Story

অধরা প্রণয়

November 4, 2026

6 views

মানুষ যা কিছু তীব্রভাবে চায়, নিয়তি বোধহয় তার চারপাশে অলক্ষ্যে এক দুর্ভেদ্য কাচের দেয়াল তুলে দেয়। দূর থেকে সব স্পষ্ট দেখা যায়,তার হাসির আলো, চোখের পলক ফেলার শব্দ, বাতাসে তার ওড়না ওড়ার মৃদু গন্ধ,সবটুকু অনুভূতির আঙিনায় এসে ধাক্কা খায়; শুধু হাত বাড়িয়ে ছোঁয়া যায় না। কাচের গায়ে বারবার আঙুল ছুঁইয়ে কেবল রক্ত ঝরে, কিন্তু সেই ব্যবধান এক চুলও কমে না।

আসিফ তার জীবনের বত্রিশটি বছর পার করে এই একটিমাত্র সত্যই সবচেয়ে নিখুঁতভাবে শিখেছে। যাকে সে চেয়েছে, তাকে সে পায়নি। আর যাকে পাওয়া হয়নি, তাকে না পাওয়ার শোকটুকুই তার জীবনের একমাত্র সঞ্চয় হয়ে রয়ে গেছে। বাকি পুরো জীবনটা কেটে গেছে কেবল কিছু অমলিন স্বপ্নের ধ্বংসাবশেষ কুড়াতে কুড়াতে।

ঢাকার নিস্তব্ধ রাতগুলো আসিফের খুব চেনা। বিশেষ করে রাত দুটো কি আড়াইটার সময় যখন শহরটা ক্লান্ত হয়ে সমস্ত কোলাহল নিজের ভেতরে টেনে নেয়, তখন আসিফের ফ্ল্যাটের বারান্দাটা এক অদ্ভুত স্মৃতিকেন্দ্রে পরিণত হয়। পুরানা পল্টনের এই পুরোনো আমলের ফ্ল্যাটের চারতলার বারান্দায় দাঁড়ালে রাস্তার সোডিয়াম বাতির হলুদ আলো এসে পড়ে রেলিংয়ের ওপর। বাতাসে মিশে থাকে পুরোনো ইট আর ভেজা ধুলোর ঘ্রাণ। আসিফের হাতে থাকে এক কাপ নিকষ কালো চা, আর মনের ভেতর ভেসে বেড়ায় একরাশ ধূসর মেঘ,যার নাম নন্দিনী।

নন্দিনী এখন কোথায়? হয়তো এই শহরেরই কোনো এক প্রান্তে, কোনো অভিজাত বহুতল ভবনের সাজানো ঘরে সে ঘুমিয়ে আছে। তার মাথার কাছে হয়তো মৃদু আলো জ্বলছে, পাশে হয়তো শুয়ে আছেন এক সফল কর্পোরেট স্বামী, আর পাশের ছোট ঘরে তার সন্তান। নন্দিনীর বাস্তবতায় আসিফ নামের কারও কোনো স্থান নেই। কিন্তু আসিফের গোটা অস্তিত্ব জুড়ে নন্দিনী ছাড়া আর কারোরই পদচিহ্ন পড়েনি।

সম্পর্কের শুরুটা ছিল বড় সহজ, অথচ পরিণতি হলো এমন জটিল এক ট্র্যাজেডি।

আসিফ আর নন্দিনী তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী। নন্দিনী ছিল ক্লাসের সেই মেয়েটি, যার দিকে সবাই অন্তত একবার হলেও ফিরে তাকাত। তার রূপ কোনো কৃত্রিম অহংকারে মোড়া ছিল না; বরং তার মধ্যে ছিল এক স্নিগ্ধ, মায়াবী পাহাড়ি ঝরনার মতো স্বচ্ছতা। কপালে সবসময় একটা ছোট কালো টিপ, সুতির সাধারণ শাড়ি বা সালোয়ার-কামিজ, আর একজোড়া কাজলভরা চোখ,যে চোখে তাকালে যে কারোরই মনে হতো, এই চোখ যুগ যুগ ধরে কোনো বিষাদ অথবা কোনো গভীর কবিতা লুকিয়ে রেখেছে।

