পুরোনো মেহগনি কাঠের ড্রেসিং টেবিলটার দিকে তাকাতে এখন অয়নের এক ধরনের অদ্ভুত দ্বিধা হয়। আয়নার কাচটা বেশ পুরোনো; এক কোণে কালচে ছোপ পড়েছে, পারদের প্রলেপটা জায়গায় জায়গায় ক্ষয়ে গিয়ে ভেতরে যেন অন্য একটা জগতের ধোঁয়াশা তৈরি করেছে। প্রতি ভোরে যখন সে শেভ করতে দাঁড়ায়, কিংবা অফিস যাওয়ার আগে অন্যমনস্কভাবে টাইয়ের নটটা ঠিক করে, তখন ওপাশে ফুটে ওঠা মুখটাকে তার বড্ড অচেনা ঠেকে। এই যে কুঁচকে যাওয়া কপাল, চোখের নিচে কালচে বলয়, আর ঠোঁটের কোণে স্থির হয়ে বসে থাকা এক টুকরো ক্লান্তি,এ মানুষটা কে? এ তো সেই অয়ন নয়, যে আজ থেকে সাত বছর আগে একঝাঁক কদমফুল হাতে বৃষ্টিতে ভিজে তিথির হলের গেটে দাঁড়িয়ে থাকত। যে অয়ন সামান্য রসিকতাতেই প্রাণখোলা হাসিতে ভেঙে পড়তে পারত, যাকে তিথি আঙুল তুলে বলত, “তোমার এই অবাধ্য চুলগুলো না ঠিক করলে আমি কিন্তু কথাই বলব না!”
সেই চুলগুলো আজও হয়তো কিছুটা অবাধ্য, কিন্তু এখন সেগুলোতে হালকা রুপোলি ছোপ লেগেছে। আর যার শাসনের অধিকারে সেই চুলগুলো নিজের জায়গা খুঁজে পেত, সে হারিয়ে গেছে বহু দূরে। জীবনের জটিল আবর্তে, অহংকারের নীরব যুদ্ধে, আর সময়ের নির্মম বিচ্ছেদে তিথি এখন অন্য কারও সংসারের অংশ। আর অয়ন আটকে আছে এই নিঃসঙ্গ চারদেয়ালে, যেখানে প্রতিটি ধূলিকণাও কেবল তিথির চলে যাওয়ার গল্প শোনায়।
আজ ছুটির দিন। সকাল থেকেই ঢাকার আকাশ জুড়ে ঘন মেঘের আনাগোনা। কার্তিকের শেষভাগে এমন অকালবৃষ্টির পূর্বাভাস খুব একটা থাকে না, তবুও বাতাসের ভিজে গন্ধে মনটা কেমন উদাসীন হয়ে ওঠে। অয়ন এক কাপ লিকার চা হাতে নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। ফ্ল্যাটের আটতলা থেকে নিচের রাস্তাটা বেশ ধূসর দেখায়। গাড়ির হর্ন, পথচারীদের তাড়াহুড়ো,সবকিছু কেমন একঘেয়ে।
তিথির সাথে কাটানো দিনগুলো কি তবে সত্যিই একঘেয়ে ছিল? না, তিথি তো ছিল রঙের বিস্ফোরণ। শান্ত, সংবেদনশীল কিন্তু একই সাথে প্রচণ্ড জেদি। তাদের পরিচয়ের দিনটার কথা মনে পড়তেই অয়নের বুকের ভেতর একটা পরিচিত চিনচিনে ব্যথা চাগাড় দিয়ে উঠল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির পেছনের চত্বর। সেদিনও এমন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছিল। সবাই যখন ছাদের নিচে দাঁড়িয়ে বৃষ্টির তোড় কমার অপেক্ষা করছিল, তিথি তখন বইয়ের ব্যাগটা বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে নিঃসংকোচে বৃষ্টির ধারায় ভিজে যাচ্ছিল। তার পরনে ছিল গাঢ় নীল রঙের সুতির শাড়ি, ভেজা চুল লেপটে ছিল পিঠের ওপর। অয়ন অপলক তাকিয়ে ছিল সেই দৃশ্যের দিকে।
