Story

গাঁয়ের মেয়ে

November 3, 2026

14 views

ভোরের কুয়াশা তখনও চন্দনা নদীর বাঁকে পাতলা সুতোর মতো জড়িয়ে আছে। ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলো কাঁচা রোদের আলোয় মুক্তোর দানার মতো জ্বলজ্বল করছে। মেঠোপথ ধরে হনহন করে হেঁটে আসছে সুরভী। তার গায়ে বাসন্তী রঙের একখানা সুতি শাড়ি, আঁচলটা কোমরে শক্ত করে বাঁধা। বগলে একটা কাঠের রুলার আর খাতাপত্রভর্তি কাপড়ের ব্যাগ। এই পথ দিয়ে যখন সে যায়, বিলের ধারের বকেরা ডানা ঝাপটে উড়ে যায়, আর মেঠোপথের ধারে বাঁশঝাড়ের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা চাষি ভাইয়েরা সশ্রদ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে।

সুরভী এই গ্রামের মেয়ে। চরজোতারকান্দির মাটি, জল আর বাতাসের সাথে তার নাড়ির টান। গ্রামের মানুষের চোখে সে শুধু একটা মেয়ে নয়, সে এই চরের বুক চিরে ফোটা এক অপরাজেয় পদ্ম। কিন্তু সুরভী খুব ভালো করেই জানে, সমাজ তাকে কতটা সম্মানের চোখে দেখতে চায় আর কতটা তাকে এক দুর্বল, অবলা ‘মেয়েমানুষ’ বানিয়ে খাঁচায় পুরে রাখতে চায়।

সুরভী যখন ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে গণিতে প্রথম শ্রেণিতে অনার্স শেষ করে মাস্টার্সে ভর্তি হলো, পুরো চরে হইচই পড়ে গিয়েছিল। চরের ইতিহাসে কোনো চাষির মেয়ে এতদূর পড়তে পারেনি। তার বাবা সোবহান শিকদার ছিলেন একজন সাধারণ বর্গাচাষি। গায়ে গতরে খেটে, একবেলা আধপেটা খেয়ে তিনি মেয়ের পড়ার খরচ জুগিয়েছেন। গ্রামের মাতব্বররা অনেক কথা শুনিয়েছে,"মেয়েছেলেকে এত পড়িয়ে জজ-ব্যারিস্টার বানাবি নাকি সোবহান? পরের ঘরে যাবে, হাঁড়ি ঠেলবে। মিছেমিছি টাকা নষ্ট!"

সোবহান শিকদার তখন চুপ করে থাকতেন, কিন্তু সুরভী পেছন থেকে এসে বাবার কাঁধে হাত রেখে বলত, "বাবা, হাঁড়ি ঠেলতে হলেও তো বিদ্যে লাগে। তোমার মেয়ে কারও গলগ্রহ হয়ে থাকবে না, তুমি দেখে নিয়ো।"

সুরভী শুধু নিজের পড়ালেখা নিয়েই ব্যস্ত থাকেনি। চরের যে মেয়েগুলোকে বারো-তেরো বছর বয়সে বিয়ে দিয়ে মায়েরা চোখের জলে ভাসাত, তাদের হাত ধরে সে গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভাঙা বারান্দায় এনে বসিয়েছে। বিকেলে সে ওদের বিনা পয়সায় পড়ায়, বাল্যবিয়ে আর কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কথা বলে। গ্রামের নাম সে দিয়েছে ‘আলোর পাঠশালা’।

কিন্তু নিয়তির চাকা হঠাৎ করেই থমকে দাঁড়াল সুরভীর জীবনে। গত চৈত্র মাসে হঠাৎ প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে সোবহান শিকদার শয্যাশায়ী হলেন। ডাক্তার পরীক্ষা করে জানালেন, দুটো কিডনিই বিকল হওয়ার পথে। চরের সামান্য ভিটে ছাড়া সোবহানের আর কোনো সহায়-সম্বল ছিল না। সুরভীর জমানো টিউশনির সামান্য টাকা আর কিছু ঋণ করে বাবার চিকিৎসা চলতে লাগল। একদিন সোবহান শিকদার মেয়ের হাত দুটো ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন, "মা রে, আমার সময় ঘনায়া আসছে। আমার আর কোনো চিন্তা নাই, শুধু তোরে কার হাতে রেখে যাব? তোরে একটা ভালো পাত্রের হাতে তুলে দিতে না পারলে আমি চোখ বুজতে পারব না রে মা!"

