Story

বিকেলের শেষ ট্রাম

November 4, 2026

Zidan

4 views

মাধবীলতা যখন কলেজ স্ট্রিটের মোড়ে এসে দাঁড়াল, তখন কলকাতার আকাশ জুড়ে মেঘের ঘনঘটা। বৃষ্টি নামবে নামবে করেও নামছে না, বাতাসে একটা অদ্ভুত সোঁদা গন্ধ আর চেনা আর্দ্রতা। ট্রামের লাইনের দিকে তাকিয়ে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই শহরটার একটা নিজস্ব সুর আছে, যা অন্য কোনো শহরে পাওয়া যায় না। অথচ এই সুরটাই আজ তার বুকে ভারী পাথরের মতো চেপে বসেছে।

অনির্বাণের সাথে তার পরিচয় হয়েছিল ঠিক পাঁচ বছর আগে, এই মোড়েই, একটা বইয়ের দোকানের নিচে। সেদিনও এমন মেঘলা বিকেল ছিল। অনির্বাণ ছিল একটু অন্যরকম উদাসীন, বইয়ের পাতায় ডুবে থাকা এক তরুণ, যার দুচোখে ছিল কবিতার ভাষা। আর মাধবীলতা ছিল বাস্তবের মাটিতে পা রাখা এক সাধারণ মেয়ে। দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুর মানুষ কীভাবে যেন একে অপরের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল।

কিন্তু জীবন তো আর উপন্যাসের পাতা নয় যে সব গল্প এক টানে শেষ পাতায় গিয়ে মিলবে। অনির্বাণের উদাসীনতা একসময় মাধবীলতার কাছে অবহেলা মনে হতে লাগল। আর মাধবীলতার জীবনের ছোট ছোট চাওয়াগুলো অনির্বাণের কাছে মনে হলো এক অদৃশ্য শিকল। কোনো ঝগড়া হয়নি, কোনো চিৎকার-চেঁচামেচি হয়নি; শুধু একদিন এক কাপ ঠাণ্ডা চায়ের টেবিলে বসে দুজনে টের পেয়েছিল—তাদের ভেতরের দূরত্বটা ট্রামের লাইনের মতোই সমান্তরাল হয়ে গেছে, যা কখনো এক বিন্দুতে মিলবে না।

আজ অনির্বাণ এই শহর ছেড়ে পাকাপাকিভাবে চলে যাচ্ছে দূর প্রবাসে। যাওয়ার আগে সে মাধবীলতাকে শেষবার দেখতে চেয়েছিল এই কলেজ স্ট্রিটের মোড়ে।

ঘড়ির কাঁটা ছুঁল পাঁচটা। দূর থেকে একটা ট্রামের টুংটাং আওয়াজ ভেসে এলো। মাধবীলতা দেখল, ভিড়ের মধ্য থেকে হেঁটে আসছে অনির্বাণ। কাঁধে সেই পুরোনো ঝোলা ব্যাগ, পরনে সাধারণ পাঞ্জাবি। তার চোখে আজ আর সেই চেনা উদাসীনতা নেই, সেখানে জমা হয়ে আছে এক সমুদ্র বিষাদ।

দুজনে পাশাপাশি দাঁড়াল, কিন্তু মাঝখানে যেন এক অলিখিত মৌনতার দেওয়াল।
"কেমন আছ, মাধবী?" অনির্বাণ প্রথম স্তব্ধতা ভাঙল।
"ভালো। তুমি? গোছগাছ সব হলো?" মাধবীলতার গলাটা সামান্য কেঁপে উঠল, কিন্তু সে তা আড়াল করল।
"হ্যাঁ। আর তো মাত্র কয়েক ঘণ্টা, তারপর রাতের ফ্লাইট।" অনির্বাণ একটু থামল, তারপর দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, "জানিস মাধবী, কিছু মানুষ জীবনে আসে শুধু গল্পটা সুন্দর করতে, শেষটা করতে নয়। আমাদের গল্পটাও হয়তো এমনই ছিল।"

মাধবীলতা কোনো উত্তর দিল না। সে জানত, কিছু কথার কোনো উত্তর হয় না।

বিকেলের শেষ ট্রামটা এসে থামল তাদের সামনে। অনির্বাণ মাধবীলতার দিকে তাকিয়ে আলতো করে হাসল, যে হাসির ভেতর লুকিয়ে ছিল পাঁচ বছরের অজস্র স্মৃতি—কফি হাউসের আড্ডা, বৃষ্টিভেজা বিকেল আর একসাথে দেখা হাজারো স্বপ্ন।

"ভালো থাকিস," বলে অনির্বাণ ট্রামে উঠে গেল।

ট্রামটা ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল। মাধবীলতা একদৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে রইল, যতক্ষণ না ট্রামটা ভিড়ের মাঝে মিলিয়ে গেল। ঠিক তখনই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। চারপাশের মানুষজন মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজছিল, কিন্তু মাধবীলতা এক জায়গায় স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তার গাল বেয়ে বৃষ্টির জল নামছিল, নাকি চোখের জল—তা বোঝার আর কোনো উপায় ছিল না।

সাহিত্য আসলে আর কিছু নয়; জীবনের এই না-পাওয়া, এই চলে যাওয়া আর বুকের ভেতর বয়ে বেড়ানো এক নিটোল নীরবতার নামই সাহিত্য।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login