Story

মুখোশের আড়ালে

November 2, 2026

5 views

অফিসের কাচঘেরা বিশতম তলার কনফারেন্স রুম থেকে নিচের ঢাকাকে দেখলে মনে হয় কোনো উন্মাদ শিল্পীর আঁকা বিমূর্ত ক্যানভাস। শত শত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গাড়ি, আলো-ছায়ার নিরন্তর সংঘর্ষ, আর গন্তব্যহীন মানুষের অবিশ্রান্ত স্রোত। সেই কাচের জানালায় নিজের অস্পষ্ট প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে ছিলেন আরহাম চৌধুরী। পঁয়ত্রিশ বছর বয়সেই একটি শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক ফিনটেক কোম্পানির হেড অব স্ট্র্যাটেজি। ফিটফাট চারকোল-গ্রে স্যুট, কবজিতে ওমেগা ঘড়ি, চোখে সরু ফ্রেমের অভিজাত চশমা, আর মুখে ঝুলিয়ে রাখা এক চিরায়ত শান্ত, আত্মবিশ্বাসী ও ঈর্ষনীয় হাসি। কারপোরেট দুনিয়ায় এই হাসির একটা নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড ভ্যালু আছে। যাকে দেখে বোর্ডের ডিরেক্টররা নিশ্চিন্ত হন, জুনিয়ররা সম্ভ্রমে মাথা নোয়ায়, আর প্রতিদ্বন্দ্বীরা নিজেদের অজান্তেই কিছুটা পিছিয়ে যায়। কিন্তু কাচের ওপারে তাকিয়ে আরহাম খুব ভালো করেই জানতেন, এই প্রতিবিম্বটা আসলে একটা নিখুঁত কারিগরিতে তৈরি ফাইবারগ্লাসের বর্ম।

ভেতরে যে মানুষটা বাস করে, সে প্রতিদিন একটু একটু করে দমবন্ধ হয়ে মারা যাচ্ছে। আজকের বোর্ড মিটিংয়ে তিনি একটি মাল্টি-মিলিয়ন ডলারের প্রজেক্টের ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরেছেন। নিখুঁত স্লাইড, জটিল ডেটা অ্যানালিটিক্স, আর সম্মোহনী বাচনভঙ্গি দিয়ে তিনি পুরো অডিটোরিয়ামকে মাতিয়ে রেখেছিলেন। হাততালি যখন থামল, তখন চিফ অপারেটিং অফিসার ইকবাল সাহেব পিঠ চাপড়ে বললেন, "ইউ আর আ জেনিয়াস, আরহাম! তোমার ঠান্ডা মাথা আর যেকোনো সংকট সামলানোর ক্ষমতা দেখে মাঝে মাঝে হিংসা হয়।"

আরহাম তখন তাঁর ট্রেডমার্ক পরিমিত হাসিটি উপহার দিয়ে বলেছিলেন, "ইটস অল অ্যাবাউট প্রিপারেশন, স্যার। ইমোশনকে টেবিলের বাইরে রাখতে পারলে সমাধান সবসময় সহজ।"

মিথ্যা। ডাহা মিথ্যা। টেবিলের বাইরে রাখা দূরে থাক, ঠিক সেই মুহূর্তটিতেও আরহামের চোয়ালের পেশি প্রচণ্ড শক্ত হয়ে ছিল। বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা লাফাচ্ছিল কোনো অবাধ্য খাঁচাবন্দি পশুর মতো। হাতের তালু ঘেমে ভিজে উঠছিল, যা তিনি অতি সন্তর্পণে স্যুট প্যান্টের পকেটে রাখা লিনেন রুমালে মুছে নিয়েছিলেন। কিন্তু কেউ তা টের পায়নি। আরহাম চৌধুরী কারও সামনে দুর্বল হতে পারেন না। দুর্বলতা এই শহরের সবচেয়ে বড় অপরাধ, আর আরহাম সেই অপরাধের জন্য কোনো মাশুল দিতে রাজি নন।

