পোস্টস

প্রবন্ধ

সুরক্ষা,সমৃদ্ধি আর সংরক্ষণে চাই বৃক্ষরোপণ।

২৯ এপ্রিল ২০২৪

সাইদুর রহমান শাহিদ

মূল লেখক সাইদুর রহমান শাহিদ

বৃক্ষের সাথে প্রাণির সম্পর্ক জীবন মৃত্যুর। অর্থাৎ গাছ না থাকলে প্রাণি অক্সিজেনের অভাবে মৃত্যুমুখে পতিত হবে। অনুরূপভাবে প্রাণি না থাকলে বৃক্ষরাজি কার্বনডাইঅক্সাইডের অভাবে নিজের অস্তিত্ব হারাবে। তাই বৃক্ষ আমাদের পরম বন্ধু। পরিবেশে তারা আমাদের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা তৈরি করে আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। কাজেই বৃক্ষরোপণের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। সুস্থ প্রজন্মের দেশ গড়তে চাইলে বেশি বেশি বৃক্ষরোপণ। বৃক্ষরোপণের বহুবিধ উপকারী দিক রয়েছে। নগরায়ন ও শিল্পায়নের ফলে যত দিন যাচ্ছে ততই কাটা পড়ছে বৃক্ষ। নির্বিচারে বৃক্ষনিধন করে তৎস্থানে নির্মাণ করা হচ্ছে বসতবাড়ি কিংবা কলকারখানা। যার ফলশ্রুতিতে পরিবেশে বাড়ছে কার্বনডাইঅক্সাইডের পরিমাণ। কেননা এই ক্ষতিকর গ্যাস শোষণের জন্য বৃক্ষের প্রয়োজন। এমনিতেই দেশে ক্রমাগত শিল্পকারখানা,ইঞ্জিনচালিত যানবাহন এবং আধুনিক বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি ব্যবহার বাড়ার ফলে পরিবেশে যুক্ত হচ্ছে বিষাক্ত অনেক গ্যাস। যাতে করে বাড়ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা। আর এই বিষাক্ত গ্যাসগুলোর কারণেই বর্তমানের এই অতিরিক্ত তাপমাত্রা, অনাবৃষ্টি, ক্ষরা এতসব সমস্যা। পরিবেশে ভারসাম্যহীনতা বিরাজ করলে তা গোটা প্রাণীজগতের বাস্তুসংস্থানে বিরূপ প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। দেখা দেয় খাদ্য সংকট এবং বাসস্থানের অভাব।  কাজেই পরিবেশে জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষা করে তা বসবাস উপযোগী রাখতে বৃক্ষরোপণ অতীব জরুরি । আমাদের প্রকৃতিতে দুর্যোগ রক্ষায় বৃক্ষ বা বনাঞ্চল প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। তাইতো একটি দেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ঐ দেশের মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বন থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশে তা নেই। যে কারণেই বারাবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হেনে সংঘটিত করছে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি। ঝড় ঝঞ্ঝাট,ভূমিক্ষয়,সাইক্লোন ও ঘূর্ণিঝড়ের মত মারাত্মক দুর্যোগগুলো তাণ্ডবলীলা চালিয়ে যাচ্ছে দেশে। ভূমিক্ষয়ের কারণে বহুমানুষ বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। আর এই ক্ষয়ে যাওয়া ভূমি মিশে যাচ্ছে নদীতে। যা নদীর নাব্যতা হ্রাস করার জন্য দায়ী। বনাঞ্চল যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ রক্ষার রক্ষাকবচ তা আমরা সুন্দরবনের দিকে তাকালেই রক্ষা পাই। প্রতিবছর বিধ্বংসী সামুদ্রিক ঝড় বা সাইক্লোনের মত দুর্যোগগুলোকে প্রতিহত করে আসছে এই বন। কিন্তু নানাবিধ কারণে এই বনের বৃক্ষও দিনে দিনে কমতে শুরু করেছে।  যা আমাদের পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। বর্তমানে বজ্রপাতের কারণে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়ে ফেলছেন। বজ্রপাত প্রতিরোধে প্রয়োজন উঁচু জাতের বৃক্ষরোপণ।  যা প্রাকৃতিক বজ্রনিরোধক হিসেবে কাজ করে।