অনেক দিন ধরেই আমার ইচ্ছে ছিল এমন একটা জায়গায় যাব, যেখানে শহরের কোলাহল নেই, মানুষের ব্যস্ততা নেই, আর সময়কে ধরে রাখার কোনো তাড়া নেই। এমন একটা গ্রাম, যেখানে বিকেল হলে গাছের ছায়া লম্বা হয়, পাখিরা ঘরে ফেরে, আর সন্ধ্যা নামে খুব ধীরে।
একদিন হঠাৎ সেই ইচ্ছেটা পূরণ করার সিদ্ধান্ত নিলাম।
কোনো বন্ধুকে বললাম না, কাউকে সঙ্গে নেওয়ার পরিকল্পনাও করলাম না। শুধু একটা ব্যাগে কয়েকটা কাপড়, একটা ডায়েরি আর কলম নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
আমার গন্তব্য ছিল নদীর ওপারে অবস্থিত একটি ছোট্ট গ্রাম। নামটা আগে একবার শুনেছিলাম, কিন্তু কখনো যাওয়া হয়নি।
সকালে বাসে উঠলাম। জানালার পাশের আসনে বসে বাইরের দৃশ্য দেখতে লাগলাম। শহরের ভবনগুলো পেছনে পড়ে রইল। ধীরে ধীরে রাস্তার দুই পাশে সবুজ মাঠ, পুকুর, তালগাছ আর মাটির বাড়ি দেখা দিতে লাগল।
কোথাও একজন কৃষক জমিতে কাজ করছিলেন, কোথাও কয়েকটি শিশু স্কুলের পোশাক পরে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল। একটা ছোট দোকানের সামনে কয়েকজন মানুষ চা খেতে খেতে গল্প করছিলেন।
সবকিছু এত সাধারণ ছিল, অথচ আমার কাছে অসাধারণ লাগছিল।
আমি ভাবছিলাম, পৃথিবীতে কত রকম জীবন আছে! কেউ শহরের ব্যস্ত রাস্তায় দিন কাটায়, কেউ নদীর পাড়ে বসে সূর্যাস্ত দেখে, কেউ আবার পাহাড়ের পাশে ছোট্ট একটা বাড়িতে নিজের সংসার গড়ে তোলে।
কিন্তু সুখ কি সত্যিই কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় থাকে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই বাস থেকে নেমে পড়লাম।
সামনে নদী। ওপারে যাওয়ার জন্য একটা ছোট নৌকা অপেক্ষা করছিল।
আমি নৌকায় উঠে বসলাম।
নৌকা ছেড়ে দিতেই নদীর বাতাস এসে মুখে লাগল। পানির ওপর সূর্যের আলো চিকচিক করছিল। দূরে কয়েকটা সাদা বক উড়ে যাচ্ছিল।
মনে হলো, আমি শুধু নদী পার হচ্ছি না, নিজের প্রতিদিনের জীবন থেকেও কিছুটা দূরে সরে যাচ্ছি।
২. যে বাড়িতে কেউ আমাকে চিনত না
গ্রামে পৌঁছে প্রথমেই চোখে পড়ল সরু মাটির রাস্তা। রাস্তার দুপাশে সবুজ গাছপালা, ছোট ছোট বাড়ি আর উঠানে শুকাতে দেওয়া ধান।
কোথাও একটা গরু ঘাস খাচ্ছে, কোথাও মুরগির পেছনে কয়েকটা ছোট বাচ্চা দৌড়াচ্ছে।
গ্রামটা যেন নিজের ছন্দে বেঁচে আছে।
আমি হাঁটতে হাঁটতে একটা পুকুরের পাশে এসে দাঁড়ালাম। পুকুরের পানি স্থির, চারদিকে নারকেলগাছ। একটা গাছের নিচে বসে থাকা বৃদ্ধ লোক আমাকে দেখে বললেন, “বাবা, কোথা থেকে এসেছ?”
আমি বললাম, “দূর থেকে এসেছি। গ্রামটা দেখতে।”
তিনি একটু অবাক হয়ে হাসলেন। “আমাদের গ্রাম দেখতে এত দূর থেকে মানুষ আসে নাকি?”