সন্ধ্যা সাতটায় আরহাম লিফটে নিচে নামলেন। পার্কিং লটে তাঁর অডি এ৪ অপেক্ষা করছে। চালক রহিমকে তিনি আগেই ছুটি দিয়ে দিয়েছেন। একা ড্রাইভ করাটা তাঁর এক ধরনের থেরাপি, আবার একই সাথে এক নির্মম আত্মদংশন।

গুলশানের এক অভিজাত রেস্তোরাঁয় আজ তাঁর ডিনার অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে মেহরিনের সাথে। মেহরিন,প্রখ্যাত কর্পোরেট আইনজীবী। পারিবারিক সূত্রে পরিচয়, ধীরে ধীরে যা একধরনের সামাজিক বোঝাপড়ায় রূপ নিয়েছে। যাকে বিয়ের মাধ্যমে দুই অভিজাত পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থানের এক চমৎকার ব্যালান্স শিট তৈরি হতে পারে। মেহরিন সুন্দরী, বুদ্ধিমতী এবং আরহামের মতোই নিজের অনুভূতিগুলোকে স্যুটের ভেতরের ড্রাগন বানিয়ে রাখতে সিদ্ধহস্ত।

রেস্তোরাঁর মোমবাতির আলোয় মেহরিনের চোখে আলো পড়ছিল। সে এক চুমুক রেড ওয়াইন নিয়ে বলল, "আজ তো শুনলাম তোমার প্রেজেন্টেশন নাকি বোর্ডের সবাইকে ইমপ্রেস করেছে। কংগ্রাচুলেশনস, আরহাম।"

"থ্যাংক ইউ, মেহরিন। সবই নিয়মিত কাজের অংশ," আরহাম কাঁটাচামচে স্যামন মাছের টুকরোটা কেটে নিলেন। তাঁর চালচলনে সামান্যতম অপচয় বা অপ্রস্তুত ভাব নেই।

"তুমি কি কখনো ক্লান্ত হও না?" মেহরিন হঠাৎ চোখ তুলে তাকাল। চোখ দুটো তীক্ষ্ণ, যেন আরহামের চামড়া ভেদ করে ভেতরের কাঠামোটা মাপতে চাইছে।

আরহাম চামচটা প্লেটের প্রান্তে রাখলেন, কোনো শব্দ হলো না। "ক্লান্তি তো একটা সাইকোলজিক্যাল স্টেট, মেহরিন। লক্ষ্য স্থির থাকলে ক্লান্তির সুযোগ থাকে না।"

মেহরিন মৃদু হাসল। সেই হাসিতে এক টুকরো ক্লান্তি নিজেই ছিল। "মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা দুজন মানুষের চেয়ে বেশি দুটো রেজুমে। সবকিছু পারফেক্ট, কিন্তু কোথাও কোনো ঘ্রাণ নেই, কোনো ধুলোবালি নেই। যেন সব সময় ক্যামেরার সামনে আছি।"

আরহামের বুকের ভেতর একটা কাঁপুনি দিয়ে উঠল। মেহরিন কি কিছু টের পেয়েছে? সে কি বুঝতে পারছে আরহামের এই কৃত্রিম কাঠামোর নিচে জমতে থাকা কাদার স্তূপ? মুখে কিন্তু তিনি সেই হাসিটাই বজায় রাখলেন, "তুমি কি আনহ্যাপি?"

"না, অসন্তুষ্ট নই। বরং সন্তুষ্ট থাকার নিখুঁত অভিনয় করতে করতে এতটাই ক্লান্ত যে, দুঃখ পাওয়ার মতো এনার্জিও অবশিষ্ট নেই," মেহরিন ন্যাপকিন দিয়ে মুখ মুছল। "আজ উঠি আরহাম? কাল সকালে একটা আর্ভিট্রেশন হিয়ারিং আছে।"

"অবশ্যই। চলো তোমাকে ড্রপ করে দিই।"

