সবুজ অরণ্য আর পাহাড়ে আমার মন আটকে থাকে। সুযোগ পেলেই চলে যাই প্রকৃতির সান্নিধ্যে। শহরের কোলাহল, যানবাহনের অবিরাম হর্ন, মানুষের ব্যস্ততা, সম্পর্কের হিসাব-নিকাশ আর জীবনের প্রতিদিনকার ক্লান্তি থেকে পালিয়ে পাহাড়ের কাছে গেলে মনে হয়, পৃথিবীটা এখনো বেঁচে আছে। এখনো কোথাও কিছু মায়া জমে আছে, কিছু নীরবতা আছে, কিছু অচেনা পথ আছে, যেখানে হাঁটতে হাঁটতে মানুষ নিজের হারিয়ে যাওয়া সত্তাটিকে খুঁজে পেতে পারে।
পাহাড় আমাকে ডাকত। নদী আমাকে টানত। অরণ্যের গাঢ় সবুজের মধ্যে আমি খুঁজে পেতাম এমন এক প্রশান্তি, যা কোনো দামি হোটেলের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে পাওয়া যায় না। আমার মনে হতো, পাহাড়েরও একটা হৃদয় আছে। সে কথা বলতে পারে না, কিন্তু তার নীরবতা দিয়ে মানুষের মনের সমস্ত কথা শুনে নেয়। আমি তখনো জানতাম না, একদিন সেই পাহাড়ের বুকেই আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকবে এক মেয়ে। তার চোখে থাকবে অরণ্যের ছায়া, হাসিতে ঝরনার শব্দ, আর অভিমানে থাকবে পাহাড়ের মতোই এক অদ্ভুত নীরবতা। তার নাম মায়া। কিন্তু আমি তাকে ডাকতাম,পাহাড়ী মেয়ে।
ঢাকার জীবন আমার কাছে অনেকটা পুরোনো একটি ঘড়ির মতো। প্রতিদিন একই শব্দ, একই ব্যস্ততা, একই দৌড়। সকাল হলে অফিস, দুপুরে মিটিং, বিকেলে অসমাপ্ত কাজের চাপ, আর রাতে ফিরে নিজের সঙ্গে একান্তে বসার চেষ্টা। দিন শেষে মনে হতো, জীবনের অনেক কিছু অর্জন করছি, অথচ কোথাও যেন নিজেকেই হারিয়ে ফেলছি।
সেদিনও অফিসের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আকাশে মেঘ জমেছিল। দূরে উঁচু ভবনের গায়ে বিকেলের আলো পড়ে অদ্ভুত এক বিষণ্নতা তৈরি করেছে। হঠাৎ মনে হলো, আর নয়। কয়েক দিনের জন্য কোথাও চলে যেতে হবে। কোথায়? উত্তরটা আমার জানা ছিল।পাহাড়ে।
সেই রাতেই ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম। পরদিন ভোরে চট্টগ্রামগামী বাসে উঠে বসলাম। জানালার পাশে বসে শহরকে পেছনে ফেলে যেতে যেতে মনে হচ্ছিল, বুকের ওপর জমে থাকা অদৃশ্য পাথরগুলো একটু একটু করে নেমে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম থেকে বান্দরবান। তারপর পাহাড়ি পথ ধরে আরও দূরে।
রাস্তার দুই পাশে সবুজের বিস্তার। কোথাও বাঁশঝাড়, কোথাও অরণ্যের ঘন ছায়া, কোথাও পাহাড়ের গায়ে মেঘ এসে এমনভাবে জড়িয়ে আছে, যেন আকাশ তার প্রিয় সন্তানকে বুকে টেনে নিয়েছে। পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে ছোট ছোট জনপদ, টিনের ঘর, উঠোনে শুকাতে দেওয়া রঙিন কাপড়, আর দূর থেকে ভেসে আসা অচেনা মানুষের কথাবার্তা।
আমি মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক হারিয়ে ফেললাম। আশ্চর্যভাবে এতে আমার মন খারাপ হলো না। বরং মনে হলো, পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আজ প্রথমবার নিজের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারছি। বিকেলের দিকে একটি ছোট পাহাড়ি জনপদে পৌঁছালাম। জায়গাটির নাম থুইসাপাড়া। নামটি আগে শুনিনি। পর্যটকদের ভিড় তেমন নেই। পাহাড়ের ঢালে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাড়িগুলো যেন সবুজের ভেতর লুকিয়ে থাকা ছোট ছোট স্বপ্ন।
একটি কাঠের ঘরে থাকার ব্যবস্থা হলো। ঘরটির সামনে ছোট বারান্দা, তার পরেই ঢালু পাহাড়। দূরে কয়েকটি পাহাড়ের সারি। সূর্য তখন ধীরে ধীরে পাহাড়ের পেছনে নেমে যাচ্ছে।
আমি বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলাম। হঠাৎ পাশের সরু পথ দিয়ে একটি মেয়ে হেঁটে গেল।
তার পরনে ছিল নীলচে সবুজ একটি পোশাক। কাঁধে বোনা কাপড়ের ব্যাগ, হাতে কয়েকটি বুনো ফুল। তার চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়িয়ে ছিল। হাঁটার ভঙ্গিতে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। যেন সে জানে, পৃথিবীর কোনো কাজই প্রকৃতির সময়ের চেয়ে জরুরি নয়।
মেয়েটি একবার আমার দিকে তাকাল।
সেই দৃষ্টিতে কৌতূহল ছিল, সামান্য বিস্ময়ও। তারপর ঠোঁটের কোণে একটি ছোট হাসি ফুটিয়ে সে চলে গেল। আমি অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলাম তার চলে যাওয়ার পথে। নিজেকে বললাম, এমন তো প্রতিদিনই কত মানুষ দেখি। এ নিয়ে এত ভাবার কী আছে? কিন্তু আশ্চর্য, সন্ধ্যা নামার পরও মেয়েটির চোখ দুটি আমার মনে থেকে গেল।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল পাখির ডাকে। শহরে অ্যালার্মের শব্দে ঘুম ভাঙে, পাহাড়ে পাখির গানে। এই সামান্য পার্থক্যটুকুই মানুষের জীবনকে কতখানি বদলে দিতে পারে, তা পাহাড়ে না এলে বোঝা যায় না। চা খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। স্থানীয় একজন বৃদ্ধ আমাকে কাছের একটি ঝরনার পথ দেখিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, খুব বেশি দূর নয়, তবে পথ কিছুটা দুর্গম। আমি হাঁটতে শুরু করলাম।
পাহাড়ি পথের দুপাশে ঘন গাছপালা। কোথাও মাটির গন্ধ, কোথাও ভেজা পাতার ওপর শিশির, কোথাও লতাগুল্মের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়ছে। দূরে কোথাও পানি পড়ার শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম।
একটি বাঁক ঘুরতেই দেখলাম, ঝরনার কাছে সেই মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে।
সে পাথরের ওপর বসে একটি ছোট খাতায় কী যেন লিখছিল। আমাকে দেখে খাতাটি বন্ধ করল।
আমি একটু ইতস্তত করে বললাম, “এই পথ দিয়ে কি ঝরনায় যাওয়া যায়?”
মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে হাসল।
“আপনি তো ঝরনার কাছেই দাঁড়িয়ে আছেন।”
আমি হেসে ফেললাম।
“ঠিক বলেছেন। আসলে আমি পথ চিনতে পারি না।”
“পাহাড়ের পথ চিনতে হলে পাহাড়কে ভালোবাসতে হয়।”
“আমি পাহাড়কে ভালোবাসি।”
সে ভ্রু উঁচু করল।
“সত্যি?”