আসিফ ছিল ঠিক তার বিপরীত। শান্ত, কিছুটা অন্তর্মুখী, পেছনের সারির ছাত্র। টিউশনি করে নিজের খরচ চালাত, আর অবসর পেলেই নোটখাতার পেছনের পাতায় লিখত অগোছালো পদ্য। ভালোবাসার সাহস তার ছিল না, কারণ সে জানত ভালোবাসা হলো এক ধরনের বিলাসিতা,যা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় ছেলের জন্য সবসময় নিষিদ্ধ ফল।

কিন্তু ভাগ্য কোনো এক অজ্ঞাত খেয়ালে তাদের কাছাকাছি এনে দিল। তৃতীয় বর্ষের এক নাট্যোৎসবে বিভাগীয় নাটকের পাণ্ডুলিপি লেখার ভার পড়েছিল আসিফের ওপর, আর প্রধান নারী চরিত্রের অভিনয়ে ছিল নন্দিনী।

রিহার্সালের সেই দিনগুলো ছিল আসিফের জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল বসন্ত। নাটমণ্ডল চত্বরে কাঠগোলাপের গাছের নিচে বসে নন্দিনী যখন আসিফের লেখা সংলাপগুলো আওড়াত, তখন আসিফের মনে হতো প্রতিটি শব্দ সে কেবল নন্দিনীর জন্যই সাজিয়েছিল।

একদিন মহড়া শেষে বৃষ্টি নামল। কার্জন হলের লাল ইটের চত্বর ধুয়ে যাচ্ছিল অঝোর ধারায়। সবাই বারান্দায় দাঁড়িয়ে হইচই করছিল, কিন্তু নন্দিনী নিঃশব্দে নেমে গেল ভেজা ঘাসের ওপর। হাত বাড়িয়ে সে বৃষ্টির জল ছুঁয়ে দেখছিল।

আসিফ বারান্দার পিলারে হেলান দিয়ে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ নন্দিনী ঘুরে তাকাল। তার ভেজা মুখের ওপর কয়েক গোছা চুল লেপটে ছিল।

"আসিফ, তুমি বৃষ্টিতে ভিজবে না?" নন্দিনী ডেকেছিল।

"না, আমার ঠান্ডার ধাত। সর্দি লাগবে," আসিফ মৃদু হেসে বলেছিল।

নন্দিনী পা টিপে টিপে বারান্দায় উঠে এল। তার শাড়ির আঁচল থেকে টুপটুপ করে জল ঝরছিল। সে আসিফের খুব কাছে এসে দাঁড়িয়ে বলেছিল, "তুমি সবকিছুতেই এত হিসাব করো কেন বলো তো? জীবন তো হিসাবের খাতা নয়। কিছু কিছু পাগলামি না থাকলে বেঁচে থাকার কোনো মানে হয়?"

আসিফ তার চোখের দিকে তাকিয়ে উত্তর খুঁজে পায়নি। সে শুধু ভেবেছিল, নন্দিনীর মতো করে জীবনকে দেখার বিলাসিতা সবার থাকে না। যার প্রতিদিনের জীবন কাটে চাল-ডাল আর মেস ভাড়ার হিসাবে, সে কীভাবে বৃষ্টির জলে নিজেকে ভাসিয়ে দেবে?

তবে সেই দিন থেকেই নন্দিনী যেন আসিফের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠল। তাদের একসাথে হাঁটা হতো ফুলার রোডের ছায়ায়, নীলক্ষেতের পুরোনো বইয়ের দোকানে কিংবা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘাসে। নন্দিনী কথা বলত অনর্গল,তার পরিবার, তার ভালোলাগা, তার ছোটবেলার ফেলে আসা গ্রামের গল্প। আর আসিফ শুনত পরম মুগ্ধতায়।

একদিন হাকিম চত্বরে চা খেতে খেতে নন্দিনী হঠাৎ আসিফের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "আসিফ, তুমি কি কখনো কাউকে ভালোবেসেছ?"