সুরভীর বুকটা ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল সেদিন। যে বাবা তার জন্য সারাটা জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন, সেই বাবার শেষ ইচ্ছা সে কীভাবে ঠেলবে? সে নিচু গলায় বলেছিল, "বাবা, তুমি যেভাবে ভালো বোঝো, তা-ই হবে।"

গ্রামের ঘটক করিম খাঁ এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল। সে প্রস্তাব নিয়ে এল পাশের শংকরপাশা গ্রামের মাতব্বর মোবারক মাতব্বরের মেজ ছেলে সাখাওয়াতের। সাখাওয়াত সরকারি একটা দপ্তরের উচ্চমান সহকারী পদে কাজ করে, শহরে পোস্টিং। দেখতে-শুনতে ভালো, পাকা বাড়ি, অগাধ জমিজমা।

সোবহান শিকদারের চোখ কপালে উঠল, "করিম ভাই, মোবারক মাতব্বর তো অনেক বড় মানুষ। তাদের ছেলের সাথে আমার এই ভাঙা ঘরের মেয়ের সম্বন্ধ কীভাবে হবে?" করিম ঘটক পান চিবুতে চিবুতে বিজ্ঞের মতো হাসল, "আরে সোবহান মিয়া, তোমার মেয়ের রূপ আর গুণের কথা কে না জানে? তাছাড়া আজকাল লেখাপড়া জানা মেয়ে সবার পছন্দ। তবে হ্যাঁ, মাতব্বরের বংশের একটা মান-ইজ্জত তো আছে, বোঝই তো! মুখে তো কিছু দাবি করবে না, কিন্তু মেজ ছেলের বিয়ে, একটু মানমর্যাদা না রাখলে কি সমাজে মুখ দেখানো যায়?"

সোবহান শিকদার সেই ইঙ্গিত বুঝতে পেরেও অসুস্থতার দুর্বলতায় অন্ধ হয়ে রইলেন। ভাবলেন, সরকারি চাকরিজীবী পাত্র, মেয়েটা তার রাজরানী হয়ে থাকবে।

বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হলো। কথাবার্তার সময় সাখাওয়াতের বাবা মোবারক মাতব্বর অত্যন্ত ধার্মিক ও উদার সাজার ভান করে বলেছিলেন, "আমরা পণ বা যৌতুকের ঘোর বিরোধী। আল্লার রহমতে আমাদের কিছুর অভাব নাই। তবে আমাদের একটাই কথা,আত্মীয়স্বজন আসবে, বরযাত্রী হবে শ’দেড়েক। তাদের একটু ভালোমন্দ খাওয়াতে হবে। আর মেয়েকে যা দেবেন, তা তো আপনার মেয়েই ব্যবহার করবে। একটা লাল রঙের পালসার মোটরসাইকেল ছেলের অফিসে যাওয়ার জন্য, আর ঘরের সাজসজ্জার জন্য নগদ দুই লাখ টাকা... এই আর কি! এগুলো তো কোনো দাবি না, উপহার!"

‘উপহার’,কী ভয়ংকর মিষ্টি এই বিষের নাম!

সোবহান শিকদার ভেতরে ভেতরে শুকিয়ে গেলেন। কিন্তু ততক্ষণে বিয়ের কথা চারদিকে রাষ্ট্র হয়ে গেছে। গ্রামের লোকে বলাবলি করছে, সোবহানের কপাল খুলে গেছে। এই পরিস্থিতিতে পিছিয়ে আসা মানে মেয়ের জীবনে কলঙ্কের দাগ লেগে যাওয়া। সোবহান শিকদার শেষ সম্বল চরের আবাদি দুই বিঘা জমি স্থানীয় সুদি মহাজন রতন সাহার কাছে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দিলেন। চিকিৎসার টাকা থেকে বাঁচিয়ে আর জমি বিক্রির পুরো আড়াই লাখ টাকা তুলে দিলেন মোবারক মাতব্বরের হাতে। বাকি রইল মোটরসাইকেলটা। সোবহান হাতজোড় করে বলেছিলেন, "মাতব্বর সাহেব, ধান উঠলে আমি বাকি পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে মোটরসাইকেলের বাকি কিস্তি শোধ করে দেব।"

