FF.
পর্ব ১ঃ শেষ ভয়েসনোট Book page

Chapter 1

পর্ব ১ঃ শেষ ভয়েসনোট

Nov 4, 2026 16 min read

পর্ব ১

—“তুই কি ল্যাপটপ নিয়ে এভাবেই আমার ঘুমের পিণ্ডি চটকাবি, নাকি নিজের ঘুমোতে যাবার ইচ্ছে নেই আজ?”

ল্যাপটপের নীলচে আলোয় কীবোর্ডটা তখনো ক্যাঁচক্যাঁচ করে চলছে। পাশের কিচেনে ফ্রিজ খোলার আওয়াজ হলো। সোহিনী একটা ঠান্ডা জলের বোতল হাতে নিয়ে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন গুলো ছুঁড়ে দিল খাটে নির্লজ্জের মত বসে থাকা ল্যাপটপটার দিকে।

দীপ্ত স্ক্রিন থেকে চোখ না সরিয়েই ঘাড়ের কাছে গোঁজা ব্লুটুথ ইয়ারপডটা একবার হাত দিয়ে ঠিক করে নিল।

—“আধ ঘণ্টা দে। কেস স্টাডিটার শেষ পার্টটা জাস্ট গুটিয়ে নিচ্ছি।”

—“পাগল নাকি রে তুই? রাত পৌনে একটা বাজে!” সোহিনী বিরক্ত হয়ে ঘরের ভেতরে এল, ওর হাতের  মিল্টনের বোতলটার বাইরে জমে থাকা ঠান্ডা জলের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে মেঝের ওপর। —“আর কতক্ষণ আদির নিখোঁজ হওয়ার চ্যাপ্টারটা নিয়ে মাথা খাবি? পুলিশ যা করার করছে, ওর ফ্যামিলিও তো বসে নেই... তুই একা একাই এখানে বসে কোন টাউটারি মারবি বল তো?”

দীপ্ত চেয়ার থেকে একটু নেমে গিয়ে পেছনে হেলান দিল। ক্লান্তিতে লাল হয়ে যাওয়া চোখ দুটো দিয়ে সোহিনীর দিকে তাকাল, তারপর বিছানার ওপর ইয়ারপডটা সশব্দে ফেলে দিল।

—“পুলিশ বালটা জানে, সোহি। হিস্ট্রি ঘাঁটতে গিয়ে কোনো পোড় খাওয়া গবেষক হঠাৎ করে ভ্যানিশ হয়ে যায় না। আর আদি তো এমন ছেঁদো ছেলে নয় যে সতেরো দিন ধরে নিজের ফোনটা সুইচড অফ করে বসে থাকবে।”

—“সুইচড অফ?” সোহিনী একটা তাচ্ছিল্যের নিঃশ্বাস ফেলল। —“কোনো রিমোট সাইটে গেছে যেখানে নেটওয়ার্কের বারোটা বেজে আছে! ও তো এমনই! গত বছর যখন বিষ্ণুপুরের ওই জঙ্গলটায় গেল, তখনও তিনদিন কারো সাথে যোগাযোগ রাখেনি।”

—“কিন্তু এবার বিষ্ণুপুর নয়,” দীপ্তর গলাটা হঠাৎ করেই একদম নেমে এল। ঘরের বসা বাতাসটা যেন এক পলকে ভারী হয়ে গেল। —“এবার মুর্শিদাবাদের বর্ডার। ওই শালার জঙ্গল আর পোড়ো বাড়িগুলোর ইতিহাস জানিস না তুই। ও আমাকে যে লাস্ট ভয়েস নোটটা পাঠিয়েছিল... ওটা নেটওয়ার্কের প্রবলেম ছিল না। আদির ওই গলা আমি চিনি না, সোহি!”

সোহিনী আর এগোতে পারল না। টেবিলের ওপর বোতল টা রাখতে গিয়ে ওর হাতটা একটু কেঁপে গেল। দীপ্তর মুখের এই অস্বাভাবিক থমথমে ভাবটা ও গত কয়েকদিন ধরে খেয়াল করছে।

—“কী বলছিল ও? এত কীসের ভয়?”

দীপ্ত তখন ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে। স্ক্রিন জুড়ে একটা পুরোনো গুগল আর্থের ম্যাপ, যার ঠিক মাঝখানের অংশটা একটা লাল কালিতে গোল করে মার্ক করা—‘ঘোষালবাড়ি’।

দীপ্ত দুহাতে মুখটা ঢেকে এক মুহূর্ত চুপ করে রইল, তারপর খুব অদ্ভুত একটা নিচু গলায় ফুসফুস করে উঠল—

“আমি জানি না ওখানে কী আছে। আদি আমাকে অনেকবার বলছিল... ওই বাড়ির ভেতরে কী যেন একটা বালের গণ্ডগোল আছে।... এক গ্লাস জল হবে রে?? জল?”