মেহরিনকে ধানমণ্ডির বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে আরহাম যখন বারিধারার নিজের পেন্টহাউসে ফিরলেন, তখন ঘড়িতে রাত এগারোটা। এই বিশাল চার হাজার স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটে কোনো দ্বিতীয় মানুষের অস্তিত্ব নেই। ইতালি থেকে আনা মার্বেল মেঝে, মিনিমালিস্টিক ফার্নিচার, নিঃশব্দ সেন্ট্রাল এয়ার কন্ডিশনার। লাইট না জ্বালিয়েই তিনি লিভিং রুমে এসে দাঁড়ালেন। অন্ধকার এখানে কোনো হুমকি নয়, বরং অন্ধকারের মধ্যেই কেবল তিনি নিজের আসল চামড়াটা ফিরে পান।

তিনি টাইয়ের নটটা আলগা করলেন। গলার কাছে বোতামটা খুলতেই যেন ফুসফুস পুরো বাতাসটুকু বুক ভরে টেনে নিতে পারল। চশমাটা টেবিলের ওপর ছুড়ে ফেললেন। জুতো-মোজা খুলে ফেলে কার্পেটের ওপর বসলেন হাঁটু মুড়ে।

হঠাৎ করেই তাঁর কানের কাছে একটা মৃদু শিস দেওয়ার মতো শব্দ বাজতে শুরু করল। টিনিটাস? নাকি তাঁর মাথার ভেতরের কোনো ভাঙন?

টেবিলের ওপর রাখা ছোট ডিজিটাল ভয়েস রেকর্ডারটা তিনি তুলে নিলেন। আজ থেকে চার মাস আগে ড. সায়ন্তনের কাছে তিনি শেষবারের মতো গিয়েছিলেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় সাইকিয়াট্রিস্ট। অত্যন্ত গোপনীয়তায় তিনি সেশন নিতেন, কারণ সমাজে জানাজানি হলে আরহামের মতো মানুষের ইমেজ এক ধাক্কায় ধসে পড়বে।

রেকর্ডারের প্লে বাটনটা চাপলেন আরহাম। ড. সায়ন্তনের ভারী, শান্ত কণ্ঠস্বর অন্ধকার ঘরে ভেসে উঠল:"আরহাম, আপনি যে পারসোনার কথা বলছেন, মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে কার্ল ইয়ুং বলেছিলেন 'পারসোনা',যা আমরা সমাজের কাছে প্রদর্শন করি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আপনি আপনার 'শ্যাডো' বা অন্ধকার সত্তাকে এতটাই অস্বীকার করছেন যে, পারসোনাটাই এখন আপনার আসল পরিচয়কে গিলে খেয়েছে। আপনি সফল হতে গিয়ে মানুষ হওয়াটা বন্ধ করে দিয়েছেন। যেদিন এই মুখোশটা আর চাপ নিতে পারবে না, সেদিন ধস নামবে।"

রেকর্ডারে আরহামের নিজের কণ্ঠ শোনা গেল:"কিন্তু ডাক্তার, মুখোশ ছাড়া তো আমি শূন্য। এই মুখোশটাই তো আমার ডিগ্রি, আমার পদবি, আমার ব্যাংক ব্যালান্স, আমার সামাজিক মর্যাদা। এটা খুলে ফেললে তো সেখানে শুধু একটা ভয়ার্ত, ইনসিকিওর বালক বসে থাকবে, যার বাবা সারাজীবন বলত,'ফার্স্ট না হতে পারলে বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই।' আমি সেই বালকটাকে ঘৃণা করি।"

ড. সায়ন্তনের কণ্ঠ:"আপনি বালকটাকে ঘৃণা করেন না আরহাম, আপনি বালকটাকে কবর দিয়ে তার ওপর অট্টালিকা বানিয়েছেন। আর সেই কবরের মাটি এখন আলগা হয়ে যাচ্ছে।"

আরহাম স্টপ বাটন চাপলেন। ঘর আবার ভারী নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল।