“কেন, বিশ্বাস হচ্ছে না?”
“শহরের মানুষ সাধারণত বলে তারা পাহাড়কে ভালোবাসে। তারপর পাহাড়ে এসে পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে মোবাইলে ছবি তোলে, আবার শহরে ফিরে যায়।”
আমি কিছুটা লজ্জা পেয়ে বললাম, “আমি ছবি তুলতে এসেছি, তবে শুধু ছবি তুলে ফিরে যেতে চাই না।”
“তাহলে কী করতে চান?”
প্রশ্নটি খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু আমি উত্তর দিতে গিয়ে থেমে গেলাম।
কী করতে চাই?
হয়তো একটু শান্তি খুঁজতে। হয়তো নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে কিছুদিনের জন্য ঘুম পাড়াতে। হয়তো এমন কিছু দেখতে, যা দেখে মনে হবে পৃথিবী এখনো সুন্দর।
আমি বললাম, “নিজেকে খুঁজতে এসেছি।”
মেয়েটি কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর খাতাটি ব্যাগে রেখে বলল, “নিজেকে খুঁজতে হলে মাঝে মাঝে নিজের সঙ্গে মিথ্যা বলা বন্ধ করতে হয়।”
কথাটি বলে সে উঠে দাঁড়াল।
“আমি মায়া। এই পথ দিয়ে প্রায়ই আসি। আপনি চাইলে ঝরনাটা দেখিয়ে দিতে পারি।”
আমি তার পাশে হাঁটতে শুরু করলাম।
পাথরের ওপর দিয়ে পানি বয়ে যাচ্ছে। ঝরনার কাছাকাছি আসতেই ঠান্ডা বাতাস মুখে এসে লাগল। পানির শব্দে চারপাশ ভরে উঠল। মায়া একটি পাথরের ওপর বসে পা দুটি পানিতে ডুবিয়ে দিল।
আমি তার পাশের পাথরে বসলাম।
কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বললাম না।
তারপর মায়া জিজ্ঞেস করল, “আপনি কী করেন?”
“প্রকল্প ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করি। অনেক মানুষ, অনেক পরিকল্পনা, অনেক সময়সীমা, অনেক হিসাব।”
“আপনার নিজের জীবনেরও কি কোনো প্রকল্প পরিকল্পনা আছে?”
আমি হেসে বললাম, “ছিল। এখন মনে হয়, পরিকল্পনার বাইরে কিছু বেঁচে থাকা দরকার।”
“তাহলে আপনি ঠিক জায়গায় এসেছেন।”
“কেন?”
মায়া ঝরনার দিকে তাকিয়ে বলল, “পাহাড় কাউকে পরিকল্পনা করতে শেখায় না। পাহাড় শেখায় অপেক্ষা করতে। মেঘ কখন আসবে, বৃষ্টি কখন নামবে, ফুল কখন ফুটবে,এসবের কোনো সময়সূচি পাহাড়ের কাছে নেই।”
আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
মেয়েটির কথা বলার মধ্যে একধরনের সরল গভীরতা ছিল। সে যেন বই পড়ে শেখেনি, জীবন থেকে শিখেছে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কী করেন?”
“আমি পড়াশোনা করি। পাশাপাশি ছোটদের পড়াই। আর লিখি।”
“কী লেখেন?”
“যা কাউকে বলতে পারি না।”
“কবিতা?”
সে হেসে ফেলল।
“কখনো কবিতা, কখনো গল্প। কখনো শুধু কিছু শব্দ, যাদের কোনো ঠিকানা নেই।”
আমি বললাম, “শব্দেরও ঠিকানা থাকে। শুধু ঠিকানাটা খুঁজে নিতে হয়।”
মায়া আমার দিকে তাকাল। তারপর চোখ নামিয়ে বলল, “আপনি কথাও ভালো বলেন।”
“সব কথা ভালো বলতে পারি না।”
“কোন কথাটা বলতে পারেন না?”
আমি উত্তর দিলাম না।
কারণ তখনো জানতাম না, এই মেয়েটির সামনে দাঁড়িয়ে একদিন আমাকে এমন একটি কথা বলতে হবে, যার উত্তর আমার নিজের কাছেও পরিষ্কার নয়।
তারপরের দিনগুলো অদ্ভুতভাবে বদলে গেল। আমি যে পাহাড়ে এসেছিলাম নিজের সঙ্গে সময় কাটাতে, সেখানে আমার দিনের সবচেয়ে সুন্দর সময় হয়ে উঠল মায়ার সঙ্গে দেখা করার অপেক্ষা।
কখনো ঝরনার পাশে, কখনো পাহাড়ের ঢালে, কখনো ছোট বাজারের কাছে। প্রতিদিন দেখা হতো না, কিন্তু যেদিন দেখা হতো, সেদিন মনে হতো পাহাড়ের বাতাস একটু বেশি নির্মল, আকাশ একটু বেশি নীল। মায়া আমাকে পাহাড়ের গাছ চিনিয়ে দিত। কোন গাছের পাতা বৃষ্টির আগে গন্ধ ছড়ায়, কোন ফুল শুধু নির্দিষ্ট ঋতুতে ফোটে, কোন পাখি ভোরে ডাকে আর কোন পাখি সন্ধ্যার আগে অরণ্যে ফিরে যায়,সব তার জানা।
আমি তাকে শহরের গল্প শোনাতাম। উঁচু ভবন, ব্যস্ত রাস্তা, অফিসের চাপ, মানুষের প্রতিযোগিতা, আর সেইসব রাতের কথা, যখন অনেক মানুষের মধ্যে থেকেও নিজেকে একা মনে হয়।
মায়া মন দিয়ে শুনত।
একদিন সে বলল, “আপনাদের শহরে এত মানুষ, তবু সবাই একা কেন?”
আমি বললাম, “কারণ আমরা সবাই কারও না কারও কাছে পৌঁছাতে চাই, কিন্তু কেউ কারও কথা শোনার জন্য থামতে চাই না।”
মায়া মাথা নেড়ে বলল, “আমাদের এখানে মানুষ কম। কিন্তু আমরা জানি, কারও ঘরে চুলা না জ্বললে পাশের বাড়ির চুলায়ও ঠিকমতো আগুন জ্বলে না।”
কথাটা আমার মনে গেঁথে গেল।
এক বিকেলে আমরা পাহাড়ের একটি উঁচু জায়গায় উঠেছিলাম। নিচে ছোট জনপদ, তার ওপারে সারি সারি পাহাড়। দূরের পাহাড়ে মেঘ জমেছে। বাতাসে বুনো ফুলের গন্ধ।
মায়া হঠাৎ বলল, “আপনি কি কখনো কাউকে ভালোবেসেছেন?”
প্রশ্নটা শুনে আমি একটু অবাক হলাম।
“কেন জিজ্ঞেস করছেন?”
“এমনিই।”
“ভালোবাসা বলতে কী বোঝেন, তার ওপর উত্তরটা নির্ভর করছে।”
মায়া হেসে বলল, “বাহ! প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আবার প্রশ্নের ব্যাখ্যা!”
আমি বললাম, “একসময় মনে করতাম ভালোবাসা মানে কাউকে নিজের কাছে পাওয়া। এখন মনে হয়, ভালোবাসা মানে এমন একজন মানুষকে পাওয়া, যার কাছে নিজেকে লুকাতে হয় না।”
মায়া চুপ করে রইল।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি?”
