শ্রীধাম চন্দ্র সরকার
বিশাল একটা সুন্দর গ্রাম। সেখানে বেশ কিছু বাড়ি আছে। গ্রামটির চারপাশে জমি আর কিছু ফলের গাছ ও বাঁশ ঝাড় আছে। সুন্দর গ্রামটির ঠিক পূর্ব পাশে, এক কিলোমিটার দূরে, একটা খাড়ি আছে। সুন্দর গ্রামের লোকজন পূর্ব দিকে খাড়ির পাথারে জমি চাষ করত। কিন্তু পাখার দূরে হওয়ার কারণে অনেকের ধান চুরি হয়ে যেত। এভাবে প্রায় প্রতি বছরই চুরি হত।
খাড়ি পার হবার জন্য একটা পুল ছিল, যেটা দিয়ে মানুষ পার হত। সেই পুলের খানিকটা দূরে একটা পুকুর। সেই পুকুরের নাম ভূত পুকুর। ওখানে অনেক শাপলা ও পদ্ম ফুল ফোটে, ও পাড়ে অনেক বড় বড় আম-জাম গাছ এবং শ্যাওড়া-শিমুল গাছ ছিল। সুন্দরপুর গ্রামের বয়স্ক লোকজন বলত, ভূত পুকুরে ভূত আছে,
সেখানে সন্ধ্যা হলেই ভূত নাচে। মানুষকে দেখলে ভয় দেখায়। এটা আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি।
সেই সময় অগ্রহায়ণ মাস, হেমন্তে ধান কাটছে। সেই সময় আমাদের এই সুন্দর গ্রামের এক লোক তার জমির ধান কাটছে। দুই একদিন হলো ধান শুকিয়ে যাচ্ছে। লোকটির নাম রুনু। সে ভাবল, আর কয়েক দিন ধান শুকালে ভালো হবে। কিন্তু তার জমির ধান প্রতিবছর চুরি হয়। রুনু চাষি ভাবল, কয়েক দিন ধান পাহারা দেবে, কীভাবে তার ধান চুরি হয়, এই মনস্থির করে, সে সুন্দরপুর গ্রামের ছোট মাঝারি ছেলেদের বলল, 'আজকে সবাই মিলে পিকনিক খাব আর আমি তোদের অর্ধেক খরচ দেব।' এ কথা শুনে সবাই তো মহা খুশি। সেদিন সবাই মিলে মাঝরাত পর্যন্ত পিকনিক খেল। একই রকম পরের দিনও খেল।
রুনু চাষি ভাবল, দুই দিন ধরে আছি, কোনো রকম সমস্যা নাই। আমাদের গ্রামের মানুষরা ভীতু, তাই গ্রামের বয়স্ক লোকজনদের কথা শুনে তারা মনে করে ভূত আছে। আসলে ভূত পুকুরে ভূত বলতে কিছুই নেই, শুধু শুধু আমার দুই দিনের পিকনিকের টাকা খরচ হল। আজকে আবার সন্ধ্যা হয়ে আসছে, গ্রামের সকল ছেলে আবার আসছে আজ তার ধান পাহারা দেবে। রুনু বলে, 'আজকে আর পাহারা দিতে হবে না।" এই বলে চলে যায়। গ্রামের সকল ছেলেরা তারা তাদের
বাড়িতে চলে যায়।
রুনু চাষি তার বাসার এক কাজের লোক, সে কিনা তার সমবয়সী পাড়া-প্রতিবেশী ভাই, তাকে নিয়ে রাতে ধান পাহারা দিতে যেতেই গ্রামের এক বয়স্ক লোক বলে, "বাবা, কোথায় যাবি?" রুনুর সঙ্গে তার ভাই বলল, "ধান পাহারা দিতে।" তখনই বয়স্ক লোকটি বলল, "বাবা, তোরা দুজনই যাবি? আর কি কেউ সঙ্গে নাই?" রুনু বলল, "না, আমরা দুজনেই হব। লোকটি বলল, "বাবা, তোদের দুজনে ধান পাহারা দিতে যাস না, তোদের ক্ষতি হতে পারে। তোরা যদি ধান পাহারা দিতে চাস,
তবে সঙ্গে চার-পাঁচ জনকে নিয়ে যাস।" তখন রুনুর ভাই বলল, "ঠিক আছে।"
বয়স্ক লোকটি চলে গেল। রুনুর ভাই বলল, 'রুনু, আমাদের দুজনের যাওয়া ঠিক হবে?' রুনু বলল, "আরে চল, দুই দিন ধরে পিকনিক খেলাম, কোনো সমস্যা নাই, চল তো।" তখন সন্ধ্যা ভরপুর, তারা সঙ্গে দুজনেই একটি করে লাঠি, একটি হারিকেন ও কিছু চিড়া, চানাচুর এবং বেশ কিছু রুটি নিয়েছিল তাদের রাতের খাবারের জন্য। দুই ভাই মিলে ধানের আঁটি জড়ো করে একটা থাকার জায়গা করল। ওখানে তারা বেশ কিছুক্ষণ আছে। তবে তারা ঠিক করল, দুই জনে সারা
রাত জেগে থাকবে।
