেন?

নাম বললো, আমি বললাম,

-কেমন আছো?

-আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?

-আমিও বেশ ভালোই আছি।

-অনেক ভালো আছেন নাকি?

-কেমন ভালো আছি সে কথা কেউ না বুঝলেও, না শুনলেও তুমি তো অবশ্যই বোঝার কথা। আমি কেমন আছি।

-হ্যা, তা বুঝেছি।

-অনেকদিন পর হঠাৎ ফোন দিলা!

-ভাবলাম আপনাকে ফোন দেই।

-ভালোই হয়েছে, ফোন করেছো। মাঝেমাঝে মনে হয় তোমরাও ভুলে গেছো..

- না ভাই আপনাকে ভুলবো কেনো। আপনিইতো যোগাযোগ শেষ করেছেন।

- এর জন্য আমি দুঃখীত।

- না না ভাই, আপনার দোষ নেই। দেখলাম আপনার বই আসছে।

- হ্যা, তোমাদের জন্যই লিখতে পেরেছি।

- প্রি অর্ডার দিয়েছি অনেকদিন আগেই। হাতে পাবো কবে?

- ডিসেম্বরের শুরু সপ্তাহে পাবে।

- এতে দেরিতে যে ভাইয়া?

- নতুন মানুষ, আমার তো তেমন পাঠক নেই। প্রচারেই প্রসার। প্রচার করছি। দেখা যাক কি হয়।

- শুভকামনা ভাই। কেমন বিক্রি চলছে?

- তা নিয়ে তেমন মাথাব্যথা নেই।

- আপনি অনেক ভালো লিখেন।

- শুকরিয়া। এইটা আমিও বিশ্বাস করি। অ্যালগরিদম টিপে লেখার অভ্যাস নেই। তাই অনেক সেলিব্রিটির থেকে ভালো লেখি বলে বিশ্বাস করি। তবে অনেক সীমাবদ্ধতা আছে আমার মাঝে।

- সব ঠিক হয়ে যাবে।

- ইন শা আল্লাহ

- একটা কথা বলার জন্য ফোন দিয়েছিলাম। কিভাবে বলবো…

- আরে বলো, কোনো প্যারা নাই।

- আসলে!

- আরে বলো। কোনো সমস্যা?

- (............) বিষয়ে কিছু জানেন? [ যে মানুষ আমাদের হয়না নিয়তি ও আমাদের দোষে তাদের নাম নিতে নেয় ]

খুব আগ্রহের সাথে জানতে চাইলাম, কি হয়েছে?

-কাল ওর বিয়ে!

আমার মুখ থেকে কোনো কথা বের হচ্ছে না। বাক্যরা বিদ্রোহ ঘোষনা করেছে আমার বিরুদ্ধে। মাথা ঘুরছে। সম্মুখে মানুষ দেখছি কিন্তু মাথায় হাত বুলিয়ে কাউকে বলার মতো পাচ্ছি না। যে আমাকে স্বযত্নে বলবে, কিছুই হয়নি। ভেঙে পডিস না। তকদিরের লেখা মেনে নিতে হয়। তুই ই তো এসবের জন্য দায়ী। এগুলো নিয়ে না ভেবে নিজেকে গোছাতে সময় দে৷

এতোই যখন তাকে ভালোবাসতি তাহলে ছেডেছিস কেনো?

আর ভালোবাসার মূল্য হিসেবে সে তোকে যেমন ভাবে দেখতে চেয়েছে, তা হয়ে দেখা।

হয়তো একদিন তোর প্রতিষ্ঠিত হওয়া দেখে মেয়েটা খুশি হবে।

তুই নিজেকে সামলা।

পৃথিবীর কোথাও থেকে আমায় সামলে দেবার জন্য পয়গাম আসলোনা।

পৃথিবী অন্ধকার হয়ে আসলো।

সত্যিই সে অন্যকারো হয়ে যাচ্ছে।

আশ্চর্য, আমার চোখে জল নেই কেনো?

তাকে ভুলে যাবার দীর্ঘ পাঠ এতদ্রুত সম্পন্ন হলো কিভাবে?

আমি তো তাকে ভুলতে পারিনি!

তার প্রতি আমার ভালোবাসা কি ক্ষীণ হয়ে গেছে?