সে কিছুক্ষণ দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “আমি এমন একজনকে চাই, যে আমার পাহাড়কে ভালোবাসবে। শুধু আমাকে নয়।”
“পাহাড়কে ভালোবাসতে হবে কেন?”
“কারণ আমার জীবনের অনেকটা জুড়ে পাহাড়। আমার শৈশব, আমার ভয়, আমার আনন্দ, আমার স্বপ্ন,সবকিছুর সঙ্গে এই পাহাড় জড়িয়ে আছে। কেউ যদি আমাকে ভালোবাসে, অথচ আমার পৃথিবীটাকে ঘৃণা করে, তাহলে সে আসলে আমাকে কতটুকু ভালোবাসবে?”
আমি কোনো উত্তর খুঁজে পেলাম না।
হয়তো প্রথমবারের মতো বুঝতে পারলাম, কাউকে ভালোবাসার অর্থ শুধু তার হাত ধরা নয়; তার শেকড়ের প্রতি সম্মান দেখানোও।
সেদিন ফেরার পথে মায়া একটি বুনো ফুল তুলে আমার হাতে দিয়েছিল।
“এটা রাখুন।”
“কেন?”
“আপনার শহরে নিয়ে যাবেন। দেখবেন, শুকিয়ে গেলেও এর গন্ধ কিছুদিন থাকবে।”
আমি ফুলটি হাতে নিয়ে বললাম, “আর আপনি?”
মায়া অবাক হয়ে তাকাল।
“আমি কী?”
“আপনাকে কীভাবে নিয়ে যাব?”
সে এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর হেসে বলল, “মানুষকে ফুলের মতো তুলে নিয়ে যাওয়া যায় না, শহুরে বাবু।”
তারপর সে সামনে হাঁটতে শুরু করল।
আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার চলে যাওয়া দেখলাম।
আমার হাতে তখন একটি বুনো ফুল। আর বুকের ভেতর জন্ম নিচ্ছিল এমন এক অনুভূতি, যার নাম আমি জানতাম, কিন্তু স্বীকার করতে ভয় পাচ্ছিলাম।
মায়ার বাড়িটি ছিল পাহাড়ের ঢালে। কাঠ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি ছোট্ট ঘর। সামনে একটি উঠোন, পাশে কয়েকটি ফলের গাছ। বাড়ির পেছন দিয়ে সরু পথ নেমে গেছে একটি ছড়ার দিকে।
একদিন সে আমাকে তাদের বাড়িতে নিয়ে গেল। তার মা আমাকে হাসিমুখে স্বাগত জানালেন। মায়ার বাবা তখন বাইরে কাজে গিয়েছিলেন। ঘরের একপাশে কয়েকটি বই, একটি পুরোনো রেডিও, আর কাঠের তাকের ওপর যত্ন করে রাখা কিছু খাতা।
আমি খাতাগুলোর দিকে তাকাতেই মায়া বলল, “ওগুলো আমার লেখা।”
“পড়তে পারি?”
“না।”
“কেন?”
“কারণ এখনো কাউকে দেখানোর মতো হয়নি।”
আমি বললাম, “কোনো লেখাই প্রথম দিন দেখানোর মতো হয় না। তবু লিখতে হয়।”
মায়া মৃদু হেসে বলল, “আপনি কি সবকিছুর মধ্যেই উপদেশ খুঁজে পান?”
“না। কিছু কিছু মানুষের মধ্যে খুঁজে পাই।”
সে চোখ নামিয়ে ফেলল।
সেদিন দুপুরে তাদের সঙ্গে খাবার খেলাম। খুব সাধারণ খাবার, কিন্তু তাতে এমন এক আন্তরিকতা ছিল, যা শহরের অনেক দামি রেস্তোরাঁয়ও পাওয়া যায় না।
খাওয়ার পর মায়া আমাকে তাদের গ্রামের স্কুলটি দেখাতে নিয়ে গেল। ছোট্ট স্কুলঘর। কয়েকটি বেঞ্চ, একটি ব্ল্যাকবোর্ড, আর দেয়ালে শিশুদের আঁকা ছবি।
মায়া সেখানে ছোটদের পড়াত।
শিশুরা তাকে দেখেই ছুটে এল। কেউ তার হাত ধরল, কেউ ব্যাগ টানল, কেউ গল্প শোনাতে শুরু করল। মায়ার মুখে তখন যে হাসি দেখলাম, তা ঝরনার পানির চেয়েও স্বচ্ছ।
আমি দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম।
মায়া শুধু পাহাড়ের মেয়ে নয়। সে যেন এই ছোট জনপদের অনেক মানুষের স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
একটি ছোট ছেলে আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি আপুর বন্ধু?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ, বন্ধু।”
ছেলেটি মাথা নেড়ে বলল, “আপু সবাইকে সাহায্য করে। কিন্তু নিজের কষ্ট কাউকে বলে না।”
আমি ছেলেটির মাথায় হাত রাখলাম।
“তুমি জানো, আপুর কষ্ট কী?”
সে মাথা নাড়ল।
“জানি না। আপু শুধু হাসে।”
কথাটি শুনে আমার বুকের ভেতর কেমন একটা ব্যথা অনুভব করলাম।
মানুষের হাসির আড়ালে কত গল্প লুকিয়ে থাকে! আমরা বাইরে থেকে শুধু মুখ দেখি, ভেতরের অন্ধকার দেখতে পাই না।
সেদিন বিকেলে মায়ার সঙ্গে বাড়ি ফেরার সময় জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কি সব সময় এমন হাসিখুশি থাকো?”
মায়া বলল, “সব সময় কেউ হাসিখুশি থাকে না।”
“তাহলে?”
“কিছু কষ্ট আছে, যেগুলোকে প্রতিদিন একটু একটু করে বয়ে নিয়ে যেতে হয়। একসময় সেগুলোও জীবনের অংশ হয়ে যায়।”
“কীসের কষ্ট তোমার?”
সে হাঁটতে হাঁটতে বলল, “আমার স্বপ্নের।”
আমি থেমে গেলাম।
“স্বপ্নের আবার কষ্ট হয়?”
মায়া পেছন ফিরে তাকাল।
“যে স্বপ্ন পূরণ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যায়, তার কষ্ট হয় না?”
আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
“তোমার স্বপ্ন কী?”
“এই পাহাড়ের শিশুদের জন্য একটা ভালো পাঠাগার গড়তে চাই। এমন একটা জায়গা, যেখানে ওরা বই পড়বে, ছবি আঁকবে, নিজেদের স্বপ্নের কথা লিখবে। পাহাড়ের বাইরে পৃথিবীটা কত বড়, সেটা জানবে। কিন্তু নিজের পাহাড়কে ভুলে যাবে না।”
আমি বললাম, “এটা তো খুব সুন্দর স্বপ্ন।”
মায়া মৃদু হেসে বলল, “সুন্দর স্বপ্নের জন্য অনেক সময় আর সামর্থ্য লাগে।”
আমি বললাম, “সামর্থ্য না থাকলে তৈরি করতে হয়।”
সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি কি সত্যিই এমনটা বিশ্বাস করেন?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে একদিন আমার পাঠাগারটা দেখে যাবেন।”
আমি বললাম, “একদিন নয়। আমি তোমার পাঠাগার তৈরির দিনও দেখতে চাই।”
মায়া কিছু বলল না।
কিন্তু সেদিন প্রথমবার তার চোখে আমি এমন একটি আলো দেখেছিলাম, যা পাহাড়ের ওপরে সন্ধ্যার সূর্যাস্তের মতো সুন্দর।
দিনগুলো দ্রুত কেটে যাচ্ছিল। আমি ভেবেছিলাম, পাহাড়ে তিন-চার দিন কাটিয়ে ফিরে যাব। কিন্তু কখন যে এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেল, বুঝতেই পারিনি। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মনে হতো, আজ মায়ার সঙ্গে দেখা হবে তো?