রাত নয়টা বাজে, তখন দুই ভাই মিলে রুটি খেল। কিছু সময় দুজনেই ছোটবেলার গল্প করল। হঠাৎ রুনু বলল, 'ভালো লাগছে না, দুজনে চিড়া চিবোই আর গল্প করি।" এভাবে থাকতে থাকতে আনুমানিক রাত তিনটা-সাড়ে তিনটা, হঠাৎ একটা কেমন আওয়াজ ভেসে এলো রুনুর কানে। রুনু বলল, 'ভাই, কোনো শব্দ পেলি?" সে বলে, "না তো।' রুনু বলল, 'আমি পালার থেকে বেরিয়ে দেখি।" বলে বের হলো, তখনই সে হঠাৎ দেখতে পেল তার মাথায় কে যেন নেড়ে পেল। ঘুরে
তাকিয়ে দেখল কিছু নাই।
রুনু পালাতে ঢুকে পড়তেই বিকট অট্টহাসি। এই হাসি শুনেই দুই ভাই ভয়ে চমকে উঠে, দুজনেই লাঠি হাতে নিয়ে বের হতেই রুনুকে পা ধরে উল্টো করে বাতাসে ঝুলাল। রুনুর ভাই ভয়ে কাঠের মতো হয়ে রইল। দেখল এক বিশাল কুৎসিত কালো ছায়া রুনুকে বাতাসে ঘোরাচ্ছে আর ফ্যাসফ্যাসে বিকট গলায় বলছে, "তোর এত সাহস, তুই আমার এখানে মরতে এসেছিস! আর কখনো তোকে দেখলে তোর ঘাড় মটকায় দেব, আজকে তোর কোমর মটকায় দেব।' বলে উপর থেকে মাটিতে দেয় একটি আছাড় আর বলে রুনুর ভাইকে, 'আজ তোরা যা, যেয়ে গ্রামের সকলকে বল, যেন কেউ আর সন্ধ্যার সময় না আসে পাথারে। দূর হ,
আমাকে শান্তিতে থাকতে দে।" তখনই কালো ছায়া দূরে সরে যায়।
সেই মুহূর্তে রুনুকে কাঁধে নিয়ে সে ভয়ে পালিয়ে আসে, কারণ রুনুর কোমর ভেঙে গেছিল। সকালে সকলেই জানাজানি হয়, রুনুকে হাসপাতালে নিয়ে ট্রিটমেন্ট দেওয়া হয়, সুস্থ হয়ে আসে। বেশ কিছু দিন পরে রুনু বলে, 'বাবা, এই দুর্ঘটনার পর ও কি আর কাজ করে না?" বাবা বলে, 'না, ও নাকি বাইরে গেছে।" কোথায়? বাবা বলল, "সে নাকি তান্ত্রিক বিদ্যা জানত, তাই তার কিছু হয়নি, সে নাকি ওই অশুভ শক্তির হাত থেকে রুনুকে বাঁচিয়েছে, আর বলল সে নাকি তার ছোটবেলার
গুরুর কাছে গেছে।"
এটা শুনতে সে মানে রুনুর পাড়া-প্রতিবেশী ভাইটা তান্ত্রিক সেজে, প্রথমে তার বাসায় রুনুর সামনে এসে বলে, "কেমন আছিস?" কথাটা অনেক ভারী ভাব, যেমনটা কোনো কিছু সফল হওয়ার মত। রুনু বলল, 'আছি, তুই? আমার জন্য তোর অনেক ক্ষতি হয়েছে।" সে বলল, 'থাক, আমি ওই অশুভ শক্তি নষ্ট করে দেব, আজই তোমরা আজকে আমাদের বাসায় এসো।" এই বলে চলে গেল।
কিছু পর রুনু বাড়ির সবাই মিলে গেল, সেখানে আমি ও গ্রামের সকল মানুষ ছিলাম। তার বাড়ির সামনে একটা বড় বট গাছের নিচে একটা গণ্ডি করা আছে, ওখানে সকলকে বসতে বলল আর বলল, 'কেউ এই গণ্ডির বাইরে যাবে না, যতক্ষণ আমি না বলি, যত রাত হোক না কেন।" সকলেই চুপ করে রইল। কয়েকজন
তান্ত্রিক আসল তার বাড়ি থেকে, মোট তারা পাঁচ জন মিলে যজ্ঞের আয়োজন করে মন্ত্র উচ্চারণ করে যজ্ঞে আহুতি দিচ্ছে। অনেক রাতে, প্রায় দুইটা, তখন অনেক বাতাসে মন্ত্র উচ্চারণের সাহায্যে ওই শক্তি ভয়ংকর রূপ নিয়ে আসে, তখন তাকে জিজ্ঞেস করে, "কেন তুমি মানুষকে ভয় দেখাও ও অত্যাচার কর?" শক্তিটা ফ্যাসফ্যাস করে বলে, 'আমার ওই পাথারের মাঝখানে পুকুরের ধারে আমার বাড়ি ছিল, আমি মৃত্যুর পর কেউ আমাকে ধর্মীয় হরির নাম করেনি, তাই আমি শান্তি পাচ্ছি না, তোমরা যদি আমাকে ধর্মীয় নাম শোনাও তবে আমি চলে যাব।"
তখন তান্ত্রিকরা বলে, "ঠিক আছে, আমরা শোনাব।" বলে সবাই মিলে হরির নাম করে, সেই অশুভ শক্তি হরির নাম শুনে শুভ শক্তি রূপে চিরদিনের
মতো
সৃষ্টিকর্তার কাছে চলে যায়।
এটি একটি কাল্পনিক গল্প। এখানে মূলত বোঝানো হয়েছে যে, বড়দের কথা শুনব। কোনো সমস্যা হলে তার সমাধানও আছে। কখনো সমস্যা দেখে
এরকম গল্প পড়তে চাইলে ফলো কমেন্ট করুণ