কথাগুলো বলতে বলতেই দীপ্তর নিজের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছিল। ঠিক যেন ওই ফোনের ওপ্রান্তে আদি নয়, দীপ্ত নিজেই ওই কোন ভূগর্ভস্থ ভল্টের অন্ধকার কোণটায় হাঁপাচ্ছে!

নিজের শোবার ঘরের পরিচিত পরিমণ্ডলে দাঁড়িয়েও দীপ্তর বুকের ভেতরের ধকপকানিটা থামছিল না। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমলেও ওর শরীর ভেতর থেকে বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসছিল। অথচ জানলার বাইরে কলকাতার আকাশ ভাঙা অকাল বর্ষণের এই রাতটা যথেষ্ট প্যাচপ্যাচে গরম ও হিমেল হাওয়ার মিশ্রণে অদ্ভুত এক অস্বস্তি তৈরি করেছিল।

দীপ্তর বন্ধু আদিত্য গোমস—আদি নামেই পরিচিত—নিখোঁজ হয়েছে আজ ঠিক সতেরো দিন। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার উন্মাদনা আর ইতিহাসের প্রতি অন্ধ আকর্ষণ তাকে তাড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের এক প্রায়-বিস্মৃত প্রান্তরে, মুর্শিদাবাদের ঠিক সীমানা ঘেঁষা এক জীর্ণ রাজবাড়িতে। আদির শেষ ফোনটা দীপ্তই পেয়েছিল। সেই ফোনের ওপ্রান্তে আদির স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর ছিল না, ছিল এক আদিম আতঙ্কের হাহাকার, আর তারও পেছনে... এক অদ্ভুত, ছন্দহীন খসখসে শব্দ। যেন কেউ শুকনো পাতার ওপর দিয়ে হেঁটে চলেছে, অথবা পুরোনো কোনো চামড়ার বাঁধানো খাতার পাতা উল্টাচ্ছে অবিরত।

-“যখন বুঝতেই পারছিস যে গোলমাল আছে, তাহলে কেন যাচ্ছিস ওখানে বাবু???” খানিকটা অবাক আর ভয় মেশানো কণ্ঠে বলে উঠল সোহিনী।

নিজের স্ত্রীর এই ভয় যে একটুও অমূলক নয়, তা দীপ্ত খুব ভালো করেই জানে। সে পেশায় মনস্তত্ত্ববিদ, মানুষের মনের গহন কোণের অন্ধকারগুলো ব্যবচ্ছেদ করাই তার কাজ। যুক্তি, তথ্য আর কার্যকারণ ছাড়া সে জীবনের আর কিচ্ছু বোঝে না। কিন্তু আজ, এই মুহূর্তে, তার সমস্ত পেশাদারী যুক্তিবাদের পাহাড়ের ওপর হঠাৎ করেই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়তে শুরু করেছে এক অন্যরকম অপরাধবোধ ও অব্যক্ত আতঙ্ক।

আদি ওকে বারবার ঘোষালবাড়ি  যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করেছিল। বলেছিল, “দীপ্ত, একবার শালা এখানে আয় ! তোর যুক্তি তর্ক পোঙার ভেতর ঢুকে যাবে। যেন একটা বদ্ধ জলাশয়ের মতো থমকে আছে। আমার হেবি ভয় করছে, আবার ম্যাগ্নেটের মতো আকর্ষণও বোধ করছি। ছেড়ে যেতে পারছি না বাঁড়া”…… 

না দীপ্ত যায়নি!  

সে তখন ব্যস্ত তার কেরিয়ার আর থেরাপি সেশনের জাঁতাকলে। ও তখন হাসিমুখে বলেছিল—‘এগুলো তোর মনের বিকার, আদি!’ আসলে ও ভয় পেয়েছিল আদির সেই অকাল-বার্ধক্যে আক্রান্ত, ভেঙে পড়া কণ্ঠস্বর শুনে। আজ আদি নেই, আর সেই না-থাকার শূন্যতা দীপ্তর ভেতরের এক পুরোনো, ক্ষতবিক্ষত অপরাধবোধের ছাই উসকে দিয়েছে। বছর তিনেক আগে ওদের ল্যাবরেটরির এক জুনিয়র গবেষক রহস্যজনকভাবে আত্মহত্যা করেছিল, আর সেই দিন ও সারাদিন টা ওর সাথেই কাটিয়েছিল। 