“এমনভাবে তাকাচ্ছেন কেন? বৃষ্টিতে ভিজতে কোনো ট্যাক্স লাগে নাকি?” হঠাৎ ফিরে তাকিয়ে তিথি বলে উঠেছিল, তার চোখেমুখে তখন দুষ্টুমি আর তীব্র আত্মবিশ্বাসের ঝলক।
অয়ন সেদিন অপ্রস্তুত হয়ে শুধু একটা কথাই বলতে পেরেছিল, “ট্যাক্স লাগে না, তবে নিউমোনিয়া লাগতে পারে।”
সেই শুরু। তারপর তো কত হাজারটা বিকেল পার হলো টিএসসির মোড়ে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘাসে কিংবা নীলক্ষেতের পুরোনো বইয়ের গলিতে। তিথি ভালোবাসত পুরোনো কাগজের গন্ধ, আর অয়ন ভালোবাসত তিথির সেই গন্ধ শোঁকার সময় নাকের ডগাটা সামান্য কুঁচকে ফেলার ভঙ্গি। তিথির একটা অদ্ভুত অভ্যাস ছিল,সে যখন খুব আবেগী হতো, তখন অয়নের হাতের তালুতে নিজের নখ দিয়ে অদৃশ্য গোল দাগ কাটত।
একদিন রমনার বটমূলে বসে তিথি বলেছিল, “জানো অয়ন, প্রেম আসলে মানুষের ভেতরের মানুষকে বদলে দেয়। তুমি যখন কাউকে গভীরভাবে ভালোবাসবে, তখন তুমি আর একা নও। তোমার সত্তার অর্ধেক জুড়ে থাকে অন্য একজন।”
অয়ন তখন হেসেছিল, তিথির হাতটা নিজের মুঠোয় চেপে ধরে বলেছিল, “তাহলে তো আমি পুরোপুরি হারিয়ে যাব, তিথি।”
তিথি উত্তর দিয়েছিল স্নিগ্ধ এক হাসিতে, “হারিয়ে যাওয়াই তো প্রেমের চূড়ান্ত প্রাপ্তি।”
কিন্তু সেই হারিয়ে যাওয়া যে এতটা রক্তক্ষরণ বয়ে আনবে, তা কি তারা তখন জানত?
সম্পর্কের ভাঙন কখনো একদিনে হঠাৎ ঘটে না। তা ঘটে নিঃশব্দে, উইপোকার মতো ভেতর থেকে সমস্ত বিশ্বাস আর সহনশীলতাকে খেয়ে ফেলে। দুজনের পরিবারের অর্থনৈতিক দূরত্বের চাপ, অয়নের শুরু হওয়া কর্মজীবনের অনিশ্চয়তা, আর তিথির পরিবারের তরফ থেকে আসা পাত্রের চাপ,সবকিছু মিলিয়ে তাদের মধ্যে দূরত্বের দেয়াল উঠতে শুরু করেছিল।
তিথি কিন্তু লড়তে চেয়েছিল। সে বহুবার অয়নকে বলেছিল, “চলো আমরা কোথাও চলে যাই। শুধু তুমি আর আমি। যা আছে তা দিয়েই সংসার সাজাব।”
কিন্তু অয়ন তখন বাস্তবতার জটিল সমীকরণে অন্ধ। সে ভেবেছিল, ভালোবাসা দিয়ে তো পেট ভরবে না। সে চেয়েছিল প্রতিষ্ঠিত হতে, নিজের পায়ে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে। তিথিকে এক অনিশ্চিত ভবিষতে টেনে নামানোর সাহস তার ছিল না। সেই অহংকার, কিংবা দায়িত্বশীলতার মুখোশ পরা কাপুরুষতাই তাদের মাঝখানে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছিল।
একদিন ধানমণ্ডি লেকের পাড়ে তিথি শেষবারের মতো এসেছিল। তার চোখে জল ছিল না, ছিল এক জমাটবদ্ধ শূন্যতা।
“তুমি আমাকে আটকালে না, অয়ন?” তিথির কণ্ঠস্বর কাঁপছিল না, অথচ তা যেন ধারালো ছুরির মতো অয়নের বুক চিরে দিচ্ছিল।