মোবারক মাতব্বর সেদিন মুখে মিষ্টি হেসে বলেছিলেন, "আরে বেয়াই সাহেব, আপনি আমাদের পর নাকি? মেয়ে ঘরে তুলি, বাকিটা আস্তেধীরে হবে।"

সুরভী এই লেনদেনের বিন্দুবিসর্গও জানতে পারেনি। তাকে জানানো হয়েছিল, কোনো যৌতুক ছাড়াই এই বিয়ে হচ্ছে। সুরভী ভেবেছিল, আধুনিক যুগের একজন সরকারি চাকরিজীবী ছেলে নিশ্চয়ই যৌতুকের মতো ঘৃণ্য প্রথাকে ঘৃণা করে।

লাল বেনারসি পরে, চোখে জল আর বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে সুরভী শ্বশুরবাড়িতে পা রাখল। কিন্তু বিয়ের প্রথম রাত থেকেই সেই স্বপ্নের কাচগুলো একে একে চুরমার হতে শুরু করল। ফুলশয্যার ঘরে দুধের গ্লাসটা টেবিলে রেখে সাখাওয়াত যখন এসে বসল, তার চোখে ভালোবাসার কোনো উষ্ণতা ছিল না, ছিল এক লোভী বণিকের দৃষ্টি।

সাখাওয়াত ঘরে ঢুকেই বাঁকা হেসে বলল, "তোমার বাবা তো খুব চালাক মানুষ সুরভী। চরের চাষাভুষা হলেও হিসেব ভালো বোঝে।" সুরভী অবাক হয়ে ঘোমটা সামান্য তুলে তাকাল, "কী বলছেন আপনি?"

"বলছি তোমার বাবার দেনার কথা। কথা ছিল বিয়ের আসরেই লাল পালসারের চাবি আমার হাতে তুলে দেবে। অথচ দিল মাত্র কুড়ি হাজার টাকা আর একটা মুচলেকা! অফিসের কলিগদের বলে রেখেছিলাম নতুন গাড়িতে করে বউ নিয়ে আসব। আজ সবার সামনে আমার কী অপমানটা হলো জানো?" সাখাওয়াতের গলার স্বর কর্কশ হয়ে উঠল।

সুরভীর পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে গেল। তার বুকের ভেতরটা থরথর করে কেঁপে উঠল। সে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে বলল, "টাকা? গাড়ি? কিন্তু বাবা তো বলেছিল আপনারা কোনো যৌতুক নেননি!"

"যৌতুক? খবরদার, এই শব্দটা উচ্চারণ করবে না!" সাখাওয়াত ধমকে উঠল। "এটা আমাদের সামাজিক সম্মান। আমার মতো পাত্রকে বিয়ে করতে গেলে শহরের বড় বড় অফিসাররা পাঁচ লাখ টাকা ক্যাশ দিত। সেখানে তোমার বাপকে মাত্র দেড় লাখের গাড়ি আর দুই লাখ টাকা ক্যাশ দিতে বলা হয়েছিল। তার মধ্যেও পঞ্চাশ হাজার টাকা বাকি রেখেছে! ভিখারির মেয়েকে ঘরে এনে আমার পরিবার দয়া করেছে, এটা মাথায় রেখো।"

সেই কালরাতে সুরভী এক ফোঁটাও ঘুমোতে পারেনি। খাটের এক কোণে বসে সে নিঃশব্দে চোখের জল ফেলেছে। তার মনে পড়ছিল বাবার সেই রুগ্ন, ফ্যাকাশে মুখের কথা। বুঝতে পারল, তার বাবা কীভাবে নিজের বুকের রক্ত জল করে, শেষ সম্বল জমিটুকু বিক্রি করে এই নরকের টিকিট কিনে দিয়েছেন।

পরের দিন থেকেই শুরু হলো সুরভীর ওপর মানসিক ও শারীরিক লাঞ্ছনা। শাশুড়ি আমেনা বেগম সকালে উঠেই সুরভীর দেওয়া শাড়ি-কাপড় আর তৈজসপত্র দেখে মুখ বাঁকালেন, "কী সব ক্ষ্যাত মার্কা জিনিস পাঠাইছে সোবহান চাষা! এগুলো দিয়ে তো আমাদের কাজের বেটিদেরও দেওয়া যায় না। চরের ছোটলোকের মেয়ের গায়ে অহংকার ছাড়া আর কিছুই নাই।"