সোহিনী রান্নাঘর থেকে এক গ্লাস জল নিয়ে এল। কাঁচের গ্লাসে দীপ্তর কম্পিত হাতের ছায়াটা কেমন যেন বিকৃত ঠেকল। এক চুমুকে জলটা গিলে ফেলে দীপ্ত সোহিনীর দিকে তাকাল। সোহিনী একজন প্রতিভাবান চিত্রশিল্পী। ওর চোখদুটো সবসময় সাধারণ মানুষের আড়ালে থাকা রং, ছায়া আর রেখাকে নিখুঁতভাবে চেনে। আজ সেই চোখে কেবল ঘন কালচে রঙের জমাট বাঁধা উদ্বেগ।

“সোহি, তুই বুঝবি না,” দীপ্ত গ্লাসটা টেবিলে সজোরে নামিয়ে রেখে বলতে শুরু করল, গলাটা তখনও ভাঙা ও খসখসে। “এটা কেবল আদির নিখোঁজ হওয়া নয়। এটা আমার ভেতরের এক দায়বদ্ধতা। আদি যা খুঁজছিল, তার অর্ধেক উত্তর আমার ড্রয়ারের ফাইলে বন্দি। আমরা দুজনে মিলে একটা প্রাচীন তান্ত্রিক লিপি নিয়ে কাজ করছিলাম। ও প্র্যাকটিক্যাল ফিল্ডে নেমেছিল, আমি থিওরিটিক্যাল সাইকোলজিতে। ও যেখানে এসে আটকে গেছে, সেখান থেকেই আমাকে শুরু করতে হবে।”

সোহিনী আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না, সোজা জানলার কাঁচের প্যানে গিয়ে হাত রাখল। বাইরে বৃষ্টির ছাঁট কাঁচের গায়ে তীব্র বেগে আছড়ে পড়ছে, যেন কোনো অদৃশ্য সত্তা ভেতরে ঢোকার জন্য আকুল হয়ে নখ দিয়ে আঁচড়াচ্ছে। ও খুব ধীর গলায়, যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলছে এমনভাবে বলল, “আমি রেখা বুঝি দীপ্ত, রং বুঝি। ক্যানভাসের ওপর যখন তুলি চালাই, তখন বুঝতে পারি কোন রংটা বাস্তবের আর কোনটা কল্পনার। কিন্তু তুই যে অন্ধকারের কথা বলছিস, সেখানে তো কোনো আলো নেই। সেখানে কেবল আলো শুষে নেওয়ার এক অনন্ত গহ্বর। আদি কোনভাবে সেই গহ্বরে হারিয়ে গেছে। আর তুই সব জেনেশুনে সেই গহ্বরের দিকেই পা বাড়াচ্ছিস… কেন?”

দীপ্ত কোনো উত্তর দিল না। ও ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে সোহিনীকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সোহিনীর শরীরটা যেন বরফের মতো ঠান্ডা। দীপ্ত অনুভব করল, ওদের দুজনের মাঝখানে মাংসের বা ভালোবাসার কোনো দেয়াল নেই, রয়েছে এক অদৃশ্য শীতল শূন্যতা। ও সোহিনীকে বলতে চাইল, ‘ভয় পাস না সোনা, আমি কদিন বাদেই ফিরে আসব।’ 

কিন্তু সান্ত্বনার এই সহজ কথাগুলো ওর গলার কাছে আসতেই আটকে গেল। গলায় যেন কেউ কাঁটা ফুটিয়ে দিয়েছে। ঠিক সেই মুহূর্তে ওদের ঘরের দেওয়ালের বড় আয়নাটায় হঠাৎ করেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলার মতো বাষ্প জমে গেল, অথচ ঘরের তাপমাত্রা বেশ উষ্ণ ছিল! এক অদ্ভুত দেজা-ভুর অনুভূতি দীপ্তর সমস্ত স্নায়ুকে অসাড় করে দিল। ওর মনে হলো, এই কথোপকথনটা, এই বৃষ্টির রাতটা, এই ভয়ের আবহটা অতীতেও কোনো এক জন্মে ঠিক এভাবেই ঘটেছিল।

পরদিন ভোরে, কাল রাতের অকাল বর্ষণ থামলেও কলকাতার আকাশটা কেমন যেন সিসে রঙের চাদরে ঢাকা রইল। শহরটা তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। শিয়ালদা স্টেশনের চেনা কোলাহল, হকারদের চিৎকার, ট্রেনের হুইসেল—সবই যেন কেমন একটা কুয়াশাচ্ছন্ন পর্দার আড়াল থেকে ভেসে আসছে। দীপ্তর এক হাতে চামড়ার সুটকেস, অন্য হাতে আদির পাঠানো সেই অসমাপ্ত লিপি আর কিছু ময়লাটে গবেষণার নোটস। কলেজ স্ট্রিটে কিছু বইয়ের দোকানে কিছু কেনাকাটা আর এক সিনিয়রের সাথে একটু কথা বলার আছে বলে সকাল সকাল বেরিয়েছে। লাটুবাবু লেনে গিয়ে আগে সিনিয়রের সাথে কথা বলে তারপর কলেজ স্ট্রিটে যাবে এই চিন্তা ভাবনা আছে। ওর ট্রেন বিকেল ৩ টে। 