তার সঙ্গে দেখা হলে মনে হতো, দিনটা সার্থক। একদিন মায়া আমাকে নিয়ে গেল একটি নির্জন পাহাড়ি পথে। সেখানে একটি পুরোনো গাছ ছিল। গাছটির নিচে বসে দূরের পাহাড় দেখা যেত। বাতাসে পাতার শব্দ হতো, আর মাঝে মাঝে মেঘ এসে চারপাশ ঢেকে দিত।
মায়া বলল, “এই জায়গাটা আমার খুব প্রিয়।”
“কেন?”
“যখন মন খারাপ হয়, এখানে এসে বসি। মনে হয়, পাহাড় আমাকে বুঝতে পারে।”
আমি বললাম, “মানুষের চেয়ে পাহাড়কে বেশি বিশ্বাস করো?”
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “মানুষ অনেক সময় কথা দিয়ে কথা রাখে না। পাহাড় কখনো প্রতিশ্রুতি দেয় না, তাই প্রতিশ্রুতি ভাঙার ভয়ও নেই।”
আমি বুঝলাম, তার কথার ভেতরে পুরোনো কোনো অভিমান লুকিয়ে আছে।
“কেউ কি তোমাকে কষ্ট দিয়েছে?”
সে মৃদু হেসে বলল, “সব কষ্টের পেছনে কোনো একজন মানুষ থাকে না। কিছু কষ্ট আসে পরিস্থিতি থেকে, কিছু আসে সময় থেকে।”
“আর কিছু আসে ভালোবাসা থেকে?”
মায়া আমার দিকে তাকাল।
“আপনি কি ভালোবাসায় বিশ্বাস করেন?”
“করি।”
“কেন?”
আমি একটু ভেবে বললাম, “কারণ পৃথিবীর এত নিষ্ঠুরতার পরও মানুষ কারও জন্য অপেক্ষা করে। কারও ফিরে আসার আশায় দরজা খোলা রাখে। কারও একটি ফোনের জন্য সারাদিন মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকে। এত কিছুর পরও মানুষ নতুন করে কাউকে বিশ্বাস করে। এই বিশ্বাসটুকুর নামই হয়তো ভালোবাসা।”
মায়া অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব আস্তে বলল, “আপনি কি কখনো কাউকে হারানোর ভয় পেয়েছেন?”
আমি উত্তর দিতে পারলাম না।
কারণ সেই মুহূর্তে আমি বুঝতে পারছিলাম, মায়াকে হারানোর ভয় আমার মধ্যে জন্ম নিচ্ছে।
অথচ তাকে পাওয়ার কোনো অধিকার এখনো আমার নেই।
আমরা পাশাপাশি বসে ছিলাম। দূরের পাহাড়ে মেঘ জমছিল। বাতাসে মায়ার চুল উড়ছিল। তার মুখে সূর্যের শেষ আলো এসে পড়েছিল।
আমার খুব ইচ্ছে করছিল, তার হাতটি ধরে বলি,মায়া, আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি।
কিন্তু বললাম না।
কিছু কথা মুখে আনার আগে মানুষ অনেক হিসাব করে। বয়স, দূরত্ব, সামাজিক বাস্তবতা, ভবিষ্যৎ, দায়িত্ব,সবকিছু সামনে এসে দাঁড়ায়।
আমি শহরের মানুষ। আমার জীবনে কাজ আছে, দায়িত্ব আছে, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা আছে। মায়ার জীবনে পাহাড় আছে, তার মানুষ আছে, তার স্বপ্ন আছে।
আমি কি তাকে আমার পৃথিবীতে নিয়ে যেতে চাই?
নাকি তার পৃথিবীতে নিজেকে একটু একটু করে জায়গা করে দিতে চাই?
সেদিন প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পাইনি।
শুধু ফেরার সময় মায়া বলেছিল, “কাল আসবেন?”
আমি বলেছিলাম, “আসব।”
সে বলেছিল, “মিথ্যা বলবেন না কিন্তু।”
আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম, “তোমাকে কথা দিলাম।”
সেদিন বুঝেছিলাম, সব প্রতিশ্রুতি মুখে বলা হয় না। কিছু প্রতিশ্রুতি মানুষের চোখের ভেতর লেখা থাকে।
আমার ফিরে যাওয়ার দিন ঘনিয়ে এল। ঢাকায় অফিসের কাজ জমে আছে। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং অপেক্ষা করছে। বারবার ফোন আসছে। আমি বুঝতে পারছিলাম, পাহাড়ে যত দিনই থাকি, শহর আমাকে আবার তার ব্যস্ততার মধ্যে টেনে নেবে। কিন্তু এবার ফিরে যাওয়ার কথা ভাবতেই বুকের ভেতর অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হচ্ছিল। মায়াকে এখনো কিছু বলা হয়নি। শেষ বিকেলে আমরা ঝরনার কাছে গেলাম। সেই প্রথম দেখা হওয়ার জায়গা। পানির শব্দ আগের মতোই, গাছের পাতায় আলো আগের মতোই, পাহাড়ের গায়ে মেঘও আগের মতোই ভেসে বেড়াচ্ছে।
শুধু আমার মনটা আর আগের মতো নেই।
মায়া একটি পাথরের ওপর বসে বলল, “আপনি কাল চলে যাচ্ছেন?”
“হ্যাঁ।”
“আবার আসবেন?”
আমি বললাম, “আসব।”
সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
“সবাই এমন কথা বলে।”
আমি তার দিকে তাকালাম।
“আমি সবাই নই, মায়া।”
সে মৃদু হেসে বলল, “সেটা সময় বলবে।”
আমি জানতাম, তার কথায় যুক্তি আছে। মানুষের পরিচয় কথায় নয়, কাজে তৈরি হয়। আমি ব্যাগ থেকে সেই শুকিয়ে যাওয়া বুনো ফুলটি বের করলাম, যেটি সে আমাকে প্রথম দিন দিয়েছিল। ফুলটির রং প্রায় হারিয়ে গেছে। পাপড়িগুলো নরম, ভঙ্গুর। মায়া অবাক হয়ে তাকাল।
“আপনি এটা এখনো রেখেছেন?”
“বলেছিলে, শহরে নিয়ে গেলে কিছুদিন গন্ধ থাকবে।”
“এখন তো শুকিয়ে গেছে।”
“সব শুকিয়ে যাওয়া জিনিসের সৌন্দর্য শেষ হয়ে যায় না।”
মায়া ফুলটির দিকে তাকিয়ে রইল।
আমি বললাম, “মায়া, একটা কথা বলব?”
“বলুন।”
“তোমার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার আগে ভাবতাম, পাহাড় আমাকে শান্তি দেয়। এখন বুঝতে পারছি, পাহাড়ের ভেতরে কিছু মানুষও থাকে, যারা পাহাড়ের মতোই গভীর।”
সে কোনো কথা বলল না। আমি আরও বললাম, “আমি জানি না, আমাদের ভবিষ্যৎ কী। জানি না, শহর আর পাহাড়ের দূরত্ব কতটা। কিন্তু আমি জানি, তোমার সঙ্গে কাটানো এই কয়েকটি দিন আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলোর মধ্যে থাকবে।”
মায়া মাথা নিচু করে রইল।
তারপর বলল, “আপনি কি আমাকে ভালোবাসেন?”