ননদ রেশমা এসে টিপ্পনী কাটল, "ভাবী তো শুনেছি ভার্সিটিতে অঙ্কে ফার্স্ট ক্লাস পাইছে! তা বাপের বাড়ির অঙ্কের হিসাবটা তো মিলল না। বাকি পঞ্চাশ হাজার টাকা কবে আসবে শুনি?"

সুরভী মুখ বুজে সব সহ্য করত। সে বাড়ির ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত দাসীর মতো খাটত। রান্নাবাড়া, বাসন মাজা, ঘর মোছা,কোনো কাজেই সে ত্রুটি রাখত না। সে ভাবত, ভালোবাসা আর সেবা দিয়ে হয়তো সে এদের মন জয় করতে পারবে। কিন্তু লোভীদের পেট কোনোদিন ভরে না। যৌতুক হলো এমন এক আগুন, যাতে যত ঘি ঢালা হয়, তা তত বেশি দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে।

মাসখানেক পর সাখাওয়াত এসে সুরভীকে বলল, "তোমার বাবাকে খবর দাও। আগামী শুক্রবার যেন পঞ্চাশ হাজার টাকা নিয়ে আসে। আর আমার অফিসের এক বড় স্যারের একটা পুরোনো সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি বিক্রির কথা আছে। তোমার বাপকে বলো আরও এক লাখ টাকা জোগাড় করতে। আমি গাড়িটা কিনব।" সুরভী স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে সরাসরি সাখাওয়াতের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, "বাবার আর কিছু দেওয়ার সামর্থ্য নেই। বাবা তাঁর চিকিৎসার শেষ সম্বল জমিও বিক্রি করে দিয়েছেন। আপনারা দয়া করে তাঁকে আর জ্বালাতন করবেন না।"

সাখাওয়াতের মুখ রাগে লাল হয়ে গেল। "কী বললি তুই? বড় বড় কথা? বাপের বাড়ি থেকে টাকা আনতে পারবি না তো এই বাড়িতে কেন এসেছিস?"

এই বলে সাখাওয়াত সুরভীর চুলের মুঠি ধরে সজোরে গালে চড় বসিয়ে দিল। সুরভী ছিটকে গিয়ে পড়ল আলমারির কোণে। কপাল ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ল।

ভেতরের ঘর থেকে শাশুড়ি এসে ছেলেকে থামানোর বদলে সুরভীকেই শাসাতে লাগলেন, "ঢং দেখলেই গা জ্বলে! বাপের বাড়ি থেকে একটা কানাকড়ি আনেনি, আবার স্বামীর মুখের ওপর কথা বলে! টাকা না আসা পর্যন্ত বাপের বাড়ি যাওয়া বন্ধ, আর কোনো মেহমানদারিও হবে না।"

সুরভী মাটিতে পড়ে রইল। ব্যথায় তার মাথা ঝিমঝিম করছিল। কিন্তু কপাল থেকে চুইয়ে পড়া রক্তের চেয়েও বেশি রক্তক্ষরণ হচ্ছিল তার আত্মসম্মানে। সে ভাবল, কার জন্য সে এই অত্যাচার সহ্য করছে? কেন সহ্য করছে?

আমাদের সমাজের হাজার হাজার মেয়ে এই ভেবে মুখ বুজে থাকে,‘সংসার তো এমনই হয়’, ‘স্বামীর পায়ের নিচে বেহেশত’, ‘মেয়েদের একটু সহ্য করতেই হয়’। আর এই সহ্যের সুযোগ নিয়েই লোভী পিশাচগুলো দিনের পর দিন নারীদের আত্মাহুতি দিতে বাধ্য করে। আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়, ঝুলিয়ে দেওয়া হয় সিলিং ফ্যানে, নয়তো বিষ খাইয়ে প্রচার করা হয় ‘আত্মহত্যা’।

সুরভী উঠে দাঁড়াল। সে আয়নার সামনে গিয়ে নিজের রক্তমাখা মুখটা দেখল। এই মুখ তো কোনো পরাজিত, লাঞ্ছিত অবলার মুখ নয়। সে চরের লড়াকু মেয়ে। সে অঙ্কের জটিল সমীকরণ মেলাতে জানে, সে চরের শত শত মেয়েকে অধিকারের পাঠ পড়িয়েছে। আজ সে যদি নিজেই এই অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে, তবে সে কাল কোন মুখে ওই চরের মেয়েগুলোর সামনে গিয়ে দাঁড়াবে?