অয়ন মুখ নিচু করে বলেছিল, “আমার যে এখন কিছুই দেওয়ার নেই তিথি। তোমাকে ধরে রাখার মতো কোনো জোর আমার নেই।”
“আমি তো তোমার কাছে প্রাচুর্য চাইনি, একটু ভরসা চেয়েছিলাম,” বলে তিথি উঠে দাঁড়িয়েছিল। যাওয়ার আগে সে শেষবারের মতো অয়নের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “তুমি বদলে যাচ্ছ অয়ন। তুমি নিজের ভালোবাসাকে নিজের ভয়ের আড়ালে লুকিয়ে ফেললে। যেদিন তুমি বুঝবে, সেদিন আর আমাকে পাবে না। এমনকি সেদিন তুমি নিজেকেও আর চিনতে পারবে না।”
তিথির সেই ভবিষ্যদ্বাণী আজ এত বছর পর অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়ে ধরা দিয়েছে। তিথির বিয়ে হয়ে গেল কানাডাপ্রবাসী এক প্রকৌশলীর সাথে। ধুমধাম করে সাজানো আসরে তিথি কেমন ছিল, অয়ন তা দেখার সাহস পায়নি। সে নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছিল কাজের সাগরে। পদোন্নতি হলো, ব্যাংকে সঞ্চয় বাড়ল, অভিজাত এলাকায় একটা ফ্ল্যাট হলো,কিন্তু হৃদয়ের ঘরটা ফাঁকা পড়ে রইল আজীবন। অয়ন হাত থেকে চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখল। টেবিলে রাখা পুরোনো ড্রয়ারটা টানতেই চোখে পড়ল একটি নীল ডায়েরি। তিথির দেওয়া শেষ উপহার। ডায়েরিটা খুলতেই খসে পড়ল এক টুকরো শুকিয়ে যাওয়া কৃষ্ণচূড়া পাপড়ি। শুকিয়ে রং চটে গেছে, তবু যেন তার স্পর্শে জীবন্ত হয়ে উঠল বহু বছর আগের এক স্নিগ্ধ দুপুর।
সে আবার এসে দাঁড়াল আয়নাটার সামনে। এবার আর সে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল না। গভীরভাবে দেখল আয়নার ভেতরের মানুষটাকে। এই চোখে এখন আর কোনো স্বপ্নের ঔজ্জ্বল্য নেই, আছে কেবল এক নির্লিপ্ত বৈরাগ্য। এই ঠোঁট এখন সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে মেকি হাসতে শিখেছে, কিন্তু সেখানে কোনো প্রাণের স্পন্দন নেই।
তিথি ঠিকই বলেছিল। নিজের ভেতরের যে মানুষটাকে তিথি ভালোবাসত,যে মানুষটা স্বপ্ন দেখতে পারত, যে মানুষটা বৃষ্টির তোড়ে ভেসে যেতে ভয় পেত না,সে তো তিথির সাথেই চিরতরে মরে গেছে। আয়নায় যে আজ দাঁড়িয়ে আছে, সে অন্য একজন। এক অচেনা, আত্মতৃপ্ত অথচ নিঃস্ব মানুষ।
বাইরে তখন ঝুমঝুম করে বৃষ্টি নামতে শুরু করেছে। কাচের জানালায় ফোঁটাগুলো আছড়ে পড়ছে বেদনার মতো। অয়ন আয়নার ওপর আলতো করে হাত রাখল। ঠান্ডা কাচ তার আঙুল ছুঁয়ে গেল। তার মনে হলো, যদি সময়ের চাকা উল্টো ঘোরানো যেত, যদি সে আরেকবার তিথির সেই ভেজা শাড়ির আঁচল ধরে বলতে পারত,‘তুমি ছাড়া এই আমি তো কেবল এক মৃত প্রতিবিম্ব!’
