হাসানুজ্জামিল মেহেদী'র পাঁচটি কবিতা
১.
নিঃসঙ্গতার অতল জল
খুঁজে ফিরি সেই হলুদ বিকেল,
শাদা মেঘের ঘুনবৃষ্টি,
যেখানে জম্পেস নগরীর হৈ হুল্লোরে
ব্যস্ত সড়কে দেখা হয়েছিলো তোমার
এবং আমার নিঃসঙ্গতার।
বিকেলের রোদ জমে নির্জন বারান্দায়,
চিলতে বাগানে প্রেমে মজে ভ্রমর মধুকরী,
উদ্দাম শিশুর মতো আনন্দে মজে পরিযায়ী প্রজাপতি,
যেন বৃহস্পতির খয়েরি পরী।
প্রেমে প্রেমে সূর্যটা অস্তগামী,
আমার সন্ধ্যার আড্ডায় কেবলই আমি।
অথচ আজও খুঁজে ফিরি তোমাকে।
সেই হলুদ বিকেল,
সেই শাদা মেঘ,
সেই ঘুনবৃষ্টি কেবলই হারাতে থাকে।
একটি শহর হয়ে ওঠে অজস্র শহর,
আদিগন্ত ছুটতে থাকে আমার নিঃসঙ্গতার বহর।
তুমি হয়ে উঠো জনক,
আমার চোখে জন্ম দাও দু'ফোঁটা
অতল জল।
২.
নিঃসঙ্গতার সাড়ে তিন’শ মাইল
বহুকাল বৃষ্টির পর আজ আবার এ শহরে রোদ।
চল বেরিয়ে পড়ি,
সুনীলের দোকানের ঘোলা চা রোদে বসে খাবো,
চল যাই!
বিপ্লবের প্রথম অধ্যায়ে যার প্রস্থান
এ বেলায় তার ঘুমানো চলেনা।
তোর সেই কথা- নিম্নমধ্যবিত্ত কবির
সমাধিতে বেড়ে ওঠা দূর্বা ঘাস তুলতে হয় নিজেকেই।
তোকেও শুকোতে হবে দরোজায় পড়ে থাকা অনীলার চিঠি,
ঘুম ছাড়।
অনীলা নেই,
নস্টালজিক শৈশব মনে নেই, এ শহর কিংবা জলফড়িংয়ের গন্ধও!
তবুও শেষ কবিতা লিখতে হবে,
ঘুম ছাড়।
তোর মতো এক দস্যি কবি এক যুগ সূর্য দেখেনি,
মাড়ায়নি রাজপথের ফুটপাত, শক্তি শুনলে হাসবে!
আজ আবার নতুন ঘাসের কবিতা লিখবি, চল।
ট্রেন ছেড়ে দিবে,
নিঃসঙ্গতার শেষ কবিতাটি এখনো লেখা হয়নি,
শর্মিলা অপেক্ষায় আছে,
পাড়ি দিতে হবে সাড়ে তিনশত মাইল পথ।
এভাবেই নিঃসঙ্গতার কবিতা লিখতে হয়।
বেড়িয়ে পড় কবি, বেড়িয়ে পড়।
চল যাই।
৩.
নিঃসঙ্গ রেলগাড়ি
জংশনে জড়ো হয়েছে কতগুলো রেলগাড়ি,
কেউ ফিরছে ঘর, কেউ ছাড়ছে বাড়ি।
এক রেলগাড়ি বয়ে নিয়ে যায় কত দুঃখ,
কত বিচ্ছিন্নতার স্বাক্ষী হয়ে ছুটে চলে ঝক ঝক,
বহুদূরের ঠিকানায় তার জমে থাকে কত জানা অজানা চিঠি।
রেলের চাকায় কত সুখ বেজে উঠে, রেল জানেনা তার হিসাব
কত ভালোবাসা ঘুরে ফিরে তার বুক জুড়ে এপার ওপার,
স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে যায় কত রঙ্গিণ খোয়াব,
রেল লাইনের মতো পিছে ফেলে অাসে কত রেখা, বিচ্ছিন্নতার।
রেল গাড়ি বয়ে নিয়ে যায় সময়, আমাদের সুখ দুুখ,
অজান্তে এতো মিলন বিচ্ছেদের এই রেলগাড়ি-
কত চঞ্চল
অথচ কত একা!
৪.
বৃষ্টি ফিরিয়ে দেয় আমাকে
মূহুর্তগুলোকে সহজ করে দেয় বহুদিনের পুরানো বৃষ্টি,
ভরদুপুরের কালোমেঘ- হঠাৎ বৃষ্টি।
দখিনা বাতাসের তোড়ে বৃষ্টিতে বিছানা ভিজে গেলে
জানালা বন্ধ করে অস্বস্তিতে ভুগি,
দরোজা খুলে দেই।
এই দরোজা আমাকে নিয়ে যায় পুরানো সেই দরোজায়,
দু'ফোঁটা বৃষ্টিতে খুলে যেতো যার পাল্লা,
আমাকে ছুটিয়ে নিয়ে যেতো অদূরের কোন জলজমিনে,
যেখানে বৃষ্টির ফোঁটায় আকাশ জমিন মিলেমিশে একাকার।
বিশ্ময়ে দেখি-
দরোজা বদলে গেছে
মানুষ বদলে গেছে
বৃষ্টিটা কেবল আছে সেই-ই।
প্রচন্ড বৃষ্টি কাঁচের দেয়ালের মতো ভেসে উঠে,
দরোজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়ানো বয়সাক্রান্ত দু'চোখ সে দেয়ালে দেখে চলে-
বোরোকাটা ধানক্ষেত, ডিয়ার ফুটবল,
বাতাসের তোড় কাটিয়ে দৌঁড়ে আসা দূরন্ত বন্ধু,
হাঁটুপানিতে দাঁড়িয়ে শিকারমগ্ন কয়েকটি ধলিবক, গোবোরে শালিকের কলরব।
দেখতে থাকে-
বৃষ্টি লাগছে গায়ে, বৃষ্টি লাগছে মুখে,
বহুদূরের থেকে হাফপ্যান্ট পড়ে দৌঁড়ে আসছে শৈশব।
৫.
শৈশব ফিরে চাই
কমরেড,
চলো রাজনীতি করি শৈশবকে ফিরিয়ে আনার।
রাজপথ জুড়ে দীর্ঘ মানবন্ধন হোক,
শ্লোগানে মুখর মিছিল-
প্ল্যাকার্ডে লিখা থাক 'শৈশব ফিরে চাই',
শহরের দেয়ালেও লিখা থাক তাই।
জেগে ওঠো বন্ধু,
সময় কই শৈশব না পাওয়ার নিয়ম মানার।