পরের দিন শুক্রবার। কথা অনুযায়ী সোবহান শিকদার মেয়ের বাড়িতে এলেন। মানুষটার শরীর এতটাই ভেঙে গেছে যে ঠিকমতো হাঁটতেও পারছেন না। পরনে একটা মলিন ফতুয়া আর লুঙ্গি। কাঁপাকাঁপা হাতে তিনি একটা মিষ্টির প্যাকেট ধরে রেখেছিলেন।

বৈঠকখানায় মোবারক মাতব্বর আর সাখাওয়াত বসে ছিল। সোবহান শিকদার ঢুকতেই সাখাওয়াত কোনো সালামের উত্তর না দিয়ে অবজ্ঞার সুরে বলল, "টাকা এনেছেন?"

সোবহান শিকদার থমকে গেলেন। তিনি ফতুয়ার পকেট থেকে বহু কষ্টে জমানো কুড়ি হাজার টাকা বের করে কাঁপতে কাঁপতে টি-টেবিলের ওপর রাখলেন। "বেয়াই সাহেব, বাবা সাখাওয়াত... আমার শরীরটা ভালো না। কাজকাম করতে পারি না। অনেক কষ্টে এই কুড়ি হাজার টাকা জোগাড় করেছি। বাকি তিরিশ হাজার টাকা ধান উঠলে আমি হাত-পা ধরে হলেও দিয়ে যাব। আমার মেয়েটাকে একটু দেখবেন, ও বড় সরল।"

মোবারক মাতব্বর টাকার বান্ডিলটার দিকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর হাত দিয়ে সেটা মেঝেতে ফেলে দিয়ে বললেন, "রাখুন আপনার ভিখারির দান! বাকি ত্রিশ হাজার তো দূরের কথা, গাড়ির জন্য আরও এক লাখ টাকার কথা বলা হয়েছিল। সেই টাকা কোথায়? মেয়েকে বিয়ে দিয়ে ভেবেছেন দায় খালাস? এই কুড়ি হাজার টাকা নিয়ে গিয়ে নিজের কাফনের কাপড় কিনুন।"

সাখাওয়াত উঠে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ সোবহান শিকদারের গায়ের ফতুয়া ধরে টান দিল, "টাকা যখন দিতে পারবি না, তখন এই নবাবজাদিকে কেন আমার ঘাড়ে চাপালি? দূর হ এখান থেকে! আজকেই তোর মেয়েকে তালাক দিয়ে রাস্তায় নামিয়ে দেব।"

সোবহান শিকদার অপমানে আর কান্নায় মেঝেতে বসে পড়লেন। "বাবা, এমন কথা বলবেন না... আমার মেয়েটার জীবন নষ্ট হয়ে যাবে... আমি পায়ে পড়ি বাবা!"

ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের ভেতরের পর্দা সরিয়ে সুরভী এসে দাঁড়াল।

তার পরনে সেই সাধারণ সুতি শাড়ি। কপালে ব্যান্ডেজ বাঁধা। কিন্তু তার চোখ দুটো জ্বলছিল এক অদ্ভুত আগুনের মতো। সেই চোখে কোনো ভয়ের লেশমাত্র নেই। সুরভী দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে বাবার হাত ধরে মেঝে থেকে টেনে তুলল। অত্যন্ত দৃঢ় ও শান্ত গলায় বলল, "বাবা, ওঠো। ওদের পায়ে তুমি পড়বে না। যে মানুষ অন্যের ঘামের দাম চেনে না, যে পরিবার মানুষের সম্মান চেনে না, তাদের পায়ে পড়ার চেয়ে মরে যাওয়াও অনেক সম্মানের।"

সাখাওয়াত চিৎকার করে উঠল, "কী বললি তুই? এত বড় সাহস তোর? আমার বাবার সামনে আমার ঘরে দাঁড়িয়ে মুখের ওপর কথা বলিস?"