তিনি উঠে দাঁড়ালেন। বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেলেন। মাস্টার বাথরুমের বড় ফুল-লেন্থ বেলজিয়াম গ্লাসের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সুইচ টিপলেন। ওপর থেকে চোখ ধাঁধানো সাদা হ্যালোজেন লাইট জ্বলে উঠল।

আয়নার ভেতরের প্রতিবিম্বটা আরহামকে দেখছে। আরহাম সেই চোখের দিকে তাকালেন। নিখুঁত ট্রিম করা দাড়ি, চকচকে চামড়া। কিন্তু চোখের গভীরে? সেখানে এক অসীম শূন্যতা। কোনো আনন্দ নেই, বিষাদ নেই, রাগ নেই,যেন বছরের পর বছর জমে থাকা শীতল বরফের মরুভূমি।

"তুমি কে?" আরহাম আয়নার মানুষটাকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন।

আয়নার মানুষটা কোনো উত্তর দিল না, শুধু স্থির চোখে তাকিয়ে রইল। আরহাম বেসিনে দুই হাত চেপে ধরলেন। তাঁর বুকের স্পন্দন আবার বেড়ে গেছে। কান দুটো ঝাঁ ঝাঁ করছে। শৈশবের সেই ভয়ংকর স্মৃতিগুলো একে একে উঠে আসছে।

ক্লাস সেভেনের রেজাল্ট ডে। আরহাম ক্লাসে দ্বিতীয় হয়েছিল, শতকরা পঁচানব্বই নম্বর পেয়ে। বাড়িতে ফেরার পর বাবা রেজাল্ট শিটটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলেছিলেন, "পঁচানব্বই পেয়ে কী লাভ হলো? রায়হান তো আটানব্বই পেয়েছে! তুমি সেকেন্ড হয়েছ মানে তুমি পরাজিত। আমার বংশে কোনো দ্বিতীয় হওয়ার জায়গা নেই।"

সেই রাতে বারো বছরের আরহাম নিজের ঘরে একা একা কেঁদেছিল। কিন্তু পরের দিন সকালে চোখ মুছে সে প্রতিজ্ঞা করেছিল,সে আর কখনো কাঁদবে না। সে এমন একজন মানুষ হয়ে উঠবে, যার কোনো খামতি থাকবে না। যে কখনোই দ্বিতীয় হবে না। যে কখনো ভুল করবে না। সেই প্রতিজ্ঞাই তাকে আজকের এই আরহাম চৌধুরী বানিয়েছে। সে নিজের কান্নাকে হত্যা করেছে, নিজের দুর্বলতাকে শিকল দিয়ে বেঁধেছে, নিজের ভয়কে কর্পোরেট সাফল্যের চাদরে ঢেকে দিয়েছে। কিন্তু এখন? এখন যখন সে চূড়ায় পৌঁছে গেছে, তখন চারপাশটা এত ফাঁকা কেন?

হঠাৎ আয়নার ভেতরের প্রতিবিম্বটার ঠোঁটের কোণে যেন এক নির্মম, বক্র হাসি ফুটে উঠল।

আরহাম চমকে উঠলেন। তিনি নিজে তো হাসছেন না! তবে আয়নার মানুষটা হাসছে কেন?

"কী ভাবছ আরহাম?" যেন একটা অশরীরী কণ্ঠ বাথরুমের টাইলসে প্রতিধ্বনিত হলো। "তুমি আমাকে খুলে ফেলতে চাও? তোমার সাহস আছে?"

আরহাম এক পা পিছিয়ে গেলেন। মাথাটা ঘুরছে। অবাস্তব হ্যালুসিনেশন? নাকি তাঁর অবদমিত অবচেতন মনের বিদ্রোহ?