তাই পরিবেশকে বাস উপযোগী করতে প্রয়োজন বৃক্ষরোপণ। গ্রিনহাউজ প্রভাব গোটা বিশ্বের কাছে উদ্বেগজনক।  কেননা বৈশ্বিক উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ার ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলতে শুরু করেছে। যার ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠ উত্থিত হয়ে বাংলাদেশসহ মোট ১০টি দেশ তলিয়ে যেতে পারে পানিতে। এরকম কোন ঘটনা ঘটে গেলে আমাদের বসবাস অসম্ভব হয়ে পড়বে। একারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা কমিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। এজন্য চাই বেশি বেশি বৃক্ষরোপণ। আমাদের দেশের অর্থনীতিতে বৃক্ষের রয়েছে বিশেষ অবদান। আমাদের দেশের বনাঞ্চলগুলো থেকে বহু মানুষ তাদের জীবিকা সংগ্রহ করেন।  কেউ মধু সংগ্রহ করে,কেউ মোমবাতি তৈরির কাঁচামাল সংগ্রহ করে, বাঁশ ও বেতের নান্দনিক আসবাবপত্র তৈরি করে। জিডিপিতে বৃক্ষের অবদান নিয়ে সমীক্ষা করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বিবিএস) জাতীয় হিসাব শাখা। কাঠ,বাঁশ,বেত,লাকড়ি,ঔষধিগাছসহ বৃক্ষের থেকে তৈরি হরেক রকমের আসবাবপত্র বাজারে ক্রয় বিক্রয় হচ্ছে। যার কিছু অংশ জিডিপিতে যোগ হচ্ছে।আমাদের দেশ প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। তবে যে হারে বিশেষত বিদ্যুৎ ও জ্বালানী গ্যাস ব্যবহারের মাত্রা বেড়েই চলেছে তাতে একসময় প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট সৃষ্টি হবে। এ বিষয় বিবেচনায় রেখে বেশি বেশি বৃক্ষরোপণ করা উচিত।  কেননা জ্বালানী হিসেবে বৃক্ষ থেকে উৎপাদিত লাকড়ি প্রাকৃতিক গ্যাসের সাশ্রয় ঘটায়। তাছাড়াও গ্যাস পোড়ালে তা পরিবেশে মিশে গিয়ে বায়ুদূষণ ঘটায়। পরিবেশে তাপমাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাওয়ায় আমরা ব্যাপকহারে বৈদ্যুতিক পাখা তাপ অনুকূল যন্ত্র ব্যবহার করছি।যাতে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে।আর বেশি বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রাকৃতিক গ্যাস,কয়লা পুড়তে হচ্ছে। এতে করে প্রাকৃতিক সম্পদে যেমনি চাপ পড়ছে তেমনি পরিবেশেও দূষণ ঘটাচ্ছে। এমতাবস্থায় বেশি বেশি বৃক্ষরোপণ করলে পরিবেশে তাপমাত্রা কমে আসবে এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সাশ্রয়ও হবে। উল্লেখ্য যে আমাদের দেশের চিকিৎসায় আজও ভেষজ ঔষধ বেশ প্রভাব বিস্তার করছে এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মুক্ত চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে রোগীর আরোগ্যলাভে অবদান রাখছে। কিন্তু বসতবাড়ি নির্মাণ,কলকারখানা স্থাপন, ও নির্বিচারে বৃক্ষনিধনের ফলে বিলুপ্তপ্রায় বহু ঔষধি গুণাগুণসমৃদ্ধ বৃক্ষ। যার ফলে চাহিদামত গুণগতমান সমৃদ্ধ ভেষজ ঔষধ উৎপাদনে বেগ পেতে হচ্ছে এইসব উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে। কাজেই আমাদের প্রজন্মকে নিরাপদ রাখতে, তাদের চিকিৎসাব্যবস্থা অক্ষুণ্ণ রাখতেও বৃক্ষরোপণ অত্যন্ত জরুরি।আমাদের দেশের মানুষের যে পরিমাণ পুষ্টি চাহিদা রয়েছে সে তুলনায় নেই পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ খাবার। আর এর অন্যতম কারণ পর্যাপ্ত ফলজ বৃক্ষের। অভাব। ফলমূল পুষ্টি লাভের সবচেয়ে উত্তম একটি উৎস।  