"হ্যাঁ, বলি!" সুরভী এক পা এগিয়ে এল। তার কণ্ঠস্বর বজ্রের মতো শোনাল পুরো বৈঠকখানায়। "এতক্ষণ বলিনি কারণ ভেবেছিলাম তোমাদের ভেতরে কোনো মনুষ্যত্ব অবশিষ্ট আছে। কিন্তু আজ বুঝলাম, তোমরা মানুষ নও। তোমরা স্যুটেড-বুটেড কিছু লোভী শকুন! আমার বাবা নিজের রক্ত জল করে, জমি বেচে তোমাদের আড়াই লাখ টাকা দিয়েছে। তাও তোমাদের ভিক্ষুকের ক্ষুধা মেটেনি? তোমরা নিজেদের মাতব্বর বলো? সরকারি অফিসার বলো? তোমরা আসলে কুলাঙ্গার, যারা বিয়ের নামে ব্যবসা খোলো আর যৌতুকের নামে ডাকাতি করো!"

মোবারক মাতব্বর থতমত খেয়ে গেলেন। গ্রামের কোনো বউ এভাবে তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহস কোনোদিন দেখায়নি। তিনি রেগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, "বউমা, মুখ সামলে কথা কও! এক কাপড়ে তোমারে এই বাড়ি থেকে এখনই বের করে দেব।"

সুরভী তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। সে নিজের হাত থেকে সোনার কাচের বালা দুটো খুলে সজোরে ছুড়ে মারল সাখাওয়াতের পায়ের কাছে।

"বের তো আমি হবই মাতব্বর সাহেব! কিন্তু আপনাদের বের করে দেওয়ার অপেক্ষায় আমি বসে নেই। এই নরকে আমি এক মুহূর্তও থাকব না। আমি একজন শিক্ষিত মেয়ে, আমার নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি আছে। তোমাদের এই লোভের ঘরে দাসীবৃত্তি করার চেয়ে চরে মাটি কেটে খাওয়া অনেক বেশি মর্যাদার!"

সাখাওয়াত হাত তুলে সুরভীকে মারতে উদ্যত হলো, "তোর এত বড় তেজ? আজ তোকে আমি,"

সুরভী এক চুলও নড়ল না। সে সটান সাখাওয়াতের চোখের দিকে তাকিয়ে হাতটা শূন্যে আটকে দিল। তার চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছিল।

"হাত নামাও সাখাওয়াত! আর একটা আঙুল যদি আমার গায়ে স্পর্শ করেছ, তবে এই হাত আমি কীভাবে ভাঙতে হয় তা ভালো করেই জানি। তুমি ভেবেছ চরের মেয়ে বলে আমি কোনো আইন জানি না? নারী নির্যাতন আর যৌতুক নিরোধ আইনের ধারাগুলো আমি মুখস্থ জানি। এই যে আমার কপালে কাল রাতের আঘাতের দাগ,এই এক দাগ দিয়েই আমি তোমাকে আর তোমার এই লোভী বাবাকে শ্রীঘরে পাঠাতে পারি। সরকারি চাকরি তো যাবেই, জেলের ভাত গিলতে গিলতে সারা জীবন পার হবে!"

সাখাওয়াতের হাত কেঁপে উঠল। সে এক পা পিছিয়ে গেল। সুরভীর এই রূপ সে কোনোদিন কল্পনাও করেনি। সুরভীর চোখ-মুখের সেই অনমনীয় তেজ দেখে মোবারক মাতব্বরের গলার আওয়াজও খাদে নেমে গেল।

সুরভী বাবার হাত ধরল। "চল বাবা। এই পাপের বাড়ি ছেড়ে আমরা চলে যাব।"

সোবহান শিকদার চোখের জল মুছতে মুছতে বললেন, "কিন্তু মা রে, সমাজে যে তোরে নিয়ে কথা বলবে... তোর যে তালাকপ্রাপ্তা মেয়ের তকমা লাগবে রে মা!"