নিজের কাজ সেরে ট্রেনের জানলার ধারের সিটে বসে দীপ্ত বাইরে ঝাপসা হয়ে আসা দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে রইল। শহর ছাড়িয়ে একটু একটু করে এগোতেই শুরু হলো সবুজ ধানক্ষেত, তারপর ক্রমশ রুক্ষ লাল মাটির প্রান্তর। ট্রেনের চাকার একঘেয়ে ছান্দসিক শব্দ ওর অবচেতন মনে আদির সেই শেষ ফোনের খসখসে শব্দটার সাথে নিখুঁতভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল।

ট্রেনে উঠে ঝালমুড়িওয়ালার থেকে দু’বার মুড়ি কিনল। সবে ঠোঙা খুলে খেতে যাবে তক্ষুনি—

—একটু সরে বসা যাবে স্যার?

চোখ ফিরিয়ে দীপ্ত দেখতে পেল একটা পাতলা ফুলহাতা জামা, ময়লা ফুলপ্যান্ট, পাতলা কিন্তু মাথার প্রায় পুরোটাই কভার করা চুল, আর সুগভীর উজ্জ্বল চোখ নিয়ে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিয়েছেন বছর পঞ্চাশের এক ভদ্রলোক। তাঁর কাঁধে একটা মলিন চট বা ঝোলা ঝোলানো।

সরে বসল দীপ্ত। সিটটা একটু চেপে গেল।

ভদ্রলোক জানলার ধারের দিকে নিজের জায়গাটা একটু গুছিয়ে নিয়ে বসলেন, একটু হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “ধন্যবাদ স্যার। যা ভিড় আজ ট্রেনে!”

—তা কলকাতা থেকে বুঝি? কোথায় যাওয়া হবে স্যারের? ভদ্রলোক একটু কৌতূহলী হয়েই জিগ্যেস করলেন।

—কাশিমবাজার। প্রায় নির্লিপ্তভাবে বলে ওঠে দীপ্ত।

—কাশিমবাজার বলছেন? সে তো বেশ ভালো জায়গা! ওই রানি স্বর্ণময়ীর রাজবাড়ি, কুঠিবাড়ি, হাতিশালা দেখতে যাচ্ছেন নাকি বেড়াতে? নাকি আবার অফিসের কোনো কাজে? ভদ্রলোকের গলার স্বরে একটা চেনা মানুষের মতো ঘরোয়া কৌতূহল মেশানো।

দীপ্ত একটু অস্বস্তি কাটানোর চেষ্টা করে বলল, “না, সেভাবে বেড়াতে নয়। একটু ব্যক্তিগত কাজই আছে।”

—বুঝেছি, বুঝেছি। ওই দিকটায় পুরোনো জমিদার বাড়িগুলোর একটা আলাদা ব্যাপার আছে ঠিকই, তবে একা একা গেলে একটু সাবধানে থাকবেন। আজকাল ওই চত্বরে কেমন যেন একটা থমথমে ভাব থাকে সন্ধ্যা নামলে। ভদ্রলোক আর বেশি কথা বাড়ালেন না, পকেট থেকে একটা ছোট্ট খৈনির  প্যাকেট বের করে জানলার দিকে মুখ করে বসলেন।

ট্রেনটা তখন একটানা শব্দে এগিয়ে চলেছে বহরমপুরের দিকে। কামরার ভেতরে লোকজনের বকবকানি ধীরে ধীরে কমে আসছে। জানলার বাইরে রোদের তেজ ফুরিয়ে আকাশটা খয়েরি থেকে আস্তে আস্তে ছাইরঙা হয়ে উঠছে।

ভদ্রলোক খৈনি চিবোতে চিবোতে হঠাৎ পাশ ফিরে দীপ্তকে জিজ্ঞেস করলেন, “তা মশাই, একা একা এই বয়সে কাশিমবাজারের ওই পুরোনো পাড়ায় কোন্ কাজে যাওয়া হচ্ছে বলুন তো? আজকালকার যুবকেরা তো ওই দিককার পোড়ো বাড়ি বা পুরোনো ইতিহাসের নাম শুনলেই এড়িয়ে চলে, আর আপনারা হুট করে চলেছেন।”