প্রশ্নটি শুনে আমার বুকের ভেতর যেন সব শব্দ থেমে গেল।
আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, “হ্যাঁ। ভালোবাসি।”
কথাটি বলার পর মনে হলো, বহুদিন ধরে বুকের ভেতর আটকে থাকা কোনো দরজা খুলে গেছে।
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর খুব আস্তে বলল, “আমি জানতাম।”
আমি অবাক হলাম।
“কীভাবে?”
সে মৃদু হাসল।
“আপনি যখন পাহাড়ের কথা বলেন, তখন পাহাড়ের দিকে তাকান। আর যখন আমার কথা বলেন, তখন আমার চোখের দিকে তাকান। মানুষ কোথায় তাকায়, তাতেই অনেক কথা বোঝা যায়।”
আমি হাসলাম।
“তাহলে তুমি?”
মায়া মুখ ফিরিয়ে দূরের ঝরনার দিকে তাকাল।
“আমারও আপনার জন্য মন খারাপ হবে।”
“শুধু মন খারাপ?”
সে এবার আমার দিকে তাকাল। চোখে জল চিকচিক করছিল।
“সব কথা কি প্রথম দিনেই বলতে হয়?”
আমি আর কিছু বললাম না।
সেদিন সন্ধ্যায় আমরা অনেকক্ষণ পাশাপাশি বসেছিলাম। কোনো প্রতিশ্রুতির ভার চাপিয়ে দিইনি একে অন্যের ওপর। শুধু বুঝেছিলাম, আমাদের দুজনের ভেতরেই একটি অদৃশ্য সেতু তৈরি হয়েছে।
যে সেতু দিয়ে মানুষ দূরত্ব পেরিয়ে একে অন্যের কাছে পৌঁছাতে পারে।
পরদিন সকালে যখন আমি পাহাড় ছেড়ে বেরিয়ে এলাম, মায়া আমাকে বিদায় জানাতে এসেছিল।
তার হাতে একটি ছোট খাম।
“ঢাকায় গিয়ে খুলবেন।”
আমি খামটি পকেটে রাখলাম। বাস চলতে শুরু করল। জানালার বাইরে পাহাড়গুলো ধীরে ধীরে পেছনে সরে যাচ্ছিল। মায়া রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার নীলচে সবুজ পোশাকটি সবুজ অরণ্যের মধ্যে ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছিল। একসময় আর তাকে দেখা গেল না। আমি খামটি খুললাম।
ভেতরে একটি কাগজ। তাতে লেখা,
“পাহাড়কে ভালোবাসেন বলেছিলেন। এবার দেখব, পাহাড়ের মেয়েটিকেও কতটা ভালোবাসতে পারেন। দূরত্বকে ভয় পাবেন না। তবে দূরত্বের অজুহাতে হারিয়ে যাবেন না। ,মায়া”
চিঠিটি বুকের কাছে ধরে জানালার বাইরে তাকালাম।
পাহাড় পেছনে পড়ে থাকলেও আমার মনে হচ্ছিল, আমি আসলে পাহাড় ছেড়ে যাচ্ছি না। পাহাড়ের একটি অংশ আমার সঙ্গে চলে এসেছে।
ঢাকায় ফিরে প্রথম কয়েক দিন সবকিছু আগের মতোই চলল।সকালে অফিস, দুপুরে মিটিং, সন্ধ্যায় কাজের চাপ। মানুষের ভিড়, গাড়ির হর্ন, রাস্তার ধুলো, ভবনের দেয়াল,সবকিছু পরিচিত।
কিন্তু আমার ভেতরে কিছু একটা বদলে গিয়েছিল। এখন কোনো মিটিংয়ের ফাঁকে জানালার বাইরে তাকালে পাহাড়ের কথা মনে পড়ত। চায়ের কাপে চুমুক দিলে ঝরনার পাশে বসে থাকা মায়ার মুখ ভেসে উঠত। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে মনে হতো, এই মুহূর্তে পাহাড়ে নিশ্চয়ই বাতাস বইছে, অরণ্যের পাতায় শব্দ হচ্ছে, আর মায়া হয়তো তার খাতায় কিছু লিখছে।
আমাদের নিয়মিত কথা হতো না। পাহাড়ে নেটওয়ার্কের সমস্যা, মায়ার পড়াশোনা, শিশুদের পড়ানো,সব মিলিয়ে সময় বের করা কঠিন ছিল।
তবু কখনো ছোট্ট একটি বার্তা আসত।
“আজ বৃষ্টি হয়েছে। পাহাড়ের গন্ধটা খুব সুন্দর।”
কখনো লিখতাম, “আজ ঢাকায় আকাশ মেঘলা। তোমার কথা মনে পড়ছে।”
কখনো সে একটি ফুলের ছবি পাঠাত। কখনো আমি শহরের আকাশের ছবি পাঠাতাম।
আমাদের কথাগুলো ছোট ছিল, কিন্তু সেই ছোট কথার ভেতরেই জমে উঠছিল অনেক না-বলা অনুভূতি।
এক রাতে মায়া আমাকে একটি কবিতা পাঠাল।
“যে মানুষ পাহাড়ে আসে,
সে কি শুধু পাহাড় দেখে?
নাকি কোনো অচেনা চোখে
নিজের হারানো পৃথিবী খুঁজে পায়?
যে মানুষ চলে যায়,
সে কি সত্যিই চলে যায়?
নাকি তার পায়ের নিচে
এক টুকরো পাহাড় রয়ে যায়?”
কবিতাটি পড়ে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলাম।
তারপর লিখলাম, “তুমি কি আমার জন্য লিখেছ?”
মায়া উত্তর দিল, “আপনি কি নিজের জন্য পড়েছেন?”
আমি হেসে ফেললাম।
তারপর লিখলাম, “মায়া, আমি আবার আসতে চাই।”
সে লিখল, “কবে?”
আমি বললাম, “খুব শিগগিরই।”
সে শুধু লিখল, “অপেক্ষায় থাকব।”
এই দুটি শব্দের মধ্যে কতটা ভালোবাসা থাকতে পারে, তা আগে জানতাম না। অফিসের কাজের মধ্যে আবার নিজেকে ডুবিয়ে দিলাম। কিন্তু এবার কাজ থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য পাহাড়ের কথা ভাবতাম না। বরং মনে হতো, এমন একটি ভবিষ্যৎ গড়তে হবে, যেখানে কাজ ও ভালোবাসা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হবে না। মায়ার স্বপ্নের কথা মনে পড়ত। একটি পাঠাগার। পাহাড়ের শিশুদের জন্য একটি ছোট্ট পাঠাগার, যেখানে তারা বই পড়বে, পৃথিবীকে জানবে, নিজেদের গল্প লিখবে।
আমি কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে কথা বললাম। বই সংগ্রহের উদ্যোগ নিলাম। কিছু পুরোনো বই, শিশুদের গল্প, বিজ্ঞানবিষয়ক বই, খাতা, পেনসিল,সব মিলিয়ে একটি তালিকা তৈরি করলাম।
মায়াকে কিছু বলিনি। আমি চেয়েছিলাম, ফিরে গিয়ে তাকে চমকে দেব।
তবে আমি এটাও বুঝতে পেরেছিলাম, ভালোবাসা মানে কারও স্বপ্নকে নিজের কৃতিত্ব বানানো নয়। মায়ার স্বপ্ন তার নিজের। আমি শুধু পাশে দাঁড়াতে চাই। এই পার্থক্যটুকু বুঝতে আমার অনেক সময় লেগেছিল।
প্রায় দুই মাস পর আবার পাহাড়ে গেলাম। এবার আর নিজের অস্থিরতা থেকে পালাতে নয়। এবার আমার যাওয়ার একটি নির্দিষ্ট কারণ ছিল। মায়াকে দেখতে চাই। তার স্বপ্নের পাশে দাঁড়াতে চাই।
বাস থেকে নেমে পাহাড়ি পথে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, সবকিছু যেন চেনা। অথচ প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি গাছ, প্রতিটি মেঘ নতুন করে আমাকে স্বাগত জানাচ্ছে। থুইসাপাড়ায় পৌঁছে প্রথমেই মায়াদের বাড়ির দিকে গেলাম। উঠোনে মায়ার মা বসে ছিলেন। আমাকে দেখে তিনি হাসলেন।
“তুমি এসেছ বাবা?”