কিন্তু নানাবিধ কারণে বৃক্ষনিধনের ফলে কাটা পড়ছে ফলজ বৃক্ষও। যাতে প্রকট হচ্ছে এদেশের পুষ্টিহীনতার সমস্যা। এদেশের আম,জাম,কাঁঠাল,কলা,লিচু,পেপে,আনারসসহ হরেক রকমের ফলে রয়েছে ব্যাপক পুষ্টিগুণ। আবার দেশে উৎপাদিত শাকসবজিও পুষ্টি ও ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার।  কিন্তু দিনে দিনে আবাদযোগ্য জমি কমে যাওয়ায় শাকসবজির উৎপাদনও কমছে। তাই এসবের উৎপাদন বাড়াতে আমাদেরকে সাধ্যমত গাছপালা লাগাতে হবে। বাড়ির উঠোন, বারান্দা,বাড়ির চারপাশ, বাড়ির ছাদ যেখানেই পারি আমরা যেন গাছপালা লাগাই। যাতে আমাদের পরিবেশ প্রজন্মের জন্য বাস উপযোগী হয় এবং পুষ্টিহীনতার মত সমস্যা দূরীভূত হয়।
বৃক্ষরোপণ বাড়ানো ও বনায়ন সংরক্ষণে করনীয় : দেশকে সুস্থ প্রজন্মের বাস উপযোগী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে বৃক্ষরোপণ যেমনি বাড়ানো প্রয়োজন তেমনি দেশের বনায়নকে সংরক্ষণ করাও প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। যেমন:সরকারি বা বেসরকারি প্রচারমাধ্যমে পরিবেশে বৃক্ষের অবদান এবং সর্বস্তরের জনগণকে বৃক্ষরোপণ করতে উদ্বুদ্ধকরণ।সামাজিক বনায়ন কর্মসূচিকে ত্বরান্বিতকরণ। বিনামূল্যে জনগণের মাঝে বৃক্ষ বিতরণ।বন বিভাগে নিয়োজিত কর্মকর্তা কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠা ও স্বচ্ছতা আনয়ন।অবৈধভাবে বনের বৃক্ষ কর্তন বা বনের ক্ষতিসাধনকারীদের আইনের আওতায় এনে বিচারকার্য সম্পাদন।সরকারি তত্ত্বাবধানে দেশের বনাঞ্চল সংরক্ষণ এবং নিয়মিত বৃক্ষরোপণ অভিযান পরিচালনা।বনাঞ্চলে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ এবং কর্মরত কর্মকর্তা কর্মচারীদের দুর্নীতি দূরীভূতকরণ।দেশের নদ-নদীর ধার, উপকূল অঞ্চল,পাহাড়ি অঞ্চল এবং রেলপথের ধারে বনাঞ্চল কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন।অভয়ারণ্যগুলোর সংরক্ষণ এবং তা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ। দেশকে বর্তমান ও পরিবর্তী প্রজন্মের বাস উপযোগী করে তুলতে হলে প্রয়োজন পরিবেশ সংরক্ষণ। কেননা দিনে দিনে যেভাবে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে,তাপমাত্রা বাড়ছে,জলবায়ুর নেতিবাচক পরিবর্তন হচ্ছে,ষড়ঋতুর বৈচিত্রতা কমে আসছে তা বেশিদিন চলতে থাকলে দেশে বসবাস করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। তাই প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে,প্রাণিজগতকে বাঁচাতে হলে,বাস্তুসংস্থান ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে হলে,সর্বোপরি পরিবেশকে বসবাস উপযোগী করে গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন বেশি বেশি বৃক্ষরোপণ।আর এই বৃক্ষরোপণ অভিযানে সরকারি,বেসরকারি সংস্থার পাশাপাশি আমাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগী হতে হবে। “বৃক্ষরাজির নিধন দেখে দূষণ যে আজ বাড়ছে বেশ,এউ বুঝি হায় বসুন্ধরায় অগ্নি পোড়ায় সোনার দেশ”। স্বরচিত এই কবিতার পঙক্তিকে নিজের মাঝে ধারণ করে চলুন বেশি বেশি গাছ লাগাই। “গাছ লাগিয়ে যত্ন করি,সুস্থ প্রজন্মের দেশ গড়ি” এই স্লোগানের প্রতিধ্বনি বেজে উঠুক প্রতিটি বৃক্ষের সবুজ পাতায় পাতায়,গোটা দেশ ভরে উঠুক সবুজে সবুজে,পাখিরা গেয়ে উঠুক বসন্তের গান।
সাইদুর রহমান শাহিদ
০১৮৬৭৫৯৯২৫১
যোগাযোগ বৈকল্য বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।