দীপ্ত একটু ত্যক্ত হয়েই পকেট থেকে একটা ফাইল বের করার ভান করল, যাতে ভদ্রলোক আর কথা না বাড়ান। ও বলল, “একটা পুরোনো পারিবারিক গবেষণার কাজ আছে, কিছু নথিপত্র মেলাতে হবে।”

—নথিপত্র? ভদ্রলোক যেন একটু খ্যাক করে অদ্ভুতভাবে হেসে উঠলেন। খৈনির ময়লা লালমিশ্রিত থুতু জানলার বাইরে ফেলতে ফেলতে বললেন, “নথিপত্র তো অনেক আছে স্যার, কিন্তু সব নথি কি আর আলোর দেখা পায়? কিছু নথি মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকে, আর কিছু দাদাপার্টি আর দিদি পার্টি চাপা দিয়ে দেয়। আচ্ছা, আপনার কোনো চেনা লোক কি ইদানীং ওই এলাকায় নিখোঁজ হয়েছে? মানে আমি বলছিলাম কি, আজকাল ওই রাজবাড়ির আশপাশে কেমন যেন একটা অদ্ভুত কানাঘুষো শোনা যায়…”

দীপ্তর হাত দুটো এক মুহূর্তে থমে গেল। ফাইলের পাতা উল্টোনোর গতিটা বন্ধ হয়ে গেল। ও শক্ত গলায় বলল, “আপনি এসব কেন বলছেন বলুন তো?”

—একটু খোঁজখবর রাখি কিনা !

এরপর ওই ভদ্রলোক আর কোনো উত্তর দিলেন না। কেবল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিটে একটু হেলান দিয়ে চোখ বুজলেন। ট্রেনের গতি তখন একটু কমে এসেছে, সামনেই স্টেশন। কামরার আলোটা একবার দপদপ করে কেঁপে উঠল।

ট্রেনটা যখন বহরমপুর কোর্ট স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে এসে সশব্দে থেমে গেল, তখন চারপাশের বাতাসে একটা ঝিম ধরা ক্লান্তির ভাব। দীপ্ত সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। পকেটের ফাইলটা হাত দিয়ে একবার ভালো করে চেক করে নিল। জানলার ধারের সেই রহস্যময় ভদ্রলোক তখনও চোখ বন্ধ করে সিটে বসে রয়েছেন, যেন তিনি কোথাও নামবেন না বা তাঁর কোনো তাড়া নেই।

দীপ্ত কামরা থেকে নেমে ভিড় ঠেলে প্ল্যাটফর্মে পা রাখল। স্টেশনটা সন্ধের মুখে বেশ থমথমে দেখাচ্ছে। কুলিদের তেমন কোনো চিৎকার নেই, গুটিকয়েক যাত্রী দ্রুত পায়ে স্টেশন চত্বর ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।

ওভারব্রিজের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার সময় দীপ্তর মনে হলো, ঠিক ঘাড়ের ওপর একটা ঠান্ডা নিঃশ্বাস পড়ল। আর অমনি কেউ যেন একদম কানের কাছে ফিসফিস করে বলে উঠল—*‘দীপ্তবাবু... বেশি দেরি করে ফেললেন না তো?’*

বজ্রাহতের মতো চমকে পেছনে ফিরে তাকাল দীপ্ত। কিন্তু না, সিঁড়িতে আর কেউ নেই। কেবল অনেক উঁচুতে ঝুলতে থাকা একটা মরচে পড়া ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় ওর নিজের লম্বা ছায়াটা ফ্যাকাশে দেওয়ালের গায়ে কেমন যেন কুঁকড়ে রয়েছে। রেলিংয়ের কোণটায় কে যেন একটা আধখাওয়া বিড়ি ফেলে গেছে, যেখান থেকে তখনো পাকিয়ে পাকিয়ে ধোঁয়া উঠছে। অথচ এই সিঁড়ি দিয়ে তো এইমাত্র ও ছাড়া আর কেউ নামল না!

গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল দীপ্তর। বুকটা ঢাকের জালের মতো দুমদাম করে কাঁপছে। নিজেকে কোনোমতে সামলে ও চটজলদি ভিড় পেরিয়ে স্টেশন চত্বরে এসে পৌঁছাল। প্ল্যাটফর্মের ওই নিস্তব্ধতা আর এই আকস্মিক ফিসফিসানিটার মধ্যে একটা গাঢ় রহস্য যেন ওর পিছু ছাড়ছে না। সময় নষ্ট না করে ও তাড়াতাড়ি চত্বর থেকে একটা রিকশা নিল।

—কাশিমবাজার বড় রাজবাড়ির মোড় যাবেন?