আমি অবাক হলাম।
“আপনি আমাকে চিনতে পেরেছেন?”
তিনি হেসে বললেন, “মায়া তোমার কথা অনেক বলেছে।”
আমার মুখ লাল হয়ে গেল।
“মায়া কোথায়?”
“স্কুলে গেছে। একটু পর ফিরবে।”
আমি স্কুলের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম।
দূর থেকেই শিশুদের কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছিলাম। স্কুলঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই মায়া আমাকে দেখতে পেল। সে প্রথমে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
“আপনি এসেছেন!”
আমি হেসে বললাম, “কথা দিয়েছিলাম।”
মায়ার চোখে আনন্দের আলো ফুটে উঠল।
“আমি ভেবেছিলাম, আপনি হয়তো খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।”
“ব্যস্ততা আছে। কিন্তু কিছু মানুষকে দেখার জন্য সময় বের করতে হয়।”
সে কিছু বলল না। শুধু আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। সেদিন বিকেলে আমরা আবার সেই ঝরনার কাছে গেলাম। সবকিছু আগের মতোই ছিল। শুধু এবার আমাদের নীরবতার মধ্যে অস্বস্তি ছিল না। আমি তাকে বইয়ের বাক্সগুলোর কথা বললাম।
“তোমার পাঠাগারের জন্য কিছু বই এনেছি।”
মায়া প্রথমে বুঝতে পারল না।
“কী বই?”
“শিশুদের গল্প, বিজ্ঞান, কবিতা, ছবি আঁকার বই। আরও কিছু বই সংগ্রহ করছি। তুমি চাইলে আমরা তোমার পাঠাগারের কাজ শুরু করতে পারি।”
সে অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।
“আপনি সত্যি বলছেন?”
“হ্যাঁ।”
মায়ার চোখ ভিজে উঠল।
“আপনি আমার স্বপ্নের কথা মনে রেখেছেন?”
আমি বললাম, “তোমার স্বপ্ন শুধু তোমার নয়, মায়া। তুমি আমাকে সেই স্বপ্নের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছ।”
সে মাথা নিচু করে ফেলল। কিছুক্ষণ পর বলল, “আমি জানতাম না, কেউ আমার ছোট্ট স্বপ্নটাকে এত গুরুত্ব দেবে।” আমি তার পাশে দাঁড়িয়ে বললাম, “পাহাড়ের উচ্চতা দিয়ে তার সৌন্দর্য মাপা যায় না। মানুষের স্বপ্নও তেমন।” সেদিন আমরা অনেকক্ষণ কথা বলেছিলাম। পাঠাগার কোথায় হবে, কীভাবে বই রাখা হবে, শিশুরা কখন আসবে,সবকিছু নিয়ে পরিকল্পনা করলাম।
মায়ার চোখে তখন এমন উচ্ছ্বাস ছিল, যা আমি কোনো বড় প্রকল্পের সফলতা দেখেও অনুভব করিনি।
আমি বুঝলাম, জীবনে সব অর্জনের মূল্য এক নয়। কিছু অর্জন মানুষের কর্মজীবনকে বড় করে, আর কিছু অর্জন তার হৃদয়কে বড় করে।
সব গল্পের পথ মসৃণ হয় না। আমাদের গল্পেও একসময় কঠিন প্রশ্ন এসে দাঁড়াল।
আমি ঢাকায় থাকি। আমার কাজ, পরিবার, দায়িত্ব,সবকিছু শহরকে ঘিরে। মায়ার জীবন পাহাড়ে। তার পড়াশোনা, তার মানুষ, তার স্বপ্ন,সবকিছু এই জনপদের সঙ্গে জড়ানো। এক সন্ধ্যায় মায়া বলল, “আপনি কি কখনো ভেবেছেন, আমাদের ভবিষ্যৎ কেমন হবে?”
আমি তার দিকে তাকালাম।
“ভেবেছি।”
“কী ভেবেছেন?”
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
“আমরা দুজন দুটো আলাদা পৃথিবীতে বাস করি। কিন্তু তাই বলে আমাদের পৃথিবী দুটো কখনো মিলতে পারে না, এমন নয়।”
মায়া বলল, “আমি শহরে গিয়ে থাকতে পারব কি না জানি না। আমি পাহাড় ছেড়ে যেতে চাই না।”
আমি বললাম, “আমি তোমাকে পাহাড় ছেড়ে যেতে বলিনি।”
“কিন্তু আপনি তো ঢাকায় থাকেন।”
“হ্যাঁ। আমার কাজ আছে। দায়িত্ব আছে। কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে শুধু আমার সুবিধা দেখলে হবে না। তোমার স্বপ্নও দেখতে হবে।”
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল, “আমি ভয় পাই।”
“কিসের ভয়?”
“একদিন হয়তো আপনি বুঝতে পারবেন, পাহাড়ের এই মেয়েটি আপনার শহুরে জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছে না। তখন আপনার মনে হবে, ভুল মানুষকে ভালোবেসেছেন।”
আমি তার দিকে এগিয়ে গেলাম।
“মায়া, আমি তোমাকে আমার মতো করে বদলে দেওয়ার জন্য ভালোবাসিনি। তোমাকে তোমার মতো করেই ভালোবেসেছি।”
সে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
আমি বললাম, “আমাদের ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটা আজই জানি না। কিন্তু আমরা একসঙ্গে বসে পথ খুঁজতে পারি। তোমার পড়াশোনা শেষ হবে। তোমার পাঠাগার হবে। আমি আমার কাজ চালিয়ে যাব। সময় ও পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নেব। কোনো সিদ্ধান্তই তোমার স্বপ্নকে মুছে দিয়ে হবে না।”
মায়া ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলল, “আপনি জানেন, আমি কী চাই?”
“কী?”