কিন্তু সময় কাউকে ক্ষমা করে না। আয়নায় তাকিয়ে থাকা সেই অচেনা মানুষটি কেবল নীরব চোখে তাকে বিদ্রূপ করতে লাগল। অয়নের চোখ দিয়ে নিঃশব্দে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল, যা আয়নার কাচ স্পর্শ করতে পারল না, শুধু ভিজিয়ে দিল তার নিজেরই বুকের বাঁ পাশের পুরোনো ক্ষতটাকে।
বৃষ্টির দিনটা ফুরিয়ে যাওয়ার কয়েকমাস পরের কথা। মাঘের শেষ বিকেলের এক সোনাঝরা রোদ এসে পড়েছে ধানমণ্ডির এক নীরব আর্ট গ্যালারির কাঠের মেঝেতে। পুরোনো এক সহকর্মীর একক চিত্রপ্রদর্শনী; খুব একটা ভিড় নেই, শান্ত আবহে বাজছে মৃদু শাস্ত্রীয় সুর। অয়ন সাধারণত এমন জায়গায় আসে না, কিন্তু একাকিত্বের ভার যখন ঘরের দেয়ালে বেশি চেপে বসে, তখন সে মানুষের ভিড়ের চেয়ে রঙের এই নীরবতাকে নিরাপদ আশ্রয় মনে করে। হাতে ক্যাটালগ নিয়ে সে একটা ক্যানভাসের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। ছবিটায় একাকী দাঁড়িয়ে থাকা এক রমণী, দূরে মিলিয়ে যাওয়া মেঘলা নদী। দৃশ্যটা তাকে আবার সেই পুরোনো ভাবনার অতলে টেনে নিচ্ছিল।
হঠাৎ পাশ থেকে ভেসে এল এক পরিচিত কন্ঠস্বর,"রংগুলো খুব পরিচিত, তাই না?"
বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো কেঁপে উঠল অয়ন। বুকের ভেতরের রক্ত যেন এক মুহূর্তের জন্য চলাচল বন্ধ করে দিল। এমন কণ্ঠ সে হাজার মানুষের কোলাহলেও এক লহমায় চিনে নিতে পারে। খুব ধীরে, এক বুক কাঁপুনি নিয়ে সে পাশ ফিরে তাকাল। তিথি।
সাতটি বসন্তের পারদ গলে যাওয়ার পর সে দাঁড়িয়ে আছে ঠিক দুই হাত দূরে। তিথির পরনে ধূসর জমিনের ওপর হালকা খয়েরি পাড়ের সুতির শাড়ি, চুলে আলগা হাতখোঁপা। চেহারায় আগের সেই উচ্ছল চাঞ্চল্য নেই, সেখানে জায়গা নিয়েছে এক গভীর, পরিমিত স্নিগ্ধতা। তবে চোখের কোণে সেই পুরোনো টান এখনও স্পষ্ট, যার আলো অয়ন একসময় নিজের ভেতরে ধারণ করত।
দুজনেই স্তব্ধ। গ্যালারির ব্যাকগ্রাউন্ডের সেতারের সুরটা যেন হঠাৎ করেই অনেক দূর থেকে ভেসে আসা কোনো প্রতিধ্বনি হয়ে উঠল। নীরবতার সেই কয়েক সেকেন্ড ছিল সহস্র বছরের চেয়েও দীর্ঘ।
"কেমন আছ, অয়ন?" তিথিই নীরবতা ভাঙল। কণ্ঠস্বর শান্ত, তবে সেই শান্ত নদীর নিচে যেন চাপা স্রোতের কাঁপুনি।
অয়ন যেন নিজের স্বর খুঁজে পাচ্ছিল না। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। বহু কষ্টে সে শুধু বলতে পারল, "আছি... চলে যাচ্ছে। তুমি... কবে ফিরলে?"
"মাসখানেক হলো। বাবার শরীরটা ভালো না, তাই কয়েক মাসের ছুটিতে আসা।" তিথি ছবির দিকে চোখ ফেরাল, তারপর খুব ধীরে আবার অয়নের দিকে তাকাল। তার দৃষ্টি অয়নের চুলে জমে থাকা রুপোলি রেখা আর চোখের নিচের ক্লান্ত রেখাগুলোতে কয়েক মুহূর্ত থমকে রইল। "তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে ঘুমোও না ঠিকমতো।"
এক অদ্ভুত ম্লান হাসি ফুটল অয়নের ঠোঁটে। "অভ্যাস হয়ে গেছে।"
"তুমি বদলাওনি, অয়ন। শুধু... নিজেকে আরও গুটিয়ে নিয়েছ," তিথির গলায় এক ফোঁটা অভিযোগের বদলে যেন উপচে পড়ল একরাশ করুণা।
"আর তুমি?" অয়ন সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল, যে চোখে সে একসময় নিজের ভবিষ্যৎ দেখত। "তুমি ভালো আছ তো, তিথি?"
