একটি আত্মার ফিরে আসার গল্প
রাত তখন গভীর। চারপাশের পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়েছে। জানালার ওপাশে আকাশে এক টুকরো চাঁদ ঝুলে আছে। দূরের কোনো মসজিদ থেকে ভেসে আসছে এশার নামাজের পরের নীরবতা।
আয়েশা জানালার পাশে বসে আছে।
সামনে খোলা ডায়েরি। হাতে কলম। অথচ অনেকক্ষণ ধরে একটি শব্দও লেখা হয়নি।
তার মনে আজকাল একটা প্রশ্ন খুব ঘুরপাক খায়—
মানুষ সারাজীবন এত কিছুর পেছনে ছোটে কেন?
একটু সুখের জন্য, একটু ভালো থাকার জন্য, মানুষের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য, পৃথিবীতে নিজের একটা পরিচয় তৈরি করার জন্য।
অথচ দিন শেষে সবকিছু ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে।
থেকে যাবে শুধু কিছু স্মৃতি, কিছু আমল আর মানুষের কাছে রেখে যাওয়া ভালো-মন্দের গল্প।
আয়েশা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তারপর অজু করতে উঠে গেল।
অনেক দিন পর আজ তার খুব ফজরের অপেক্ষা করতে ইচ্ছে হচ্ছে।
আয়েশার জীবনটা একসময় খুব ব্যস্ত ছিল। কত স্বপ্ন, কত চাওয়া, কত অভিমান!
মানুষের কাছ থেকে একটু অবহেলা পেলেই তার মন খারাপ হতো। কারও কথায় কষ্ট পেলে দিনের পর দিন সেই কথা মনে রাখত।
কিন্তু কখনো ভাবেনি, তার রব প্রতিটি মুহূর্তে তার মনের খবর জানেন।
একদিন তার জীবনে এমন একটি সময় এলো, যখন পরিচিত অনেক মানুষ দূরে সরে গেল।
যাদের আপন ভেবেছিল, তাদের কাউকে পাশে পেল না।
এক রাতে খুব কাঁদতে কাঁদতে সে সিজদায় পড়ে গেল।
কোনো সুন্দর ভাষা ছিল না তার প্রার্থনায়। কোনো সাজানো বাক্যও নয়।
শুধু বলেছিল,
'হে আল্লাহ, আমি খুব ক্লান্ত। মানুষের কাছে কিছু চাইতে চাইতে ক্লান্ত। আপনি আমাকে এমন একটি হৃদয় দিন, যে হৃদয় আপনার ওপর ভরসা করতে শিখবে।'
সেদিন তার চোখের পানি সিজদার জায়গাটি ভিজিয়ে দিয়েছিল।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, পরদিন পৃথিবী বদলে যায়নি।
সমস্যাগুলোও দূর হয়নি।
শুধু আয়েশার ভেতরে কিছু একটা বদলে গিয়েছিল।
সে বুঝতে শিখেছিল, সব সমস্যার সমাধান সঙ্গে সঙ্গে না পেলেও আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার দরজা কখনো বন্ধ হয় না।
এরপর থেকে আয়েশা ছোট ছোট কিছু অভ্যাস তৈরি করল।
ফজরের নামাজের পর কিছুক্ষণ কুরআন পড়া।
কাউকে কষ্ট দিলে ক্ষমা চাওয়া।
কারও অনুপস্থিতিতে তার বদনাম না করা।
সামর্থ্য অনুযায়ী কাউকে সাহায্য করা।
আর প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে নিজের ভুলগুলোর জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া।
তার জীবনে তখনও দুঃখ ছিল। কখনো চোখে পানি আসত, কখনো মন খারাপ হতো।
তবে সে এখন জানত, দুঃখ মানেই আল্লাহ তাকে ভুলে গেছেন—এমন নয়।
একদিন বিকেলে আয়েশা তার ছোট বোনকে নিয়ে ছাদে বসেছিল।
আকাশে তখন গোধূলির রং।
ছোট বোন হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
— আপু, তোমার এখন আর আগের মতো মন খারাপ হয় না কেন?
আয়েশা মৃদু হাসল।
— হয় তো।
— তাহলে বুঝতে পারি না কেন?
— আগে মন খারাপ হলে মানুষের কাছে ছুটে যেতাম। এখন আল্লাহর কাছে যাই।
বোনটি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল,
— আল্লাহ কি সব কথা শোনেন?
আয়েশা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
— আমরা মুখে বলার আগেই তিনি আমাদের মনের খবর জানেন।
সেদিন রাতে আয়েশা ডায়েরির শেষ পাতায় লিখল—
'একদিন এই পৃথিবীর সব পরিচয় মুছে যাবে। নাম, পদবি, সৌন্দর্য, সম্পদ—কিছুই সঙ্গে যাবে না।
যে ঘরটিকে নিজের ভেবে সাজিয়েছি, একদিন সেই ঘরেও অন্য কেউ বসবাস করবে।
যে আয়নায় প্রতিদিন নিজের মুখ দেখেছি, একদিন সেই মুখও মাটির নিচে হারিয়ে যাবে।
তাই এখন আর পৃথিবীর কাছে খুব বেশি কিছু চাই না।
চাই, আমার রব যেন আমার ওপর সন্তুষ্ট থাকেন।
চাই, আমার ভুলগুলো তিনি ক্ষমা করে দেন।
চাই, জীবনের শেষ মুহূর্তে আমার জিহ্বায় যেন কালিমা থাকে।
আর চাই, যে পথ ধরে একদিন এই পৃথিবীতে এসেছিলাম, সেই পথের শেষ প্রান্তে যেন তাঁর রহমত নিয়ে পৌঁছাতে পারি।
কারণ আমার শেষ গন্তব্য কোনো শহর নয়, কোনো মানুষের ভালোবাসাও নয়।
আমার শেষ গন্তব্য আমার রবের কাছে ফিরে যাওয়া।'
ডায়েরি বন্ধ করে আয়েশা জানালার বাইরে তাকাল।
আকাশে তখন অসংখ্য তারা।
তার মনে হলো, পৃথিবী যতই সুন্দর হোক, মুমিনের হৃদয়ে আখিরাতের আশাই সবচেয়ে বড়।