না। তাকে তো আমি আজো ভালোবাসি।

তাহলে জল কোথায়।

ওহ, আমার মনে নেই,

ছেলেদের শৈশবে দেয়া এক ভুল পাঠ,

ছেলেমানুষের কাঁদতে নেই।

তাই হয়তো ভুল সিস্টেমে আবদ্ধ হয়ে আমি কাঁদতে পাচ্ছি না।

কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে পডেছে। কিছু আর ভালো লাগছেনা।

কেনো এমন হয়?

কিছু কিছু মানুষ হয় কিন্তু তারা কেনো আমাদের হয়না?

কেনো থেকে যায়না?

থেকে যাওয়ার মতো অমিমাংশিত প্রলাপ আমার থেকে মানায় না নিশ্চয়ই। আমিই তো তাকে ছেডে দিয়েছিলাম সুদীর্ঘ আট মাস পূর্বে।

যখন আমাদের ভালোবাসা পরিপূর্ণ ছিলো।

তাহলে তার বিবাহের কথা শুনে আমার কেনো খারাপ লাগছে?

আমি নির্লজ্জের মতো আজো কেনো তার কথা ভাবি?

কেনো তাকে আজো ভুলে উঠতে পারলাম না।

আত্মবিরুদ্ধ বাক্যগুলোও আমার কানে বাজছে। কেনো পৃথিবী এমন?

আচ্ছা!

মেয়েটার তো স্বপ্ন ছিলো, সুশিক্ষায় শিক্ষিত হবে।

দীর্ঘ পড়ালেখার পর সংসারি হবে।

তাহলে হঠাৎ বিয়ে কেনো?

একাই ভাবছি,

খানেক সময় ভেবে মনে হলো, আরে

আমি তো ওর থেকেই শুনতে পারি।

ফোনের দিকে চেয়ে দেখি কল কেটে গেছে।

হ্যালো হ্যালো করতে করতেই হয়তো ফোন রেখে দিয়েছে। আমার খেয়ালই ছিলোনা মেয়েটা যে লাইনে আছে।

আমার ফেনে ব্যালেন্স নেই। টাকা ভরা হয়না। অধিকাংশ সময়ই পকেটের হালত খারাপ থাকে। বেকারের পকেট আকার থাকা বেমানান।

মনে হলো কল দিলে তার সিমে মিসড কল যেতে পারে…

মিসড কল নিয়ে আমার জীবনে মজার অনেক গল্প আছে।

আমার ফোনে আগে থেকেই তেমন টাকা থাকতোনা৷ তার সাথে সম্পর্ক গডে ওঠার পর সেই ই অনেক সময় রিচার্জ করে দিতো।

আর আমি তারে মিসড কল দিতাম অথবা অনলাইনে আসতে বলতাম।

আমি কল দিলে অবশ্য সে নিজ থেকেই কেটে দিতো।

সে জানেই আমার ফোনে টাকা থাকেনা।

শুধু ফোনে না পকেটেও টাকা থাকেনা।

দেখা সাক্ষাতের খরচ- বিল তার পক্ষ থেকেই চোকানো হতো।

তার টাকা গচ্ছানোর ইচ্ছে না থাকলেও জোর করে আমায় ট্রিট দিতোই।

না নিলেও অভিমান করতো।

দিনগুলো সুন্দর ছিলো। অনেক সময় আমাকে টাকাও দিয়েছে মেয়েটা।

টাকা নিয়ে আমাদের অনেক ঝগড়া হয়েছে।

সে আমাকে খাওয়াবে, মন চাইলে নিজে থেকে দিবে কিন্তু আমি যদি তার থেকে চেয়ে নেই তা তার কাছ থেকে ঋণ হিসেবে নিতে হবে এবং তা পরিশোধ করতেই হবে।

আমি ঋণ শোধ করার বিপক্ষ দলের লোক।

এ নিয়ে খুব ঝগড়া করেছি জীবনে।

আহ্! সময়।

এখন দীর্ঘস্বাশেই শুধু সেই স্মৃতিগুলো ভেসে ওঠে। চোখ না কাঁদলেও ঠুকরে কাদে স্মৃতির দালান।

প্রতিটি ভালো আছি বাক্যের সাথে মিশে থাকে মিথ্যে। মূলত আমি তো ভালো নেই। সত্যিই ভালো নেই।

তবুও বেঁচে আছি দুঃখের ঘরে জীবন বেচে দিয়ে।

একটু পর বেক করলো সেই সহপাঠী।

বললো,

-ঠিক আছেন তো নাকি?

- হ্যা। কিন্তু ওর তো অনেক স্বপ্ন ছিলো। পডালেখা করে তারপর বিয়ে শাদী করবে!