"তুমি তো কেউ নও," আরহাম কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন। "তুমি শুধু আমার চামড়া। আমি যা নিয়ন্ত্রণ করি, তুমি তা-ই।"

আয়নার অবয়বটি যেন মাথা নাড়ল। "না, উল্টোটা। আমিই এখন মালিক। এই শহরে তুমি যে আরহাম চৌধুরী হয়ে হাঁটো, সেটা আমি। মানুষ আমাকে সম্মান করে, আমাকে ঈর্ষা করে। আর তুমি? তুমি তো সেই ভীতু, রক্তাক্ত কিশোর, যে এখনও বাবার ভর্ৎসনার ভয়ে খাটের নিচে লুকিয়ে কাঁদে। যদি তুমি তোমার আসল চেহারাটা ওদের সামনে আনো, জানো কী হবে? ইকবাল সাহেব এক মুহূর্তে তোমাকে ছাঁটাই করবে। মেহরিন করুণার চোখে তাকিয়ে বলবে,'আই অ্যাম সরি'। তোমার অধীনস্থরা তোমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে।"

"না!" আরহাম চিৎকার করে উঠলেন। তাঁর হাত দিয়ে কপাল চেপে ধরলেন। ঘাম গড়িয়ে পড়ছে চোখের ভেতর।

"হ্যাঁ আরহাম," প্রতিবিম্বের কণ্ঠ আরও ধারালো হয়ে উঠল। "তুমি আমাকে ছাড়া কিছুই নও। তুমি যদি এই মুখোশটা ছুড়ে ফেলতে চাও, তোমাকে নিজেকেই ছুড়ে ফেলতে হবে। তুমি সারা জীবন ধরে এই পুতুলটাই বানিয়েছ, এখন সেই পুতুলই তোমার নিয়ন্তা।"

আরহামের বুকের ভেতরে এক আদিম আক্রোশ জেগে উঠল। দীর্ঘ তিরিশ বছর ধরে যে ক্রোধ, যে কান্না, যে অপমানের বোঝা তিনি চেপে রেখেছেন, তা এক প্রবল আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে বের হতে চাইল। তিনি এই নিখুঁত, অনুভূতিহীন, রোবটের মতো আরহাম চৌধুরীকে আর সহ্য করতে পারছেন না। এই মুখোশটা তাঁর মুখে আঠার মতো সেঁটে গেছে, তাঁর চামড়া ছিঁড়ে ফেলছে।

"আমি তোমাকে শেষ করব!"

আরহাম মার্বেলের টপ থেকে ভারি স্ফটিকের তৈরি পারফিউমের বোতলটা তুলে নিলেন। কোনো দ্বিধা ছাড়া, সর্বশক্তি দিয়ে তিনি বোতলটা ছুড়ে মারলেন আয়নার কেন্দ্রবিন্দু লক্ষ্য করে।

প্রচণ্ড শব্দে কাচ চুরমার হয়ে গেল।

ঝনঝন শব্দে ভাঙা কাচের শত শত টুকরো ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। বোতলটা আঘাত করার জায়গায় একটা মাকড়সার জালের মতো ফাটল তৈরি হলো, আর বাকি কাচগুলো খসে পড়ল বাথরুমের সাদা মেঝের ওপর।

শব্দটা মিলিয়ে যাওয়ার পর বাথরুমে কেবল আরহামের দ্রুত শ্বাসের শব্দ শোনা গেল।

তিনি হাঁপাচ্ছেন। হাত কাঁপছে। ডান হাতের আঙুলের ডগায় সামান্য কেটে গেছে, ফোঁটা ফোঁটা তাজা লাল রক্ত পড়ছে সাদা মার্বেলের ওপর।আরহাম কাচের টুকরোগুলোর দিকে তাকালেন। ভাঙা কাচের প্রতিটি ছোট ছোট অংশে এখন তাঁর মুখের শত শত খণ্ডচিত্র প্রতিফলিত হচ্ছে। কোনোটাতে কেবল তাঁর বিস্ফারিত চোখ, কোনোটাতে তাঁর রক্তাক্ত আঙুল, কোনোটাতে তাঁর ঘর্মাক্ত কপাল। একটি নিখুঁত মানুষ এখন শত শত ভাঙা অংশে বিভক্ত।