আসিফের বুকের ভেতর একটা তীব্র ঢেউ আছড়ে পড়ল। সে চায়ের কাপে চোখ রেখে বলল, "না। ভালোবাসার মতো যোগ্যতা আমার নেই।"

"যোগ্যতা আবার কী?" নন্দিনী ভ্রু কুঁচকে তাকাল। "ভালোবাসা কি কোনো চাকরির পরীক্ষা যে সার্টিফিকেট লাগবে? ভালোবাসা তো একটা সমর্পণ। যে তোমাকে চাইবে, সে তোমার শূন্যতাটুকু নিয়েই তোমাকে চাইবে।"

আসিফ সেদিন মুখ ফুটে বলতে পারেনি,‘নন্দিনী, আমি তো সেই প্রথম দিন থেকেই তোমাকে সমর্পণ করে বসে আছি। আমার এই রিক্ত, শূন্য জীবনে তুমিই একমাত্র অমূল্য রত্ন।’

মুখের ভাষা না পেলেও আসিফের চোখ নিশ্চয়ই মিথ্যা বলতে পারেনি। নন্দিনী হয়তো বুঝতে পেরেছিল, কিংবা হয়তো অবচেতনভাবেই সে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চেয়েছিল সেই সত্য থেকে। কারণ বাস্তবতার যে নির্মম দেয়াল, তা নন্দিনীও খুব ভালো করেই জানত।

নন্দিনীর পরিবার ছিল পুরান ঢাকার এক রক্ষণশীল, বিত্তশালী খানদানি পরিবার। তার বাবা ছিলেন বিশাল কাপড়ের ব্যবসায়ী, আর ভাইয়েরা প্রভাবশালী। সেখানে ভালোবাসার চেয়ে বংশমর্যাদা, ব্যাংক ব্যালান্স আর সামাজিক প্রতিপত্তি ছিল অনেক বড় মানদণ্ড। আসিফের মতো এক ভবঘুরে, বেকার যুবকের সেই সমাজে কোনো মূল্যই ছিল না।

মাস্টার্স শেষ হতে না হতেই ঝড়টা এল। নন্দিনীর বিয়ের সম্বন্ধ ঠিক হলো ইংল্যান্ডপ্রবাসী এক চাটার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের সাথে। পারিবারিকভাবেই সব ঠিকঠাক।

যেদিন খবরটা আসিফ শুনল, সেদিন তার পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। সে সারাদিন ধানমণ্ডি লেকের পাড়ে একা বসে রইল। চারপাশের কোলাহল স্তব্ধ হয়ে গেল।

সন্ধ্যায় নন্দিনী এল। তার পরনে ছিল একখানা বিবর্ণ শাড়ি, চোখে ছিল শুকিয়ে যাওয়া জলের দাগ। এসে সে আসিফের পাশে ঘাসের ওপর বসল। দুজনেই অনেকক্ষণ চুপ করে রইল। লেকের জলে তখন শহরের নিওন আলোর বিকৃত ছায়া কাঁপছিল।

"তুমি কিছু বলবে না আসিফ?" নন্দিনীর কণ্ঠস্বর কাঁপছিল।

আসিফ নিজের হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে রাখল। নখগুলো চামড়া ভেদ করে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছিল। সে নিচু গলায় বলল, "কী বলব নন্দিনী? শুভকামনা জানাব?"

"শুধু শুভকামনা?" নন্দিনী এবার ঘুরে বসল। তার চোখে এক অচেনা হাহাকার। "তুমি একবারও আমাকে বলবে না,‘নন্দিনী, তুমি যেও না’? তুমি একবারও আমার হাতটা ধরে বলবে না,‘আমি তোমাকে ভালোবাসি, তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না’? একবার বলো আসিফ, আমি সব ছেড়ে তোমার সাথে এক কাপড়ে চলে আসব। আমি মেসে থাকব, আধপেটা খেয়ে থাকব, তবুও আমি তোমার পাশে থাকব। একবার শুধু বলো!"