“আমি চাই না, আপনি শুধু আমাকে ভালোবেসে পাহাড়ে আটকে থাকুন। আমি চাই, আপনি আপনার কাজ করুন, আপনার স্বপ্ন পূরণ করুন। কিন্তু ব্যস্ততার ভেতরেও যেন আমার জন্য একটু জায়গা থাকে।”
আমি তার হাতের দিকে তাকালাম।
“থাকবে।”
মায়া বলল, “আর আমি চাই, আপনি আমাকে কখনো করুণা করবেন না। আমি পাহাড়ের মেয়ে বলে আমার জীবনকে ছোট ভাববেন না। আমারও নিজের স্বপ্ন আছে, নিজের সিদ্ধান্ত আছে।”
আমি তার হাতটি আলতো করে ধরলাম।
“তোমাকে করুণা করার কোনো কারণ নেই। তুমি আমার কাছে সমান একজন মানুষ, মায়া। আমার ভালোবাসা তোমার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার জন্য নয়।”
সে আমার হাত শক্ত করে ধরল।
পাহাড়ের ওপর তখন সন্ধ্যা নেমেছে। দূরের বাড়িগুলোতে আলো জ্বলছে। বাতাসে অরণ্যের গন্ধ।
আমরা পাশাপাশি বসে রইলাম।
সেদিন বুঝেছিলাম, ভালোবাসা শুধু আবেগের নাম নয়। ভালোবাসা হলো দুটি মানুষের স্বাধীনতাকে সম্মান করে একসঙ্গে পথ চলার সাহস।
পরের কয়েক মাসে আমরা নিয়মিত যোগাযোগ রাখলাম। আমি ঢাকায় থেকে বই সংগ্রহ করতাম, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতাম। মায়া স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করত, শিশুদের তালিকা তৈরি করত, পাঠাগারের জন্য জায়গা ঠিক করত। কাজটা সহজ ছিল না। কখনো অর্থের সমস্যা, কখনো বই পরিবহনের অসুবিধা, কখনো জায়গা নিয়ে মতভেদ। কিন্তু মায়া হাল ছাড়েনি।
আমি বুঝতে পারতাম, তার ভেতরে পাহাড়ের মতো দৃঢ়তা আছে।
একদিন সে ফোনে বলল, “আমরা জায়গাটা ঠিক করেছি!”
আমি আনন্দে বলে উঠলাম, “সত্যি?”
“হ্যাঁ। স্কুলের পাশে একটি ছোট ঘর পাওয়া গেছে। কিছু মেরামত করতে হবে।”
“দারুণ! এবার কাজ শুরু করা যাবে।”
মায়া হেসে বলল, “আপনি কিন্তু উদ্বোধনের দিন আসবেন।”
আমি বললাম, “শুধু উদ্বোধনের দিন নয়, তার আগেও আসব।”
“দেখা যাবে।”
তারপর সে হেসে উঠল। আমি সেই হাসি শুনতে শুনতে জানালার বাইরে তাকালাম। ঢাকা শহরের আকাশে সেদিন কোনো তারা দেখা যাচ্ছিল না। তবু আমার মনে হচ্ছিল, পাহাড়ের ওপরে কোথাও একটি তারা জ্বলছে। অবশেষে সেই দিন এল।
ছোট্ট ঘরটি রং করা হয়েছে। দেয়ালে শিশুদের আঁকা ছবি। কাঠের তাকগুলোতে সাজানো বই। জানালার পাশে একটি টেবিল, কয়েকটি চেয়ার। দরজার ওপরে হাতে লেখা একটি নাম,
“মায়ার পাঠাগার”
আমি নামটি দেখে অবাক হয়ে গেলাম।
“তুমি নিজের নামে পাঠাগার করলে?”
মায়া হেসে বলল, “নামটা শিশুরা দিয়েছে। আমি তো অন্য নাম ভেবেছিলাম।”
“কী নাম?”
“সবুজ অরণ্য পাঠাগার।”
আমি বললাম, “দুটো নামের মধ্যে পার্থক্য কী?”
মায়া একটু ভেবে বলল, “সবুজ অরণ্য আমার পৃথিবী। আর মায়া তো সেই পৃথিবীরই একটা অংশ।”
উদ্বোধনের দিন ছোট ছোট শিশুরা নতুন বই হাতে নিয়ে আনন্দে চিৎকার করছিল। কেউ ছবির বই দেখছে, কেউ গল্প পড়ছে, কেউ আবার আমাকে ঘিরে প্রশ্ন করছে।
একটি ছোট মেয়ে আমার কাছে এসে বলল, “ভাইয়া, আপনি কি ঢাকা থেকে বই এনেছেন?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ।”
সে বইটি বুকের কাছে ধরে বলল, “আমি বড় হয়ে লেখক হব।”
আমি মুচকি হেসে বললাম, “তাহলে আজ থেকেই লেখা শুরু করো।”
মেয়েটি দৌড়ে মায়ার কাছে চলে গেল।
আমি দূরে দাঁড়িয়ে মায়াকে দেখছিলাম।
সে শিশুদের বই দিচ্ছে, তাদের সঙ্গে কথা বলছে, কারও মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। তার মুখে সেই পরিচিত হাসি। কিন্তু আজ সেই হাসির ভেতরে আরও কিছু আছে,অর্জনের আনন্দ, স্বপ্ন পূরণের তৃপ্তি, নিজের পৃথিবীকে একটু বড় করে তোলার গর্ব।
অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর মায়া আমার পাশে এসে দাঁড়াল।
“কেমন লাগল?”
আমি বললাম, “অসাধারণ।”
“শুধু অসাধারণ?”
“তোমার স্বপ্নের মতো সুন্দর।”
সে চোখ নামিয়ে হাসল।
তারপর বলল, “আপনি না এলে হয়তো এত তাড়াতাড়ি হতো না।”
আমি মাথা নেড়ে বললাম, “তুমি নিজেই করতে। হয়তো একটু বেশি সময় লাগত।”
মায়া বলল, “আপনি আমার পাশে ছিলেন। এটাই আমার কাছে অনেক।”
আমি তার দিকে তাকালাম।
“তুমি জানো, এই পাঠাগারের সবচেয়ে সুন্দর বিষয় কী?”
“কী?”
“এখানে শুধু বই রাখা হয়নি। এখানে তোমার স্বপ্নের একটা দরজা খুলেছে। এই শিশুরা সেই দরজা দিয়ে নিজেদের পৃথিবী খুঁজে নেবে।”
মায়া চুপ করে রইল।
তারপর বলল, “আর আপনি?”
“আমি?”
“আপনি কী খুঁজে পেয়েছেন?”
আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, “আমি আমার পৃথিবী খুঁজে পেয়েছি।”
মায়া আর কোনো কথা বলল না।
কিন্তু তার চোখে যে আলো দেখেছিলাম, তার কাছে পৃথিবীর সব ভাষা যেন হার মেনে যায়।
সময়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আরও গভীর হলো। আমরা ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতাম। কখনো মতের অমিল হতো, কখনো অভিমান জমত, কখনো দূরত্ব আমাদের দুজনকেই ক্লান্ত করে তুলত। কিন্তু আমরা কথা বলা বন্ধ করতাম না। আমি শিখেছিলাম, ভালোবাসা মানে সব সময় একমত হওয়া নয়। বরং মতের অমিলের মধ্যেও একে অন্যকে বোঝার চেষ্টা করা। মায়া শিখেছিল, শহরের ব্যস্ততা সব সময় অবহেলা নয়। কখনো কখনো দায়িত্বও ভালোবাসারই একটি রূপ।
আমরা একে অন্যের পৃথিবীকে চিনতে শুরু করেছিলাম।
আমি তাকে আমার শহরের বইয়ের দোকানে নিয়ে গিয়েছিলাম। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখেছিল কত বই, কত মানুষ, কত ব্যস্ততা। আমি তাকে নদীর ধারে নিয়ে গিয়েছিলাম। সে দীর্ঘক্ষণ পানির দিকে তাকিয়ে ছিল। মায়া বলেছিল, “নদীকে দেখলে মনে হয়, সে কোথাও থামে না। পাহাড়কে দেখলে মনে হয়, সে কোথাও যায় না। অথচ দুজনেরই নিজস্ব সৌন্দর্য আছে।”
আমি বলেছিলাম, “তাহলে আমরা কে?”