রিকশাওলা প্রথমে একটু ইতস্তত করল। তারপর বলল, “এত রাতে ওদিকে যাবেন বাবু? ওই রাজবাড়ির চত্বরটায় তো আজকাল সন্ধের পর লোকজন তেমন একটা যায় না।”

—আমার একটু জরুরি কাজ আছে। চলুন না ভাই, ডবল ভাড়া দেব। দীপ্তর গলায় একটা তাড়া আর জেদ দুটোই মিশে ছিল।

রিকশাওলা আর দ্বিরুক্তি করল না। রিকশা চলতে শুরু করল। পিচঢালা রাস্তা কখন যেন হারিয়ে গেছে, তার জায়গায় শুরু হয়েছে এবড়োখেবড়ো ইটের সুরকি দেওয়া পথ। রাস্তার দুপাশে অঝোরে বেড়ে ওঠা ঘন বাঁশঝাড়, আর মাঝে মাঝে অন্ধকার গিলে খাওয়া পুরোনো জমিদার বাড়ির ভাঙা ইকর-মকর দেওয়া কঙ্কাল। গোধূলির শেষ আলোটুকু হুড়মুড় করে নিভে গেল, আর তার জায়গায় নেমে এল এক ঘন, বেগুনি-কালো অন্ধকার। বাতাসের আর্দ্রতা হঠাৎ বহু গুণে বেড়ে গেল, সাথে নাকে এল একটা অদ্ভুত পচা জলাভূমির কটু গন্ধ—যেন বহুদিনের বদ্ধ জল আর শুকিয়ে যাওয়া রক্তের গন্ধ।

দীপ্ত পকেট থেকে মোবাইলটা বের করল। নেটওয়ার্কের সিগন্যাল পুরো জিরো—'নো সার্ভিস'। অথচ এই কিছুক্ষণ আগেও তো ঠিকই কাজ করছিল। ওর বুকের ভেতরে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। আদি ঠিক এই রাস্তা দিয়েই কি তবে ঘোষালবাড়ির দিকে গেছিল? 

হঠাৎ রিকশাটা একটা জোরালো ঝাঁকুনি খেয়ে থেমে গেল। রিকশাওলা ঘামতে ঘামতে সিট থেকে নেমে পড়ে বলল, “বাবু, আর এক পাও এগোব না। ওই দেখুন সামনে রাজবাড়ির গেট। আমি এর চেয়ে ভেতরে গেলে আর ফিরতে পারব না।”

দীপ্ত ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে রিকশা থেকে নেমে পড়ল। সামনেই দাঁড়িয়ে রয়েছে সেই প্রকাণ্ড, জীর্ণ রাজবাড়ি— ‘ ‘ঘোষালবাড়ি’। অন্ধকার আর কুয়াশায় মোড়া তার সেই বিশাল ডালপালা ছড়িয়ে থাকা লোহালক্কড় আর ভাঙা গম্বুজ। দীপ্ত গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তারপর সামনের সেই মরিচা পড়া গেটটার দিকে এগিয়ে গেল। নেমপ্লেট টা দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থেকে যত্নের অভাবে ঘষে গিয়ে উঠে গেছে। 

ক্লান্তিতে দীপ্ত চোখ বন্ধ করল। চোখের পাতা নামতেই অন্ধকারের ভেতরের এক অদ্ভুত অন্ধকার ওকে গিলে খেতে চাইল। সেখানেও ও দেখতে পেল সোহিনীর আঁকা সেই আধো-সমাপ্ত ছবিটা—যা সে গত সপ্তাহে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছিল। একটা বিশাল, জীর্ণ ভিক্টোরিয়ান আমলের দালান, যার থামগুলো কুয়াশায় অর্ধেক ঢাকা, আর প্রবেশপথটা যেন একটা হা-করা অন্ধকারের গুহা। ছবিটার নিচে সোহিনী নাম দিয়েছিল—'স্মৃতির সরণি'। দীপ্ত তখন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বলেছিল, ‘এসব কি আলবাল আঁকছিস সোহি !’ আজ সকালে ট্রেন ছুটতে ছুটতে ওর মনে হলো, সোহিনী কি তবে অবচেতনে ওই ঘোষালবাড়িরই ছবি এঁকেছিল? শিল্পীরা কি তবে সচেতন মনের অনেক বাইরে গিয়ে ভবিষ্যতের কোনো অভিশপ্ত ইঙ্গিত আগে থেকেই দেখতে পায়? দীপ্ত, একজন পোড় খাওয়া মনস্তত্ত্ববিদ হয়েও, আজ এই সাধারণ প্রশ্নের সামনে একেবারে অসহায় বোধ করল। কেমন দেজাভু দেজাভু লাগছে না?