আমি বললাম, “আপনাদের কাছে হয়তো সাধারণ, কিন্তু আমার কাছে খুব সুন্দর।”
তিনি কথাটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “তাহলে বসো। একটু বিশ্রাম নিয়ে যাও।”
আমি তাঁর পাশে বসলাম।
কথা বলতে বলতে জানলাম, তিনি বহু বছর ধরে এই গ্রামেই থাকেন। তাঁর জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে এই পুকুর, মাঠ আর নদীকে ঘিরে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “চাচা, কখনো মনে হয় না শহরে গিয়ে থাকবেন?”
তিনি পুকুরের পানির দিকে তাকিয়ে বললেন, “মাঝে মাঝে মনে হয়। কিন্তু তারপর সকালে ঘুম থেকে উঠে এই গাছগুলো দেখি, পাখির ডাক শুনি, নদীর দিকে হাঁটতে যাই। তখন মনে হয়, আমার যা আছে, তা-ও তো কম নয়।”
আমি কথাটা মনে মনে ভাবলাম।
আমরা অনেক সময় যা নেই, তার পেছনে ছুটতে ছুটতে যা আছে, তার সৌন্দর্য ভুলে যাই।
বৃদ্ধ লোকটি আমাকে গ্রামের একটা ছোট অতিথিশালার ঠিকানা দিলেন। সেখানে গিয়ে একটা ঘর নিলাম। ঘরটা সাধারণ, জানালার পাশে কাঠের একটা টেবিল, আর বাইরে একটা আমগাছ।
ব্যাগ রেখে জানালা খুললাম।
দূরে কয়েকটা শিশু খেলছিল। তাদের হাসির শব্দ ভেসে আসছিল বাতাসে।
আমি ডায়েরি খুলে লিখলাম—
“অচেনা জায়গায় এসে একটা অদ্ভুত ব্যাপার
বুঝলাম। এখানে কেউ আমার অতীত জানে না, আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে কারও প্রত্যাশা নেই। আমি শুধু একজন পথিক, যে পৃথিবীটাকে একটু কাছ থেকে দেখতে এসেছে।”
৩. বিকেল যখন গল্প হয়ে নামে
বিকেলে গ্রামের রাস্তা ধরে হাঁটতে বের হলাম।
আকাশে তখন হালকা মেঘ। সূর্যের আলো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে মাটিতে পড়ছিল। কোথাও ধানখেত, কোথাও ছোট খাল, আবার কোথাও বাঁশের সাঁকো।
একটা সাঁকোর ওপর দাঁড়িয়ে নিচের পানির দিকে তাকালাম। ছোট মাছগুলো মাঝে মাঝে পানির ওপর ভেসে উঠছিল। বাতাসে ধানের গন্ধ।
কিছু দূরে একটা মেয়ে তার ছোট ভাইকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিল। ছেলেটার হাতে কয়েকটা বুনো ফুল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “ফুলগুলো কোথায় পেলে?”
ছেলেটা হাসল। “ওই মাঠ থেকে।”
“কাকে দেবে?”
সে তার বোনের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপুকে।”
মেয়েটা হেসে বলল, “ও নিজেই ফুল তুলে আবার আমাকেই দেয়।”
আমি তাদের হাসি দেখে মুগ্ধ হলাম।
শহরে থাকলে হয়তো এই ছোট্ট ঘটনাটা আমার চোখেই পড়ত না। অথচ গ্রামের এই বিকেলে ফুলের একটা ছোট্ট তোড়া যেন অনেক বড় আনন্দের গল্প হয়ে উঠল।
আরও কিছু দূর গিয়ে একটা মাঠে বসে পড়লাম।
সূর্য ধীরে ধীরে নিচে নামছিল। মাঠের ওপারে কয়েকজন কৃষক বাড়ি ফিরছিলেন। গরুগুলোকে নিয়ে একজন রাখাল রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল। গাছের ডালে পাখিরা জড়ো হচ্ছিল।
কোনো কিছুই তাড়াহুড়ো করছিল না।