- সব ইচ্ছে পূরণ হয়না।

- কি হয়েছে বলো প্লিজ

- না ভাই, আমার থেকে জানতে চায়েন না। আপনাকে আমি বলতে পারবোনা।

-কেনো বোন? প্লিজ।

- আপনার লেখা পডি মাঝেমাঝে।

আমি ভেবেছিলাম আপনি ওর সাথে প্রতারণা করেছিলেন। এখন আপনার লেখা পডে মনে হলো আপনিও পরিস্থিতির স্বীকার। সেজন্য আপনাকে বললাম ওর বিয়ের কথা।

ওকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করুন। ভালো থাকুন।

-ওর বিয়ের কারণটা বলো প্লিজ। আল্লাহর ওয়াস্তে বলো বোইন।

- আপনি…..

আচ্ছা বলছি শোনেন!

আপনি ছেডে দেবার পর একদম ভেঙে পড়েছিলো মেয়েটা। খুব কেঁদেছে। অনেক অনেকদিন কেঁদেছে। মেয়েটা আপনাকে অনেক ভালোবাসতো।

ওইতো কলেজ বাদ দিয়ে দিছে, ক্লাস করেনা। বাসায়ই প্রাইভেট পডে। বের হয়না। কারো সাথে তেমন কথা বলেনা।

একরকম পাগলের মতো। সারাদিন চুপচাপ থাকে।

আগেথেকেই চুপচাপ থাকা মেয়েটা আরো চুপচাপ হয়ে গেছে। টেবিল বই আর এককি চিন্তা। এইমিলিয়েই ছিলো।

পরে এসব দেখে আঙ্কেল ওর বিয়ে ঠিক করেছে।

-(........) ওই কি রাজি?

- প্রথমে রাজি ছিলোনা। পরে রাজি হয়েছে।

- ছেলে কি করে?

- ক্যাডার সার্ভিসে আছে।

- তাহলেতো বয়সে অনেক বড।

- খুব বড না। সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছে কিছুদিন আগেই শুনলাম।

- বাহ্! আলহামদুলিল্লাহ।

মেয়েটা সুখে আছে জেনে ভালো লাগবে। তুমি কি বলো?

-আপনাদের সিনেমাটিক প্রেম ভাই আমি বুঝি না।

- কাল যাবো।

- কই যাবেন?

- দাওয়াত খেতে।

- মজা করতেছেন?

- না। সত্যি।

- কিভাবে যাবেন?

- তুমি ব্যবস্থা করবা।

- ভাই আমি পারবোনা।

- প্লিজ। তাকে শেষ বারের মতো দেখবো। এইটুকু করে দাও!

- পসিবল না ভাই।

- দেখো, আমাদের হয়তো আর কখনো দেখায় হবেনা৷ পৃথিবীতে সংসারটাও হলোনা। আখেরাতেও পাবোনা। সেখানেও দেখা হবার কোনোই সুযোগ নাই।

তার সাথে শেষবারের মতো দেখা করার ব্যবস্থা কইরে দাও।

হয়তো এটাই আমাদের শেষ দেখা। জীবনের কথাতো বলা যায়না। মরার আগে এই শেষবারের মতো দেখা করার সুযোগ করে দেও। প্লিজ প্লিজ। না বোইলোনা প্লিজ।

-আমি চেষ্টা করবো।

- তোমাকে ব্যবস্থা করতেই হবে।

-আচ্ছা বিকাল চারটায় ওর বাসার কাছে এসে আমাকে ফোন দিয়েন।

- আচ্ছা।

- সমস্যা হলো, ওর বাসার সবাইতো আপনাকে চেনে। সমস্যা হতে পারে।

- কিছু হবেনা। চিন্তা নেই। এইটুকু রিস্ক নেয়া ব্যপার না।আর বিয়ে বাডিতে যেচে আমার সাথে গেন্জাম করবেনা। আর আমিতো দূর থেকে তারে দেখেই চলে আসবো।

- আচ্ছা ভাইয়া।

- ওকে।

- আসসালামু আলাইকুম

-ওয়া আলাইকুমুস সালাম।

ফোন রাখার পরে নানান ভাবনা মাথায় আসছে। এসব লিখে রাখা উচিৎ।

ভাবনাগুলোর কয়েকটি গানে রূপান্তরিত হলো। কয়েকটি কবিতাও হয়েছে।

এরমাঝে একটা কবিতা এখন খুব প্রিয়।

ক্রিয়াপদহীন কবিতা। খুব সহজে সেই সময় সাহিত্য ধরা দিচ্ছিলো।

কয়েকটি কবিতা ও গান লিখে বাডি চলে এলাম।

নিজেকে স্বাভাবিক রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা চললো পরদিন পর্যন্ত।