দীপ্তর মাথার ভেতরটা কেমন যেন ঝিমঝিম করে উঠল। ওর মনে হলো, ও কেবল ভৌগোলিক দূরত্ব অতিক্রম করছে না, ও যেন কোনো এক জাদুমন্ত্রের প্রভাবে বাস্তব পৃথিবী থেকে কেটে টুকরো হয়ে অন্য কোনো মাত্রায় চলে যাচ্ছে। 

দীপ্ত নিজের পকেট থেকে লাইটটা বের করে কোনোমতে জ্বালল। টর্চের সেই দুর্বল আলো ঘোষালবাড়ির প্রকাণ্ড গেটের সামনে পড়তেই ও আবিষ্কার করল, গেটের গায়ে লোহার শিকগুলোর সাথে জড়িয়ে রয়েছে অজস্র শুকনো লতাগুল্ম, যা দেখতে অবিকল মানুষের জট পাকানো চুলের মতো। ও সাহস সঞ্চয় করে সামনে এগোল। আর ঠিক তখনই এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল—ও যেখানে পা রাখল, সেখানে মাটিটা হঠাৎ কেমন যেন ডেবে গেল। 

দীপ্ত আর এক মুহূর্তও দেরি না করে মরচে ধরা গেটটা দুটো হাত দিয়ে সজোরে ঠেলল। আশ্চর্যের বিষয়, কোনো ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ হলো না, গেটটা নিজে থেকেই দুপাশে গলে যাওয়ার মতো করে খুলে গেল—যেন ও বহুক্ষণ ধরে দীপ্তেরই অপেক্ষায় প্রহর গুনছিল। ও বাড়ির প্রধান চত্বরে পা রাখল। চারপাশের নিস্তব্ধতা এতটাই ভারী যে দীপ্ত নিজের হৃৎপিণ্ডের ধকধক শব্দ নিজের কানের ভেতরে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিস। মাথার ওপর একটাও তারা নেই, কেবল মাথার ওপরে জমাট কালো মেঘের চাদর।

দালানের প্রধান বিশাল প্রবেশপথের দিকে এক পা এক পা করে এগিয়ে যাওয়ার সময় দীপ্তর মনে হলো, ওর ঠিক বাঁ কাঁধের পাশ দিয়ে কেউ যেন নিঃশব্দে হেঁটে গেল। একরাশ বরফঠান্ডা হাওয়া ওর ঘাড় ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল। ও চমকে ঘাড় ঘুরিয়ে ফেলল—কিন্তু সেখানে কেউ নেই। কেবল কুয়াশার চ্যাপ্টা, নড়াচড়া করা কিছু অবয়ব। ও আবার সামনের দিকে দৃষ্টি দিল। আর তখনই সেই পরিচিত শব্দটা ওর কানে এল—খসখস… খসখস… ঠিক যেন কেউ পুরোনো লাইব্রেরির কোনো নিষিদ্ধ বইয়ের পাতা উল্টে চলেছে, একটানা, নিখুঁত ছন্দে।

হঠাৎ ঘরের গভীর অন্ধকার থেকে ভেসে এল এক বৃদ্ধের মন্থর কণ্ঠস্বর। দীপ্ত ভয়ে থরথর করে কেঁপে উঠল এবং টর্চটা সেই শব্দের উৎসের দিকে ঘোরাল। হলঘরের এক কোণে, একটা উইয়ে খাওয়া পুরোনো কাঠের চেয়ারে বসে আছেন এক অদ্ভুত বৃদ্ধ। তাঁর গায়ে বহু পুরোনো একটা রেশমি জোব্বা, চুলগুলো কাঁধ পর্যন্ত ছড়ানো, আর চোখের কোটর দুটো এতই গভীর যে মনে হলো সেখানে কোনো চোখই নেই, কেবল অন্ধকারের দুটো জ্বলজ্বলে গহ্বর।

দীপ্ত কোনোমতে নিজের গলাটা পরিষ্কার করে কাঁপাকাঁপা গলায় বলল, “আমি… আমি দীপ্তজিত বর্মণ । আমি আদি মানে আদিত্য গোমসকে খুঁজতে এসেছি। সে কোথায়?”

বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন। সে হাসিতে দাঁতগুলো এমনভাবে চকচক করে উঠল যা মানুষের নয়। “আদিত্য রায়? ওহ, সেই চঞ্চল ছেলেটি! সে তো অনেক আগেই এসে পৌঁছেছে। সে এখন আর বাইরে নেই, সে এই দেওয়ালের ভেতরে মিশে গেছে। সবাই এখানেই থাকে, দীপ্তবাবু। কেউ বাইরে যায় না।”

“কোথায় সে? আমাকে তার কাছে নিয়ে চলুন!” দীপ্ত আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে এক পা এগিয়ে গেল।

বৃদ্ধ আর কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি তাঁর হাত দুটো চেয়ারের হাতলে রেখে অদ্ভুত ভঙ্গিতে নাড়াতে লাগলেন। দীপ্ত টর্চের আলোটা ওনার হাতের দিকে ফেলতেই শিউরে উঠল—বৃদ্ধের হাতের আঙুলগুলোর জায়গায় কেবল কিছু মাংসের তাল ঝুলছে, নখ বা হাড়ের কোনো চিহ্ন নেই! যেন কেউ অতীতে কোনো নিষ্ঠুর শাস্তিতে তাঁর আঙুলগুলো কেটে নিয়েছিল।

দীপ্ত পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। ওর মাথার ভেতরকার সমস্ত লজিক, সমস্ত সাইকোলজির থিওরি মুহূর্তে তাসের ঘরের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ও বুঝতে পারল, ও কোনো সাধারণ পোড়ো বাড়িতে আসেনি, ও এমন এক মায়ার জালে এসে পড়েছে যেখানে সময় আর স্থান নিজের অর্থ হারিয়ে ফেলেছে। এই ঘর, এই বৃদ্ধ, এই পচা গন্ধ, এই জানলার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ছায়াগুলো—সবই যেন ওর অবচেতনের গভীরতম অপরাধবোধের মূর্ত রূপ।

বৃদ্ধ এবার ফিসফিস করে বলে উঠলেন, “এখানে ঘড়ি চলে না, বাবু। এখানে কেবল স্মৃতিরা বেঁচে থাকে। তুই তোর নিজের জীবনের সব পাপ, সব ধামচাপা দেওয়া সত্যগুলোকে সাথে নিয়ে এসেছিস। দেখ… তোর পেছনের দেয়ালে দেখ কী ঝুলছে!” 

দীপ্ত আতঙ্কিত হয়ে পেছনে তাকাল। বিশাল হলঘরের বিবর্ণ পলেস্তারা ওঠা দেওয়ালে হঠাৎ করেই যেন প্রজেক্টরের পর্দার মতো ভেসে উঠল এক বীভৎস দৃশ্য—তিন বছর আগের সেই ল্যাবরেটরি, যেখানে সেই জুনিয়র গবেষক ছটফট করতে করতে মারা যাচ্ছে, আর দীপ্ত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিছু করতে পারছে না ! দৃশ্যটা দেখে দীপ্তর মাথা ঘুরে উঠল। ও অনুভব করল, ওর নিজের পায়ের তলার মাটি ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে, ও যেন মহাশূন্যে তলিয়ে যাচ্ছে।

“না! এসব মিথ্যা! এগুলো আমার অবচেতন মনের বিকার!” দীপ্ত চিৎকার করে উঠল।

“অবচেতন?” বৃদ্ধের অশরীরী গলাটা পুরো হলঘরে প্রতিধ্বনিত হলো। “এখানে অবচেতন বা সচেতন বলে কিছু নেই রে পাগল! যা দেখছিস, সবই সত্যি। তুই এই বাড়ির জালে আটকে গেছিস।”

ঠিক সেই মুহূর্তে ওপরের তলা থেকে একটা ভারী পায়ের শব্দ শোনা গেল—ধুপ… ধুপ… ধুপ… যেন কেউ খুব ভারী বুট জুতো পরে ছাদের ওপর হাঁটছে। আর সাথে সেই খসখস শব্দ—খসখস… খসখস… কেউ যেন সময়ের বিশাল খাতার পাতাগুলো একের পর এক উল্টে চলেছে, আর প্রতিটা পাতা ওল্টানোর সাথে সাথে দীপ্তর জীবনের একটা করে বছর চোখের সামনে থেকে মুছে যাচ্ছে।

দীপ্ত টর্চটা হাত থেকে ফেলে দিল। কাঁচ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। অন্ধকার এসে ওর সারা শরীরকে পেঁচিয়ে ধরল। ও আর নড়তে পারল না। ও বুঝতে পারল, ও আর কলকাতার সেই নামকরা মনস্তত্ত্ববিদ দীপ্তজিত বর্মণ  নেই; ও এই ঘোষালবাড়িরই একটা প্রাচীন অভিশপ্ত অংশ হয়ে গেছে। 

চারপাশের সমস্ত শব্দ মুছে গেল। কেবল আঁধারের এক অনন্ত, নিঃসীম কুহক এসে দীপ্তকে চিরতরে গ্রাস করে নিল।



Picked up where you left off

Conversation

(0)

Log in to join the conversation.

No comments on this chapter yet.