আমি মনে মনে ভাবলাম, শহরে আমরা প্রায়ই ঘড়ির দিকে তাকিয়ে থাকি। কতটা সময় চলে গেল, কতটা কাজ বাকি, কখন কোথায় পৌঁছাতে হবে—এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে দিন শেষ হয়ে যায়।
অথচ এই গ্রামের মানুষগুলোও তো কাজ করেন, পরিশ্রম করেন, দুশ্চিন্তায় থাকেন। তবু প্রকৃতির সঙ্গে কাটানো ছোট ছোট মুহূর্তগুলো তাঁদের জীবনের অংশ।
হয়তো শান্তি মানে দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়। শান্তি মানে দায়িত্বের মাঝেও একটু থেমে চারপাশের পৃথিবীটাকে দেখতে পারা।
সূর্য ডুবে যাওয়ার আগে মাঠ থেকে উঠে পড়লাম।
ফেরার পথে একটা বাড়ির উঠান থেকে ভেসে আসছিল রান্নার গন্ধ। কোথাও থালাবাসনের শব্দ, কোথাও মানুষের গল্প, কোথাও আবার শিশুর কান্না।
গ্রামটা ধীরে ধীরে সন্ধ্যার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল।
আর আমার মনে হচ্ছিল, এই সাধারণ দৃশ্যগুলোর মধ্যেই জীবনের কত সুন্দর গল্প লুকিয়ে আছে।
৪. সেই রাতের আকাশ
সন্ধ্যার পর অতিথিশালায় ফিরে খাবার খেলাম। তারপর বাইরে বেরিয়ে আমগাছটার নিচে দাঁড়ালাম।
আকাশে অসংখ্য তারা।
শহরে এত তারা কখনো দেখিনি। চারপাশের আলো কম থাকায় আকাশটা যেন আরও বিশাল হয়ে উঠেছিল।
আমি উঠানের একটা চেয়ারে বসে রইলাম।
কিছুক্ষণ পর অতিথিশালার মালিক এসে পাশে বসলেন। তাঁর সঙ্গে গল্প করতে করতে জানতে পারলাম, এই গ্রামে তাঁর জন্ম। পড়াশোনার জন্য একসময় শহরে ছিলেন, পরে আবার গ্রামে ফিরে এসেছেন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “শহরে থাকতে ভালো লাগত না?”
তিনি বললেন, “ভালো লাগত। সেখানে অনেক সুযোগ আছে। কিন্তু আমার মনে হতো, আমি সব সময় কোথাও পৌঁছানোর চেষ্টা করছি। অথচ কোথায় পৌঁছাতে চাই, সেটা পরিষ্কার জানতাম না।”
আমি চুপ করে শুনছিলাম।
তিনি আবার বললেন, “গ্রামে ফিরে এসে বুঝলাম, জীবনকে সুন্দর করার জন্য শুধু বড় কিছু অর্জন করলেই হয় না। কখনো পরিবারের সঙ্গে খাওয়া, পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা, বিকেলে হাঁটতে যাওয়া—এসবও খুব মূল্যবান।”
তারপর তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তবে একটা কথা মনে রেখো। গ্রামে থাকলেই মানুষ সুখী হয় না, শহরে থাকলেই অসুখী হয় না। নিজের জীবনকে কীভাবে দেখছ, সেটাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ।”
আমি তাঁর কথার সঙ্গে একমত হলাম।
কারণ আমি এখানে এসেছিলাম শান্তি খুঁজতে। কিন্তু শান্তি যে শুধু গ্রামের মধ্যে আটকে নেই, সেটা বুঝতে পারছিলাম।
আমরা যেখানে থাকি, সেখানেও হয়তো শান্তির ছোট ছোট মুহূর্ত আছে। শুধু সেগুলো দেখার জন্য আমাদের একটু থামতে হয়।
রাত গভীর হলো।
ঘরে ফিরে শুয়ে পড়লাম। জানালা দিয়ে আকাশের কয়েকটা তারা দেখা যাচ্ছিল।
ঘুমানোর আগে ডায়েরিতে লিখলাম
আজ কোনো বিখ্যাত জায়গা দেখিনি। কোনো বড় ঘটনা ঘটেনি। তবু আজকের দিনটা সুন্দর ছিল। কারণ আজ আমি তাড়াহুড়ো না করে একটা দিন কাটিয়েছি। মানুষের কথা শুনেছি, প্রকৃতিকে দেখেছি, আর নিজের ভাবনাগুলোকে সময় দিয়েছি।”