বিকাল চারটায় দাডিয়ে আছি তাদের চারতলা বডির ঠিক দুই বাডি আগে।

এখানথেকে দেখা যাচ্ছে ওদের বাসার ছাদের সুসজ্জিত আলো জলছে, বেশ ভালো সাজানো। বিয়ে বাডির আমেজ আনার মনে বিষাদ হয়ে ধরা দিচ্ছে।

বুকটা মোচড দিয়ে উঠছে। একবার মন বলছে নির্লজ্জের মতো যেতে আবার বলছে গিয়ে লাভ কি? শুধু শুধু দুঃখ বাডাবি কেনো?

সহপাঠীকে ফোন দিলাম।

আসলো….

শাডি পডে আসছে, আস্তে আস্তে। মন সে সময় চাইতেছিলো তারে আছাড দিতে। বিষায়গুলে মনে মনে তার উপর পড়তে বলছিলো।

আমার শুধু মনে হচ্ছে, সে দৌডে এসে আমাকে সেকেন্ডের মাঝে দেখিয়ে দেবে সেই মানুষটাকে।

সে এসে বললো কেমন আছেন?

হেসে কথা বলার মতো অহেতুক অভ্যাস আমার, হাসিমুখে বললাম, এইতো ভালোই।

ওদের বাসার কি খবর? যাবার মতো ব্যবস্থা আছে তো নাকি?

-হ্যা সমস্যা নেই।

- (…….) ও কি জানে? আমি যে যাবো।

- হুম। কি বললো?

- আপনার মুখ সে দেখতে চায়না।

- হেসে বললাম, তাকে একটা কথা বলতে পারবেন?

- কী?

- সে যেনো মন খুলে একটা চড় মারে আমাকে?

- কেনো?

- নিঃসন্দেহে তারসাথে প্রতারণা করেছি আমি। চরের মতো সামান্য উপহার পেতেই পারি।

- ভাই মজা কইরেন না। বলেন আমাকে কেমন লাগতেছে?

- তুমি আমার সাথে মজা করতেছো নাকি?

আমার কি এইসব এখন বোঝার কথা? কিছু ভালো লাগতেছেছেনা। নো কমেন্ট্স…

-আরে বলেন না?

- এক পলক তাকিয়ে দেখলাম। নাহ, বেশ সুন্দর লাগছে মেয়েটাকে। নীল শাডিতে মেয়েদের আসল সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। এমনিতেই সুন্দর। আর এরমাঝে সব মিলিয়েতো প্রশংসা করার মতোই। বললাম, তোমার সৌন্দর্য দেখে আবারো প্রেমে পড়ার ভুল করতে পারি।

- মজা কইরেন না ভাই।

- হা হা হা। তাডাতাডি আসো।

- শাডি পডে দ্রুত গেলে পডে যাবো। অভ্যাস নেই শাডি পডার। আর হ্যা প্লিজ ভিতরে পাগলামি কইরেন না।

- আমি কি পাগল? পাগলামি করবো কেনো?

- সিনেমায়তে পাগলামিই দেখি। আপনাদের প্রেম সিনেমার থেকে কম কী?

গল্প করতে করতে হাসিমুখে চলে এলাম।

সেই মানুষটি মিষ্টি রঙের শাডি পডেছে। কানে আমার পছন্দ করা সেই দুলটাও ঝুলছে। গলায় ভারি গহনা। গলারটা ভালো লাগছেনা। অল্পতেই সে সুন্দর। মাথার টিকলি বাঁ দিকে কিছুটা সরে আছে। হাতে বালা না পরলেও চলতো।

সম্ভবত এটা ওর মায়ের বালা, অনেকদিন আগে এক গল্পে এই বালার ছবি দেখেছিলাম। তবে বালার সাথে চিকন যেই স্বর্ণের চূডি সেটি থাকলেই বেশি ভালো লাগতো। তবে খারাপনা।

মুখে তেমন মেকাপের ছাপ নেই। এমনিতেই সুন্দর। অপরূপ সুন্দর। আর সুন্দর মানুষকে ভারি মেকাপে বেমানান লাগে।

ঠোটেও গোলাপি লিপস্টিক। হালকা করে দেয়া হলেও একদম জলজল করছে।

হাতেও মেহেদি পডেছে, তাতে আমার নাম লেখা হবার কথা ছিলো। কিন্তু সেখানে আজ অন্য জনের নাম লেখা।