সুরভী বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত, কিন্তু প্রত্যয়ী গলায় বলল, "বাজে সমাজের ভয় পেয়ে কোনো আত্মসম্মানহীন নরকে বেঁচে থাকার নাম জীবন নয় বাবা। সমাজ কথা বলবে কয়েকদিন, কিন্তু আমি যদি আমার মেরুদণ্ড সোজা রাখি, তবে সেই সমাজই একদিন আমার সামনে মাথা নোয়াতে বাধ্য হবে।"সুরভী তার বাবার হাত ধরে সেই বাড়ির প্রধান ফটক পেরিয়ে মেঠোপথে এসে দাঁড়াল। পেছনে পড়ে রইল একদল হতভম্ব, কাপুরুষ ও লোভী মানুষের অন্ধকার জগৎ।

গ্রামে ফেরার পর সুরভী কোনো কান্নাকাটি বা ভেঙে পড়ার নাটক করল না। সে পরের দিন সকালেই সোজা চলে গেল থানায়। ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় গিয়ে সে সাখাওয়াত ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে যৌতুক দাবি ও শারীরিক নির্যাতনের লিখিত এজাহার দায়ের করল। তার কপালের ক্ষতের মেডিকেল রিপোর্ট যুক্ত করে দিল। পুলিশ অফিসার প্রথমে ভেবেছিলেন কোনো সাধারণ গৃহবধূর অভিযোগ। কিন্তু সুরভীর স্পষ্ট বক্তব্য, আইনের সঠিক ধারা উল্লেখ এবং আত্মবিশ্বাসী চাহনি দেখে তিনি নড়েচড়ে বসলেন।

"আপনি নিশ্চিত তো আপা? আপস করবেন না?" অফিসার জিজ্ঞেস করলেন।

সুরভী দৃঢ় কণ্ঠে বলল, "অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে,দুজনেই সমান অপরাধী। আমি আপস করব না স্যার। এই লোভীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার, যাতে আর কোনো সাখাওয়াত কোনো বাবার বুক খালি করার সাহস না পায়।"

থানা থেকে বেরিয়ে সুরভী সোজা চলে গেল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে। সেখানে তখন এক জরুরি সভা চলছিল। সুরভী সেখানে গিয়ে নারী বিষয়ক কর্মকর্তার সাথে দেখা করে নিজের বক্তব্য তুলে ধরল।

ঘটনাটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল পুরো জেলায়। চরের এক সাধারণ কৃষককন্যার এমন সাহসিকতার খবর স্থানীয় সংবাদপত্রে শিরোনাম হলো,"যৌতুকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল চরের মেয়ে: স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা।"

এদিকে সাখাওয়াত ও তার পরিবার তখন আতঙ্কে কাঁপছে। পুলিশের নোটিশ যেতেই মোবারক মাতব্বর স্থানীয় প্রভাবশালী মাতব্বরদের নিয়ে সোবহান শিকদারের ভাঙা ঘরে এসে হাজির হলেন। এবার তাদের গলায় কোনো অহংকার ছিল না, ছিল কাকুতি-মিনতি।

"সোবহান ভাই, যা হওয়ার হয়ে গেছে। মামলাটা তুলে নাও। আমরা সুরভীকে মাথায় করে রাখব। বাকি কোনো টাকা লাগবে না, উল্টো আমরা জরিমানা দেব," মোবারক মাতব্বর হাতজোড় করলেন।

সুরভী ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল।

"মাতব্বর সাহেব, আপনারা যেটাকে টাকা দিয়ে মেটাতে চাইছেন, তার নাম আত্মসম্মান। সেটা কেনা যায় না। আপনারা ভেবেছিলেন একজন গরিবের মেয়েকে যা খুশি তাই করা যায়। এবার আইনের মুখোমুখি হোন।"

সাখাওয়াতের চাকরি সাময়িকভাবে বরখাস্ত হলো। যৌতুক ও নারী নির্যাতন মামলায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে চালান দিল। মোবারক মাতব্বর জামিনের জন্য আদালতের বারান্দায় বারান্দায় ঘুরতে লাগলেন, যে বারান্দায় একসময় তিনি সাধারণ মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেন।

এদিকে সুরভী থেমে থাকেনি। সে দিনরাত এক করে বিসিএস এবং সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে লাগল। পাশাপাশি ‘আলোর পাঠশালা’র পরিধি আরও বাড়িয়ে দিল। এবার শুধু চরের মেয়েরা নয়, তাদের মায়েরা পর্যন্ত সুরভীর কাছে আসতে শুরু করল।