৫. যে সকাল আমাকে ফিরিয়ে দিল
পরদিন ভোরে ঘুম ভাঙল মোরগের ডাকে।
জানালা খুলে দেখি, চারপাশে হালকা কুয়াশা। গাছের পাতায় শিশির জমে আছে। দূরে একজন কৃষক মাঠের দিকে যাচ্ছেন।
আমি বাইরে বেরিয়ে নদীর পাড়ে চলে গেলাম।
নদীর ওপর কুয়াশার পাতলা চাদর। ওপারের গাছগুলো অস্পষ্ট দেখাচ্ছিল। কয়েকটা নৌকা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল পানির ওপর দিয়ে।
পাড়ে বসে অনেকক্ষণ নদী দেখলাম।
মনে হচ্ছিল, এই দৃশ্যটা শেষ হয়ে যাক, তা চাই না। আরও কিছুক্ষণ এখানে থাকতে ইচ্ছে করছিল।
কিন্তু ভ্রমণ যত সুন্দরই হোক, একসময় ফিরে যেতে হয়।
সকালের নাশতা শেষে ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম। গ্রামের কয়েকজন মানুষের সঙ্গে বিদায় নিয়ে নদীর দিকে রওনা দিলাম।
নৌকায় উঠবার আগে একবার পেছনে তাকালাম।
গ্রামের মাটির রাস্তা, গাছের সারি, দূরের বাড়িগুলো—সবকিছু ধীরে ধীরে চোখের আড়ালে চলে যাচ্ছিল।
মনে হলো, এখানে হয়তো আর কোনো দিন আসা হবে না। আবার হয়তো বহু বছর পর কোনো এক সকালে ফিরে আসব।
কিন্তু এই দুই দিনের স্মৃতিগুলো আমার সঙ্গে থাকবে।
নৌকা যখন নদীর মাঝখানে পৌঁছাল, তখন সূর্যের আলো পানির ওপর পড়তে শুরু করেছে। বাতাসে ভেসে আসছিল ভেজা মাটির গন্ধ।
আমি ব্যাগ থেকে ডায়েরিটা বের করলাম।
শেষ পাতায় লিখলাম—
“আমি ভেবেছিলাম, দূরের কোনো গ্রামে গেলে জীবনের সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাব। তা হয়নি। কিন্তু আমি শিখেছি, সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে জীবন কাটিয়ে দেওয়ারও কোনো মানে নেই। কিছু দিন শুধু বেঁচে থাকার জন্য, কিছু মুহূর্ত শুধু অনুভব করার জন্য।”
তারপর কলমটা বন্ধ করে ডায়েরি ব্যাগে রেখে দিলাম।
বাড়ি ফেরার পথে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলাম। এবার পরিচিত মাঠ, গাছ আর মানুষের দৃশ্যগুলোও অন্য রকম লাগছিল।
হয়তো পৃথিবী বদলায়নি।
বদলে গিয়েছিল আমার দেখার ধরন।
বাড়ি ফিরে যখন নিজের ঘরে ঢুকলাম, তখন সবকিছু আগের মতোই ছিল। সেই জানালা, সেই টেবিল, সেই পরিচিত পরিবেশ।
কিন্তু আমার ভেতরে একটা নতুন অনুভূতি রয়ে গেল।
আমি বুঝলাম, পৃথিবী দেখার জন্য সব সময় অনেক দূরে যাওয়ার দরকার হয় না। কখনো দূরের কোনো গ্রামে গিয়ে আমরা নিজের পরিচিত জীবনকেও নতুন করে চিনতে শিখি।
সেদিন রাতে ঘুমানোর আগে জানালা খুলে আকাশের দিকে তাকালাম।
তারাগুলো দেখা যাচ্ছিল না, আকাশ মেঘলা ছিল।
তবু আমার মনে পড়ছিল সেই গ্রামের রাতের আকাশ, নদীর ওপর ভেসে থাকা কুয়াশা, আর বৃদ্ধ মানুষটির কথা।
আমি জানতাম, আবার কোনো একদিন ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ব।
নতুন কোনো গ্রাম, নতুন কোনো নদী, নতুন কোনো রাস্তা আমার জন্য অপেক্ষা করবে।
আর আমি আবারও আবিষ্কার করব পৃথিবীর কোনো না কোনো ছোট্ট সৌন্দর্য।
কারণ ভ্রমণ শুধু অচেনা জায়গাকে চেনার নাম নয়; ভ্রমণ হলো পরিচিত জীবনকে নতুন চোখে দেখতে শেখা।