সেই মুহূর্তটিতে আসিফের জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধটি ঘটে গেল। তার সমস্ত সত্তা চিৎকার করে বলতে চেয়েছিল,‘থেমে যাও নন্দিনী! তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই!’ কিন্তু তার অবাধ্য বিবেক তাকে এক নির্মম বাস্তবতার আয়না দেখাল।

আসিফের ঘরে তখন শয্যাশায়ী মা, ছোট বোনের কলেজের ফি বকেয়া, ছোট ভাইয়ের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। নিজে সে একটা নামমাত্র বেতনের প্রকাশনা সংস্থায় প্রুফ রিডারের কাজ করে। নন্দিনীকে এনে সে কোথায় রাখবে? কোন মুখে সে এক রাজকন্যাকে টেনে আনবে ফুটপাতের ধুলোয়? ভালোবাসার দাবি পূরণ করতে গিয়ে সে কি নন্দিনীকে এক আজীবন অভাব আর অপমানের খাঁচায় বন্দি করে ফেলবে?

প্রেমিকের চেয়ে দায়িত্বশীলতার মুখোশ পরা কাপুরুষতাই সেদিন আসিফের চরিত্রে জয়ী হয়েছিল।

আসিফ মুখ তুলে চাইল। তার চোখ ছিল শুষ্ক, ভাবলেশহীন,যে কাঠিন্য সে বহু কষ্টে ধার করেছিল।

"পাগলামি কোরো না নন্দিনী," আসিফ খুব ঠান্ডা গলায় বলল। "জীবন কোনো সিনেমার গল্প নয়। বাস্তব বড় কঠিন। তুমি যে পরিবারে বড় হয়েছ, সেখানে অভাবের কষ্ট তুমি সহ্য করতে পারবে না। কয়েকটা দিন হয়তো রোমান্টিক লাগবে, তারপর শুরু হবে খিদে আর দারিদ্র্যের অভিশাপ। তখন ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালাবে। তার চেয়ে বাবার পছন্দের পাত্রকে বিয়ে করো। তুমি সুখে থাকবে।"

নন্দিনী স্তব্ধ হয়ে গেল। সে যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না তার কানের কথাগুলো। তার চোখ দিয়ে টপ টপ করে জল গড়িয়ে পড়ল।

"সুখ?" নন্দিনী এক করুণ বিদ্রূপের হাসি হাসল। "তুমি এত বড় মাপের স্বার্থপর আসিফ? তুমি আসলে কোনোদিনই আমাকে ভালোবাসোনি। তুমি কেবল নিজের ভয়ের পূজা করেছ। আমার সুখের দোহাই দিয়ে তুমি আসলে নিজের দায়িত্ব এড়াতে চাইছ।"

আসিফ কোনো উত্তর দিল না। সে পাথরের মতো বসে রইল।

নন্দিনী উঠে দাঁড়াল। আঁচল দিয়ে চোখ মুছে সে শেষবারের মতো তাকাল আসিফের দিকে। "জানো আসিফ, মানুষ যাকে মন থেকে চায়, তাকে সে কখনো পায় না,এটা হয়তো বিধাতার নিয়ম। কিন্তু যাকে পেয়েও ছেড়ে দেয়, তার মতো দুর্ভাগা আর কেউ নেই। তুমি সারা জীবন একলা থাকবে আসিফ। তোমার এই সাজানো ভীরুতা তোমাকে কোনোদিন শান্তি দেবে না।"

নন্দিনী চলে গেল। তার পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল অন্ধকারের ভেতর। আসিফ সেই ঘাসের ওপর একা বসে রইল। সে কাঁদতে পারল না। কেবল অনুভব করল, তার বুকের ভেতরে থাকা জীবন্ত মানুষটা ঠিক সেই মুহূর্তেই মারা গেছে।

এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ আটটি বছর।

নন্দিনীর বিয়ে হয়েছিল ধুমধাম করে। আসিফ দূর থেকে সেই সানাইয়ের সুর শুনেছিল, কিন্তু কাছে যাওয়ার সাহস পায়নি। বিয়ের পর নন্দিনী দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিল।

আসিফের জীবন থেমে থাকেনি, সময় তার নিজস্ব গতিতে গড়িয়ে গেছে। সে চাকরি বদলেছে, এক বহুজাতিক কোম্পানিতে পদোন্নতি পেয়েছে, মায়ের চিকিৎসা করিয়েছে, বোনের বিয়ে দিয়েছে, ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা শেষ করিয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে সে আজ আর সেই রিক্ত আসিফ নয়। এখন তার ব্যাংক ব্যালান্স আছে, পল্টনে ফ্ল্যাট আছে, একটা পুরোনো টয়োটা গাড়িও আছে।

কিন্তু যা নেই, তা হলো প্রাণ।

পরিবার থেকে বহুবার তার বিয়ের জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে। মা কত মেয়ের ছবি নিয়ে এসেছেন, বোন কত অনুনয় করেছে। কিন্তু আসিফ প্রতিবারই এড়িয়ে গেছে। সে কীভাবে অন্য কোনো নারীকে তার জীবনের অংশ করবে? যে সিংহাসনে নন্দিনী তার অদৃশ্য অস্তিত্ব নিয়ে আট বছর ধরে বসে আছে, সেখানে অন্য কাউকে বসানো তো স্রেফ প্রতারণা।

আসিফের দিনগুলো কাটে কম্পিউটারের স্ক্রিন, মিটিং আর ফাইলের হিসাবে। কিন্তু রাত নামলেই শুরু হয় তার আসল জীবন,স্বপ্নের জীবন।

মনোবিজ্ঞানীরা হয়তো একে বলবেন এক ধরনের মানসিক অবসাদ বা ফ্যান্টাসি। কিন্তু আসিফের কাছে এটাই তার একমাত্র বেঁচে থাকার রসদ। প্রতি রাতে চোখ বন্ধ করলেই সে ফিরে যায় সেই বৃষ্টিভেজা কার্জন হলে। সে দেখে, নন্দিনী শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে। সে দেখে, তারা দুজন ঢাকার মেঠোপথে হাঁটছে হাত ধরাধরি করে।

স্বপ্নে তারা কোনোদিন আলাদা হয় না। স্বপ্নে নন্দিনী কখনো তার বাবার কথায় অন্য কারও বধূ হয়ে দূর প্রবাসে পাড়ি জমায় না। স্বপ্নে আসিফ কোনো কাপুরুষ নয়; সে নন্দিনীর হাত শক্ত করে ধরে বলে,‘তোমাকে আমি কোথাও যেতে দেব না।’

মাঝে মাঝে মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে যায় আসিফের। বুকটা ভারী হয়ে থাকে। হাত বাড়িয়ে সে পাশের বালিশটা স্পর্শ করে,শীতল, শূন্য। তখন সে বুঝতে পারে, স্বপ্ন ভেঙে গেছে, কিন্তু স্বপ্ন দেখার তৃষ্ণা মেটেনি।

মাস চারেক আগের এক ঘটনা। আসিফ তখন গুলশানের এক বড় সুপারশপে গিয়েছিল সপ্তাহের বাজার করতে। ট্রলি ঠেলে সে যখন মসলার কাউন্টারের দিকে এগোচ্ছিল, হঠাৎ একটি ছোট শিশু এসে তার পায়ে ধাক্কা খেল। বছর চারেকের ফুটফুটে এক মেয়ে, চোখে একরাশ চঞ্চলতা।

আসিফ নিচু হয়ে শিশুটিকে কোলে তুলে নিল, "আরে মামণি, পড়ে যাবে তো!"