তিথি এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। গ্যালারির বড় কাচের জানালার বাইরে পাতাঝরা গাছের ডালগুলো দুলছে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "ভালো থাকা তো এক ধরনের আপস, অয়ন। আমার সংসার আছে, দায়দায়িত্ব আছে, একজন মানুষ আছেন যিনি আমার যত্ন নেন। কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু..." তিথি থেমে গেল।
"কিন্তু?" অয়নের বুকের ভেতর একটা অদৃশ্য ক্ষত আবার রক্তক্ষরণ শুরু করল।
"কিন্তু যে তিথি বৃষ্টিতে ভিজে তোমার হাত ধরে বলত হারিয়ে যাওয়াই প্রাপ্তি,সেই মেয়েটাকে আমি টরন্টোর তুষারঝড়ের নিচে কোথাও ফেলে এসেছি। আমি আর তাকে খুঁজে পাই না।" তিথির চোখে এক ফোঁটা জলের চিকচিকে আভা ফুটে উঠেই নিমেষে মিলিয়ে গেল।
অয়ন স্তব্ধ হয়ে শুনল। সে ভেবেছিল শুধু সেই একাই নিঃস্ব হয়েছে, শুধু তারই আয়নায় অন্য একজন অচেনা মানুষ এসে দাঁড়িয়েছে। আজ বুঝতে পারল, সেই ভাঙনের ধাক্কায় তিথির ভেতরের মানুষটিও অক্ষত থাকেনি। বিচ্ছেদের যন্ত্রণা কেবল একজনের ভাগ্যে জোটে না; তা দু’জনকেই একটু একটু করে নিজের অচেনা করে তোলে।
"আমি তোমাকে আটকে রাখতে পারিনি, তিথি," অয়নের কণ্ঠ ফ্যাসফেঁসে শোনাল। "সেদিনের সেই কাপুরুষতার শাস্তি আমি প্রতিটা দিন পাচ্ছি।"
তিথি তার খুব কাছে এগিয়ে এল। বহু বছর পর তাদের মাঝের দূরত্বটুকু মুছে গেল এক মুহূর্তের জন্য। তিথি আলতো করে অয়নের ডান হাতের তালুটা ছুঁয়ে দিল। সেই পুরোনো স্পর্শ, সেই চেনা উত্তাপ। তবে এবার আর সে নখ দিয়ে কোনো বৃত্ত আঁকল না। শুধু আঙুলের ডগা ছুঁয়ে রইল কয়েক সেকেন্ড।
"অতীতকে শাস্তি বানিয়ে বেঁচে থেকো না, অয়ন," তিথি খুব নিচু স্বরে বলল। "আমরা যা হতে পারতাম, তা তো আর হব না। কিন্তু যা হারিয়ে গেছে, তাকে আঁকড়ে ধরে বাকি জীবনটাকে অচেনা করে রেখো না। আয়নার মানুষটাকে ক্ষমা করে দাও।"
দূর থেকে কারও পায়ের আওয়াজ শোনা গেল। তিথি হাত সরিয়ে নিল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক অসম্ভব বিষণ্ণ অথচ শান্ত বিদায়ের হাসি।
"আমার যাওয়ার সময় হয়েছে। ভালো থেকো।"
তিথি ঘুরে দাঁড়াল। ধীর পায়ে সে হেঁটে গ্যালারির দরজার দিকে এগিয়ে গেল। অয়ন তাকে ডাকল না, এক পা এগিয়ে গিয়ে থামানোর ভানও করল না। সে শুধু দাঁড়িয়ে রইল কাঠের মেঝেতে, যেখানে তিথির শাড়ির আঁচলের মৃদু সুবাসটুকু তখনও বাতাসে ভাসছে। গ্যালারি থেকে বের হয়ে অয়ন যখন গাড়িতে উঠল, ঢাকার আকাশে তখন রক্তিম গোধূলি নেমে এসেছে। গাড়ির রিয়ারভিউ মিররে চোখ পড়তেই অয়ন নিজের মুখের দিকে তাকাল। সেই একই ক্লান্ত চোখ, একই বলিরেখা। কিন্তু এবার আর সেই প্রতিবিম্বকে অচেনা মনে হলো না। সেই চোখে এখন বিচ্ছেদের পূর্ণতা, মেনে নেওয়ার শান্তি। তিথি তার স্পর্শ দিয়ে যেন আয়নার সেই অচেনা মানুষটার সাথে তার এক অদ্ভুত সন্ধি করিয়ে দিয়ে গেছে।