একই ঘরে দেহ আর আত্মা—
কতকাল ছিল দুই নীরব বাসিন্দা,
একজন মাটির প্রদীপ, অন্যজন তার শিখা;
কে কাকে বাঁচিয়ে রাখে
সে হিসাব কোনোদিন করেনি তারা।
একদিন সামান্য কথার কাঁটা
বড় হয়ে বিঁধল দুজনের মাঝে।
অভিমান জমতে জমতে আত্মা বলল—
এই ঘর আমার নয়,
এই বন্ধনই আমার সকল বন্দিত্ব;
আমি এবার মুক্ত হব।
দেহ কোনো উত্তর দিল না।
শুধু দরজাটা খুলে রেখে
চুপ করে বসে রইল—
যে যেতে চায়, তাকে ধরে রাখাও
হয়তো আরেক ধরনের পরাধীনতা।
আত্মা বেরিয়ে গেল।
প্রথম প্রথম আকাশটাকে
তার অসীম মনে হলো;
কোনো দেয়াল নেই, শিকল নেই,
কারও কাছে ফেরার দায় নেই—
সে ভাবল, এরই নাম বুঝি মুক্তি।
ওদিকে দেহ পড়ে রইল একা।
চোখ ছিল, অথচ দেখার আকাঙ্ক্ষা নেই;
বুক ছিল, অথচ স্পন্দনের কোনো অর্থ নেই।
ঘরখানা অক্ষতই ছিল—
শুধু ঘরের মানুষটি ছিল না।
কিছুদিন যেতে
আত্মারও কেমন অসুখ হলো।
আকাশ এত বড়,
তবু কোথাও বসবার জায়গা নেই;
পৃথিবী এত বিস্তৃত,
তবু নিজের বলে কোনো ঘর নেই।
তখন সে প্রথম বুঝল—
যাকে এতদিন খাঁচা ভেবেছে,
সেই দেহই ছিল তার ঠিকানা;
আর দেহ বুঝল—
যাকে অদৃশ্য বলে কখনো গুরুত্ব দেয়নি,
সেই ছিল তার বেঁচে থাকার কারণ।
কিন্তু কিছু সত্য
মানুষ বুঝতে শেখে
ফিরে আসার সময় ফুরিয়ে গেলে।
দেহ ধীরে ধীরে নিভে গেল,
মাটির প্রদীপের শেষ তেলের মতো।
আত্মাও আর বেশিদিন টিকল না—
ঠিকানাহীন হতে হতে
একদিন সেও হারিয়ে গেল
অসীমের কোন অজানা অন্ধকারে।
পড়ে রইল শুধু
কয়েকটি সামান্য কথা,
কিছু অহংকার, কিছু অভিমান—
যাদের জন্য একদিন
দুই পরিপূরক অস্তিত্ব
পরস্পরকে পর করে দিয়েছিল।
তারা ভেবেছিল
একে অপরের কাছ থেকে দূরে গেলেই মুক্ত হবে;
বোঝেনি—
সব বন্ধন শিকল নয়,
কিছু বন্ধনই অস্তিত্ব।
দেহ ছাড়া আত্মা ছিল ঠিকানাহীন,
আত্মা ছাড়া দেহ ছিল অর্থহীন।
শেষে দুজনেই মুক্ত হলো—
অভিযোগ থেকে, অপেক্ষা থেকে,
ফিরে আসার সমস্ত সম্ভাবনা থেকে।
যে সামান্য অভিমানে
তারা একদিন মুক্তি চেয়েছিল,
সেই মুক্তিই শেষ পর্যন্ত
তাদের নিয়ে গেল এমন এক স্বাধীনতায়—
যেখানে বন্ধন নেই,
কিন্তু অস্তিত্বও নেই।
- খন্দকার মঈন হোসেন