তিনি মেঝেতে বসে পড়লেন। রক্তের গন্ধ আর দামি পারফিউমের গন্ধ মিশে এক অদ্ভুত মাদকতাময় পরিবেশ তৈরি করেছে। ডান হাতের সেই ক্ষতের দিকে তিনি তাকিয়ে রইলেন ব্যথা করছে। তীব্র এক শারীরিক ব্যথা। আর সেই ব্যথার সাথে সাথেই আরহামের চোখের কোণ দিয়ে কিছু একটা গড়িয়ে পড়ল। তিনি নিজের গাল স্পর্শ করলেন। ভিজে গেছে।

তিনি কাঁদছেন। দীর্ঘ তেইশ বছর পর, আরহাম চৌধুরী নামের এই বরফমানব প্রথমবারের মতো নিঃশব্দে কাঁদছেন। সেই কান্নায় কোনো পরাজয় ছিল না, কোনো লজ্জা ছিল না। ছিল এক অপরিসীম মুক্তির স্বাদ। তিনি কাঁদলেন তাঁর ফেলে আসা শৈশবের জন্য, সেই অবহেলিত কিশোরটির জন্য যাকে তিনি নিজের ভেতরে খুন করেছিলেন, আর সেই হাজারটা দিনের জন্য যেখানে তিনি নিজের নিঃশ্বাস বন্ধ করে রেখেছিলেন কেবল সমাজের হাততালি পাওয়ার লোভে।

রক্ত আর চোখের জল একাকার হয়ে গেল। কিন্তু আরহামের মনে হলো, এত হালকা তিনি তাঁর জীবনে কখনো অনুভব করেননি। কাঁধের ওপর থেকে যেন শত টনের এক অদৃশ্য ইস্পাতের বোঝা চিরতরে নেমে গেছে।

পরদিন সকালে। অফিসের বিশাল কনফারেন্স রুমে আবার জরুরি বোর্ড মিটিং। নতুন বিনিয়োগকারীদের সামনে প্রেজেন্টেশন দিতে হবে। সবাই অপেক্ষা করছে আরহাম চৌধুরীর জন্য। ঘড়ির কাঁটা দশটা ছুঁয়েছে।

কনফারেন্স রুমের ভারী ওক কাঠের দরজাটা খুলে গেল। ভেতরে প্রবেশ করলেন আরহাম। কিন্তু আজকের আরহামকে দেখে টেবিলে বসে থাকা ডিরেক্টররা মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন।

তিনি স্যুট পরে আসেননি। তাঁর গায়ে একটি সাধারণ ধূসর ক্যাজুয়াল শার্ট, গলায় কোনো টাই নেই। চোখের নিচে বিনিদ্র রাতের স্পষ্ট ছাপ, আর ডান হাতের তর্জনীতে সাদা ব্যান্ডেজ প্যাঁচানো। সবচেয়ে বড় কথা, তাঁর মুখে সেই বহু পরিচিত, মেকি আর কৃত্রিম আত্মবিশ্বাসের ‘ব্র্যান্ডেড’ হাসিটা নেই। তাঁর মুখ শান্ত, গভীর এবং অসম্ভব মানবিক।

ইকবাল সাহেব ভ্রু কুঁচকে তাকালেন, "আরহাম? এনিথিং রং? তোমার এই হাল কেন?"

আরহাম তাঁর ল্যাপটপটা টেবিলের ওপর রাখলেন। প্রজেক্টরের সুইচ অন করলেন না। তিনি সোজাসুজি ডিরেক্টরদের চোখের দিকে তাকালেন। কোনো কুঁকড়ে যাওয়া নেই, কোনো লুকোচুরি নেই।

"নাথিং ইজ রং, ইকবাল সাহেব। বরং প্রথমবারের মতো সবকিছু ঠিক আছে," আরহামের গলা সামান্য ভারী শোনাল, তবে সেখানে ছিল এক অদ্ভুত দৃঢ়তা।