ঠিক তখনই পেছন থেকে এক আতঙ্কিত কণ্ঠ ভেসে এল, "মাইশা! কোথায় গেলে তুমি?"

আসিফের পায়ের তলা থেকে যেন সমস্ত পৃথিবীটা আবার দুলে উঠল। সেই কণ্ঠস্বর! আট বছর ধরে যে কণ্ঠস্বর কেবল তার নির্ঘুম রাতের প্রার্থনায় বেজেছে।

সে ঘুরে দাঁড়াল।

সামনে দাঁড়িয়ে নন্দিনী। পরনে মেরুন রঙের জামদানি, গলায় সরু সোনার চেইন, সিঁথিতে লাল সিঁদুর। চেহারায় মাতৃত্বের এক অপূর্ব স্নিগ্ধতা, তবে চোখের নিচে হালকা কালচে ছোপ।

দুজনের চোখাচোখি হলো।

সুপারশপের সমস্ত আলো, মানুষের আনাগোনা, ট্রলির চাকার ঘর্ঘর শব্দ,সবকিছু যেন এক লহমায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। সময় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল তাদের দুজনের মাঝখানে।

নন্দিনীর চোখ দুটো বিস্ফারিত হলো। তার হাত থেকে পার্সটা প্রায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সে অস্ফুটে বলল, "আসিফ..."

আসিফ শিশুটিকে সাবধানে নিচে নামিয়ে দিল। তার গলা শুকিয়ে গেছে, হৃৎপিণ্ডটা পাগলের মতো আছড়ে পড়ছে পাঁজরের খাঁচায়। বহু কষ্টে সে শুধু বলল, "কেমন আছ, নন্দিনী?"

নন্দিনী কথা বলতে পারল না কয়েক মুহূর্ত। সে শুধু একদৃষ্টিতে আসিফের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। আসিফের চুলে সামান্য পাক ধরেছে, চোখের কোণে জমেছে নিঃসঙ্গতার রেখা। নন্দিনীর চোখ দুটো ভিজে উঠল।

"তুমি... তুমি এখনও ঠিক আগের মতোই আছ," নন্দিনী নিচু স্বরে বলল। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছিল।

"আর তুমি আগের চেয়েও অনেক বদলে গেছ। অনেক সুন্দর লাগছে তোমাকে," আসিফ এক ম্লান হাসি হাসল।

"দেশে ফিরলে কবে?" আসিফ জানতে চাইল।

"গত মাসে। ওনার পোস্টিং এখন ঢাকায়। আর বাইরে যাব না হয়তো," নন্দিনী নিজের মেয়ের মাথায় হাত রাখল। "তোমার... তোমার পরিবার? তোমার স্ত্রী আসেনি সাথে?"

আসিফের বুকের ভেতর একটা অদৃশ্য ছুরি আমূল বিঁধে গেল। সে শান্ত চোখে নন্দিনীর দিকে তাকাল। সেই চোখে কোনো অভিযোগ ছিল না, ছিল কেবল এক অনন্ত আত্মত্যাগের ছায়া।

"আমি বিয়ে করিনি নন্দিনী," আসিফ খুব স্বাভাবিক গলায় বলল।

নন্দিনী যেন চাবুকের আঘাত খেল। তার মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। "কেন? কেন করোনি?"

আসিফ একটু হাসল। যে হাসিতে কোনো আনন্দ নেই, শুধুই বিষাদের নিঃশব্দ প্রকাশ। "হয়ে ওঠেনি আর। সবাই তো আর সবকিছু পায় না নন্দিনী। কেউ কেউ না পাওয়ার তালিকাকেই নিজের সংসার বানিয়ে নেয়।"

নন্দিনীর চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জল নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ল। সে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিল, যেন চারপাশের লোকজন দেখতে না পায়। ঠিক তখনই দূর থেকে এক সুপুরুষ ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন, "নন্দিনী, পেয়েছ ওকে? আরে মাইশা, এখানে দুষ্টুমি করছ?"

