Posts

গল্প

সৎ মা

February 16, 2025

Arif Ali Mahmud

15
View
সৎ মা 

      রাজধানী ঢাকার সিটি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী প্রতীক। তার পরিবারের অন্য সদস্যরা হলেন—বাবা সোহেল সাহেব, সৎ মা শিউলি বেগম এবং সৎ বোন শামা। তাদের বাসা আজিমপুরে। প্রতীকের মা মারা যাওয়ার পর সোহেল সাহেব শিউলি বেগমকে বিয়ে করেন। শিউলি সদা হাসিমুখী একজন মহিলা; কিন্তু প্রতীকের সঙ্গে তার সম্পর্ক শীতল। প্রতীক মনে করে, তার সৎ মা তাকে বোঝা মনে করেন।

      তার কলেজের বন্ধু হাসান প্রায়ই তাকে উৎসাহ দিয়ে বলে, “তিনি যদি তোকে ভালোবাসেন, তাহলে সেটা তাকে তার কাজ দিয়েই প্রমাণ করতে হবে। হয়তো একদিন দেখবি, তুই ভুল ভেবেছিলি।”

      প্রতীক বলে, “আমার সৎ মা আমাকে ভালোবাসে না, এটা আমি জানি।”

      এভাবে তাদের দু'জনের মাঝে বিতর্ক চলে।
 

      শামার প্রতি প্রতীকের ভালোবাসা অনেক। তাকে সে কখনও সৎ বোন ভাবে না। শামাও প্রতীককে খুব ভালোবাসে। সে মাঝেমাঝে বায়না ধরে, তার ভাইয়ার হাতে ভাত খাবে। শামার ছোটবেলায় প্রতীক শখ করে শামাকে খাইয়ে দিত। সেই অভ্যাসটিই শামার মধ্যে রয়ে গেছে।

      শামা বলে, “ভাইয়ার বিয়ের সময় আমিও সবার মতো শাড়ি পরব আর হাতে মেহেদী লাগাব।”

      তার এসব কথা শুনে সবাই হাসে আর বলে, “আর তোর বিয়ের সময় কী পরবি?”

      শুনে ছোট্ট শামা লজ্জা পেয়ে বলে, “যাহ! আমি বিয়ে বসব না।”
 

      একদিন, এলাকার এক দরিদ্র দম্পতি—নাসির এবং আসমার ছেলে খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। ছেলেকে হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর ওর চিকিৎসার ব্যয়ভার কীভাবে সামলাবে, তা-ই নিয়ে তারা চিন্তিত হয়ে পড়ে। তারা এ ব্যাপারে প্রতীকের সাথে কথা বলে। প্রতীক অর্থ সহায়তা জোগাড় করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করবে বলে জানায়।

      রাতে প্রতীকের পরিবারের সবাই মিলে খাওয়ার সময় প্রতীক এ ব্যাপারে তাদেরকে জানাল। তার কাছ থেকে এই কথা শুনে, শিউলি বেগম বিনা দ্বিধায় নিজের সঞ্চয় থেকে কিছু টাকা বের করে ছেলেটির চিকিৎসার জন্য প্রতীকের হাতে দিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি প্রতীককে বললেন, “যদি আরও টাকা লাগে, তাহলে আমাকে জানাবে।”

      “আপনি কেন সাহায্য করলেন?” প্রতীক বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল।

      শিউলি বেগম স্নেহভরে বললেন, “আমি বুঝি, সন্তানের জন্য বাবা-মায়ের এবং বাবা-মায়ের জন্য সন্তানের গুরুত্ব কত। কারণ, আমিও একজন মা। আর আমি এটাও বুঝি যে, বাবা-মায়ের অভাব কতটা কষ্ট দেয়। তাই আমি চেষ্টা করি যেন আমার কারণে কেউ সেই অভাবটা টের না পায়। তোমার প্রতি আমার যত্নটা হয়তো বোঝাতে পারিনি; কিন্তু তোমার জন্য আমার ভালোবাসা সবসময় ছিল।”

      সেদিন প্রতীকের ভুল ভাঙল। সে বুঝল, ভালোবাসা শুধু কথায় নয়, কাজেও প্রকাশ পায়। তাই শিউলি বেগমের প্রতি তার মনোভাব বদলে গেল, আর তাদের সম্পর্ক নতুন রূপ পেল।

      এখন শিউলি বেগম এবং প্রতীকের মধ্যে সখ্যতা গড়ে উঠেছে। প্রতীক শিউলিকে নিজের মায়ের মতোই সম্মান করে। শিউলি বেগমও প্রতীককে আগের চেয়ে বেশি ভালোবাসেন। আর এসব দেখে সোহেল সাহেব মনে মনে খুশি হন।
 

      মা-ছেলের মধ্যকার এই মধুর সম্পর্কের কথা শুনে হাসান বলে, “দেখলি? আমি বলেছিলাম না, একদিন তুই ভুল প্রমাণিত হবি?”

      “হ্যাঁ, আমি স্বীকার করছি। তবে এভাবে ভুল প্রমাণিত হওয়াতে আমার দুঃখ নেই। বরং আমি খুব আনন্দিত। আসলে আমি আমার সৎ মা'কে বুঝতে পারিনি। আর তিনিও কখনও মুখ ফুটে বলেননি যে, তিনি আমাকে নিজের সন্তানের মতোই ভালোবাসেন।” প্রতীক বলল।

      হাসান বলল, “ভালোবাসা আপন বা সৎ দ্বারা নির্ধারিত হয় না রে। ভালোবাসার জন্য একটা সুন্দর মন থাকতে চাই, আর সাথে থাকতে চাই আন্তরিকতা। তোর সৎ মা'র কাছে এগুলো রয়েছে। তুই খুব ভাগ্যবান।”

      হাসানের মুখ থেকে এসব সুন্দর কথা শুনে প্রতীকের খুব ভালো লাগল। সে দূরের নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির হাসি দিলো এবং নিজেকে সৌভাগ্যবান ভাবতে লাগল।

Comments

    Please login to post comment. Login