সে হেসে বলেছিল, “আপনি নদী, আমি পাহাড়।”
আমি বলেছিলাম, “তাহলে আমাদের দেখা হবে কোথায়?”
মায়া আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “যেখানে নদী পাহাড়ের কাছে এসে নিজের পথ খুঁজে নেয়।”
সেই কথাটি আমি ভুলিনি।
একদিন আবার পাহাড়ে ফিরে গেলাম। এবার আর পর্যটক হয়ে নয়, অচেনা পথের সন্ধানী হয়ে নয়। এবার ফিরে গেলাম এমন একটি জায়গায়, যেখানে আমার জন্য কেউ অপেক্ষা করে।
সন্ধ্যায় আমরা সেই পুরোনো গাছটির নিচে বসেছিলাম। সামনে দূরের পাহাড়, ওপরে মেঘের ভেলা, নিচে সবুজ অরণ্য।
মায়া বলল, “আপনার মনে আছে, প্রথম দিন আমি আপনাকে কী বলেছিলাম?”
“কী?”
“পাহাড়ের পথ চিনতে হলে পাহাড়কে ভালোবাসতে হয়।”
আমি হেসে বললাম, “মনে আছে।”
“এখন কি পথ চিনতে পারেন?”
আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম, “পথ চিনতে শিখেছি। তবে সব পথ এখনো চিনি না।”
“কেন?”
“কারণ তোমার সঙ্গে আরও অনেক পথ হাঁটা বাকি।”
মায়া মৃদু হাসল।
“আপনি জানেন, আমি কী চাই?”
আমি বললাম, “বলুন।”
“আমি চাই, একদিন এই পাহাড়ের প্রতিটি শিশু বই পড়তে শিখুক। মেয়েরা নিজেদের স্বপ্নের কথা বলতে ভয় না পাক। কেউ শুধু পাহাড়ে জন্মেছে বলে নিজেকে ছোট না ভাবুক।”
আমি তার কথা শুনছিলাম।
সে আরও বলল, “আমি চাই, আমাদের ভালোবাসা শুধু আমাদের দুজনের মধ্যে আটকে না থাকুক। আমাদের ভালোবাসা দিয়ে যদি আরও কয়েকটি শিশুর জীবনে আলো জ্বালাতে পারি, তাহলে সেটাই হবে সবচেয়ে বড় পাওয়া।”
আমি তার হাত ধরলাম।
“আমরা চেষ্টা করব।”
মায়া বলল, “সবকিছু কি আমরা পারব?”
আমি বললাম, “সবকিছু পারব কি না জানি না। কিন্তু চেষ্টা করার সময় একে অন্যের হাত ছেড়ে দেব না।”
সে আমার কাঁধে মাথা রাখল।
দূরে কোথাও পাখি ডাকছিল। সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছিল। পাহাড়ের গায়ে কুয়াশা নেমে আসছিল।
আমি মনে মনে ভাবলাম, মানুষের জীবনে কিছু জায়গা থাকে, যেখানে ফিরে গেলে নিজের ভেতরের সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে যায়। কিছু মানুষ থাকে, যাদের পাশে বসলে আর কিছু বলার প্রয়োজন হয় না।
মায়া আমার কাছে সেই জায়গা, সেই মানুষ।
আজও যখন শহরের ব্যস্ততা আমাকে ক্লান্ত করে তোলে, আমি জানালার পাশে দাঁড়াই। দূরে ভবনের সারি, গাড়ির শব্দ, মানুষের ছুটে চলা দেখি। কখনো মনে হয়, জীবনটা খুব দ্রুত চলে যাচ্ছে। আমরা এত কিছু অর্জন করতে চাই যে, বেঁচে থাকার ছোট ছোট আনন্দগুলোকে আর সময় দিতে পারি না। তখন আমার মনে পড়ে পাহাড়ের কথা।
মনে পড়ে, প্রথমবার একটি ঝরনার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির কথা। মনে পড়ে তার প্রশ্ন,“আপনি কি নিজেকে খুঁজতে এসেছেন?”
হ্যাঁ, আমি নিজেকে খুঁজতে গিয়েছিলাম।
কিন্তু ফিরে এসেছিলাম অন্য একজন মানুষ হয়ে।
মায়া আমাকে শিখিয়েছিল, প্রকৃতিকে ভালোবাসা মানে শুধু তার সৌন্দর্য উপভোগ করা নয়; তার মানুষদেরও ভালোবাসা। পাহাড়কে ভালোবাসা মানে শুধু মেঘে ঢাকা চূড়ার ছবি তোলা নয়; পাহাড়ের মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম আর জীবনকে সম্মান করা। সে আমাকে শিখিয়েছিল, ভালোবাসা মানে কাউকে নিজের কাছে বেঁধে রাখা নয়। ভালোবাসা মানে এমন একটি জায়গা তৈরি করা, যেখানে দুজন মানুষই স্বাধীনভাবে নিজেদের মতো করে বেড়ে উঠতে পারে।
আমাদের গল্পের শেষ কোথায়, তা আমি জানি না। হয়তো সামনে আরও অনেক পথ, আরও অনেক পরীক্ষা, আরও অনেক অনিশ্চয়তা অপেক্ষা করছে। কিন্তু আমি জানি, পাহাড়ের সেই ছোট্ট জনপদে একটি পাঠাগার আছে। সেখানে শিশুরা বই পড়ে, স্বপ্ন দেখে, নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলে। আর সেই পাঠাগারের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কোনো এক বিকেলে মায়া হয়তো দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চুলে বাতাস লাগে। অরণ্যের গন্ধ ভেসে আসে। আকাশের মেঘ পাহাড়ের গায়ে নেমে আসে ধীরে ধীরে।
আমি হয়তো তখন ঢাকায়, কোনো ব্যস্ত অফিসে বসে কাজ করছি। সামনে কম্পিউটারের পর্দা, টেবিলে ফাইল, ফোনে একের পর এক বার্তা।
হঠাৎ মোবাইলের পর্দায় একটি ছোট্ট বার্তা ভেসে উঠবে।
“আজ পাহাড়ে খুব সুন্দর মেঘ হয়েছে। আপনি থাকলে ভালো লাগত।”
আমি হয়তো জানালার বাইরে তাকিয়ে মৃদু হাসব।
তারপর লিখব,
“পাহাড়ে না থাকলেও আমার মন তো তোমার কাছেই পড়ে আছে।”
মায়া হয়তো উত্তর দেবে,
“তাহলে মনটাকে একদিন নিয়ে আসুন। অনেক দিন পাহাড় দেখা হয় না আপনার।”
আমি জানি, আমি আবার যাব।
কারণ সবুজ অরণ্য আর পাহাড়ে আমার মন আটকে থাকে। সুযোগ পেলেই আমি চলে যাই প্রকৃতির সান্নিধ্যে।
তবে এখন আর শুধু প্রকৃতির কাছে যাই না।
আমি যাই সেই মেয়েটির কাছে, যে আমাকে শিখিয়েছে,পাহাড়ের মতো ভালোবাসতে হলে গভীর হতে হয়, নদীর মতো ভালোবাসতে হলে চলতে জানতে হয়, আর আকাশের মতো ভালোবাসতে হলে কাউকে নিজের ভেতরে জায়গা দিয়েও তাকে মুক্ত রাখতে হয়। মায়া আমার জীবনে আসার আগে পাহাড় ছিল আমার আশ্রয়। মায়া আসার পর পাহাড় হয়ে উঠেছে আমার ভালোবাসার ঠিকানা। আর সেই ঠিকানার নাম, পাহাড়ী মেয়ে।