ভদ্রলোক আসিফের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন, "হ্যালো, আমি ফারহান। নন্দিনীর হাসব্যান্ড।"

আসিফ হাত বাড়িয়ে দিল। "হ্যালো। আমি আসিফ। নন্দিনীর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী।"

"ওহ, নাইস টু মিট ইউ! নন্দিনী তো বন্ধুদের কথা খুব একটা বলে না। চলুন না, আজ একসাথে কোথাও কফি খাই?" ফারহান আন্তরিকতার সাথে বললেন।

"না, অনেক ধন্যবাদ। আমার একটু জরুরি কাজ আছে, এখনই বের হতে হবে," আসিফ সৌজন্যমূলক হাসি উপহার দিল।

সে নন্দিনীর দিকে শেষবারের মতো তাকাল। নন্দিনী তখন মাথা নিচু করে নিজের মেয়ের হাত শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। সে আর আসিফের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস পেল না। কারণ সে জানত, তাকালেই হয়তো তার এত বছরের সাজানো দুর্গ ভেঙে ধুলোয় মিশে যাবে।

"ভালো থেকো, নন্দিনী," আসিফ বলল।

"তুমিও... ভালো থেকো আসিফ," অস্ফুটে ভেসে এল সেই কথাটুকু।

আসিফ সুপারশপ থেকে বের হয়ে এল।

বাইরে তখন বিকেলের শেষ রোদ মিলিয়ে গিয়ে কালচে অন্ধকার নামছে। ট্রাফিকের তীব্র জ্যাম, মানুষের অবিরাম ছোটাছুটি। আসিফ ফুটপাত ধরে হাঁটতে লাগল। তার কোনো তাড়া ছিল না।

আজ সে নিশ্চিতভাবে জেনেছে,মানুষ যাকে সবচেয়ে বেশি চায়, তাকে কোনোদিনই পায় না। ঈশ্বর বা প্রকৃতি মানুষকে চাওয়ার অফুরন্ত ক্ষমতা দিয়েছেন, কিন্তু পাওয়ার ভাগ্য দিয়েছেন বড় পরিমিত করে। যাকে পাওয়া যায় না, সে চিরকাল নিখুঁত থাকে। তার কোনো ত্রুটি থাকে না, তার সাথে কোনো সংসারের কলহ হয় না, তার কোনো বার্ধক্য আসে না। সে মনের মণিকোঠায় চিরনবীন, চিরসুন্দর এক প্রতিমা হয়ে বেঁচে থাকে।

আজ রাতেও বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে আসিফ। চায়ের কাপটা ঠান্ডা হয়ে গেছে।

আকাশে আজ কোনো তারা নেই, ঘন কালো মেঘে ঢাকা। বাতাস বইছে এলোমেলো। আসিফ চোখ বন্ধ করল।

আবার সেই পরিচিত দৃশ্য। সেই বৃষ্টি, সেই কার্জন হল, আর সেই একজোড়া কাজলটানা হরিণী চোখ।

বাস্তবে নন্দিনী অন্য কারও ঘরের আলো হতে পারে, অন্য কারও সন্তানের জননী হতে পারে,কিন্তু আসিফের এই স্বপ্নের ভূবনে সে কেবলই আসিফের। এই রাজ্য থেকে তাকে কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা পৃথিবীর কোনো ফারহানের নেই, কোনো সামাজিক বাস্তবতার নেই, এমনকি স্বয়ং নিয়তিরও নেই।

মানুষ যাকে পায় না, তাকে সে স্বপ্নের ভেতর নতুন করে জন্ম দেয়। আর সেই স্বপ্নের কিস্তি শোধ করতে করতেই একদিন মানুষের জীবন ফুরিয়ে যায়।

আসিফের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাদমাখা প্রশান্তির হাসি। সে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,"তুমি আমার অধরা প্রণয়, নন্দিনী। তোমাকে না পাওয়ার মাঝেই আমার ভালোবাসার পূর্ণতা।"

 

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login