সুরভী তাদের উঠোনে বসিয়ে বলত, "শোনো মায়েরা, মেয়েদের কখনো বোঝাবেন না যে পরের বাড়ি গিয়ে মার খেয়েও পড়ে থাকতে হবে। মেয়েদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখান। যৌতুক দিয়ে মেয়ে পার করা মানে মেয়েকে একটা কসাইয়ের হাতে তুলে দেওয়া। যে পুরুষ নিজের যোগ্যতায় একটা বাইক বা ঘর সাজাতে পারে না, সে পুরুষ আপনার মেয়েকে ভাত দেওয়ার যোগ্য নয়।"

বছর দেড়েক পরের কথা। চন্দনা নদীর পাড়ে হেমন্তের এক সোনাঝরা সকাল। চরের মেঠোপথ ধরে পোস্টম্যান সাইকেলের বেল বাজিয়ে ছুটে আসছে। সোবহান শিকদার তখন উঠোনে বসে পাট ছাড়াচ্ছিলেন।

"সোবহান কাকা! ও সোবহান কাকা! মিষ্টি খাওয়ান!" পোস্টম্যান চিৎকার করে উঠল।

সুরভী ঘর থেকে বেরিয়ে এল। পোস্টম্যান তার হাতে একটা বড় সরকারি খাম তুলে দিল। খামটা খুলতেই সুরভীর চোখ দিয়ে আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ল। ৩৮তম বিসিএস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। সুরভী শিক্ষা ক্যাডারে প্রথম সারিতে উত্তীর্ণ হয়েছে। সে এখন একজন সরকারি কলেজের প্রভাষক।

সোবহান শিকদার মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন। তাঁর রুগ্ন শরীরটা যেন নিমেষেই সুস্থ হয়ে উঠল। তিনি বুকভরে শ্বাস নিয়ে আকাশের দিকে তাকালেন।

 গ্রামের মানুষ জড়ো হলো তাদের উঠোনে। যে মাতব্বররা একসময় সুরভীকে নিয়ে কটূক্তি করেছিল, তারা আজ হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে আছে সম্মান জানাতে। করিম ঘটক এসে এককোণে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে রইল। সুরভী তার বাবার হাত ধরে বলল, "বাবা, সেদিন যদি আমি মুখ বুজে মার সহ্য করতাম, তবে আজ হয়তো চন্দনা নদীর কোনো চরে আমার লাশ ভেসে উঠত। কিন্তু তুমি আমাকে পড়ালেখা শিখিয়েছিলে, তুমি আমার মেরুদণ্ড শক্ত করেছিলে।"

সুরভী আজ আর কেবল সোবহান শিকদারের মেয়ে নয়। সে সমগ্র চরের, সমগ্র দেশের সেইসব হাজারো মেয়ের প্রতীক,যাঁরা প্রতিদিন যৌতুকের নির্মম আগুনে তিলে তিলে পুড়ে মরছে। সুরভী প্রমাণ করে দিয়েছে, নারীর আসল গহনা বাবার দেওয়া স্বর্ণালংকার বা যৌতুকের মোটরসাইকেল নয়; নারীর আসল পরিচয় তার শিক্ষা, তার আত্মমর্যাদা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর অদম্য সাহস।

চরজোতারকান্দির বুক চিরে বাতাস বয়ে যায়। সেই বাতাসে সুরভী দাঁড়িয়ে থাকে মাথা উঁচু করে,এক নির্ভীক, অপরাজেয় গাঁয়ের মেয়ে।

 

Picked up where you left off

Comments

Borhan Mahmud was this story’s first reader

+20 XP

    Please login to post comment. Login

  • Borhan Mahmud 2 hours ago First reader

    গল্পটিতে আপনি একটি ইতিবাচক পরিণতি এনেছেন, তবে সেটি সম্ভবত সাধারণ দৃশ্য নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিণতি ভয়াবহ, ভাই। উপহার’,কী ভয়ংকর মিষ্টি এই বিষের নাম! এ বাক্যটিই এ গল্পের কোর সেন্টেন্স। খুব ভালো লিখেছেন। শুভেচ্ছা জানবেন।