ভাগ্যের নিষ্ঠুর নির্মম পরিহাস আমাকে তার থেকে খুব খুব দূরে নিয়ে গেছে।

তাকে আমি খুব খুব নির্লজ্জ, বেহায়াদের দৃষ্টিতে দেখছিলাম। তাই তার বর্ণনা খুব করেই দিতে পারছি।

আরো অনেক বর্ণনা চাইলেই দেয়া যাবে।

তবে খুব করেই অনেক কথা আপনমনে রেখে দিলাম।

তাকে খুব কাছ থেকে দেখছিলাম। আমার ঠিক পাশে এসে দাডালো তার মা!

কখন দাডিয়েছে খেয়াল করিনি, দেখেই লজ্জিত কন্ঠে সালাম দিয়ে বললাম ভালো আছেন?

সে বললো, আলহামদুলিল্লাহ। বাবা তুমি কেমন আছো?

-আলহামদুলিল্লাহ।

- খেয়েছো?

- না আমি চলে যাবো এখনই।

- কেনো? না খেয়ে যেতে পারবেনা।

- বললাম, না আন্টি দোয়া করবেন। আসি, আসসালামু আলাইকুম ।

- আরে না বাবা খেয়ে যাও!

- না না আন্টি ধন্যবাদ।

আয়োজন ছাদে করা হয়। সেখানে প্রায় পঞ্চাশের মতে মানুষ ছিলো। প্রায় লোকেই আমাকে চেনেনা। হয়তো আমার চাহনি তাদের চোখে নেতিবাচকভাবে ধরা দিয়েছে। এসবের পরোয়া করিনা।

তাকে দেখেছি, দেখতে পেরেছি। এটাইতো পরম পাওয়া। আর কি লাগে?

আমি তাকে অনেক সময় ধরে দেখলেও সে আমার দিকে এক সেকেন্ডের জন্য দেখেই চোখ ফিরিয়ে নেয়। আর তাকায়নি।

সে সময় সে কি ভাবছিলো?

নিশ্চয়ই আমাকে প্রতারক বললে ভুল বলা হবেনা।

তবে তার কাছে ক্ষমা চাওয়া ব্যতিত আমার আর কিচ্ছু চাওয়ার নেই।

একটা সময় ছিলো। চোখাচোখ - যোগাযোগ কিছুরই কমতি ছিলোনা।

কিন্তু আজ?

দীর্ঘস্বাশ জমিয়ে এটাই বলতে হয়।

আমাদের এই দেখাই হয়তো শেষ দেখা।

কোনোদিন হয়তো আমাদের আর দেখা হবেনা পৃথিবীর মাঝে। কোনোদিন কথা হবেনা।

নিষ্ঠুরতম হৃদয় নিয়ে বাঁচতে হবে। বাঁচার মতো করে না হলেও বাঁচতে হবে।

সে ভালো আছে জানলেই ভালো লাগবে। প্রতিষ্ঠিত জামাই পেয়েছে। এখন গোছানো সংসার হলেই হয়। তার জন্য আমার থেকে অশেষ দোয়া শেষ সময় পর্যন্ত। সে ভালো থাকুক। তার ভালোর জন্যইতো আমার সাথে তার চুকিয়েছিলো প্রেম।

খুব করে তার জামাইকেও দেখার ইচ্ছে ছিলো। তবে দেখতে পারিনি। তার জন্যও শুভকামনা।

সে খুব ভাগ্যবান এমন জীবনসঙ্গী পেয়েছে বলে। মেয়েটা এক কথায় অন্নপূর্ণা।

শেষে শেষবাক্যে জমে থাকে, তার দেখা না পাওয়ার আফসোস। আর হ্যা পৃথিবীর পাঠ শেষ মৃত্যুর পরের সেই অনন্তের জীবনেও তার দেখা পাবোনা। স্রষ্টা এমন নিয়তিই লিখে দিয়েছে….

মেনে নিয়েছি। নিজেকে প্রতিনিয়ত বোঝাই। শুধু বোঝেনা এইটুকুই ব্যপার।

যেই কলঙ্ক নিজেই লিখেছি নিজের জীবনে— সেই কলঙ্ক নিয়েই জীবন চলছে জীবনের গতিতে।

[ জীবনের অলিখিত ডায়েরি ]

২২শে নভেম্বর, ২০২৫||জামালপুর, বাংলাদেশ

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+35 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login