"মানে?" একজন ডিরেক্টর প্রশ্ন করলেন। "আজকের প্রেজেন্টেশনটা তো,"

"প্রেজেন্টেশনটা তৈরি আছে। তবে তার আগে একটা কথা বলে নেওয়া ভালো," আরহাম শান্তভাবে নিজের চেয়ারে বসলেন। "গত তিন বছরে আমরা যে লক্ষ্যগুলো নির্ধারণ করেছিলাম, তার মধ্যে দুটো বড় প্রজেক্টে বিশাল কিছু কাঠামোগত ত্রুটি আছে। আমরা এতদিন সাফল্যের যে রঙিন গ্রাফ দেখিয়েছি, তার নিচে বড় একটা ঝুঁকি চেপে রাখা হয়েছিল। কারণ আমরা ভয় পেতাম, দুর্বলতা দেখালে আমাদের পারফেকশন নষ্ট হয়ে যাবে।"

পুরো রুমে পিনপতন নীরবতা নেমে এল। সবাই স্তম্ভিত। করপোরেট সংস্কৃতিতে নিজের ত্রুটি এভাবে সরাসরি স্বীকার করা আত্মহত্যার শামিল। ইকবাল সাহেব রেগে গিয়ে বলতে চাইলেন, "তুমি কী বলছ এসব আরহাম? এটা তো আমাদের শেয়ার মার্কেটে বড় ধাক্কা দেবে!"

"ধাক্কা দেবে, কিন্তু ধ্বংস করবে না," আরহাম অবিচল চোখে তাকালেন। "মিথ্যা দিয়ে তৈরি সৌধ বেশিদিন টিকে থাকে না। ত্রুটিগুলো শুধরে নতুন করে শুরু করার ব্লুপ্রিন্ট আমার কাছে আছে। তবে সেটা নিখুঁত কোনো রূপকথা নয়, তাতে ঘাম থাকবে, রক্ত থাকবে এবং সময় লাগবে। আপনারা চাইলে আমাকে এই মুহূর্তেই টার্মিনেট করতে পারেন। কিন্তু আমি আর কোনো বানানো সাফল্যের মুখোশ পরে এই টেবিলে বসব না।"

সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগল। কেউ কথা খুঁজে পাচ্ছিল না। আরহামের ঠোঁটের কোণে এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল। এটা সেই পুরোনো মেকি হাসি নয়। এটা এক খাঁটি, মুক্তির হাসি। যে মানুষ নিজের ধ্বংসকে দেখে ফেলেছে, তাকে আর কোনো চাকরিচ্যুতি বা সামাজিক অপমানের ভয় দেখিয়ে নতজানু করা যায় না।

মিটিং শেষে আরহাম করিডোর দিয়ে হেঁটে তাঁর কিউবিকলের দিকে এগিয়ে গেলেন। কাচের বড় জানালাটা দিয়ে বাইরের রোদ এসে পড়েছে করিডোরের মেঝের ওপর।

জানালায় আবার তাঁর প্রতিবিম্ব ফুটে উঠল। এবার আরহাম আর চোখ ফিরিয়ে নিলেন না। তিনি সেই প্রতিবিম্বের দিকে সরাসরি তাকালেন। চশমাহীন চোখ, এলোমেলো চুল, কপালে ক্লান্তির বলিরেখা। নিখুঁত নয়, কোনো বিজ্ঞাপনের মডেলের মতো নয়,বরং ক্ষতবিক্ষত এক বাস্তবের মানুষ।

কিন্তু সেই মানুষটির চোখ দুটো এখন জীবন্ত। সে আর কোনো মুখোশধারীর ক্রীতদাস নয়। সে একজন মানুষ, যে অবশেষে নিজের সাথে দেখা করার সাহস সঞ্চয় করেছে। আরহাম জানালার কাচে নিজের হাত রাখলেন। কাচটা এখন আর বরফের মতো ঠান্ডা ঠেকল না; দুপুরের নরম রোদে তা এখন একমুঠো উষ্ণতায় ভরে উঠেছে।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login